প্রতিটি প্রবাসীর অন্তর ভরে থাকে দেশ, দেশের মানুষ এবং আত্মীয় স্বজনের মায়ায়। তাইতো দেশ থেকে নতুন কেউ প্রবাসে আসলে অথবা ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসলে তার কাছে আমরা প্রবাসীরা জানতে চাই দেশ এবং দেশের মানুষের অবস্থা, সুখ-দুঃখ এবং উন্নতি অগ্রগতির খবর।

কেমন চলছে আমাদের বাংলাদেশ?

মোহাম্মদ লোকমান
 

প্রশ্নটি আমার নয়, আমারই মতো আরেকজন সৌদি প্রবাসী ব্লগার বন্ধুর। আমি ছুটি কাটিয়ে দেশ থেকে আসার পর একটি পোস্টের কমেন্টে বন্ধুবর পরামর্শ দিলেন, ‘লিখে ফেলুন কেমন চলছে আমাদের বাংলাদেশ’। প্রতিটি প্রবাসীর অন্তর ভরে থাকে দেশ, দেশের মানুষ এবং আত্মীয় স্বজনের মায়ায়। তাইতো দেশ থেকে নতুন কেউ প্রবাসে আসলে অথবা ছুটি কাটিয়ে ফিরে আসলে তার কাছে আমরা প্রবাসীরা জানতে চাই দেশ এবং দেশের মানুষের অবস্থা, সুখ-দুঃখ এবং উন্নতি অগ্রগতির খবর। তিনি নিকটজন হলে তো কথাই নেই, চেনা জানার মধ্যে পড়ে এমন সকলের নাম-ধাম ধরে ধরে তাদের কুশল জিজ্ঞাসা করে থাকি। তাই বন্ধুগণ আসুন আমরা শেয়ার করার চেষ্ট করি কেমন চলছে আমাদের বাংলাদেশ-

সু-সংবাদ দিয়েই শুরু করি- ধীরগতি এবং দেরীতে হলেও আমাদের দেশ ক্রমে সামনের দিকে এগোচ্ছে। পরিমানে কম হলেও বিদেশী স্টাইলের শপিং মল, নজর কাড়া বহুতল ভবন, রাস্তায় দেখা যাচ্ছে নতুন মডেলের উন্নত মানের গাড়ী। উন্নত হয়েছে খাবার মেনু। কেউ একজন রস করে বলেছিলেন, এক সময় কোন বাড়ীতে মুরগীর ঝাপ্টা ঝাপ্টি এবং ভয়ার্ত ডাক শুনে অনুমান করা যেতো ঐ বাড়ীতে নিশ্চয়ই জামাই এসেছেন। অর্থাৎ জামাই বা মেহমান না এলে যেসব বাড়ীতে সাধারণত মুরগী খাওয়া হতো না এখন সেই মুরগী একটা কমন খাদ্যে পরিণত হয়েছে। পাওয়া যাচ্ছে বিদেশী পদ্ধতির নতুন নতুন মোড়কে নানা পদের খাদ্য সামগ্রী এবং ফলমুল। ফাস্ট ফুড, শপিং মল ও শপিং সেন্টার সমূহের আঙ্গিনায় দাঁড়িয়ে মাঝে মধ্যে ভ্রম হয়, দেশে আছি নাকি বিদেশে।

অনেষ্টলি বলতে গেলে বলতে হয়, এসব উন্নয়ন এবং অগ্রগতির মূলে রয়েছেন প্রবাসীরা। হাউজিং কোম্পানীগুলোর সিংহভাগ বিনিয়োগ প্রবাসীদের, ব্যক্তি মালিকানায় তৈরী স্থাপনা সমূহের উপর জরিপ চালালে দেখা যাবে এখানেও তারাই। বৈদেশীক মুদ্রার মূল যোগানদাতা প্রবাসীরা। দেশের পোশাক এবং অন্যান্য শিল্প মানুষের কর্মসংস্থান করেছে ঠিকই কিন্তু অধিকাংশ শিল্পপতি তাদের এসেটের চেয়ে অধিক পরিমান ঋণী থাকেন বিভিন্ন ব্যাংকের নিকট এবং তারা দেশে অর্জিত অর্থ বিদেশে নিয়ে গিয়ে সেখানে বাড়ী ঘর ও ব্যাংক ব্যালেন্স করে উন্নততর লাইফ এনজয় করে থাকেন। কৃষকগণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে মূল খাদ্যের যোগান দেয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকারের অবস্থান জানতে চান? তারা (যখন যারা আসেন) দল পূজা, নিজেদের আখের গোছানো আর দলীয় মাস্তানদের পেট ভরাতেই ব্যস্ত থাকেন। বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়। নিজেদের দলের না হলে অন্যরা দেশ ও জনগণের সেবা করুক তাও তারা চায় না। একটি দুঃখজনক ঘটনা শুনলেই বুঝবেন বিষয়টি-

চট্টগ্রামের একজন মেডিকেল অফিসার, নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। নিজ পেশার পাশাপাশি তাঁর এলাকায় একটি দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। গত কয়েক বছর আগে তাঁর সাথে পরিচয় আবুধাবীতেই। ছুটি পেয়ে তাঁর গড়া প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে এসেছিলেন এখানে। আমরা সাধ্যমত সহযোগীতা করেছি। কেউ কেউ মেডিকেল ইকুইপম্যান্ট, এক্সরে মেশিন, কম্পিউটার, বেড ইত্যাদি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ভবনটি একতলা পর্যন্ত করে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া শুরু করে ৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপ দেয়ার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। দেশে গিয়ে খোঁজ খবর নেয়ার জন্য যোগাযোগ করে জানতে পারলাম সরকারের প্রভাবশালী এমপি বাহাদুরের নির্দেশে কাজ বন্ধ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বেশী কথা বললে জঙ্গলে ট্রান্সফার করার হুমকিও দেয়া হয়েছে। এই হলো সরকারের দেশ সেবার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। জনগণের উপকার নিজেরাতো করবেই না, অন্যদেরকেও বাঁধা প্রদান করা হচ্ছে। আমার উল্লিখিত এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঐ এমপি সাহেবের চেয়ে সম্মান ও যোগ্যতায় অনেক উপরে। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রভাবশালীদের নিকট তিনি অসহায়।

আশির দশকে স্বৈরাচারী আমলে আমাদের দেশে সন্ত্রাস এবং নৈরাজ্য যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল, ছোট ছোট ছেলেদের হাতে অস্ত্র এবং জর্দার কৌটায় নির্মিত ককটেল শোভা পেত। স্বৈরাচার পতনের পর ক্রমে সেই অবস্থা থেকে আমরা অনেকটা মুক্ত হয়েছিলাম। কিছু কিছু ঘটনা আমাকে আবারও সেই স্বৈরাচারী আমলকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, হয়ত আমরা আবারো সেদিকে পা বাড়াচ্ছি। শুনুন কেন বলছি এই দুঃসংবাদটি-

আমি বর্তমানে যেখানে নতুন বাড়ী করেছি (আমার বাড়ী থেকে এক/দেড় কিলোমিটার দূরে) মাত্র ১৬টি প্লটের একটি আবাসিক এলাকা। এখানে বহিরাগতদের আগমনের কোন প্রয়োজনই নেই, কারণ রাস্তাটি শুধুমাত্র ঐ ১৬টি প্লটের জন্য। দেশে গিয়ে দেখলাম, সন্ধ্যা হলে আমাদের এই এলাকার গলির ভিতর বিল্ডিং সমূহের নিকট দাঁড়িয়ে/বসে একঝাঁক আন্ডা-বাচ্চা, সিকি-আধুলী বয়সের ছেলেদের আড্ডা। এসব ছেলেদের কারো মুখে সিগারেট, কারো মোবাইলে উচ্চ ভলিউমে গান এবং হৈ চৈ তো চলছেই। আমি দেশে যাওয়ার আগে অন্যান্য বাড়ীর মালিকেরা প্রতিবাদ করাতে ওরা তো দমেই নাই বরং উল্টো হৈ চৈ’র মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলে ‘মোদের চেনো?’ টাইপের হুমকি-ধামকি দিতেও বাদ রাখেনি। ভেবে দেখুন, সম্মানীত নাগরীকদের কী লাঞ্ছনা। আমি দেশে যাওয়ার পর পরিবারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে সাহসী প্রতিবাদ করে আপাতত আড্ডা বন্ধ করাতে পেরেছি। জানিনা আমি চলে আসার পর আবার শুরু করে কি না। ক্ষমতা এখন তাদের হাতে, থানা পুলিশ তো দলের পাতি নেতাদের নিকটও নত শীর।

দুবাই প্রবাসী একজন আজীম ভাই, আমাদের ঐ এলাকায় ছয়তলা বাড়ী বানিয়েছেন, বিল্ডিং এর নাম ‘এ জেড ম্যানসন’। এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই একজন সন্ত্রাসী স্ত্রী পরিচয়ে এক মহিলা সাথে এনে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। পরে দেখা গেল ঐ ফ্ল্যাটে নানা রকম অসামাজিক কর্মকান্ড এবং সন্ত্রাসীদের আড্ডা। ভাড়া তো দেয়-ই না, তার উপর উল্টো জমিদারের নিকট টাকা দাবী করে এবং এসব প্রকাশ করলে বড় ধরনের সমস্যা করার হুমকি দিয়ে রাখার কারণে ভয় এবং লজ্জায় দীর্ঘদিন পর্যন্ত ওরা মুখ খোলেনি। আজীম ভাইয়ের শ্বশুর দেখাশুনা করতেন বাড়ীটি। একদিন অতিষ্ঠ হয়ে বিষয়টি তিনি আমাকে বলার পর বিশেষ কৌশল অবলম্বন করে ওদেরকে বের করা হয়েছে। তবে গোপনে ওদেরকে টাকা দিতে হয়েছিল কিনা জানতে পারিনি।

আমার ইউনিভার্সিটি গোয়িং মেয়ের কমেন্ট- “রাস্তায় বেরুলেই বুঝা যায় এখন কারা দেশ শাসন করছে”। অর্থাৎ সে চিনতে পেরেছে বখাটে, আড্ডাবাজ এবং ইভটিজাররা কাদের খুঁটির জোরে নাচছে। মেডিকেল স্টাফ কোয়ার্টারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার স্ত্রী দেখিয়ে দিল সেই স্থানটি, যেখানে গত বছর সোনার ছেলেরা একটি মেয়েকে…..।

বাংলাদেশের মানচিত্রে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সহায়তায় দেখতে হবে এমন একটি ক্ষুদ্র স্থানের বর্ণনা তুলে ধরলাম মাত্র। পাতিলের সব ভাত টিপে দেখতে হয় না, একটা হাতে নিলেই বুঝতে পারা যায় পুরা ভাতের অবস্থা। এখন ভাবতে পারেন কেমন চলছে আমাদের বাংলাদেশ।

আমি শতভাগ নিশ্চিত যে, আমাদের দেশের সরকার যদি সত্যিকার দেশ প্রেমিক এবং দেশ ও দেশের মানু্ষের প্রতি আন্তরিক হতেন, সকল দল ও মতের মানুষকে নিজের হিসাবে গ্রহণ করতেন তাহলে দেশের চিত্র ভিন্ন হতে বাধ্য ছিল। আমাদের বিরোধী দলের ভূমিকাও কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ। তারা নানা রকম অজুহাতে সংসদ বয়কট করে কী বুঝাতে চান তা অন্তত আমার বোধগম্য নয়। তাদের উচিৎ ছিল সংসদে গিয়ে দেশের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা। নিজেরাই নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার এবং গোল করার জন্য ফিল্ড খালী করে দেয়া কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়। ১/১১ তথা অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক বিষাক্ত অধ্যায় থেকে শিক্ষা নেয়ার সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। আসুন আমরা যার যার অবস্থান থেকে সরকার ও বিরোধী দলের ভুলগুলি আঙ্গুলি নির্দেশ করে দেশ ও দেশের মানুষকে ভাল থাকার সহযোগিতা করি।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: