একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই তার চারপাশে দেখছে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক পরিবেশ। সে দেখছে সমাজ তাকেই মর্যাদা দিচ্ছে যার টাকা আছে। যার জ্ঞান আছে সে যেন অনেকটা করুণার পাত্র।

ভালো চাকরিই তরুণদের লেখাপড়ার উদ্দেশ্য

 

নতুন প্রজন্ম দেখছে, টাকা থাকলেই সমাজ সম্মান করে

০০ আসিফুর রহমান সাগর

Kids and Money

শিক্ষা অন্তে একটি চাকরি-আমাদের সমাজে প্রতিটি তরুণেরই লক্ষ্য যেন এই একটাই। প্রতিটি তরুণের মাঝে এই ধারণা পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে যে, পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্যটাই হচ্ছে চাকরি করার জন্য নিজেকে তৈরি করা। আর শুধু চাকরি করাই নয়, তার অন্তর্নিহিত লক্ষ্য হচ্ছে এমন চাকরি যা বিশাল অংকের বেতনও নিশ্চিত করবে। পড়াশোনার মূল লক্ষ্য যে জ্ঞান অর্জন; যে জ্ঞান তাকে সমৃদ্ধ করবে, আলোকিত করবে তার সমাজকে তার দেশকে- এমন ধারণা তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশই পোষণ করে না। দেশের সামাজিক কাঠামো এমনভাবেই গড়ে উঠেছে যে, এই ধারণা তাদের মনে জন্মাবার সুযোগটাও নেই।

আজকের তরুণ আগামী দিনের ভবিষ্যৎ- এমন কথা সবাই মুখে বললেও কাজে তার প্রমাণ মেলে না। তরুণদের গড়তে কী একটা সুষ্ঠু শিক্ষাকাঠামো তৈরি করা গেছে? এমন প্রশ্ন নিয়ে আমরা কথা বলেছি দেশের রাজনীতিবিদ, সমাজচিন্তাবিদ, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে। তারা বলছেন, না। জ্ঞান অর্জনের জন্য যে শিক্ষা পদ্ধতি, তা আমরা তৈরি করে দিতে পারিনি তরুণ প্রজন্মের সামনে। অদূর ভবিষ্যতে যে পারা যাবে, এমন আশার কথাও বলতে পারেননি কেউ। এর মূল কারণ হিসাবে তারা চিহ্নিত করেছেন, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, শিক্ষার দুর্বর্ৃত্তায়ন, শিক্ষার রাজনীতিকরণ- এই তিনটি মিলে দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়েছে। ফলে তরুণরা ধাবিত হচ্ছে যেনতেনভাবে অর্থ উপার্জনের দিকে।

সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমরা আজো বের হয়ে আসতে পারিনি। তখন একশ্রেণীর কেরানি তৈরির জন্য শিক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমানে দেশে পুঁজির বিকাশ ঘটেছে, এখন সেই পুঁজিপতিদের মুনাফা বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে লেখাপড়ার প্রসার ঘটছে। বাংলাদেশের মাটি, প্রকৃতিনির্ভর যে শিক্ষা ব্যবস্থা তা আজ পর্যন্ত গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সামাজিক অবস্থা বিচার করে তার ভিত্তিতে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ’তে ভর্তি হয়েছেন রাজশাহীর বাসিন্দা সাদমান সাকিব। তিনি বলেন, বাবার ইচ্ছা আমি ডাক্তারি পড়ি। আর মা চান যা পড়লে ভাল বেতনের চাকরি পাওয়া যাবে আমি তেমন কিছু পড়ি। আমি অংক করতে ভালবাসি। আমি অংক নিয়ে পড়তে চাই। কিন্তু সেটা মা-বাবা কেউ একদিনও জিজ্ঞেস করেননি তুমি কী পড়তে চাও। ফলে এখনকার ট্রেন্ড বিবিএ’তে ভর্তি হলাম। সবাই খুশি।

ঢাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের নবম স্ট্যান্ডার্ডের ছাত্রী মেহজাবিন তানজিলা। সে জানায়, আমি ছবি অাঁকতে ভালবাসি। কিন্তু পড়াশোনা করবো বিবিএ’তে। কেন? পেইন্টিং নয় কেন? তানজিলার সাফ জবাব, ওই বিষয়ে পড়লে ভাল চাকরি মিলবে না। ছবি অাঁকা আমার শখ। কিন্তু ক্যারিয়ার করবো অন্যদিকে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলী খান বলেন, বাংলাদেশের জনসম্পদ সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই সম্পদকে কাজে লাগাতে হলে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে হবে। যে লেখাপড়া করতে চায় তাকে যেমন সুযোগ করে দিতে হবে, যে কাজ করতে চায় তারজন্যও কর্মমুখী পড়াশোনা ও কর্মক্ষেত্র প্রস্তুত এবং আর্থিক স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি সনদমুখী হয়ে পড়েছে। শিক্ষার বিস্তার ঘটানো আর তাকে সস্তা করে ফেলা এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থীকে মননশীল, যুক্তিবাদী হিসাবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নেই। এতে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে কিন্তু মান বাড়ছে না। শিক্ষা ব্যবস্থার এই যে দুরবস্থা এর আরেকটা কারণ- এই শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠে পরে যারা শিক্ষকতা শুরু করেছেন তাদের মধ্যেও নেই সেই মননশীলতা। ফলে এই শিক্ষক শ্রেণীর হাতে পড়ে এখন পড়াশোনা হয়ে পড়েছে নোটনির্ভর, কোচিংনির্ভর। তবে তিনি নতুন শিক্ষানীতির প্রশংসা করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ-বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন তরুণ যদি চাকরি লাভের আশায় পড়াশোনা করতে চায় তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু আমরা সেই কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাই তরুণ প্রজন্মের সামনে দিতে পারিনি। সাধারণ বিএ, এমএ পাস করে চাকরি পাওয়া যে সম্ভব নয় এটা আমরা সবাই জানি। তারপরও সবাই সুযোগের অভাবে সেই বিএ, এমএ পাস করে চাকরির বাজারে জায়গা করে নেবার জন্য অহর্নিশ শক্তিক্ষয় করে ক্লান্ত, অবসন্ন। সুতরাং যে তরুণ কাজ করতে চায় তার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের পরই দ্রুত কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়ার বা কাজ শেখার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। আর যারা উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করতে চায় বা যাদের যোগ্যতা রয়েছে তাদের জন্যও চাই সেই বিশেষ সুযোগের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই তার চারপাশে দেখছে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক পরিবেশ। সে দেখছে সমাজ তাকেই মর্যাদা দিচ্ছে যার টাকা আছে। যার জ্ঞান আছে সে যেন অনেকটা করুণার পাত্র। এই স্বেচ্ছাচারী অর্থনীতি তাকে শেখাচ্ছে টাকা না থাকলে সমাজে কোন অবস্থান নেই। এখানে পড়াশোনার কোন প্রয়োজন নেই। ফলে তারা ক্ষমতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ধাবিত হচ্ছে অর্থ উপার্জনের দিকে- জ্ঞান অর্জনের দিকে নয়।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to একটি শিশু ছোটবেলা থেকেই তার চারপাশে দেখছে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক পরিবেশ। সে দেখছে সমাজ তাকেই মর্যাদা দিচ্ছে যার টাকা আছে। যার জ্ঞান আছে সে যেন অনেকটা করুণার পাত্র।

  1. Mirza Faruk বলেছেন:

    We need to raise voice against this issue, A country only can improve & prosper well when its education system is well organized……….

    Mr.Hasan, Pls keep writing on this kind issue………

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: