শ্রেণীর চেয়ে ভাষা যে বড় সেই সত্যটা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন, যে আন্দোলন সমাজকে মুক্ত করবে, মুক্ত করবে সমাজের মানুষকে। তখন আমরা স্বাভাবিক হবো।

ভাষা বড় নাকি শ্রেণী বড়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রশ্নটির জবাব খুব সোজা, বলা যায় প্রশ্নের ভেতরই জবাব নিহিত রয়েছে। শ্রেণী কী করে বড় হবে ভাষার চেয়ে? ভাষা তো অনেকের, শ্রেণী হচ্ছে অল্প কয়েক জনের। ভাষা অবশ্যই বড় শ্রেণীর তুলনায়। কিন্তু আয়তনে বড় হলেও বহুক্ষেত্রে দেখা গেছে, দেখা যাচ্ছে এখনো, যে ভাষা শ্রেণীর ওপর কর্তৃত্ব করবে কী, উল্টো শ্রেণীই আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে ভাষার ওপর। আমাদের নিজেদের ইতিহাসে এটা দেখেছি আমরা, দেখা গেছে অন্য দেশের ইতিহাসেও। একাদশ শতাব্দীতে নরমানরা ইংল্যান্ড জয় করে নিয়েছিল; নরমানদের ভাষা ছিল ফরাসী। তারা সংখ্যায় অল্প ছিল, কিন্তু তারা যেহেতু বিজয়ী শ্রেণী তাই তাদের ভাষা চালু হয়ে গেল ইংল্যান্ডের অভিজাত মহলে। কেবল তাই নয়, ফরাসী ভাষার মিশ্রণে স্থানীয়দের অ্যাংলো-স্যাকসন ভাষা বদলে গেল এবং এখন যে ইংরেজি ভাষা পৃথিবীময় চালু হয়েছে তার ভিত্তিতে রয়েছে ওই সংমিশ্রণ।

বিজয়ী নরমানরা এক সময়ে স্থানীয় হয়ে গেছে। কিন্তু ওই যে অল্পসংখ্যক লোক এসেছিল, ইংল্যান্ডের ভাষার ওপর তাদের প্রভাব স্থায়ী হয়ে রইল। যেমন ধর যাক, খাবার-দাবারের ক্ষেত্রটা। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, যে গরুকে ইংল্যান্ডবাসী লালন-পালন করে সেটা ‘কাউ’ বটে কিন্তু ওই ‘কাউ’ যখন খাবার টেবিলে চলে আসে তখন সেটা ‘বিফ’ হয়ে যায়; ‘বিফ’ ফরাসী ভাষা থেকে উদ্ভূত। অন্য অনেক খাবারের ব্যাপারেও ঘটনা এ রকমেরই। সমগ্র ইউরোপে এক সময়ে ল্যাটিন ভাষার প্রভাব ছিল। কারণটা ছিল ধর্মীয়। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা ইউরোপ দখল করে নিয়েছিল, তাদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা ছিল ল্যাটিন। দেখা গেল, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তত্ত্ব-তথ্য সব কিছুর আদান প্রদান চলছে ল্যাটিন ভাষাতে। ল্যাটিনের বিরুদ্ধে এক সময়ে বিদ্রোহ হয়েছে। জার্মানিতে লুথার যে প্রটেস্ট্যান্ট মতবাদ প্রচার করেন যার মূলে ছিল রোমান ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সেই মতবাদ জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য লুথার জার্মান ভাষায় ল্যাটিন বাইবেলের অনুবাদ করে ফেলেন। ঘটনাটা ছিল বৈপ্লবিক। আমাদের উপমহাদেশে যেমন বেদ সংস্কৃত ভাষায় পড়ার বিধি ছিল, ইউরোপেও ছিল সেই একই রকমের নিয়ম, বাইবেল পড়তে হবে ল্যাটিন ভাষায়। লুথার সেই নিয়ম ভেঙে দিলেন। বাইবেলকে নিয়ে এলেন জার্মান কৃষকদের জীবনের কাছাকাছি, অত্যন্ত সরল জার্মান ভাষায় তার অনুবাদ করে।

তারপরও কিন্তু ল্যাটিন ভাষার দাপটটা চলে যায়নি। লুথারের অনেক পরেও, ইংরেজি ভাষার অত্যাশ্চর্য বিকাশ যখন ঘটে গেছে, শেক্সপিয়র যখন তার নাটক লিখছেন তখনো যারা জ্ঞানী তারা মনে করতেন গভীর তত্ত্বালোচনা সাধারণ ইংরেজিতে সম্ভব নয়, সেটা করতে হবে ল্যাটিন ভাষাতেই। যেজন্য অত বড় লেখক যে ফ্রান্সিস বেকন তিনিও তার তত্ত্বমূলক গ্রন্থগুলো ল্যাটিন ভাষায় লিখেছেন। নিউটনও তার বিজ্ঞানের বই লিখেছেন ল্যাটিন ভাষাতেই।

কিন্তু ল্যাটিন থাকেনি। তাকে সরে যেতে হয়েছে। বাইবেলের ইংরেজি অনুবাদ হয়েছে, সেই অনুবাদ ইংরেজি গদ্যভাষাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। জনগণের ভাষার জয় হয়েছে। তারপরেও কিন্তু দেখা গেছে যে, ভাষা এক হলেও ভাষার উচ্চারণের ভেতর পার্থক্য দাঁড় করিয়ে শ্রেণীর সঙ্গে শ্রেণীর দূরত্ব বোঝানোর চেষ্টাটা রয়ে গেছে। ভাষা একই কিন্তু উচ্চারণ ভিন্ন ভিন্ন। অভিজাত যারা তাদের উচ্চারণ এক রকমের, সাধারণ মানুষ যারা তাদের উচ্চারণ ভিন্ন রকমের। আর ওই উচ্চারণ শুনেই নাকি বোঝা যেত কে কোন শ্রেণীর মানুষ। উচ্চ শ্রেণীর মানুষ কথা বলে ‘ইউ’ উচ্চারণে ‘ইউ’ মানে আপার, উঁচুতলার আর বাদবাকিদের কথাবার্তা ছিল ‘নন-ইউ’ অর্থাৎ অনভিজাত।

আমাদের এই ঢাকা শহরেও এক সময়ে ঠিক উচ্চারণ না হলেও শব্দের ব্যবহার দিয়ে শ্রেণী বিভাজন চিহ্নিত করবার একটা রেওয়াজ চালুর চেষ্টা করেছিলেন কেউ কেউ। তারা মনে করতেন ‘ডিম’ হচ্ছে সাধারণ মানুষের শব্দ, অভিজাতরা ‘ডিম’ বলবে না, বলবে ‘আন্ডা।’ জিনিসটা একই, খাদ্যবস্ত্ত বটে কিন্তু দুই মুখে তার দুই নাম এবং তাতেই নাকি ছিল মস্ত ব্যবধান। গল্প আছে, একবার এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগের ব্যাপারে সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। সাক্ষাৎকার যিনি নিচ্ছিলেন তিনি শব্দের ব্যবহার দিয়ে আভিজাত্য বিচারে বিশ্বাস রাখতেন। প্রার্থী ছিলেন দুই জন, দুই জনই উচ্চশিক্ষিত এবং পদটির জন্য উপযুক্ত; পার্থক্য করা কঠিন। নিয়োগকর্তা পার্থক্য দাঁড় করালেন ভাষা দিয়ে। আলাদা আলাদাভাবে একই প্রশ্ন তিনি দুই জনকেই জিজ্ঞাসা করেছেন। আজ সকালে আপনি কি নাস্তা করেছেন, তিনি জানতে চেয়েছিলেন। প্রথম প্রার্থী বলেছেন, ডিমের অমলেট এবং রুটির সঙ্গে চা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরেছেন। দ্বিতীয় প্রার্থী নিয়োগকর্তার প্রশ্নের ভেতর ‘নাস্তা’ শব্দের ইশারাটা ঠিক মতো ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি নাস্তা করেছেন আন্ডা ভাজা ও পারোটা দিয়ে। ‘আর কিছু খাননি?’ এই প্রশ্ন শুনে, দ্বিতীয় প্রার্থী বিলম্ব করেননি, বানিয়েই বলে দিয়েছেন, ‘হ্যাঁ, স্যার ভুলে গিয়েছিলাম, খাসির গোশতও ছিল।’ আর কোনো জিজ্ঞাসার দরকার হয়নি, ডিমের বদলে আন্ডা এবং মাংসের বদলে গোশত বলার জোরে তিনিই অধিকতর যোগ্য বিবেচিত হয়েছেন এবং তিনিই নাকি নিয়োগ পেয়েছিলেন।

জল ও পানির বিরোধের খবর তো আমরা জানিই। জিনিসটা একই, একই কল থেকে পাওয়া যাচ্ছে, একইভাবে তৃষ্ণা নিবারণ করছে, কিন্তু হিন্দু বলছে সে জল পান করছে, মুসলমান বলছে সে পান করছে পানি। এ নিয়ে ভীষণ গোলযোগ ছিল। অথচ ‘জলপানি’  পেতে হিন্দু-মুসলমান কোনো ছাত্রেরই আপত্তি ছিল না। আপত্তি থাকবে কেন, ওটা তো পুরস্কার, তাতে জল ও পানি মেশামেশি করে থাকলে অসুবিধাটা কোথায়? জল খাবারও ঠিকই চলতো, পানি ফল পেলে কেউ যে নামের কারণে তা ফেলে দিতো এমন মোটেই নয়। সাধারণ মানুষ জল ও পানির পার্থক্য নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাত না, তারা জিনিসটা পেলেই খুশি থাকত। কিন্তু মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণীর মানুষকে নিয়েই যত মুশকিল ছিল, তারা ভাষার ওই পার্থক্যটাকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চিহ্নগুলোর একটি হিসেবে অাঁকড়ে ধরেছিল। সাম্প্রদায়িকতা জনগণের ব্যাপার ছিল না, ব্যাপার ছিল দুই দিকের দুই মধ্যবিত্তের। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থে ঝগড়া-ফ্যাসাদ বাঁধিয়ে এমন ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি করলো যে, অখন্ড ভূমিকে দুই টুকরো করা ছাড়া গত্যন্তর রইল না। তাতে প্রকৃতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সব কিছুরই ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ভাষা বিকাশেরও।

শব্দ নয় শুধু উচ্চারণের ব্যাপারটাও ছিল। কলকাতা যেহেতু ছিল রাজধানী তাই সেখানকার শিক্ষিত মানুষের যে উচ্চারণ সেটাই ছিল মানদন্ড, সেই মাপেই উচ্চারণের গুণাগুণ মানা হতো। পূর্ববঙ্গের মানুষ ছিল কলকাতা থেকে দূরে, তাদের উচ্চারণ ছিল ভিন্ন। সেজন্য তাদের বাঙ্গাল বলে নিম্নস্তরবর্তী হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টাটা থাকতই। বাঙ্গালরাও কম যেত না, সংখ্যায় তারাই ছিল বেশি, তাদের জোরটা যদিও প্রবল ছিল না, কেননা থাকত তারা রাজধানী থেকে দূরে, কিন্তু তবু কলকাতা ও তার আশপাশের লোকদের তারা ঠাট্টা করতে চাইত ‘ঘটি’ বলে।

এই সত্যটা তো অনস্বীকার্য, শাসক শ্রেণীর ভাষা শাসিত মানুষের ওপর চেপে বসে। তাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়। এটা সব দেশেই ঘটেছে। ঘটেছে আমাদের নিজেদের দেশেও। যেজন্য আমরা দেখেছি, রাজদরবারের ভাষা হিসেবে এসেছে সংস্কৃত, ফার্সি, ইংরেজি। চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল উর্দুকে। যারা অভিজাত শ্রেণীর মানুষ তারা দরবারি ভাষা রপ্ত করেছে, করে নিজেদের সুখ-সাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করে নিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ পারেনি। তারা চর্চা করেছে তাদের মাতৃভাষারই। বাংলাদেশ যে দীর্ঘকাল ধরে বিদেশী শাসনের অধীনে ছিল এর জাজ্বল্যমান প্রমাণ হচ্ছে এই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগ পর্যন্ত বাংলা শাসক শ্রেণীর ভাষা হয়নি, জনগণের ভাষাই রয়ে গেছে।

বাংলা প্রাকৃত ভাষা। প্রাকৃতজনের ভাষা। তারাই একে রক্ষা করেছে। শাসক শ্রেণীর অবজ্ঞা ও উন্নাসিকতা ছিল। কিন্তু শাসক শ্রেণী ধ্বংস করতে পারেনি জনগণের ভাষাকে, বাংলা ভাষা রয়েই গেছে। ওই যে দুই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাতে বাংলা ভাষার ওপর যে চাপটা পড়েছে সেটা সামান্য নয়। হিন্দু মধ্যবিত্ত মুসলিম মধ্যবিত্তের তুলনায় এগিয়ে ছিল। এক সময়ে ফার্সি ছিল রাজভাষা; তখনকার অভিজাত শ্রেণী ওই ভাষা রপ্ত করেছে নিজেদের আভিজাত্যের অনুরোধে ও স্বার্থে। হিন্দুরাও ফার্সি শিখেছে, রাজা রামমোহন রায় চমৎকার ফার্সি জানতেন, তারপর যখন ইংরেজ এলো তখন ফার্সির জায়গায় ইংরেজি হলো রাষ্ট্রভাষা। হিন্দু অভিজাত শ্রেণী ইংরেজি শিখে নিয়েছে; মুসলমানরা সেভাবে শিখতে পারেনি। কিছুটা ছিল অভিমান, কিছুটা ছিল অর্থনৈতিক দুর্বলতা, যেজন্য তারা পিছিয়ে পড়ল। হিন্দু মধ্যবিত্ত শ্রেণীও গড়ে উঠল শিক্ষা, পেশা এবং বিশেষভাবে জমিদারি ব্যবস্থার কারণে। আধুনিক বাংলা গদ্য এই মধ্যবিত্তের হাতেই তৈরি। এরা সংস্কৃত জানতেন এবং ধর্মীয় কারণে সংস্কৃতের প্রতিই তাদের টানটা ছিল অধিক ও স্বাভাবিক। তাই তাদের হাতে যে গদ্য তৈরি হলো তাতে আধিপত্য থাকল সংস্কৃতের। ফলে ভাষার মধ্যে একটা কৃত্রিমতা চলে এলো।

পরে মুসলিম মধ্যবিত্ত নিজেকে গড়ে তুলেছে। তারা এসে দেখে যে, তারা যে ধরনের ফার্সি, আরবি ও দেশীয় শব্দ ব্যবহার করতে অভ্যস্ত বাংলা গদ্যে সেগুলোর স্থান হয় সংকুচিত নয়তো অবলুপ্ত। তাদের অভিমানে লাগল। তাদের একাংশ বাংলা ভাষাতে তথাকথিত মুসলমানী শব্দ কিভাবে প্রয়োগ করা যায় সে ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়ল।

এই উৎসাহ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে উৎকট আকার ধারণ করেছিল। তখন কেবল যে আরবি, ফার্সি শব্দ বাড়াবার চেষ্টা হয়েছে তা নয়, আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়া, নজরুলকে সংশোধন করার চেষ্টা যে হয়নি তাও নয়। সর্বোপরি ছিল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ভয়াবহ সিদ্ধান্ত। যেন সেই পুরাতন ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন। শাসক শ্রেণীর ভাষা হবে বিদেশী; জনগণের মাতৃভাষা থাকবে অবহেলিত ও নিপীড়িত। অন্য কিছুর দরকার ছিল না, ওই এক সিদ্ধান্তই পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিল যে, পূর্ববঙ্গের মানুষ স্বাধীন হয়েছে বলে যতোই বাজনা বাজানো হোক, আসল ঘটনা ভিন্ন, সে মোটেই স্বাধীনতা পায়নি, বরং নতুন করে আবদ্ধ হতে চলেছে পরাধীনতার শৃঙ্খলে। পূর্ববঙ্গ বিদ্রোহ করেছে, স্বভাবতই।

বিদ্রোহী পূর্ববঙ্গ শেষ পর্যন্ত স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু এখনকার অবস্থাটা কী? ভাষার কাছ থেকে কোন খবরটা পাওয়া যাচ্ছে? সাহিত্যকে আমরা দর্পণ বলি, বলি সমাজ ও সংস্কৃতির দর্পণ। কিন্তু ভাষার ব্যবহারেও ছবি পাওয়া যাবে বৈকি; সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রের ছবি। বলাবাহুল্য, ওই ছবি তৃপ্তিকর নয়, ওখানে এমন খবর মোটেই পাওয়া যাচ্ছে না যে আমরা প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন হয়েছি।

আবারও সেই শ্রেণী কর্তৃত্বের প্রশ্ন। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, বাঙালি মধ্যবিত্তের কারণেই বাংলা ভাষার এতটা উন্নতি ঘটেছে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, ব্যবহারিক জীবন সর্বত্র বাংলা ভাষা আজ ব্যবহৃত ও সমৃদ্ধ। আমাদের সাহিত্যের সাধারণ অর্জনও সামান্য না মোটেই। কিন্তু এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী একটা মনেপ্রাণে চায়নি যে সাধারণ মানুষ শিক্ষিত হোক। সবাই যদি শিক্ষিত হয় তাহলে মধ্যবিত্তের অহংকারের জায়গাটা বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়বে। ভয় ছিল সেটাই, যদিও প্রকাশ্যে সে তা স্বীকার করেনি। এদেশে শিক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি, সমষ্টিগত উন্নতিকে প্রধান বিবেচ্য করা হয়নি। হয়নি যে তার কারণ ওই মধ্যবিত্ত শ্রেণীই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একাংশ উচ্চবিত্ত হয়ে গেছে। তারাই এখন দেশের শাসক, তারাই শাসন করে নানা নাম নিয়ে। এই শাসক শ্রেণী জনগণের সম্পদ ও অর্জনগুলোকে লুণ্ঠন করছে এবং তাদের যে রাজনীতি সেটি ওই লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতার বাইরে অন্য কিছু নয়। জনগণ থেকে এরা যে দূরবর্তী তার নানা প্রাচীর, প্রকরণ ও চিহ্ন সাড়ম্বরে তুলে ধরে। এগুলোর মধ্যে ভাষাও একটি। এই ব্যাপারে আগেকার শাসকদের থেকে বর্তমান শাসকদের আচরণে কোনো পার্থক্য নেই। বিদেশী শাসকরা যেমন বাংলা ব্যবহার করত না, বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীও পারলে সেই কাজই করে। অন্তত চেষ্টা যে করে সে নিয়ে তো সন্দেহ করার সুযোগ নেই।

এই শ্রেণীর সন্তানরা ইংরেজির মাধ্যমে পড়াশোনা করে। অনেকেই বিদেশে চলে যায়। সম্পত্তিবানেরা সম্পত্তির প্রাচুর্যের অনুপাতে বিদেশ ভ্রমণ করে। পরিবারের একাংশ সেখানেই থাকে। দেশে যে থাকে তা অনেকটা বিদেশীদের মতোই। পণ্য, আসবাব, পোশাক-পরিচ্ছদ, জীবনযাত্রার ধরনে বাঙালিত্বের বড়ই অভাব। সবচেয়ে উৎকট হচ্ছে ভাষা। এসব ঘরে বিচিত্র সব চ্যানেলের টেলিভিশন বিরামহীনভাবে চলতে থাকে, সেসব চ্যানেলে বাংলার চেয়ে ইংরেজি ও হিন্দিরই আধিক্য থাকে। ওদের ইমেইল, ইন্টারনেট, সিডি- সর্বত্র ইংরেজির একচেটিয়া রাজত্ব। সবচেয়ে উৎকট হচ্ছে মুখের ভাষা। বাংলা বলে ইংরেজি মিশিয়ে।

আমরা এখন এই শাসক শ্রেণীর অধীনে রয়েছি। বোঝা যাচ্ছে, স্বাধীন হয়েছি ঠিকই কিন্তু আসলে হইনি। বাংলা উচ্চ আদালতের ভাষা হয়নি, উচ্চ শিক্ষার মাধ্যম হতে ব্যর্থ হয়েছে। যারা অতি উচ্চশিক্ষিত তারা বাংলার চর্চা করে না, যারা কম শিক্ষিত বাংলা ভুলে ভর্তি থাকে।

ওদিকে টেলিভিশনের কারণে বই পড়ার অভ্যাস কমছে। ওই অভ্যাস অবশ্য কখনোই উল্লেখযোগ্য ছিল না। অধিকাংশ বাঙালিই ছিল অক্ষরজ্ঞানবঞ্চিত। এখন শিক্ষিতের হার বেড়েছে। কিন্তু পাঠ্যাভাস সে তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। আমাদের সংস্কৃতিতে দেখতে পাই, পড়ালেখার তুলনায় স্মৃতি ও শ্রুতির ওপরই জোরটা ছিল বেশি। আগের কালের মানুষ স্মৃতির ওপরই নির্ভর করতে চাইতেন। শোনা কথার জোর ছিল; যে জন্য গুজব ও পরনিন্দার চর্চা ছিল প্রায় সর্বজনীন। মুখস্থবিদ্যা ছিল সর্বোচ্চ বিদ্যা। পরে ‘পড়ালেখা’র চল বেড়েছে। এখানেও দেখা যাচ্ছে, বাঙালি পড়েছে যত লিখেছে সে তুলনায় অনেক কম। আমরা শুনেছি, এমন গুরুজনীয় পরামর্শ যা একবার লেখা দশবার পড়ার সমান। পরামর্শটা যে ভিত্তিহীন ছিল তাও নয়। কিন্তু তবু লেখার ব্যাপারে বাঙালি তেমন এগোয়নি। তার জীবনে কাগজের ব্যবহার ছিল নগণ্য।

লেখেনি কেন? একটা কারণ চিন্তার অভাব। বাঙালি দুশ্চিন্তায় খুবই অভ্যস্ত, কিন্তু চিন্তায় তেমন নয়। দুশ্চিন্তার কারণেই হয়তো চিন্তা জমে ওঠেনি। বিজ্ঞানী তবু কিছু কিছু পাওয়া গেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক চিন্তার অভাব ছিল, এখনো রয়েছে। দর্শনের ক্ষেত্রে মৌলিক অবদানও অত্যন্ত সামান্য। হ্যাঁ, এখন আমরা যে লেখাপড়া করছি সেটা ঠিক কিন্তু এখনো পড়ছি যত তত লিখতে পারছি না। বুঝি-বা বক্তব্যের অভাব। তাছাড়া বক্তব্য দিতে গেলে ভয়ও থাকে, যদি গ্রাহ্য না হয়, যদি প্রমাণ হয় ভ্রান্তির। বক্তব্যের অভাব যে সত্য সেটা কথা বলার মধ্যেও টের পাওয়া যায়। অনেকেই অনেক কথা বলেন, কোনো কথা না বলে আবার অনেকে আছেন মুখই খোলেন না। কথা বলতে যে উৎসাহ দেওয়া হয় তাও নয়। ব্যবস্থাটা হচ্ছে স্বৈরাচারী। এখানে যার ক্ষমতা আছে সেই বলবে, অন্যরা শুনবে। জিজ্ঞাসা করা ঔদ্ধত্য, প্রশ্ন করা বেয়াদবি। গণতন্ত্র যে নেই সেটা বুঝতে সংসদে যাওয়ার দরকার হয় না, সমাজে, শিক্ষায়তনে, পরিবারে সর্বত্র পাওয়া যায়।

আর আছে দেখা। আমরা দেখতে ভালোবাসি, বোঝার চেয়ে। সাহিত্যের ক্লাসে আমাদের শিক্ষকরা এক সময়ে ‘আহা, কী সুন্দর’ বলেই ক্ষান্ত দিতেন। কেন সুন্দর, কোথায় সৌন্দর্য তার ব্যাখ্যা করতে উৎসাহ পেতেন না। এ ব্যাপারটা অন্যত্রও পাওয়া যায়। লোকে সৌন্দর্যের বড় প্রশংসা করে, বুদ্ধি বা মেধাকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। টেলিভিশন এই প্রবণতাটাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ভিডিও বেশি, অডিও কম। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও দেখি লেখার চাইতে ছবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চাইছে।

ব্যাপার যে গুরুতর তাতে সন্দেহ নেই এবং ব্যাপার যে আগের মতোই রয়ে গেছে তাও মিথ্যা নয়। বাংলা ভাষার শত্রু কে, এ প্রশ্ন যদি ওঠে, বলা যাবে শত্রু হচ্ছে শাসক শ্রেণী। আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। রাষ্ট্র বদল হয়েছে, ভেঙে পড়েছে, উঠেছে কিন্তু শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসেনি। আর ওই যে শাসক শ্রেণী সে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা তো করেইনি, বরং তার যথার্থ বিকাশে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। সেটা এখনো চলছে। আর আজ যে আমরা ‘স্বাধীন’ হয়েছি, এখনো যে শ্রেণী আমাদের শাসন করছে তারা নামে বাঙালি হতে পারে, কিন্তু তারা স্বদেশে থাকে বিদেশীর মতো এবং তাদের ভাষা যে বাংলা তাও বলা যাচ্ছে না। খাটি বাংলা তো নয়ই। এরা ইংরেজি পছন্দ করে। কেননা এদের মুরুবিব হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদীরা এবং এদের আদর্শ যদি কিছু থেকে থাকে তবে সেটা হচ্ছে পুঁজিবাদী।

বাংলা ভাষা যে বাংলাদেশে ভালো অবস্থায় নেই তার দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশ এখনো প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন হয়নি। মুক্তির জন্য সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার হবে। ওই মুক্তির লক্ষণ ও শর্ত হবে শ্রেণীবৈষম্য দূর করা। শ্রেণীর চেয়ে ভাষা যে বড় সেই সত্যটা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও পুঁজিবাদবিরোধী আন্দোলন, যে আন্দোলন সমাজকে মুক্ত করবে, মুক্ত করবে সমাজের মানুষকে। তখন আমরা স্বাভাবিক হবো।[ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ● সাপ্তাহিক বুধবার ]

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush info,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: