ওবামার কিছু সহজাত সুকুমার প্রবৃত্তি থাকলেও থাকতে পারে, যা তার মুসলিম বিশ্বের প্রতি মনোভাবে প্রকাশ পায়- সেড়্গেত্রে অবশ্য তিনি একই রকম ভয়াবহভাবে দুর্বল, কাপুরম্নষোচিত

ওবামার স্ববিরোধিতা ও প্রত্যয়ের অভাব

এম আবদুল হাফিজ

Barack Obama

Barack Obama


 

তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানে প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজের খ্রিস্টান পরিচিতিকে সতর্কভাবে ধরে রেখেছেন। তিনি জানতেন যে, বিপুলভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তরাষ্ট্রে এই পরিচয়ই তার অভিলাষকে পূর্ণ করবে- হোক না তার জন্ম কোনো অখ্যাত আফ্রিকীয় জনকের ঔরসে। তাই তিনি মাতৃকুলের খ্রিস্টান সম্পৃক্ততাকে নিজে শুধু ধারণই করেননি, সেটাকে ঘষে-মেজে উজ্জ্বল করেছেন। ক্যাম্পেইনের সময় প্রায়ই ওবামাকে গির্জায় যেয়ে উপাসনায় লিপ্ত দেখা যেত। মসজিদ বা কোনো ধরনের মুসলিম উপাসনালয়কে তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতেন। তিনি তার অতীতের মুসলিম সম্পৃক্ততাকে প্রাণপণে চেষ্টা করেছেন মুছে ফেলার, যদিও তার জন্মদাতা বাবা এবং সৎ বাবা দুজনে মুসলমান ছিলেন। জাকার্তায় তার সৎ বাবার সঙ্গে বসবাসকালে তার জীবনারম্্‌ভ হয়েছিল একজন মুসলমান হিসেবে। কী পরিমাণ স্বার্থ-বুদ্ধি কারো মধ্যে কাজ করলে সে অবলীলায় তার শেকড়কে অস্বীকার করতে পারে। ওবামা সেটিই করেছিলেন এবং এখন তার মধ্যে যে দ্বিবিধ চেহারা পরিদৃষ্ট হয়, তার কারণও এটি।

নির্বাচনে ওবামাকে বেকায়দায় ফেলতে তার প্রতিপড়্গরা প্রায়ই তার চোখের মধ্যাংশের প্রতি ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। শুধু তাই নয়, তারা ওবামার জন্ম-বৃত্তান্তের রেকর্ডকেও বিতর্কিত করেছিল এবং এও প্রচার করেছিল যে, ওবামা ফিলিস্তিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। সম্্‌ভাব্য প্রেসিডেন্টকে ঘায়েল করতে প্রতিপড়্গরা তাদের অনুকূল কন্সটিটিউয়েন্সি বিশেষ করে ইহুদি-খ্রিস্টানদের মুখাপেড়্গী হয়েছিল।

যা হোক, ড়্গমতায় আসীন হওয়া মাত্রই কিছু কিছু বিষয়ে ওবামা আরব ইসলামী বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসে বুশ প্রশাসনের নীতিকে বর্জন করেন। ইরাক থেকেও তিনি মার্কিন সৈন্যদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন, যদিও তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে তার ইরাককে নিয়ে সত্যিকারের অভিপ্রায় নিয়ে। কেননা তিনি বিপুল সংখ্যার সৈন্য ইরাকেই পুনঃমোতায়েন করছেন ইরাকি নেটিভ আর্মির প্রশিড়্গণের ছুতোয়। তাছাড়াও ইরাকের এ পর্যায়ে একটি লেজেগোবরে অবস্থা, যার অছিলায় যুক্তরাষ্ট্র যখন তখন সৈন্য পুনঃমোতায়েন করতে পারে এবং ইরাকের জাতি ও ধর্ম গোষ্ঠীগত বিভেদ-বিদ্বেষকে কাজ লাগিয়ে মার্কিন-দোসর ইসরায়েলের গ্রেটার ইসরায়েলে স্বপ্নের অনুকূলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এদিকে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি বিরোধ নিষ্পত্তিতেও ওবামা আপাতদৃষ্টিতে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় ইহুদি বসতি স্থাপন সম্প্রসারিত না করার জন্য চাপে রেখেছেন এবং সরল বিশ্বাসে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে বলছেন। মিত্র হিসেবে ইসরায়েলের ওপর ওয়াশিংটনের বিরাট প্রভাব রয়েছে। ওবামা সম্্‌ভবত সেটিই কাছে লাগাতে চান। প্রয়োজনে এবং সদিচ্ছা থাকলে ওবামা ইসরায়েলকে আগের মতো মার্কিন অস্ত্র প্রেরণ বন্ধও করে দিতে পারেন।

কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের এতসব হুমকি-ধমকি বা প্রভাব এ পর্যন্ত ইসরায়েলি আচরণে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। ওবামা কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার অনুকূল মনোভাব দেখিয়েই যাচ্ছেন। যদিও তার ইতিবাচক কোনো ফলাফলই নেই। ২০০৯ সালের জুনে ওবামার বহুল প্রচারিত কায়রো ভাষণটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে গতানুগতিকভাবে পৌঁছেছিল এবং তিনি সে সময় ‘বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ নামটি পরিবর্তনের কথাও চিন্তা করছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে টার্গেট করতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি শব্দমালা থেকে এই নামটির কোনো পরিবর্তন হয়নি।

শুধু তাই নয়, ওবামার এতসব মুসলিম বিশ্বের জন্য উদার এবং মহৎ উচ্চারণের পর ওবামা আফগানিস্তানে সৈন্যস্ফীতির আদেশ দিয়েছেন। সিআইএর ড্রন হামলাও তীব্র হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র পাকিস্তানের সীমান্ত সংলগ্ন উপজাতীয় অঞ্চলে।

ড্রন হামলার এই তীব্রতা ওবামার মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিশেষ সমীকরণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণার পর। মার্কিন বিশেষ বাহিনীগুলো এখন ৭৫টি দেশে সক্রিয়। বুশ আমলে তা ছিল ৬০টি দেশে। ইত্যবসরে গুয়ানতানামো বে এখনো চালু আছে। মার্কিনিরা এখনো সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি নেয় এবং প্রয়োজনে ‘হত্যা’ এখনো ওয়াশিংটনের টুলবক্সে একটি যন্ত্র বা হাতিয়ার।

মার্কিনিদের কনটিজেন্সি অপারেশন্স-এ বিদেশ-বিভূইয়ে যেসব বেসামরিক ব্যক্তি মারা পড়ে তাদের অধিকাংশই মুসলমান। যেসব বিদেশি ধরা পড়ে এবং জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয় তাদেরও প্রায় সবাই মুসলিম। ফলে আল-কায়েদার ব্যবহৃত উক্তি ‘ক্রুসেডর’ এবং ‘ইমপেরিয়ালিস্ট’ কাদের বোঝায় তা কিছুটা চোখ-কান খোলা রাখলে আর অস্পষ্ট থাকে না।

আশ্চর্যের বিষয় যে, ওবামার কায়রো ভাষণের লালিত্য সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্বে ওবামার দেশের গ্রহণযোগ্যতা যা আগেও খুব ভালো ছিল না- আরও অনেক নিচে নেমে এসেছে। গ্রহণযোগ্যতার এই নিম্নগামিতা মার্কিনিদের মিত্র আরব দেশ মিসরে ২০০৯ সালের শতকরা ৪১ ভাগের বিপরীতে এখন শতকরা ৩১ ভাগে নেমে এসেছে। তুরস্ড়্গে তা গত বছরের শতকরা ৩৩ ভাগের বিপরীতে এখন শতকরা ২৩ ভাগে নেমেছে। তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস ঘটেছে পাকিস্তানে, যা গত বছরের শতকরা ১৩ ভাগের বিপরীতে এখন শতকরা ৮ ভাগ। বোঝা যায়, ওবামা প্রেসিডেন্সি এই ধ্বংস সর্বাধিক।

মার্কিনি যুদ্ধ, দখলদারিত্ব এবং অতর্কিত ড্রন হামলা মার্কিনিদের বিরম্নদ্ধে মুসলিম বিশ্বে বিরূপ অবস্থান গ্রহণ প্রধান কারণ। এমনটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবাট প্যাপের অভিমত। তিনি আরো বলেন, অধিকাংশ আত্মঘাতী হামলা- যা দখলদারদের এবং বিদেশি হামলাকারীদের বিরম্নদ্ধে পরিচালিত হয়েছে বা হচ্ছে। তা সব প্রতিশোধমূলক, যা মার্কিনিরা কোনো যৌক্তিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকেই নয়- এগারোর অব্যবহিত পর ঘটিয়েছিল। অনেকে ধর্মের দোহাই দিলেও এগুলো নিছক প্রতিশোধের বীভৎস প্রকাশ।

নয়-এগারোয় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি আইকন ধ্বংস হওয়ার পরই প্রতিশোধের দাবানল জ্বলে উঠেছিল। মার্কিনিরা এর ধর্মীয় অনুশাসন বা অনুমোদন খঁুজতে তখন বাইবেলের প্রাসঙ্গিক ছত্র হাতড়াতে যায়নি। জনমত জরিপ বিশেষজ্ঞ স্টিফেন কাল বলেন যে, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বব্যবস্থা এবং একটি শক্তিশালী জাতিসংঘ ও সর্বজনীন মূল্যবোধের প্রতি গভীর আস্থা এবং সমর্থন আছে। তা সত্ত্বেও মুসলিম বিশ্ব ওবামা যুগের বৈদেশিক নীতিকে মুসলমানরা বুশ নীতিরই প্রলম্বন ভাবছে না। তাদের কাছে ওবামার যুদ্ধ এবং দখলদারিত্বের নীতি আরো কদর্য, আরো ভয়াবহ। ওবামার কিছু সহজাত সুকুমার প্রবৃত্তি থাকলেও থাকতে পারে, যা তার মুসলিম বিশ্বের প্রতি মনোভাবে প্রকাশ পায়- সেড়্গেত্রে অবশ্য তিনি একই রকম ভয়াবহভাবে দুর্বল, কাপুরম্নষোচিত।

লেখকঃ ব্রিগেডিয়ার (অব·), সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to ওবামার কিছু সহজাত সুকুমার প্রবৃত্তি থাকলেও থাকতে পারে, যা তার মুসলিম বিশ্বের প্রতি মনোভাবে প্রকাশ পায়- সেড়্গেত্রে অবশ্য তিনি একই রকম ভয়াবহভাবে দুর্বল, কাপুরম্নষোচিত

  1. arni says:

    আসলেই ব্যাপার খানা ঠিক । বেচারা চেস্টা করতাচে । ইহুদিবাদীরা বেশি প্রভাব ফেলতাছে ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: