কাশ্মীরের তেঁতোফল

কাশ্মীরের তেঁতোফল

বুকার পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতের লেখিকা ও মানবাধিকারকর্মী অরুন্ধতী রায়। ভারতের মাওবাদী আন্দোলনের ওপর ‘ওয়াকিং উইথ কমরেডস’ এবং ‘দ্য ট্রিকলডাউন রেভ্যুলিউশন’ শিরোনামের দুটি সাড়াজাগানো দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। এরপর নয়াদিল্লিতে কাশ্মীরের ওপর এক সেমিনারে প্রথাবিরোধী বক্তব্য রেখে যথেষ্ট আলোচিত এবং আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি কাশ্মীর পরিভ্রমণ করে তার সরেজমিন অভিজ্ঞতার আলোকে লেখেন ‘কাশ্মীর’স ফ্রুইস অব ডিসকর্ড’ শিরোনামের নিবন্ধ। কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবনের সুবিধার্থে নিবন্ধটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর : নেয়ামুল হক

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে ২০০৮ সালে ওবামা বলেছিলেন, কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন প্রশ্নে জন্ম নেওয়া বিরোধের নিষ্পত্তি করাটা তার জন্য হবে কঠিন একটা কাজ। ১৯৪৭ সালের পর থেকে কাশ্মীরকে ঘিরে ভারত ও পাকিস্তান তিন দফা যুদ্ধে জড়ায়। তার বক্তব্য সেদিন ভারতে উদ্বেগ ও শঙ্কার জন্ম দিয়েছিল এবং তখন থেকে আজ পর্যন্ত বলতে গেলে তিনি আর কাশ্মীর নিয়ে কোনো কথাই বলেননি। কিন্তু ভারত সফরকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র কাশ্মীরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের সদস্যপদ লাভকে সমর্থন জানাবে ঘোষণা দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আনন্দে ভাসিয়ে দেন। আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গিতে সন্ত্রাসবাদের হুমকি সম্পর্কে বক্তব্য দিলেও কাশ্মীরে সংঘটিত মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা নিয়ে একটি কথাও বলেননি তিনি।

কাশ্মীর প্রশ্নে ওবামা তার অবস্থান আবারো পাল্টাবেন কি না তা বেশ কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। যেমন আফগানিস্তানে যুদ্ধের অবস্থা কী দাঁড়ায়, পাকিস্তানের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কতটা সাহায্য প্রয়োজন এবং চলতি বছরেরই শীতে ভারত সরকার যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিমান কিনবে কি না। (৫.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ১০টি বোয়িং সি-১৭ গ্লোবমাস্টার ৩ বিমানের জন্য আদেশ দেওয়া আছে। এ ছাড়াও আরো বিপুল পরিমাণ বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রস্তাব বিবেচনাধীন। এগুলোই কাশ্মীর প্রশ্নে প্রেসিডেন্ট ওবামার নীরবতার কারণ বলে মনে হয়)। তবে ওবামার নীরবতা কিংবা কাশ্মীরের ব্যাপারে তার নাক গলানো, কোনোটাই কাশ্মিরী জনগণকে তাদের অবস্থান থেকে সরাতে পারবে না। দিনদশেক আগে আমি কাশ্মীর গিয়েছিলাম। পাকিস্তান সীমান্তের সেই সুদৃশ্য উপত্যকাটি তিনটি মহান সভ্যতাকে ধারণ করে আছে। এগুলো হলো ইসলামি, হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতা। এটি হচ্ছে পুরাণ আর ইতিহাসসমৃদ্ধ এক উপত্যকা। কেউ মনে করেন যিশু এখানেই দেহত্যাগ করেন, কেউ মনে করেন মুসা তার হারিয়ে যাওয়া জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে খুঁজতে এখানে এসে হাজির হয়েছিলেন। হজরতবাল মসজিদে লাখ লাখ পুণ্যার্থী প্রার্থনায় রত হন। বছরের বিশেষ কয়েকটা দিন নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর চুল সেখানে ভক্ত দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হয়ে থাকে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত জঙ্গিবাদী ইসলামের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক স্বার্থ এবং ভারতীয় জাতীয়তাবাদের (যা ক্রমশ আগ্রাসী ও হিন্দুত্ববাদী রূপ নিচ্ছে।) কবলে পড়া কাশ্মীর এখন একটি পারমাণবিক ঝুঁকির অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। পাঁচ লাখেরও বেশি সৈন্য এখন এখানে প্রহরারত এবং এটিই এখন বিশ্বের সবচেয় বড় সামরিকীকরণকৃত অঞ্চল। কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগর থেকে আমার গন্তব্য দক্ষিণাঞ্চলীয় আপেলসমৃদ্ধ ছোট্ট শহর সপিয়ান পর্যন্ত মহাসড়কটি উত্তেজনায় ঠাসা ছিল। মহাসড়ক ধরে ফলের বাগান, ফসলের মাঠ, ঘরবাড়ির ছাদ এবং ছোট ছোট বাজার অঞ্চলের কাছাকাছি দোকানগুলোতে সৈন্যরা টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। মাসের পর মাস সান্ধ্য আইন জারি থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদাদের দ্বারা উজ্জীবিত পাথর নিক্ষেপকারীদের আজাদির (স্বাধীনতা) ধ্বনি দিতে দিতে আবারো রাস্তায় বেরিয়ে আসতে দেখা গেছে। মহাসড়কের কোনো কোনো জায়গায় এসব পাথর এত পরিমাণে জমে গিয়েছিল যে এর ওপর দিয়ে চলতে গেলে এসইউভি গাড়ি দরকার হয়ে পড়েছিল। ভাগ্যক্রমে আমার সঙ্গে থাকা বন্ধুটির পেছন দিককার গলি এবং গ্রামের ভেতরকার বিকল্প পথগুলো চেনা ছিল। থেমে থেমে যাওয়ার কারণে এবারকার বিক্ষোভ আন্দোলনের ঘটনাগুলো শোনার একটা সুযোগও আমি পেয়ে যাই। একেবারে ছোট, এখনো প্রায় বালক, একজন আমাকে জানাল পাথর ছোড়ার কারণে কীভাবে তার তিন বন্ধুকে ধরে নিয়ে যায়, কীভাবে তাদের সবার দুই হাতের সব আঙুলের নখ তুলে নেওয়া হয়েছিল।

তিন বছর ধরেই কাশ্মিরীরা রাস্তায়। তাদের চোখে ভারতীয়রা এখন সশস্ত্র দখলদার। এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন তারা। তবে ২০ বছর আগে পাকিস্তানের সমর্থনে তাদের মধ্যে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া সশস্ত্র বিদ্রোহের অবস্থান থেকে কাশ্মিরীরা পিছিয়ে আসতে শুরু করেছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিসাবমতে, কাশ্মীর উপত্যকায় এখন সক্রিয় সশস্ত্র যোদ্ধার সংখ্যা পাঁচ শরও কম। কাশ্মীর যুদ্ধে ৭০ হাজার নিহত এবং নির্যাতনের কারণে লাখ লাখ মানুষ পঙ্গু হয়ে আছেন। হাজার হাজার মানুষ রয়েছেন নিখোঁজ। দুই লাখেরও বেশি হিন্দু অধিবাসী উপত্যকা ছেড়ে চলে গেছেন। জঙ্গিদের সংখ্যা কমতে থাকলেও সেখানে ভারতীয় সৈন্যসমাবেশের পরিমাণ কমেনি। একটি রাজনৈতিক বিজয় দিয়ে ভারত সেখানে সামরিকভাবেও বিজয়ী হয়েছে এমনটা ভাববার কোনো কারণ নেই। সেখানকার সাধারণ মানুষ ক্ষোভ থেকে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করছে।  নতুন একটি প্রজন্মের পুরোটাই বড় হয়েছে চারদিকে চেকপয়েন্ট, বাংকার, সেনাক্যাম্প জিজ্ঞাসাবাদকেন্দ্রের মধ্যে। তাদের বাল্যকালটা কেটেছে ‘ধর এবং মার’ অভিযান দেখে দেখে। গুপ্তচর, অজ্ঞাত বন্দুকধারী, গোয়েন্দা ও জালিয়াতির নির্বাচন তাদের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ফলে এরা ধৈর্য এবং ভয়-দুটোই হারিয়ে ফেলেছে। বলা যায়, উন্মত্ত এক সাহসিকতা কাশ্মিরী তরুণদের সশস্ত্র সেনাদের মোকাবিলা করার সাহস জোগাচ্ছে।

এপ্রিলে সেনাবাহিনী তিনজন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা এবং তাদের সন্ত্রাসী ও মুখোশধারী পাথর নিক্ষেপকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে। এদের অধিকাংশই ছিলেন ছাত্র। আর তখন থেকেই কাশ্মীরের জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার বুলেট ব্যবহার, সান্ধ্য আইন এবং নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কয়েক মাসে সেখানে ১১১ ব্যক্তি নিহত হয় যাদের অধিকাংশই কিশোর। তিন হাজারেরও বেশি আহত হন এবং গ্রেফতারের সংখ্যা এক হাজার।

কিন্তু এর পরও সেই তরুণরা বেরিয়ে আসছে, পাথর ছুড়ে মারছে। তাদের দেখে মনে হয় না, তাদের কোনো নেতা আছেন কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী তারা। তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীটি হঠাৎ করেই ভুলে যায় এ অবস্থায় তাদের করণীয় কী। ভারত সরকারও জানে না কার সঙ্গে আসলে কথা বলা দরকার এবং বহু ভারতবাসীও ধীরে ধীরে বুঝতে পারছে, দশকের পর দশক ধরে তাদের ভুল বোঝানো হয়েছে। এতদিন কাশ্মীর প্রশ্নে যে ঐকমত্যটি ছিল তা হঠাৎ করেই যেন কিছুটা নড়বড়ে হয়ে যেতে শুরু করেছে। যেদিন সকালে আমরা সপিয়ানে যাচ্ছিলাম সেদিন আমি একটু ঝামেলার মধ্যেই ছিলাম। এর কয়েকদিন আগে দিল্লিতে এক জনসভায় আমি বলেছিলাম, কাশ্মীর হচ্ছে একটা বিতর্কিত ভূমি এবং ভারত সরকারের দাবির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি বলেছিলাম, এটিকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা যায় না। ক্ষিপ্ত রাজনীতিক এবং সংবাদমাধ্যমগুলো দেশদ্রোহের অভিযোগে আমাকে গ্রেফতারের দাবি তোলে। সরকার নিজে খুব নরম-এই অপবাদ ঘোচাতে হুমকিমূলক বিবৃতি প্রচার করে এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। দিনের পর দিন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রচারিত সংবাদগুলোতে আমাকে বিশ্বাসঘাতক, ভদ্রপোশাকধারী সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হতে থাকে এবং অবাধ্য নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সব ধরনের শব্দই আমার নামের পাশে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সপিয়ান যাওয়ার পথে গাড়িতে বসে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে যা শুনলাম তাতে আমার এখন মনে হচ্ছে দিল্লিতে যেসব কথা বলেছি সেগুলোর জন্য আমার অনুতপ্ত হওয়ার কোনোই কারণ নেই।

আমরা যাচ্ছিলাম শাকিল আহমদ আহাঙ্গির নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে। আগের দিন তিনি আমি যেখানে অবস্থান করছিলাম সেই শ্রীনগরে এসেছিলেন এবং বেশ জোর দিয়েই বলছিলেন আমি যেন একবার সপিয়ানে যাই। তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া কঠিনই ছিল। শাকিলের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ২০০৯ সালের জুনে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই তার ২২ বছর বয়সের স্ত্রী নিলুফার এবং ১৭ বছরের বোন আয়েশার মৃতদেহ একটি ছোট নালা থেকে হাজারখানেক গজের ব্যবধানে পড়ে থাকা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। সেনাক্যাম্প এবং রাজ্য পুলিশক্যাম্পের মাঝখানে অবস্থিত ও ফ্লাডলাইট জ্বলতে থাকা সেই স্থানটি উচ্চমাত্রার নিরাপদ অঞ্চল হিসেবেই চিহ্নিত। প্রথম ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ধর্ষণ এবং হত্যার বিষয়টি স্পষ্টই উল্লেখ ছিল। কিন্তু এরপরই খেলা শুরু হয়ে গেল। নতুন ময়নাতদন্ত প্রথমবারেরটি বাতিল করে দিল এবং কবর থেকে লাশ উঠানোর নোংরা প্রক্রিয়া শেষে ধর্ষণের ব্যাপারটি খারিজ করে দেওয়া হলো। বলা হলো, দুটি মৃত্যুই ঘটেছে পানিতে ডুবে। লাগাতার ৪৭ দিনের বিক্ষোভ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সপিয়ান অচল হয়ে পড়ে। মাসের পর মাস ধরে সারা উপত্যকা ক্রোধে ফেটে পড়তে থাকে। আপাতভাবে মনে হয়েছিল ভারত সরকার বুঝি-বা সংকটটি মিটিয়ে ফেলতে পেরেছে। কিন্তু পরে বোঝা গেল ওই হত্যাকান্ডের ঘটনাই এবারের বিক্ষোভ আন্দোলনকে আরো বেশি জোরদার করে তুলেছে।

শাকিল চাচ্ছিলেন, আমরা যেন সপিয়ানে তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। কারণ হত্যাকান্ডটি নিয়ে কথা বলায় পুলিশ তাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছিল। তা ছাড়া তিনি আশা করছিলেন, আমরা গেলে অন্তত এ বিষয়টি বোঝা যাবে যে, কাশ্মীরের বাইরের লোকজনও তার পাশে আছে এবং তিনি একা নন। কাশ্মীরে এখন আপেলের মৌসুম। সপিয়ানের পথে যেতে যেতে চোখে পড়ল আপেলের বাগান। বাগানের মালিকরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পড়ন্ত বিকেলের আলোতে কাঠের ঝুড়িতে আপেল ভরছেন। দেখতে ঠিক আপেলের মতোই লাল গালের অনেক শিশু, আবার ভয় হলো ভুলবশত শেষে না আবার দুই-একটা শিশুকেই আপেলের ঝুড়িতে পুরে ফেলা হয়। আমরা পৌঁছার আগেই আমাদের আগমনবার্তা জানাজানি হয়ে যায় এবং রাস্তার ওপর কিছু লোক জটলা করে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল।

শাকিলের বাড়িটি গোরস্থানের শেষ সীমায়। এ গোরস্থানেই তার স্ত্রী এবং বোনকে সমাহিত করা হয়েছে। আমরা পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল এবং বিদ্যুৎও ছিল না সে সময়। আমরা একটি লণ্ঠনের আলোতে অর্ধবৃত্তাকারে বসলাম। শাকিল তার কাহিনী বলে যেতে লাগলেন, যে কাহিনী আমরা সবাই আগে থেকেই ভালোভাবে জানি। আরো কিছু মানুষ ঘরে ঢুকল। আরো কিছু ভয়ঙ্কর ঘটনার বর্ণনা আমরা শুনলাম। এসব ঘটনার কথা মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের নারীদের নির্যাতিত হওয়ার কাহিনী। ওইসব অঞ্চলে বেসামরিক লোকজনের চেয়ে সেনা সদস্যদের সংখ্যাই বেশি। শাকিলের শিশুপুত্রটি অন্ধকারের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করছিল, কখনো বা আবার এক কোল থেকে অন্য কোলে। শাকিল বারকয়েক উচ্চারণ করলেন, সে খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে শিখবে তার মায়ের জীবনে কী ঘটেছিল।

আমরা যখন উঠতে যাচ্ছি ঠিক তখনই এক লোক এসে খবর দিল শাকিলের শ্বশুর নিলুফারের বাবা চান যে, আমরা যেন একটিবার তার বাড়ি হয়ে যাই। আমরা আমদের অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিই। কারণ আরো যদি বিলম্ব হয়ে যায় তো গাড়ি চালিয়ে আমাদের ফিরে আসাটা অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে ওঠার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা এক বন্ধুর ফোন পেলাম। ফোনটা আমার বন্ধুর এক সাংবাদিক সহকর্মীর। তিনি জানালেন, পুলিশ আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করতে যাচ্ছে এবং আজ রাতেই আমি গ্রেফতার হতে যাচ্ছি। আমরা কিছুক্ষণ নীরবেই অগ্রসর হলাম। আপেলবোঝাই ট্রাকের পর ট্রাক আমাদের অতিক্রম করে যাচ্ছিল। শেষে আমার বন্ধুটি বললেন, আমার মনে হয় না তেমন কিছু একটা ঘটবে। এটা আসলে একটা মনস্তাত্ত্বিক চাপ।

তবে আমরা আমাদের গাড়ির গতি দ্রুততর করতেই লোকজন ভর্তি একটি গাড়ি আমাদের অতিক্রম করে গেল। তারা হাতের ইশারায় আমাদের ডাকছিল। মোটরসাইকেলে চড়া দুজন লোক আমাদের ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলল। কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে এবং আমি তার জন্য নিজেকে প্রস্ত্তত করছিলাম। একজন ভদ্রলোক গাড়ির জানালার পাশে এসে দাঁড়ালেন। নীলাভ চোখ দুটি তার দ্যুতি ছড়াচ্ছিল। সাদা দাড়ি বুক অবধি নেমে এসেছে। নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন, তার নাম আবদুল হাই এবং নিহত নিলুফারের বাবা তিনি। তিনি বললেন, আপেলগুলো না নিলে কীভাবে আপনাকে যেতে দিই বলুন তো? মোটরসাইকেলের আরোহী দুজন আমাদের গাড়ির পেছনে দুই ঝুড়ি আপেল ঢোকাতে শুরু করলেন। এবার আবদুল হাই তার গায়ের বাদামি জোববাটার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটি ডিম বের করে আনলেন। তিনি এটি আমার হাতের তালুতে রাখলেন এবং রেখে নিজেই আমার আঙুলগুলো ভাঁজ করে করে ডিমটিকে আমার থাবার মধ্যে পুরলেন। এরপর আবার তিনি আরো একটি ডিম বের করলেন এবং একইভাবে সেটি আমার অন্য হাতটিতে রাখলেন। ডিমগুলো তখনো পর্যন্ত গরমই ছিল। তিনি বললেন, ”আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন, আপনাকে রক্ষা করুন।” বলেই অন্ধকারেই মিলিয়ে গেলেন। একজন লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?

সে রাতে আমি গ্রেফতার হইনি। তার পরিবর্তে সাধারণত যে ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করা হয়, তাই করা হলো। সরকারি কর্মকর্তারা আমার বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষকে জনগণের মধ্যে সংক্রমিত করার কাজে নেমে পড়ল। আমি বাড়ি ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই ভারতীয় জনতা পার্টির (দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল) মহিলা শাখা আমার বাড়ির সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে আমাকে গ্রেফতারের দাবি জানাতে থাকে। ঘটনাটি সরাসরি প্রচার করার জন্য আগে থেকেই টেলিভিশনের ভ্যান সেখানে উপস্থিত ছিল। হিন্দু চরমপন্থী গ্রুপ খুনি বজরং দল, যারা ২০০২ সালে গুজরাটে সহস্রাধিক মুসলিমকে হত্যা করেছিল, ঘোষণা করেছে যে, শায়েস্তা করার জন্য যা কিছু করতে হয় তারা করবে। তারা সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে আমার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করবে বলেও জানিয়েছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা এবং ভারত সরকার ধরেই নিয়েছে, শক্তি প্রয়োগ আর বোয়িং বিমান দিয়েই তারা তাদের পুনরুত্থিত ভারতের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। কিন্তু সিদ্ধ তপ্ত ডিমের বিধ্বংসী শক্তি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই নেই। [ ● সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to কাশ্মীরের তেঁতোফল

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: