দেশকে ভালবাসি বললে, দেশের কি কিছু যায় আসে? ভালবাসতে হয় মানুষকে

আর কত অপরাধী দরকার আমাদের?

সুলতানা আজীম

জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই উদ্যোগকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। যে কোন উদ্যোগ সফল হয়, যদি তা সঠিকভাবে কার্যকর করার পরে, নির্ধারিত নিয়মে চালিয়ে যাওয়া হয়। সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সাহায্যে এই উদ্যোগ কার্যকর করবে অথবা করার চেষ্টা করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবুও কিছু কথা মনে পড়ছে এ ব্যাপারে।
আমাদের দেশের কত ভাগ শিক্ষক প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, উদার, যৌক্তিকভাবে জ্ঞানী, সব ব্যাপারে সচেতন, সৎ এবং মানবিক? যেসব শিক্ষক চারিত্রিক এবং মানসিকভাবে এ রকম নন, তাঁরা অবশ্যই তাঁদের ছাত্রছাত্রীদের সঠিক শিক্ষা দেন না। দেয়া সম্ভবও নয় তাঁদের পক্ষে। এ প্রসঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেক অধ্যাপকের নাম আমাদের মনে পড়ে। যারা কেবল রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল, ধর্মীয় এবং জঙ্গী দলগুলোর সঙ্গে জড়িতই নন, দলগুলোর নেতা পর্যায়েরও। ‘হিযবুল তাহ্রীর’ মতো দল গড়ে, গোটা দেশে তাদের কর্মকা- পরিচালনার সঙ্গেও জড়িত আছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এ ধরনের শিক্ষকরা, (প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের) শ্রেণীকক্ষে নির্দিষ্ট বিষয় পড়ানোর নামে আসলে কি পড়ান, তা দেশের অনেক ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে কথা বললে, তাদের দিকে তাকালে বোঝা যায়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগ কি পুরোপুরি সফল করা সম্ভব হবে, এ রকম শিক্ষকদের দিয়ে? শিক্ষার্থীদের আগে কি এ রকম শিক্ষকদেরই জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে সচেতন এবং শিক্ষিত করে তোলা উচিত নয়? কিন্তু তারা কি রাজি হবেন তাতে? বীভৎসভাবে মানুষ হত্যা, আর ভয়ঙ্করভাবে ধ্বংস করা ছাড়া, জঙ্গীবাদ যে সৃষ্টিশীল এবং মানবিক কোন কর্মকা- করে না, প্রমাণিত এই সত্য কি মেনে নেবেন তাঁরা? ধারাবাহিক হত্যা আর ধ্বংস কি কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠার সুস্থ পথ এবং পদ্ধতি হতে পারে? সুস্থ মগজের, মানবিক কোন মানুষ কি বেছে নিতে পারে বীভৎস এই পথ এবং পদ্ধতি? যে কোন সময়ে, যে কোন স্থানে, জঙ্গীদের নিক্ষিপ্ত বোমা বিস্ফারিত হয়ে নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, হারাচ্ছেন এবং হারাতে পারেন, যে কোন বয়সের নিরপরাধ শিশু, বৃদ্ধ, নারী, পুরুষ। এ রকম আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা যে জীবন, তা স্বাভাবিক জীবন নয়।
অপঘাতে মৃতু্যর আতঙ্কে কাঁপা রাষ্ট্রে, ধারাবাহিক এবং যথার্থ উন্নয়ন অসম্ভব। পাকিসত্মান, একটি উদাহরণ। দুর্নীতি, ধর্মান্ধতা, নিউক্লিয়ার বোমা তৈরি, তালেবান এবং জঙ্গী প্রতিপালন ও পরিচালিত করার কারণে, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক আর ভয়ঙ্কর দেশ হিসেবে নির্দিষ্ট হয়েছে দেশটি।
এ বছর ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হবার পরে, ব্যাকুলভাবে সাহায্যের আবেদন করছে এই দেশটির দুর্নীতিবাজ ক্ষমতাসীনরা। পাকিস্তানের জন্য দান করতে চাচ্ছেন না পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ। তাঁরা মনে করছেন, তাঁদের দান করা অর্থ নিয়ে দুর্নীতি হবে। তালেবান এবং জঙ্গী প্রতিপালন করা হবে। আরও এটম বোমা বানানো হবে। বন্যা আক্রান্ত মানুষের কল্যাণে আসবে না এই অনুদান। যে দেশের মানুষ এটম বোমা তৈরি করে নিজেদের খুব শক্তিশালী এবং গর্বিত মনে করে, তারা কেন বন্যার মতো দুর্যোগের সমাধান নিজেরা করতে পারে না?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় যে সব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তার কয়েকটি হচ্ছে, সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মাদ্রাসার শিক্ষকরাও জঙ্গীবাদবিরোধী প্রচারণা চালাবেন। শিক্ষার্থীদের জঙ্গীবাদে সম্পৃক্ত না হবার জন্য শপথ পড়ানো হবে। জঙ্গীবাদবিরোধী প্রচারপত্র, লিফলেট, পোস্টার ছড়ানো হবে। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জঙ্গীবাদবিরোধী আলোচনাসভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, পদযাত্রা ও র্যালির আয়োজন করা হবে। মানবতাই ধর্ম, একথা প্রচার করা হবে।
এই উদ্যোগগুলো ‘অধর্মে অন্ধ’ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কতটা প্রভাবিত করবে, তা বুঝতে পারব ভবিষ্যতে। বাংলাদেশের জনগণ, বিশেষভাবে রাজনীতি ও রাষ্ট্রপরিচালনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন এবং আছেন, ধারণা করছি, ‘মানবতাবোধ’ শব্দটি তাঁদের পরিচিত। মানবতাবোধই যে মানুষের সবচেয়ে বড় অথবা একমাত্র ধর্ম হওয়া উচিত, যে কোনভাবে এই বাক্যটিও শুনেছেন তাঁরা। কিন্তু তা কি উপলব্ধি করেছেন কখনও? যদি করতেন, তাহলে চর্চাও করতেন নিশ্চয়ই। এদেশের অধিকাংশ মানুষ অনুশীলন নয়, উপলব্ধিই করেননি এই বাক্যটি। করেননি যে, তার প্রমাণ, ঊনচলিস্নশ বছর বয়সী এই দেশটির চেহারা।
পৃথিবীর সৃষ্টিশীল এবং মানবিক মানুষেরা, অজস্র বাক্য লিখে এবং বলে গেছেন বিভিন্ন বিষয়ে, যা তাঁদের বাণী হিসেবে প্রচারিত হয়ে আসছে। কোন কিছুই হয় না, এসব বাণী পড়া আর শোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখলে। যদি না তা প্র্যাকটিস বা অনুশীলন করা হয়। মানবতাবোধ ব্যাপারটি, প্রতিটি মানুষের মগজ, হৃদয় এবং অনুভূতির অনত্মর্গত। মানুষ বলে নিজেকে দাবি করতে পারেন না কেউ, যদি তাঁর ভেতরে মানবতাবোধসহ, সব ধরনের মানবিক গুণগুলো না থাকে। মানবতাবোধ থাকলেও নিজেকে ‘মানুষ’ বলে দাবি করতে পারবেন না কেউ, যদি না তিনি প্রতি মুহূর্তে, মানবিক গুণগুলোসহ মানবতাবোধের চর্চা করে তা প্রমাণ করেন। শিশু বয়স থেকে মানবতাবোধের অনুশীলন করে বড় হন যিনি, তিনি অমানবিক এবং অমানুষ হতে পারেন না।
মানুষ একই সঙ্গে অনেক বিষয়ে বুদ্ধিমান এবং অনেক ব্যাপারে বোকা। খুব বুদ্ধিমান মানুষ ক্রিমিনাল হতে পারে এবং হয়। বুদ্ধি খুবই জরম্নরী, ক্রিমিনাল হবার জন্য। কিন্তু কোন মানবিক মানুষ খুব সহজে বা নিজের স্বার্থে, অমানবিক কাজ করতে পারেন না। ‘মানবতাবোধই ধর্ম’ এই বাক্যটিকে খানিকটা বদলে দিয়ে, তা অনুশীলন করার কথা বলতে চাই আমি। যে কোন মানুষ এবং প্রাণীকে সম্মান করে, তার অধিকার রক্ষা করা এবং মানবিক গুণগুলোর অনুশীলন করাই মানুষের ধর্ম (নীতি) হওয়া উচিত। একই সঙ্গে, এই প্রকৃতির যা কিছু আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে (জল বাতাস মাটি আলো গাছ) কোনভাবেই তাদের দূষিত এবং নষ্ট না করা। প্রতিটি মানুষ, প্রতিদিন এই নীতির চর্চা করলে, অনেক সমস্যা কমে যাবে পৃথিবীতে। আমি নিশ্চিত। নিজের স্বার্থেই, যে কোন মানুষের তা করা উচিত। কিছুমাত্র কঠিন নয়, এই নীতি মেনে চলা, যদি খুব ছোটবেলা থেকে অভ্যসত্ম করানো হয়।
অর্থনৈতিক দরিদ্রতার চেয়েও বড় যে সমস্যাটি বাংলাদেশে, তা আমাদের মানসিক দরিদ্রতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা এবং লোভ। শপথ পড়েই তো ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন, আমাদের রাষ্ট্রপরিচালকরা সবসময়। কি করেছেন তারপর? সব কিছুতে দুর্দমনীয় স্বার্থ, অপরিমিত লোভ আর ক্রমাগত বেড়ে চলা উচ্চাভিলাষের কাছে কি কোন ভূমিকা রাখতে পারে, কটি বাক্যের একটি শপথ? পেরেছে? মনে রাখার জন্য, মেনে চলার জন্য, শপথ করেন কয়জন? বাধ্যতামূলক শপথ মানে তো, আত্মশুদ্ধি করা নয়। জঙ্গীবাদে সম্পৃক্ত না হবার জন্য শপথ করা শিক্ষাথর্ীরা কি, টাকা এবং জিহাদ করে স্বর্গে (?) যাবার লোভে আসক্ত হবে না? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীরা কি করবে, তার খবর কে রাখবে?
দুর্নীতির অজস্র ধরনের মধ্যে, জঙ্গীবাদ বড় ধরনের একটি। সব ধরনের সততার অনুশীলন করিয়ে বড় করা হয় না বলেই, দুর্নীতিতে অভ্যসত্ম বা আসক্ত হয়ে যায় মানুষ, অনায়াসে। সততার সঙ্গে শিশুদের বড় করার দায়িত্ব, অধিকাংশ অভিভাবক নেন না। নেবেন কেমন করে, ঘরে-বাইরে অভিভাবক যাঁরা, তাঁরাও বড় হয়েছেন একইভাবে। যে মা, বাবা, শিক্ষক, সমাজপতি, রিকশাওয়ালা কৃষক শ্রমিক মুচি মেথর এমন কি বাড়ির কাজের ছোট্ট ছেলে বা মেয়েটিকেও, মানবেতরভাবে শোষণ অসম্মান অত্যাচার করে, ঘুষ দুর্নীতির টাকায় ধনী হয়ে জীবন কাটাচ্ছেন, তিনি নিশ্চয়ই তাঁর সনত্মান এবং ছাত্রকে ঘুষ দুর্নীতি শোষণ অন্যায় বৈষম্যের বিরম্নদ্ধে বলবেন না। বলবেন না, কারণ এসবে তিনি এবং তাঁরা এতই অভ্যসত্ম যে, এসব তাঁদের কাছে কোন অন্যায় মনে হয় না। জন্মসূত্রে দুর্নীতি আসক্ত মানুষরা, ন্যায় অন্যায়ের ব্যবধান অনুভব করে না। অনুভব করে না, সত্য আর মিথ্যার পার্থক্য। হত্যা ধ্বংস শোষণের মাধ্যমে, মানুষের জীবন এবং রক্ত শুঁষে নিয়েও বিন্দুমাত্র অপরাধবোধ হয় না এঁদের। অপরাধবোধ কি জিনিস, তাও জানেন না এঁরা। এ রকম মগজহীন, চরিত্রহীন অমানুষেরা যখন শিশুদের অভিভাবক হন, তখন সেই শিশুরা জন্মসূত্রেই আক্রানত্ম হয়, দুরারোগ্য মানসিক চারিত্রিক ‘ক্যান্সারে’। এরা এই শিশুরা বড় হয়ে যে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র এবং জাতির দায়িত্ব নেয় এবং নেবে, সে পরিবার সমাজ রাষ্ট্র ও জাতি, ততোধিক অমানবিক আর অমানুষ হতে বাধ্য।
মানবেতর মানুষদের প্রতি মুহূর্তে অসম্মান অত্যাচার শোষণ করে, অত্যাচারী এবং শোষক মনে করবে না এঁরাও নিজেদের। দুর্নীতির টাকা বসত্মায় ভরে ডাস্টবিনে ফেলে, হ্যান্ডকাফ পরে পুলিশের গাড়িতে উঠেও দুর্নীতিবাজ মনে করবে না নিজেকে। দু আঙ্গুল তুলে নিশ্চিত করবে তাদের বিজয়। অবশ্যই বিচার বিভাগকে ‘ড্যাম কেয়ার’ করে। তাদের অভিভাবকদের জীবন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতাই, এ রকম স্পর্ধার নেপথ্য কারণ হবে। জামিনে মুক্তি পেয়ে, এরাও প্রতিষ্ঠিত করবে নিজেদের আবার আগের যায়গায়, অদৃশ্য অভিভাবকদের সাহায্যে।
হত্যা ধ্বংসযজ্ঞ শোষণ অত্যাচার দুর্নীতি করার সবটুকু স্বাধীনতা এবং নিশ্চয়তা নিয়ে গড়ে উঠেছে এবং উঠছে, গত চার দশকের বাংলাদেশের অধিকাংশ ধনী, সচ্ছল এবং দরিদ্র পরিবারের সনত্মানরা। গড়ে উঠছে তাদের মা বাবার কর্মকা-ে সংক্রমিত এবং প্ররোচিত হয়ে। তারপরেও এই বাবা, মা বলবে, আমাদের সনত্মানদের ‘মানুষ’ করেছি আমরা। যোগ্য করে তুলেছি, দেশ জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য। জঙ্গীবাদের বিরম্নদ্ধে একটি নির্দেশনা তৈরি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যা পাঠানো হবে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকদের কাছে। এই নির্দেশনা যদি তাঁরা অনুসরণ না করেন, তখন কি করা হবে? কারা এটা মনিটর করবে? শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের প্রতি সম্মান রেখে দু-একটি প্রসত্মাব করতে চাচ্ছি আমি।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ালেখার পাশাপাশি সঙ্গীত, শিল্পকলা, রান্না, জুডো, কারাতসহ বিভিন্ন ধরনের স্পোর্টস ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে, ছাত্রছাত্রীদের প্রতিভা বিকশিত হবে এবং তারা ব্যসত্ম থাকবে সৃজনশীল কর্মকা-ে। বাংলাদেশের সংশোধিত সংবিধান সহজভাবে লিখে, পর্যায়ক্রমে পাঠ্য করা উচিত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ছোটবেলা থেকে সংবিধান পড়ে, প্রশ্নের জবাব লিখে, নিজেদের অধিকার ও আইন সম্পর্কে জেনে এবং মেনে বড় হবে ছাত্রছাত্রীরা। কোনরকম অপশিক্ষা বিভ্রানত্ম করতে পারবে না তাদের। যে কোন অন্যায় অবিচারের প্রতিকার করবে তারা আইনের সাহায্যে। আইন না জানার কারণে, প্রতারিত হবে না কেউ। সংবিধান এবং আইন হয়ে উঠবে তাদের প্রতিদিনের জীবনের জরম্নরী অংশ।
একটি দেশে তিন ভাষায়, তিনটি ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, তাও ভেবে দেখতে পারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ রকম শিক্ষাব্যবস্থাও সমর্থন করছে ভয়াবহ শ্রেণী বৈষম্য। টিকিয়ে রাখছে প্রচ-ভাবে, শ্রেণী বৈষম্য মেনে চলার নির্মম মানসিকতা। ‘৭২-এর মৌলিক সংবিধানে কি তিন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল? যদি না থেকে থাকে, তাহলে তিনটি ধারাকে এক করে, বাংলাভাষার গুরম্নত্বনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা কি প্রতিষ্ঠা করা যায় না? মায়ের ভাষার মাধ্যমে শিক্ষাই কি, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রথম সিদ্ধানত্ম হওয়া উচিত নয়? ইংরেজী এবং আরবী ভাষা মাধ্যমে পড়ে যারা বড় হচ্ছে, তারা আসলে কি হচ্ছে, তা ভেবে দেখা এবং এই অপব্যবস্থা পরিবর্তন করার সময় কি হয়নি এখনও? কবে হবে? না যদি হয়, তো পরিবার সমাজ রাষ্ট্রে ভারসাম্য আসবে কি করে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্যই চেষ্টা করতে পারেন, ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমে যুক্তিবাদী প্রগতিশীল মানবিক একটি জাতি গড়ে তুলতে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ রকম শিক্ষক গড়ে, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নিয়োগ দিলে, তা সম্ভব হতে পারে।
মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য, প্রধানত কি হওয়া উচিত, তা নির্দিষ্ট করে পাঠ্য বিষয়ের অনত্মর্ভুক্ত করা যেতে পারে। অন্যায়ভাবে ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতা, আর ভোগবিলাসিতায় আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপন করা যে কোনভাবেই মানুষের জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না, এই মতবাদে ছাত্রছাত্রীদের ছোটবেলা থেকে ‘কনভিন্সড’ বা একমত করা খুবই সম্ভব।
এই কাজটি করা উচিত, বিশেষভাবে ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়ের। যদি তাঁরা উন্নত এবং মানবিক সমাজ রাষ্ট্র গড়ে, সনত্মানদের নিরাপদ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে চান। তাহলে, তাদের প্রথম কর্তব্য হবে, সব ধরনের অন্যায় অপরাধের বৃত্ত থেকে নিজেদের বের করে আনা। যৌক্তিক মানবিক চেতনার অনুশীলন করা। তারপর, একই চেতনায় সনত্মানদের পরিচালিত করা। এদেশের নিরক্ষর এবং মানবেতর জীবনযাপনকারীদের কাছে এই প্রত্যাশা আমরা করতে পারি না, যদি না তাঁদের কাজ ঘর শিক্ষা চিকিৎসা দিয়ে মানুষের পর্যায়ে আনতে পারছি। কিন্তু অর্থ সম্পদ সামর্থ্য বিবেচনায় যাঁদের মধ্য এবং উচ্চবিত্ত বলা হয়, তাঁরা কি এ রকম একটি দেশ গড়তে রাজি হবেন? রাজি হবেন, মানবিক গুণগুলোর অনুশীলন করতে? তাঁরা কি তা পারবেন? যে কোনভাবে ভাল রেজাল্ট করে অথবা না করেও, এমন একটি পজিশন বা অবস্থানে থাকতে হবে সনত্মানকে, যেখানে থাকলে অদৃশ্য ডাকাতির মাধ্যমে অর্থ সম্পদ লুটে, দরিদ্রতম দেশটিতে, মা-বাবার চেয়েও বেশি ধনী হবার গর্ব এবং অহঙ্কার টিকিয়ে রাখতে পারবে সে। সনত্মান ‘মানুষ’ করার দর্শন যাঁদের এ রকম, তাঁদের কাছে আমার এই প্রসত্মাব হাস্যকর নয়, অন্যায়ও মনে হতে পারে।
তবুও বলছি, খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য মানুষের একটি পেশা জরম্নরী। কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরম্নরী, তার সঠিক চরিত্রটি। তা যদি না থাকে, তাহলে সে তার পেশা এবং পদমর্যাদাকে অপব্যবহার করে। করে এবং কতটা ভয়ঙ্করভাবে করে, তার প্রমাণ গোটা দেশ। যে সব উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তি সৃষ্টি ও ব্যবহার করে সব উন্নত দেশে মানুষের জীবন সমৃদ্ধ এবং সহজ হয়েছে, সেই প্রযুক্তি যখন আমাদের দেশে আনা হয়, তখন তা হয়ে ওঠে দুর্যোগ। হয়ে যে ওঠে, টেলিফোন পানি বিদু্যতসহ প্রায় সব কিছুই তার প্রমাণ। বিদু্যতের যে অবস্থা, তা কি সত্যিই জনসংখ্যা বৃদ্ধি সম্পর্কিত চাহিদার কারণে? না কি এই বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়িত্বহীনতা, অসচেতনতা, অযোগ্যতা, লোভ, দুর্নীতি, মানুষের প্রতি ভালবাসাহীনতাই এর কারণ? অর্থাৎ পদের অপব্যবহার। ক্ষমতার স্বেচ্ছাাচারিতা। ক্রমাগত বেড়ে চলা জনসংখ্যাই যদি কারণ হয়, তো তার সঙ্গে বিদু্যত উৎপাদন বাড়ানো কি জরম্নরী ছিল না? তা করা হয়নি কেন?
অন্যায় অপরাধে আসক্ত এই মানুষগুলোও দাবি করেন, তাঁরা দেশকে ভালবাসেন। দেশকে ভালবাসি বললে, দেশের কি কিছু যায় আসে? ভালবাসতে হয় মানুষকে। উপলব্ধি করতে হয় তাদের কষ্ট অভাব বঞ্চনা অভিযোগ। ‘ভালবাসা’ একটি শব্দ। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, অনেক অনেক দায়িত্ব। দায়িত্ব না মানলে এই শব্দটি এবং এর সঙ্গে যুক্ত অনুভূতি, হয়ে পড়ে অর্থহীন। মূল্যহীন। নিজেকে যিনি শ্রদ্ধা করতে পারেন, তিনি হতে পারেন সবচেয়ে সুখী মানুষ। নিজেকে শ্রদ্ধা করার জন্য জরম্নরী, নিজের চরিত্রটি। ষোলো অথবা কুড়ি কোটি জনসংখ্যার এই দেশে, ক’জনের তা আছে? নেই কেন? এ দেশের অধিকাংশ মা-বাবা এবং শিক্ষকদের কাছে একটি অনুরোধ। তাঁরা যেন ন্যায়-অন্যায়ের, ভাল-মন্দের, বিচার-অবিচারের, সত্য-মিথ্যার, মানবতা-অমানবতার, যথার্থ দায়িত্ববোধ ও দায়িত্ববোধহীনতার, সৃষ্টি আর ধ্বংসের পার্থক্য কি, তা বুঝতে এবং উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেন। তারপর, সনত্মান এবং ছাত্রছাত্রীদেরকে তা ব্যাখ্যা করেন। সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলে, তাদের সন্তান এবং ছাত্রছাত্রীরা কখনোই ভুল পথ বেছে নেবে না। এই এতটুকু দায়িত্ব যদি তারা নিতে না পারেন, তাহলে শিশুর জন্ম দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। সত্যিই নেই। আর কত ‘ক্রিমিনাল’ উৎপাদন করব আমরা? যথেষ্ট কি হয়নি এখনও?

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: