এক দশকে জমির দাম বেড়েছে ৭শ’ শতাংশ : অভিমতঃ বাড়িভাড়া প্রসঙ্গ

এক দশকে জমির দাম বেড়েছে ৭শ’ শতাংশ

সমকাল, Wed 22 Dec 2010
গত এক দশকে রাজধানীতে এলাকা ভেদে কাঠা প্রতি জমির দাম বেড়েছে গড়ে ৭০০ শতাংশ। অভিজাত এলাকায় দাম বেড়েছে আরও বেশি। জমির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণেই ফ্ল্যাটের দাম আকাশছোঁয়া।

Housing in Dhaka


বেসরকারি হাউজিং কোম্পানি শেলটেকের এক জরিপ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল শেলটেক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. তৌফিক এম সেরাজ। এতে আবাসন খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করে ড. তৌফিক বলেন, মূলত জমির অগি্নমূল্যের কারণেই ফ্ল্যাটের দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে আবাসন একটি সম্ভাবনাময় খাত। মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে এ খাতের অবদান ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। আবাসন খাতের এ সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তার মতে, আবাসন খাতের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে সমন্বয়ের অভাব। বিদ্যমান বিধি, আইন ও নীতিমালার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। সুষ্ঠু আবাসন শিল্প বিকাশের জন্য সমন্বয় খুবই জরুরি। জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু জমি নয়, আবাসন খাতের অন্যান্য উপকরণ ইট, বালু, সিমেন্ট ও রডের দামও বেড়েছে বহুগুণ। গত দশ বছরে ইটের দাম বেড়েছে ৩০০ শতাংশ, সিমেন্ট ২০০ শতাংশ, রড ২৫০ শতাংশ। নির্মাণ সামগ্রীর উচ্চ মূল্যের কারণে ফ্ল্যাটের দামের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তার ওপর যোগ হয়েছে জমির দাম। এ প্রসঙ্গে ড. তৌফিক বলেন, ধানমণ্ডিতে এখন প্রতি বর্গফুট ফ্ল্যাটের দাম ১৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে জমির দামের কারণে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়। ঢাকা শহরে চাপ কমাতে নগরায়ণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। প্রকৌশলী ও পরিকল্পনাবিদ তৌফিক এম সেরাজ বলেন, একটি প্লান পাস করতে রাজউক এক বছর সময় নেয়। অথচ আইনে আছে ৪৫ দিন। এ ধরনের নীতির কোনো যৌক্তিকতা নেই।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, বারিধারায় ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৫০ লাখ টাকা। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৩ কোটি টাকা। গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিতে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা, এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। মোহাম্মদপুর, উত্তরায় প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা । এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা। মিরপুরে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৭ লাখ টাকা, ২০১০ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ টাকা। বাসাবোতে ২০০০ সালে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল ৮ লাখ টাকা, এখন ৩৫ লাখ টাকায়ও সে জমি পাওয়া যায় না। ২০০০ সালে এলাকা ভেদে গড়ে ঢাকা শহরে প্রতি কাঠা জমির দাম ছিল সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত দশ বছরে গড়ে ঢাকা শহরের এলাকা ভেদে জমির দাম বেড়েছে ৭ গুণ বা ৭০০ শতাংশ। ২০০০ সালে প্রতি পিস ইটের দাম ছিল আড়াই টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িছে ৭ টাকা। ২০০০ সালে প্রতি বেগ সিমেন্টের দাম ছিল ১৯৩ টাকা। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৫ টাকা। ২০০০ সালে প্রতি টন রডের দাম ছিল ২১ হাজার ৩০০ টাকা, এখন ৫৪ হাজার ৪০০ টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত চলি্লশ বছরে বেসরকারি ডেভেলপার কোম্পানিগুলো ১ লাখ ফ্ল্যাট সরবরাহ করেছে। তবে জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় আবাসন সংকট এখন তীব্র। বিশেষ করে ঢাকা শহরে এই সংকট আরও প্রকট। তাই এ শিল্পের রয়েছে প্রচুর সম্ভাবনা।

অভিমতঃ বাড়িভাড়া প্রসঙ্গ

হুসাইন আল জাওয়াদ
বাড়িওয়ালারা ভাড়ার ব্যাপারে কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করেন না। তাদের খেয়াল খুশিমতো ভাড়া নির্ধারণ করেন। বছর যেতে না যেতেই ভাড়াটিয়াদের ওপর চাপিয়ে দেন অতিরিক্ত ভাড়ার নোটিশ। ফলে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের মাঝে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। যারা কম আয়ের মানুষ, তাদের হয়তো বাড়িওয়ালার এই অসঙ্গত ভাড়া দিতে না পারায় ছাড়তে হয় বাসা। নয়তো গুনতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া। তাদের আয়ের ৬০ ভাগই চলে যায় এই ভাড়ার পেছনে। বাকি টাকা দিয়ে কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে দিন চালাতে হয়। এসব মানুষের বেশির ভাগই বেসরকারি চাকরিজীবী এবং কম বেতনভোগী। সরকারি চাকুরেদের বছর বছর বেতন বাড়লেও বেসরকারিদের বেলায় অনেকের ক্ষেত্রেই অন্য রকম নিয়ম। কয়েক বছর পরও বেতন বাড়ান না ওই সব মালিকপক্ষ। বেশির ভাগই তিন থেকে আট হাজার টাকার বেশি বেতন পান না। অথচ অন্যপক্ষে সরকারি একজন পিয়নও এখন পাঁচ থেকে ১২ হাজার টাকা বেতন পান। দেশের ৯৫ শতাংশ লোকই বেসরকারি চাকরিজীবী। সুতরাং শতকরা তিন-চার ভাগ সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ানোর সাথে বাড়িভাড়া বাজারে দ্রব্যমূল্য তরতর করে বেড়ে যায়। যার ভোগান্তির শিকার হয় দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ। এ দিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

বাড়িভাড়ার ব্যাপারে নীতিমালা থাকলেও সে নীতিমালাকে মালিকরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের ইচ্ছামাফিক ভাড়া বাড়াতেই থাকেন। অথবা কেউ সে নীতিমালা সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। এ জন্য কর্তৃপক্ষই দায়ী। ভুক্তভোগী জনগণ এ নীতিমালার প্রয়োগ দেখতে চায়। বেসরকারি নাগরিক সংহতির এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়াকে তাদের আয়ের অর্ধেকই খরচ করতে হচ্ছে ভাড়ার পেছনে।
উচ্চ বাড়িভাড়া ঠেকাতে আদালতের দ্বারস্থও হয়েছে মানবাধিকার সংগঠন। গত ১৭ মে উচ্চ আদালত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করতে সরকারের প্রতি রুলও জারি করেন। কিন্তু ভাড়াটিয়ারা বলছেন, এতে কোনো লাভ হয়নি। বাড়িভাড়া সংক্রান্ত ১৯৯১ সালের আইনের প্রতি তিন বছর পর আলোচনাসাপেক্ষে এবং বাড়ি সংস্কার করা হলে ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা আছে। কিন্তু তার প্রয়োগ আদৌ দেখা যায় না। নাগরিক সংহতির জরিপে আরো বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়াদের ১৬ শতাংশই বলেছেন, প্রতি ছয় মাস পরপর বাসাভাড়া বাড়ানো হয়। ৪৫ শতাংশ ভাড়াটিয়ার উক্তি, প্রতি এক বছর পরপর ভাড়া বাড়ানো হয়। আর ১৩ শতাংশ বলেছেন, প্রতি এক বছর পরপর ভাড়া বাড়ানো হয় মালিকের ইচ্ছেমতোই।
ক্যাবের এক জরিপে বলা হয়েছে, গত ১৮ বছরে ঢাকা শহরে ভাড়া বেড়েছে ২৮৫ শতাংশ। ১৯৯১ সালের আইনে ভাড়া আদায়ের রসিদ দেয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও কেউ এই আইন মানেন না। (সূত্রঃ প্রথম আলো, ১৫.০৭.১০)

ইত্তেফাকের শিরোনাম ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণহীন’। ১৫ বছরে বেড়েছে তিন গুণ। আইন থাকলেও অকেজো। বাড়িভাড়া বাড়ানো দণ্ডযোগ্য অপরাধ তা জানেন না বহু বাড়ির মালিক। এক শ্রেণীর বাড়িওয়ালা পৌরকর, গ্যাস, বিদুøৎ, পানির মূল্য বাড়ানোর অজুহাতে ঘনঘন অনেকটা চক্রবৃদ্ধিহারে বাসাবাড়ির ভাড়া বাড়িয়ে যাচ্ছেন। এতে নগরীর তিন-চতুর্থাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভাড়াটিয়া নির্ধারিত ভাড়া দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে মালিক কর্তৃক দুর্বøবহার, পানি দিতে কৃপণতা, ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ, পেশিশক্তির ব্যবহার­ এ অভিযোগ বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে। আর ভাড়াটিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ জোরপূর্বক বাড়িতে থাকা, নিয়মিত ভাড়া না দেয়া, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ঢাকার একটি জোনের দায়িত্বে থাকা রেন্ট কন্ট্রোলার জানান, নতুন বাড়ি করার পর রেন্ট কন্ট্রোল বিভাগকে জানালে তারা তদন্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করবেন এবং বাড়ির মালিককে সার্টিফিকেট দেয়ার পরই কেবল ভাড়া দেয়া যাবে। এমন আইন দরকার। (ইত্তেফাক, ২৭.০৮.১০)
বাড়িভাড়া বাড়ানো সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবাদ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করার পরও কোনো বাড়িওয়ালাকে সোচ্চার কিংবা সংশোধন হতে দেখা যায়নি, তা খতিয়ে দেখা দরকার। বাড়িওয়ালারা কেন এবং কোন অসাধু চক্রের ইঙ্গিতে এসব আইনের তোয়াক্কা না করে বাড়িভাড়া বাড়িয়ে চলছেন লাগামহীন, তা সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল যত দ্রুত বিষয়টি উপলব্ধি করবেন ততই মঙ্গল।
লেখকঃ কবি ও সাংবাদিক, বাংলাবাজার, ঢাকা

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: