উইকিলিকসের প্রকাশিত বেশ কিছুসংখ্যক তারবার্তায় বাংলাদেশ

আ’লীগের জয়ে খুশি ভারত, ডেথ স্কোয়াড, মাদরাসা সংস্কারে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র-ব্রিটেন

উইকিলিকসের চাঞ্চল্যকর তথ্য

উইকিলিকসের সদ্য ফাঁস করা এক তারবার্তায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন কর্তৃক সরকারি ‘ডেথ স্কোয়াড’ নামে অভিহিত বাংলাদেশী আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাবকে ব্রিটিশ সরকার প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। মার্কিন দূতাবাসের ফাঁস হওয়া তারবার্তার বরাত দিয়ে উইকিলিকস আরো বলেছে, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) সদস্যরা ইনভেস্টিগেটিভ ইন্টারভিউ টেকনিকস ও ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’-এর ওপর ব্রিটিশ প্রশিক্ষণ লাভ করেছে। এ বাহিনীর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত লোককে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও বন্দীদের ওপর রুটিনমাফিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

উইকিলিকসের ফাঁস করা অন্য এক তারবার্তায় বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার পাঠক্রম পরিবর্তনে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করছে। এ ছাড়া ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়েছিল।

গোপন নথি ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়, ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষাকারী আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী খুশি হয়েছিলেন। পিনাক রঞ্জন মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টিকে বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা বাড়ানোই হবে ভারতের প্রধান অগ্রাধিকার। ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে সন্ত্রাস প্রতিরোধ। পিনাক রঞ্জন বলেন, মন্ত্রী যৌথ টাস্কফোর্স গঠনে শেখ হাসিনার আহ্বানকে স্বাগত জানাবেন। ভারত যদিও মূলত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের দিকেই নজর দেবে, তবুও শেখ হাসিনা খুবই ভারতঘেঁষা­ এ অভিযোগ থেকে তাকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা আড়াল দিতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনে জোর দেয়ার কারণটি উপলব্ধি করছে। অবশ্য হাইকমিশনার টাস্কফোর্সটি যাতে আরেকটি আঞ্চলিক কথার দোকান (টক শপ) না হয়ে ফলপ্রসূ টাস্কফোর্সে পরিণত হয়, সে ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।

গত মঙ্গলবার গভীর রাতে যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উইকিলিকসের এসব তথ্যের উল্লেখ করা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গুরুত্ব দিয়ে এসব তথ্য পরিবেশন করে।

ফুলবাড়ী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ

ফুলবাড়ী কয়লাখনিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দিয়েছিল বলে উইকিলিকসের ফাঁস করা গোপন নথিতে বলা হয়েছে। এই নথির ভিত্তিতে গার্ডিয়ানে বলা হয়েছে, গত বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহীর সাথে বাংলাদেশে নিযু্‌ক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি বৈঠক করেন।

‘বৈঠকে মরিয়ার্টি ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল কোল মাইনিং ম্যানেজমেন্টকে ফুলবাড়ীতে কয়লা উত্তোলনের অনুমতি দিতে বলেন’। তিনি বলেন, কয়লা উত্তোলনে উন্মুক্ত পদ্ধতিই সর্বোত্তম পন্থা। এ প্রতিষ্ঠানই ২০০৬ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে ফুলবাড়ী থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। ওই বিক্ষোভে সেনাদের গুলিতে তিনজন নিহত ও অসংখ্য মানুষ আহত হন। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো কয়লা প্রকল্পটি চালু করার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। মানবাধিকার কর্মীদের বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির আশঙ্কায় বিষয়টি নিয়ে এখনো ব্যাপক বিতর্ক চলছে।

পরে আরেকটি তারবার্তায় মরিয়ার্টি ব্যক্তিগতভাবে উল্লেখ করেন, ফুলবাড়ী প্রকল্পের পেছনে থাকা এশিয়া এনার্জি কোম্পানির ৬০ শতাংশ মার্কিন বিনিয়োগ। এশিয়া এনার্জি কর্মকর্তারা রাষ্ট্রদূতকে বলেন, তারা খুবই আগ্রহী যে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই সরকার এ প্রকল্পের ব্যাপারে অনুমোদন দেবে। তবে মরিয়ার্টি উল্লেখ করেন, তৌফিক-ই-ইলাহী স্বীকার করেন, কয়লাখনিটি রাজনৈতিকভাবে খুবই স্পর্শকাতর।

মাদরাসায় পরিবর্তনে সক্রিয় যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র

উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষার পাঠক্রম পরিবর্তনে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র একত্রে কাজ করছে। ‘সামষ্টিক সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের’ অংশ হিসেবে দেশ দু’টি মাদরাসা পাঠক্রমকে প্রভাবিত করতে চায়।

উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়, মাদরাসার পাঠক্রম পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ (ডিএফআইডি) একত্রে কাজ করছে। এক তারবার্তায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলের বিষয়টি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোর জন্য একটি মান পাঠক্রম তৈরি ও প্রয়োগের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কিভাবে দেয়া হবে তা দুই দেশের সমন্বিত পরিকল্পনায় আছে বলে বার্তায় জানান মরিয়ার্টি। মাদরাসা ‘পাঠক্রম উন্নয়ন পরিকল্পনা’র অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইড’র দেয়া এক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়।

লন্ডনের মুসলিম ইনস্টিটিউটের ড. গিয়াসউদ্দিন সিদ্দিক স্বীকার করেন, ডিএফআইডি’র উদ্যোগটি ছিল দক্ষিণ এশিয়া ইসলামের চরমপন্থা রোধের জন্য। তিনি বলেন, ‘এটি অনেক পুরনো সমস্যা’। ‘অনেক আগেই অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোর পাঠক্রমের দিকে নজর দেয়া উচিত ছিল। ডিএফআইডি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৬৪ হাজার মাদরাসা রয়েছে। যেসব অভিভাবক তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য প্রথাগত বিদ্যালয়ে পাঠাতে পারেন না তাদের সন্তানরা প্রায়ই বিনামূল্যে মাদরাসায় শিক্ষার সুযোগ পায়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তবে প্রায় ১৫ হাজার অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসা নিয়ে সচেতন বর্তমান সরকার। এসব মাদরাসায় অন্যগুলোর তুলনায় শিক্ষার গড় মান ভালো নয়। ‘মাদরাসার বিরুদ্ধে সন্তানদের চরমপন্থী করে তোলার অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।’

‘গত সপ্তাহে মাদরাসার অর্থের উৎস তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে সরকার’, উল্লেখ করে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরির মাদরাসায় ঘাঁটি গাড়ছে­ এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়।

ডেথ স্কোয়াডকে সহযোগিতা

উইকিলিকসের প্রকাশিত বেশ কিছুসংখ্যক তারবার্তায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সরকারের সন্ত্রাসবাদ দমনসংক্রান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। একটি তারবার্তায় এটা পরিষ্কার করে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবকে মানবাধিকার বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কোনো সহায়তা দেবে না এবং মার্কিন আইনানুযায়ী এটা করা হবে অবৈধ। কেননা র‍্যাব সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ ঘটনার সাথে জড়িত এবং এ জন্য তাদের কোনো ধরনের শাস্তি পেতে হয় না।

ছয় বছর আগে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী সে থেকে এ পর্যন্ত এ বাহিনীটি ‘ক্রসফায়ারের’ নামে সহস্রাধিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে র্যাবের মহাপরিচালক বলেছিলেন, তার সদস্যদের হাতে ক্রসফায়ারে ৫৭৭ জন মারা গেছেন। এ বছর মার্চে তিনি এ সংখ্যা ৬২২ জনে উন্নীত হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

গার্ডিয়ানে বলা হয়, তারবার্তায় এ বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে যে, ব্রিটিশ ও আমেরিকা উভয়ই বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমন কর্মকাণ্ড জোরদারে এ বাহিনীকে সহায়তা দিতে তাদের সঙ্কল্পের কথা জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হচ্ছে এই যে, বিগত দশকে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে র্যাবের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মনোভাব ইতিবাচক। সাধারণ মানুষ তাদের সপ্রশংস ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেন। একটি তারবার্তায় বলা হয়েছে, ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি এ মর্মে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে র‍্যাব এখন ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং এক দিন এটি ইউএস ফেডারেল বুøরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) বাংলাদেশী সংস্করণে পরিণত হবে।’

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য একটি তারবার্তায় আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, তারা র‍্যাবকে ১৮ মাস ধরে ইন্টারভিউয়ের অনুসন্ধানী কৌশল ও কর্মতৎপরতা পরিচালনার বিধির মতো কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছেন। র্যাবের জন্য প্রশিক্ষণ সহায়তাসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাজ্য সরকার দেশটিকে মানবাধিকারসংক্রান্ত কতগুলো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে র্যাবের প্রশিক্ষণ প্রধান মেসবাহ উদ্দিন গার্ডিয়ানকে বলেছেন, গত গ্রীষ্মে কাজে যোগদানের পর থেকে তিনি এ ধরনের কোনো প্রশিক্ষণের ব্যাপারে অবহিত নন।

তারবার্তায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তিন বছর আগে লেবার সরকারের আমলে র্যাবে প্রশিক্ষণকার্যক্রম শুরু হয়। তবে র‍্যাব কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, কোয়ালিশন সরকার গঠিত হওয়ার পাঁচ মাস পর অক্টোবরে তারা কতগুলো কোর্স ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেছেন। মন্ত্রীরা এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুমোদন করেছেন কি না তার জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ ও অন্যদের সন্ত্রাসবাদ দমনে অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তারবার্তায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্যাখ্যা করেন, মার্কিন সরকার র্যাবের বিরুদ্ধে কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অঙ্গীকারের কারণে বাধার সম্মুখীন হয়েছে। এই অভিযোগের কারণে এই বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ কিংবা অন্য কোনো সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ততা হারিয়েছে। মার্কিন আইনে বলা হয়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পার পেয়ে যাওয়া বিদেশী কোনো সামরিক ইউনিটকে মার্কিন অর্থসহায়তা দেয়া যাবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও রবাবরই র্যাবের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। আর বাংলাদেশী মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তো ২০০৪ সালের মার্চ মাসে র‍্যাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটি যেসব বিচারবহিভূêত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে তার বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ রেখেছে। মানবাধিকার গ্রুপগুলোর উদ্বেগের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘আমরা সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার অপারেশনাল দিকটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি না। সন্ত্রাস দমনে সহযোগিতার বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে আমাদের আইন ও মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। অন্তত ব্রিটিশ প্রশিক্ষণের কিছু কর্মরত ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। এসব ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা পুলিশিং ক্যাপাসিটি ও মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল পুলিশিং ইমপ্রুভমেন্ট এজেন্সির (এনপিআইএ) পৃষ্ঠপোষকতায় কাজ করেন। র্যাবের সাম্প্রতিক ফোর্সগুলো পরিচালিত হয় ওয়েস্টমার্সিকা ও হামবারসাইড পুলিশের কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, এনপিআইএ বাংলাদেশ পুলিশ ও র‍্যাবকে কারিগরি কিছু ক্ষেত্রে সীমিত সহযোগিতা দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে­ ফরেনসিক সচেতনতা, অপরাধ সংগঠনের স্থান সংরক্ষণ ও সাক্ষ্যপ্রমাণ উদ্ধার প্রভৃতি। সমগ্র প্রশিক্ষণে আমরা এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছি, সাক্ষী, সন্দেহজনক ব্যক্তি ও ভিকটিমের মানবাধিকারকে সর্বাধিক সম্মান জানাতে হবে। আমাদের সহযোগিতার লক্ষ্য হচ্ছে পুলিশের পেশাগত মানোন্নয়ন। পুলিশ যাতে গণতান্ত্রিক আচরণ ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে সে বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করা হয় প্রশিক্ষণে।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশের একাধিক সরকার র্যাবের হাতে হত্যাকাণ্ডের অবসান ঘটানোর ব্যাপার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে র্যাবের বিচারবহিভূêত হত্যাকাণ্ড বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দুই বছর আগে ক্ষমতায় আসার পর তারা সে আগের ধারাই অব্যাহত রেখেছে। গত বছর অক্টোবর মাসে বিবিসি আয়োজিত একটি আলোচনায় নৌপরিবহনমন্ত্রী এম শাহজাহান বলেছিলেন, এমন কিছু কর্মকাণ্ড আছে যেগুলোর বিচার দেশের আইন দ্বারা সম্ভব নয়। সে কারণে সরকারকে বিচারবহিভূêত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হতে পারে। যে পর্যন্ত না সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির মূলোৎপাটন করা যাবে সে পর্যন্ত ক্রসফায়ার নামের এই কর্মটি চলার দরকার আছে।

আওয়ামী লীগের জয়ে খুশি ভারত

গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী খুশি হয়েছিলেন।

গোপন নথি ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উইকিলিকসের তথ্যে বলা হয়, ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদীয় নির্বাচনে নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষাকারী আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী খুশি হয়েছিলেন।

পিনাক রঞ্জন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এফ মারিয়ার্টিকে বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা বাড়ানোই হবে ভারতের অগ্রাধিকার। ৮ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরে প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে সন্ত্রাস প্রতিরোধ। পিনাক বলেন, মন্ত্রী যৌথ টাস্কফোর্স গঠনে শেখ হাসিনার আহ্বানকে স্বাগত জানাবেন। ভারত যদিও মূলত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ের দিকেই নজর দেবে, তবুও শেখ হাসিনা খুবই ভারতঘেঁষা­ এ অভিযোগ থেকে তাকে রাজনৈতিকভাবে কিছুটা আড়াল দিতে বাংলাদেশের আঞ্চলিক টাস্কফোর্স গঠনে জোর দেয়ার কারণটি উপলব্ধি করছে। অবশ্য হাইকমিশনার টাস্কফোর্সটি যাতে আরেকটি আঞ্চলিক কথার দোকান (টক শপ) না হয়ে ফলপ্রসূ টাস্ক ফোর্সে পরিণত হয়, সে ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন। ভারত প্রায়ই অভিযোগ করে থাকে­ আন্তর্জাতিক ইসলামি সন্ত্রাসীরা প্রায়ই বাংলাদেশকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহার করে এবং ভারতে বোমা ও বিভিন্ন ধরনের হামলা চালানোর জন্য প্রায়ই সীমান্ত অতিক্রম করে থাকে। নয়াদিল্লি আরো জানায়, বাংলাদেশকে নিরাপদ স্থান হিসেবে ব্যবহারকারী ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামসহ (উলফা) ভারতের চরমপন্থী গ্রুপগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য ঢাকার আরো কিছু করা দরকার।

উইকিলিকসের আরেক নথিতে বলা হয়, মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার আঞ্চলিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধে সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এবং ‘ট্র্যাক ২’ প্রোগ্রামের বিষয়টি বিবেচনা করছে যাতে সুশীলসমাজ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে আরো ব্যাপক সমন্বয় সাধন করবে। পিনাক বলেন, এ ধরনের কর্মসূচি ‘সব সময়ই সাদরে গ্রহণযোগ্য’। নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বাংলাদেশী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর জন্য শেখ হাসিনার সন্ত্রাস প্রতিরোধবিষয়ক একজন ‘জার’ নিয়োগ দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাবেও ভারতীয় হাইকমিশনার ইতিবাচক সাড়া দেন। শেখ হাসিনার র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ভেঙে দেয়া উচিত হবে না বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যে একমত হন পিনাক রঞ্জন (সন্ত্রাস প্রতিরোধের জন্য র‍্যাব বাংলাদেশের প্রধান বাহিনীতে পরিণত হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি গঠন করায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এই বাহিনী নিয়ে সংশয় পোষণ করতেন)।

পিনাক বলেন, নির্বাচনের পরপরই এক বৈঠকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মৃতপ্রায় রেলব্যবস্থায় বিপুল বিনিয়োগের জন্য খুব আগ্রহ ব্যক্ত করেন। এর মধ্যে ছিল ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার সাথে বাংলাদেশী রেললাইনের পুনঃসংযোগ সাধন। পিনাক রঞ্জন উল্লেখ করেন, তিনি ১২-১৩ তারিখে পানিসম্পদবিষয়ক মন্ত্রী রমেশচন্দ্র সেনের সাথেও বৈঠক করেছেন (এর পরপরই বাংলাদেশী মিডিয়া খবর প্রকাশ করে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভারত থেকে আসা নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে বিতর্ক অবসানে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে শিগগিরই বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে)।

ভারতীয় হাইকমিশনার আরো বলেন, ভারত আগরতলায় নতুন প্রতিষ্ঠিত ৭৫০ মেগাওয়াটের নতুন বিদুøৎকেন্দ্র থেকে মারাত্মক জ্বালানি সঙ্কটে থাকা বাংলাদেশে ২৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদুøৎ বিক্রির প্রস্তাব দেবে। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন, বিদুøতের দাম নিয়ে এখনো আলোচনা হয়নি এবং বাংলাদেশকে তার জাতীয় বিদুøৎ গ্রিডের সাথে ওই প্লান্টের সংযোগসাধনের জন্য ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। পিনাক রঞ্জন ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ভারতীয় কোম্পানিগুলো নতুন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে। তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিনিয়োগের বিষয়টি নির্ভর করছে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার তাদের সামর্থø ও প্রযুক্তিকেন্দ্র গঠনের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সমর্থনের ওপর।

[নয়া দিগন্ত ডেস্ক]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: