নির্বাচিত সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা তাদের নেতা-কর্মীদের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করছেন : রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সেকাল-একাল

রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের সেকাল-একাল
“১৬ বৈঠকে ৪ হাজার মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ : রাজনৈতিক আবরণে খালাস পাচ্ছে ২১ হাজার আসামি : ২১ সেকেন্ডে বাতিল হচ্ছে মামলা, ৮ সেকেন্ডে খালাস হচ্ছে আসামি”

১৬ বৈঠকে ৪ হাজার মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ : রাজনৈতিক আবরণে খালাস পাচ্ছে ২১ হাজার আসামি : ২১ সেকেন্ডে বাতিল হচ্ছে মামলা, ৮ সেকেন্ডে খালাস হচ্ছে আসামি

১৬ বৈঠকে ৪ হাজার মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ : রাজনৈতিক আবরণে খালাস পাচ্ছে ২১ হাজার আসামি : ২১ সেকেন্ডে বাতিল হচ্ছে মামলা, ৮ সেকেন্ডে খালাস হচ্ছে আসামি


আইন তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারছে না। প্রায়ই প্রভাব খাটিয়ে আইনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনীতিবিদরা আইনের শাসনের কথা বললেও বাস্তবে নিজেদের ধ্যান-ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে-পড়ে লেগেছেন। অভিযোগ আছে জোট ও মহাজোট উভয় সরকারই প্রভাব বিস্তার করে দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মামলা থেকে বের করে এনেছে এবং আনছে। এতে অপরাধীরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক মামলার নামে কীভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে এ প্রতিবেদন লিখেছেন খোন্দকার তাজউদ্দিন

রাজনৈতিক মামলার নামে অরাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের হিড়িক পড়েছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের হয়ে এসব মামলা প্রত্যাহারের তদবির করা হয়েছে। দিনেদুপুরে গুলি করে মানুষ খুন, শীর্ষ সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী হিসাবে ধরা পড়ার মামলাও রাজনৈতিক মামলা বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ রকম অনেক চাঞ্চল্যকর মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। বেশকিছু প্রক্রিয়াধীন আছে। হত্যা-ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের অনেক মামলাও প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক মামলা নাম দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ নিচ্ছে ছিঁচকে চোর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের উপঢৌকন দিয়ে চিহ্নিত অনেক অপরাধী মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলের ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। তাদের মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ মিলছে না। এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

দলীয় নেতা-কর্মীদের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিতে নির্বাহী ক্ষমতা ছাড়াও রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে সরকার।

দলীয় নেতা-কর্মীদের অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দিতে নির্বাহী ক্ষমতা ছাড়াও রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করছে সরকার।

সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় মালিবাগ হত্যাকা- মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এ মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ায় অভিযুক্ত সন্ত্রাসী শওকত হোসেন হিরণ, লন্ড্রি দুলাল, কিরণ ও শাওন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছে।

মালিবাগ হত্যাকা-ের ঘটনা ছাড়াও সরকার গঠিত কমিটি রাজধানীর বাড্ডার শরীফ হত্যা মামলাটি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বিবেচনায় তা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসমি কাউসার ওরফে গালকাটা কাউসার নিজেকে স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা উল্লেখ করে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করে এবং তা ঢাকা জেলা প্রশাসকের সুপারিশসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এ সংক্রান্ত নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা-১-এর সহকারী সচিব মোঃ আবু সাইদ মোল্লার কাছে রয়েছে। শরীফ হত্যা মামলার বাদী মাহবুবুর রহমান এ তথ্য উল্লেখ করে নৃশংস এ খুনের মামলা যাতে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত না নেয়া হয় সে জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

যশোরের ত্রাস, রিপন হত্যা মামলার আসামি আনিসুর রহমান লিটন ওরফে ফিঙ্গে লিটন যশোর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতার সুপারিশ নিয়ে দলীয় নেতা সেজে সম্প্রতি রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছে। যশোর আওয়ামী লীগের ওই নেতা ফিঙ্গে লিটনের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কুষ্টিয়ায় উদীচীর বোমা হামলা মামলার অন্যতম আসামি, শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসানের ছোট ভাই মিজান স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাকে উপঢৌকন দিয়ে তার বিরুদ্ধে ২০০৬ সালে দায়েরকৃত অস্ত্র মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করে। ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ক্রসফায়ারে সে মারা যায়। ফলে ঐ প্রক্রিয়া স্থাগিত হয়ে যায়।

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় মোবারক হোসেন হত্যা মামলা নিয়েও শুরু হয়েছে ষড়যন্ত্র। শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের নির্দেশে ওই হত্যাকা- ঘটানো হয়। জিসানকে ধরতে ইন্টারপোলে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়। ওই মামলার ৬ কিলার ধরা পড়েছে। জিসান রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমানে এ মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় এনে তা প্রত্যাহারের তোড়জোড় চলছে।
রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাৎ। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আবেদন করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করার জন্য একটি পক্ষ তৎপর রয়েছে।

মডেলকন্যা তিন্নি হত্যার নায়ক সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক অভি। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। হঠাৎ করে দেশে ফিরে আসার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছেন তিনি। তার রাজনৈতিক গডফাদার তিন্নি হত্যা মামলাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে অভিকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেছেন। ধানমন্ডি থানার শীর্ষ সন্ত্রাসী ব্যাঙ বাবু। ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৫টি মামলার ২টি থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অব্যাহতি নিয়েছেন।

সারাদেশে এখন রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার ছড়াছড়ি। রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত ব্যক্তির নামে মামলা হচ্ছে সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

সারাদেশে এখন রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার ছড়াছড়ি। রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত ব্যক্তির নামে মামলা হচ্ছে সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।


নারায়ণগঞ্জের শীর্ষ সন্ত্রাসী হোসেন চেয়ারম্যানÑ বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলের পাঁচ বছর বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা করা হয়।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এলে একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার ছত্রছায়ায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা থেকে অব্যাহতি পান। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা উৎকোচ নিয়ে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নরসিংদী জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আসাদুজ্জমান আসাদ। পরকীয়া করতে গিয়ে প্রেমিকা খুন করে দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। সম্প্রতি ওই মামলা রাজনৈতিক দেখিয়ে তা প্রত্যাহার করিয়ে নেয়ার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন।
নাটোরে চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রপতির অনুকম্পা নিয়ে কারাগার থেকে বের হয়ে এসেছেন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সারাদেশ থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে সংশ্লিষ্ট কমিটি এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৮শ ৬৩টি মামলা গ্রহণ করে। এর মধ্যে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণসহ দ বিধির বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা মামলা রয়েছে ৫ হাজার ৫শ ৪৮টি। বাকি ৩ হাজার ৩শ ১৫টি মামলা দুদকের। ইতিমধ্যেই সরকারের সংশ্লিষ্ট কমিটির সুপারিশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৮ অক্টোবর কমিটির ২২তম সভায় রাজনৈতিক বিবেচনায় ১০৫টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গত ৫ জুলাই কমিটির ২০তম সভায় ৪শ ৫৭টি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ওই বৈঠকে ২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি চাঞ্চল্যকর মালিবাগ হত্যাকা-ের মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঘটনার দিন ডা. এইচবিএম ইকবালের একটি মিছিল থেকে বিএনপির মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

এতে এক পুলিশসহ ৫ জন খুন হন। রাজনৈতিক বিবেচনায় মালিবাগ হত্যাক-ের মতো মামলা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম ২০০০ কে বলেন, ২০০১ সালে ডা. এইচবিএম ইকবাল ও নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা ফাইনাল রিপোর্ট দেন। এ রিপোর্টের ভিত্তিতে তারা আদালত থেকে অব্যাহতি পান। পরে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এ মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে। তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে ড. ইকবাল ও শাওনকে হেনস্থা করার চেষ্টা করে। তাই বর্তমান মহাজোট সরকারের রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ২০০৯ সালের ১০ জুন। প্রথম বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা ১২টি মামলাসহ ৬২টি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রত্যাহারের তালিকায় পল্টন থানার একটি হত্যা মামলাও ছিল। প্রথম দিনই শেখ হাসিনা ছাড়াও মামলা প্রত্যাহারের তালিকায় এক মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে উপদেষ্টাম-লীর সদস্য তোফায়েল আহমেদের ৯টি, সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ১টি সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ৬টি, গৃহায়ণ প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খানের ১টি, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের ২টি, কামাল আহমেদ মজুমদার এমপির ১৩টি, বাহাউদ্দিন নাছিমের ৪টি ও সাবেক এমপি হাজি মকবুল হোসেনের ১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২১ জুন দ্বিতীয় বৈঠকেও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ৪৬টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১ জুলাই তৃতীয় বৈঠকে দুদকের ১১ মামলাসহ ৬৬টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৫ জুলাই চতুর্থ বৈঠকে ৬৯টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ৫ আগস্ট পঞ্চম বৈঠকে ১২১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২৬ আগস্ট ষষ্ঠ বৈঠকে ১২০টি, ১৬ সেপ্টেম্বর সপ্তম বৈঠকে ১২৩টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই বৈঠকে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

১৩ অক্টোরব অষ্টম বৈঠকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের ১টি ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১টি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা তাদের নেতা-কর্মীদের জন্য রাজনৈতিক বিবেচনায় খুন, ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করছেন। বড়মাপের নেতা বাদে সাধারণ নেতাকর্মীদের নাম গোপন রাখা হচ্ছে। মামলা প্রত্যাহার বিষয়ে জেলা পিপিরা রমরমা বাণিজ্য করছেন বলে অভিযোগ আছে।

জোট আমলে যা হয়েছে
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় রাজনৈতিক মামলার নামে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, রাজহানি, অপহরণ মামলা থেকে আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সারাদেশে খুন ধর্ষণের রেকর্ড করা হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। এসব মামলার আসামি ছিল বিএনপি-জামায়াতের নেতৃবৃন্দ। ১৯৯৬-২০০১ চাঞ্চল্যকর কিছু মামলার আসামিদের রাজনৈতিক মামলার ব্যানারে অব্যাহতি দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের পটিয়ায় ৪১ জন হুজি সদস্য সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া অবস্থায় ধরা পড়ে।

এদের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে ফেরা শীর্ষ মুজাহিদরা ছিলেন। অস্ত্র আইনে তাদের সাজা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই মামলাকে রাজনৈতিক দেখিয়ে সব সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে শীর্ষ জঙ্গি আবু সুফিয়ান, সিদ্দিকুল ইসলাম ছিলেন। পরে তারা সারাদেশে জঙ্গি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
একইভাবে শীর্ষ সন্ত্রাসী আহমদ্যা, গিট্টু নাসিরকে কারাগার থেকে বের করে এনে আওয়ামী লীগ দমনে ব্যবহার করা হয়। পরে অবশ্য র‌্যাবের ক্রসফায়ারে তারা মারা যায়। রাজধানীর টপটেরর আমিন রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগরের মামলাকে রাজনৈতিক দেখিয়ে তা থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। আরব-বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের নায়ক তৌহিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাও রাজনৈতিক বলে চালানোর চেষ্টা করা হয়। পরে সে পালিয়ে দুবাই চলে যায়।

রাজনৈতিক রঙ লাগিয়ে ড. হুমায়ুন আজাদ ও ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার হোসেন চৌধুরী হত্যাচেষ্টা মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়। সংসদ সদস্য আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যার নায়ক নুরুল ইসলাম সরকারকে বাঁচানোর নানা চেষ্টা করা হয়। পরে বিষয়টি মিডিয়ার চলে এলে তা বানচাল হয়ে যায়। বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু ও জেলহত্যার আসামি মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানকে বের করে এনে মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রদূত পর্যন্ত করা হয়।

রাজনৈতিক মামলার নামে দিনাজপুরে ইয়াসমিন ধর্ষণ মামলা আলোর মুখ দেখেনি। পূর্ণিমা ও রীতা ধর্ষণ মামলায় উল্টো বাদী পক্ষের লোকজনকে আসামি করে চিহ্নিত আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হয়। একইভাবে ঝিনাইদহের সর্বহারা ত্রাস সিদ্দিক মোল্লা ও গণমুক্তি ফৌজ নেতা আনোয়ার হোসেন দেবু রাজনৈতিক ছাত্রছায়ায় কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন।
মাদারীপুর জেলার নিরঞ্জন বাগচী ১২০ কেজি ওজনের কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে র‌্যাব-৮ হাতে ধরা পড়েন ২০০৭ সালে। র‌্যাবের মতে ওই মূর্তির বাজার দাম ১২ কোটি টাকা। আলোচিত এ মামলা থেকে নিরঞ্জন বাগচী রেহাই পেয়েছেন রাজনৈতিক তদবিরের বদৌলতে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে জামাল উদ্দিন অপহরণ, গোপাল কৃষ্ণ মহুরী হত্যা, সাংবাদিক মানিক সাহা হত্যা, সাংবাদিক শামছুর রহমান, হুমায়ূন কবীর বালু, গৌতম বিল্লাল হত্যা মামলা রাজনৈতিক তদবিরের কারণে কোনো গতি পায়নি। বাঁশখালী হত্যাকা-, ফাহিমা ধর্ষণ, বুশরা হত্যাকা-, অ্যাডভোকেট কালিদাস বড়াল হত্যাকা-, ভোলার ওবায়দুল হত্যাকা-, অ্যাডভোকেট হুমায়ূন কবীর, যুবদল নেতা সাগির, নাটোরের মমতাজ হত্যা রাজনৈতিক তদবিরের কারণে স্থবির হয়ে গেছে। চিহ্নিত অপরাধীরা রাজনৈতিক মদদে পার পেয়ে গেছে। পুরনো ঢাকার লোমহর্ষক হত্যাকা- ব্যবসায়ী সামছুল আলমকে ৫৬ টুকরা করার নায়ক রফিকুল ইসলাম কাজলের রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে কোনো শাস্তি পেতে হয়নি।
রাজনৈতিক মামলা ও তদবিরের প্রভাব খাটিয়ে বুয়েটে সাবেকুন্নাহার সনি হত্যায় ছাত্রদল নেতারা বেরিয়ে এসেছেন রাজনৈতিক বিবেচনায়। খুলনার অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম, তেজগাঁওয়ের অ্যাডভোকেট খোরশেদ, চট্টগ্রামে প্রফেসর ইউনুস হত্যার আসামিরা বিএনপির রাজনীতি করার সুবাদে সে সময় পার পেয়ে গেছে।

রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই নব্বইয়ের আন্দোলনে শহীদ ডা. মিলন, নূর হোসেন হত্যাকা-ের বিচার হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ মার্ডারের হোতা বর্তমান জাগপা প্রধান শফিউল আলম প্রধানকে কারাগার থেকে বের করে ৭৫ পরবর্তী রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করার ঘটনাও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রসূত।

বিশিষ্টজনের মতামত
রাশেদ খান মেনন, এমপি, সভাপতি, ওয়ার্কার্স পার্টি
রাজনৈতিক মামলার নামে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক মামলার নামে সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শুরু করেছিল। বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছে। এই ধারা রাজনীতিতে সুফল বয়ে আনবে না।

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এমপি, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
রাজনৈতিক মামলার নামে সরকার যেসব মামলা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে তাতে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। চিহ্নিত অপরাধীদের ছেড়ে দেওয়া সরকারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। আগের সরকারের আমলে কিছু অপরাধীকে বিএনপির দলীয় পরিচয়ে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, টিআইবির সাবেক চেয়ারম্যান
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ও বর্তমান মহাজোট রাজনৈতিক মামলার নামে যেসব মামলা প্রত্যাহার করেছে তাতে সমাজে অপরাধীদের অপরাধ করার প্রবণতা বাড়বে। রাজনৈতিক মামলার মোড়কে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি মামলা প্রত্যাহারের অভিযোগ উঠছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত আমাদের রাজনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না।

ড. কামাল হোসেন, বিশিষ্ট আইনজীবী
আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়া উচিত। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে বলে সে মাফ পেয়ে যাবে এটা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। তবে অপরাধ না করে শুধু রাজনীতি করার জন্য হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকলে সেগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া দোষের কিছু দেখি না।

খন্দকার মাহবুব হোসেন, সভাপতি
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন
যেভাবে খুন ধর্ষণ মামলার আসামিদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে না যে দেশে আইন বলে কিছু আছে। দেশে রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার আশু পরিবর্তন প্রয়োজন। এ ধারা চলতে থাকলে আবার আমরা অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হব।

ব্যারিস্টার জাকির আহমেদ, আইনজীবী
বিএনপি-জামায়াতের দায়ের করা ষড়যন্ত্রমূলক মামলা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়ের করা জোর জবরদস্তির মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। খুন-ধর্ষণের মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছেÑ এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয়। রাজনৈতিক কারণেই এ ধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: