বাংলাদেশের মানুষ দায়িত্ব এড়াতে খুব পটু। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন যদি সঠিকভাবে কাজ করে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয় তাহলে এসব মৃত্যুরহস্য সহজেই উদ্ঘাটিত হতো।

পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের অন্য নাম বেওয়ারিশ লাশ

আহম্মদ ফয়েজ রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রতিদিনিই বাড়ছে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা। শুধু আঞ্জুমান মুফিদুলের হিসাব মতে, ২০০৯-এর জুলাই থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত খোদ রাজধানী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় দুই হাজার বেওয়ারিশ লাশ। ২০০৪-এর জুলাই থেকে ২০০৫-এর জুন পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৬৫৬। আঞ্জুমানে মুফিদুলের উপ-পরিচালক (সার্ভিসেস) মোঃ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বেওয়ারি লাশের সংখ্যা এখন তুলনামূলকভাবে কম। এর কারণ হচ্ছে, আগে মানুষের কাছে কোনো প্রকার পরিচয়পত্র থাকতো না। এখন বেশিরভাগ মানুষের কাছেই জাতীয় অথবা কর্মরত প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র থাকে। তবে এখন যেসব বেওয়ারিশ লাশ পাওয়া যায় এর বেশিরভাগই পরিকল্পিত হত্যাকান্ড।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের পর মৃতদেহের ওয়ারিশ না থাকায় তা বেওয়ারিশ হয়ে যাচ্ছে। পার পেয়ে যাচ্ছে ঘাতকরা। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কোনো লাশই বেওয়ারিশ নয়। তাদের মতে, লাশের পরিচয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু পুলিশের অবহেলার কারণে এত বেশি লাশ বেওয়ারিশ হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে নিখোঁজ হওয়া লোকজনকে উদ্ধারের ব্যাপারে প্রশাসনের তৎপরতা বাড়লে বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা কমবে।

পুলিশের যেন নেই কোনো দায়িত্ব : ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত পরিচয় এসব লাশ সম্পর্কে সঠিক খোঁজখবরও কেউ রাখছে না। এসব মানুষের লাশ পাওয়ার পর স্থানীয় থানা পুলিশ কিছুদিন বিবরণসহ সুরতহাল রিপোর্ট সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে তাদের আর কোনো হদিস থাকে না। এক সময় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দফতরে অজ্ঞাত লাশের ছবিসহ বিবরণ সংরক্ষণ করা হতো; কিন্তু এখন আর সেই ব্যবস্থা নেই। ফলে কত অজ্ঞাত লাশ পাওয়া যাচ্ছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পুলিশের খাতায়ও পাওয়া যাচ্ছে না। মহানগরীর বিভিন্ন থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার এবং হাসপাতালের মর্গ পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে। হাসপাতালের মর্গে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে তিনদিন সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে; কিন্তু অতিরিক্ত লাশের চাপ এবং সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় সাধারণত এক থেকে দুই দিনের বেশি লাশ রাখা হয় না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের লাশকাটা ঘরে দায়িত্বপালনরত একজন ডাক্তার নাম প্রকাশ না করে বলেন, পুলিশ তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অনেক সময় লাশ মর্গে নিয়ে এসে কোনো রকমে একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেই লাশটিকে বেওয়ারিশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে ফেলে। এ কারণে অনেক লাশ তাদের আত্মীয়-স্বজনরা জানার আগেই দাফন হয়ে যায়।

রাজধানীতে বেওয়ারিশ লাশ দাফন করে এমন একমাত্র প্রতিষ্ঠান আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ বাহার জানান, অভিভাবক না থাকায় এসব ক্ষেত্রে সুষ্ঠু তদন্তের যথেষ্ট অভাব আছে। পুলিশ কখনো কখনো লাশের পরিচয় জানার চেষ্টা না করেই অজ্ঞাত লাশ বলে আঞ্জুমান মুফিদুলে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। তিনি আরো বলেন, প্রত্যেকটি মৃত্যুর কারণ ও এগুলোর খুনিদের চিহ্নিত করে যদি শাস্তি দেওয়া যেত তাহলে হয়তো অজ্ঞাত খুনের সংখ্যা কমানো যেত। বাংলাদেশের মানুষ দায়িত্ব এড়াতে খুব পটু। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন যদি সঠিকভাবে কাজ করে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয় তাহলে এসব মৃত্যুরহস্য সহজেই উদ্ঘাটিত হতো।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এআই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, সারাদেশেই এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের নিস্পৃহতার কারণেই এসব লাশের পরিচয় মিলছে না। বেওয়ারিশ লাশ শনাক্তকরণে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং মোবাইল অপারেটররা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। বেওয়ারিশ লাশের ছবি মিডিয়ায় প্রকাশ হলে অথবা মোবাইল অপারেটররা এসএমএসের মাধ্যমে মৃতদেহের বর্ণনা তাদের গ্রাহকদের সরবরাহ করলে সহজেই তা শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র প্রকাশ হয়ে পড়ার ভয়ে প্রশাসন অজ্ঞাত লাশের পরিচয় বের করতে চায় না। তাছাড়া রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা তো আছেই। এগুলোর পরিচয় শনাক্ত করার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় নিহতরা রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার। প্রশাসন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় পুলিশ এসব মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটন করতে চায় না।
ঢাকা মেডিকেলের তথ্য : ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সভাপতি ও বিভাগীয় প্রধান মিজানুল হক জানান, খুন ও অপমৃত্যুর পরিসংখ্যান তাদের কাছে রয়েছে। তবে তা সবাইকে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিককে আমরা তথ্য দেই না। এসব তথ্য প্রকাশ হলে জনমনে আশঙ্কা বাড়তে পারে। এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ থেকে একটি গোপন সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে মোট ৪৫৩টি অজ্ঞাত লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩৩ জন পুরুষ ও ৫ জন মহিলা, ফেব্রুয়ারিতে ৪১ জন পুরুষ ও ৯ জন মহিলা, মার্চে ৩৭ জন পুরুষ ও ৬ জন মহিলা, এপ্রিলে ৬ জন মহিলা ও ৩৬ জন পুরুষ, মে’তে ১৪ জন মহিলা ও ৪৬ জন পুরুষ, জুনে ১১ জন মহিলা ও ৪৯ জন পুরুষ, জুলাইয়ে ৫ জন মহিলা ও ৩৩ জন পুরুষ, আগস্টে ১২ জন মহিলা ও ৩৭ জন পুরুষ, সেপ্টেম্বরে ৫৩ জনের মধ্যে ১৫ জন মহিলা ও ৩৮ জন পুরুষ এবং ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ৪ জন মহিলা ও ১৬ জন অজ্ঞাত পুরুষের লাশ ময়নাতদন্ত করেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেন্সিক বিভাগ। এছাড়া স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে জানুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৭৮টি অজ্ঞাত লাশের ময়নাতদন্ত করেছে।

হত্যাকান্ডের লাশ বেওয়ারিশ এবং অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে : পরিকল্পিতভাবে হত্যার পর লাশ গুম করার কারণেও লাশের পরিচয় পাওয়া যায় না। এর কারণে খুনি বা অপরাধী চক্র সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। উত্তরা জোনের পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি বাড্ডা এবং উত্তরখান থেকে উদ্ধার করা টুকরো লাশের পরিচয় না পাওয়ার কারণে এ হত্যার সঙ্গে জড়িতদেরও শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। খুনিদের সম্পর্কেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তেজগাঁও জোনের পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ১৪ মাস পর পরিকল্পিত হত্যার শিকার ২ তরুণীর পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি তাদের ঘাতকদেরও শনাক্ত করা হয়েছে। কারওয়ানবাজার এলাকার একটি ড্রেন থেকে এ দুই তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। এ দুই তরুণী দীর্ঘ ১৪ মাস তাদের পরিবারের কাছে নিখোঁজ হিসেবে ছিল। সংশ্লিষ্ট থানায় এ ব্যাপারে সাধারণ ডায়রিও করা হয়েছিল। অথচ সংশ্লিষ্ট থানা থেকে তাদের ছবি দেশের বিভিন্ন থানায় পাঠানো হলে ঘটনার পরপরই তরুণীদের পরিচয় পাওয়া যেত। পরিচয় শনাক্তের পর হত্যাকারীদেরও দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতো।

মানবাধিকার সংগঠনের বক্তব্য : মানবাধিকারকর্মী ও হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, এখন যারা অপরাধ সংঘটিত করে তারা বেশ ভালো করেই জানে আইনকে কিভাবে ফাঁকি দেওয়া যায়। আর এসব জেনে বুঝে তারা কাউকে খুন করার পর লাশটিকে এমন অবস্থা করে ফেলে যে সেটা আর সহজে চেনা যায় না। অনেক সময় দেখা যায় ইচ্ছা করে পুলিশ অনেক কারণেই একটি লাশকে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে চালিয়ে দেয়। তা ছাড়া সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে পরিকল্পিত হত্যার শিকার অনেককে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হচ্ছে। এসব হত্যাকান্ডের কোনো ক্লু থাকে না এবং প্রশাসনও এ ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতারের ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে না। এ কারণে অপরাধীরা খুব সহজেই পার পেয়ে যায়।

বেওয়ারিশ লাশের হিসাব : রাজধানীতে বেওয়ারিশ লাশের মিছিল দিনে দিনে বড় হলেও এর কতটি খুন, কতটি সড়ক দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যু তার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ প্রশাসন, এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে বেওয়ারিশ লাশগুলো কিভাবে খুন হয় এর কোনো নির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। আঞ্জুমানে মুফিদুলের তথ্য মতে, ২০০৪-এর জুলাই থেকে ২০০৫-এর জুন পর্যন্ত বেওয়ারিশ লাশের সংখ্যা এক হাজার ৬৫৬টি, ২০০৫-এর জুলাই থেকে ২০০৬-এর জুন পর্যন্ত দুই হাজার ৪৯টি, ২০০৬-এর জুলাই থেকে ২০০৭-এর জুন পর্যন্ত দুই হাজার ২০৩টি, ২০০৭-এর জুলাই থেকে ২০০৮-এর জুন পর্যন্ত দুই হাজার ১১৯টি, ২০০৮-এর জুলাই থেকে ২০০৯-এর জুন পর্যন্ত এক হাজার ৭১৪টি এবং ২০০৯-এর জুলাই থেকে ২০১০-এর অক্টোবর পর্যন্ত এক হাজার ৯২২টি। [ আহম্মদ ফয়েজ ● সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: