‘দলীয় নেত্রী’ ও দেশের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মধ্যে যে একটা গুণগত পার্থক্য থাকে তা অনেক সময়ই তিনি বিস্মৃত হয়ে যান

ক্ষুদ্রঋণ : প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য প্রসঙ্গে

আ বু ল আ ব্বা স

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ ও প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা তাদের এক সম্পাদকীয়তে বলেছে : ‘শেখ হাসিনা যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তা অনিভিপ্রেত। তদন্তের আগেই কাউকে দোষারোপ করা যায় না।’ (৭ ডিসেম্বর) ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকাও এ বিষয়ে এক সম্পাদকীয়তে বলেছে : প্রধানমন্ত্রী ও মিডিয়ার একটি অংশ নরওয়ের টিভি চ্যানেলে প্রচারিত একটি প্রামাণ্যচিত্রের সূত্র ধরে নোবেল বিজয়ী, গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণ কল্যাণ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছে তা সব তথ্যকে বিবেচনায় এনে করা হয়নি। (৬ ডিসেম্বর) দৈনিক ‘সমকাল’ এক সম্পাদকীয়তে বলেছে : ‘ইতিমধ্যে ড. ইউনূস সম্পর্কে কোনো কোনো মহল থেকে এমন সব মন্তব্য করা হয়েছে, যা সমর্থনযোগ্য নয়। ক্ষুদ্রঋণের সাফল্যকে এক ফুত্কারে অস্বীকার করব, সেটিও সমর্থনযোগ্য নয়। (৮ ডিসেম্বর)

প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য বক্তব্য নিয়ে অনেক স্থানে আলোচনা ও সমালোচনা হচ্ছে। আমি অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর এরকম বক্তব্যে অবাক হইনি। কারণ, তিনি এরকমই বলে থাকেন। ‘দলীয় নেত্রী’ ও দেশের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মধ্যে যে একটা গুণগত পার্থক্য থাকে তা অনেক সময়ই তিনি বিস্মৃত হয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নানা উপলক্ষে তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কেও ব্যঙ্গোক্তি ও চটুল ভাষায় সমালোচনা করে থাকেন। পাঠকের নিশ্চয় তা মনে আছে। রাজনীতিতে অনেক সময় ভাষা বা ভাবের ত্রুটি খোঁজা হয় না। তবু সেখানেও একটা পরিমিতি থাকা প্রয়োজন।

দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ হাসিনা নোবেল বিজয়ী ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে যে ভাষায় সমালোচনা করেছেন, তা শেখ হাসিনার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী পদের একজন নেতা দেশের কোনো সম্মানিত নাগরিক সম্পর্কে (রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক ছাড়া) ব্যক্তিগত পর্যায়ে অশোভন, অরুচিকর ভাষায় যে মন্তব্য করতে পারেন তা অনেকেরই কল্পনার অতীত ছিল। প্রধানমন্ত্রী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কর্মসূচির সমালোচনা করতেই পারেন। প্রত্যেক নাগরিকেরই সেই অধিকার রয়েছে। কিন্তু সমালোচনার যে ভাষা তিনি ব্যবহার করেছেন, তা প্রধানমন্ত্রী পদের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

শুধু ভাষা নয়, তিনি গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কে যেসব অভিযোগ করেছেন, তাও তথ্যভিত্তিক নয়। তা কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মতলববাজ গবেষক বা সাংবাদিকের পক্ষে এ ধরনের অভিযোগ মানালেও দেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য তা খুবই বেমানান ও অশোভন। প্রধানমন্ত্রী এমন একটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সম্পর্কে তির্যক সমালোচনা করেছেন, ঘটনাক্রমে সেই প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পুরস্কার ‘নোবেল শান্তি পুরস্কারে’ সম্মানিত, যা প্রকারন্তরে বাংলাদেশেরই গৌরব। সমালোচনা করার সময় প্রধানমন্ত্রী সেই তথ্যটিও বিস্মৃত হয়েছেন। আশা করি, নোবেল পুরস্কারের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভুল ধারণা নেই। শুধু নোবেল পুরস্কার নয়, ড. ইউনূস সারা বিশ্বের জাতীয়, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মানের অসংখ্য পুরস্কার এবং পৃথিবীর নানা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত ৪৮টি সম্মানসূচক ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি লাভ করেছেন। এসব ডিগ্রি তিনি কোনো সরকারি পদে থাকার সময় পাননি। ড. ইউনূসের মতো এত বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার খুব কম মানুষের ভাগ্যে জুটেছে। বিশ্বের বহু দেশের সাধারণ মানুষ এখন ‘বাংলাদেশকে’ চেনেন শুধু ড. ইউনূসের জন্য।

আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ড. ইউনূসসংক্রান্ত এসব তথ্য জানেন না। বোধ হয় প্রধানমন্ত্রীর ধারণা, ড. ইউনূস সোনালী বা জনতা ব্যাংকের মতো আরেকটি সরকারি ব্যাংকের এমডি। তা না হলে তিনি ড. ইউনূস সম্পর্কে প্রকাশ্যে এই ভাষায় সমালোচনা করতে পারতেন না।
ড. ইউনূস প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তিনি ভোট, হরতাল, মিছিল, সরকারি ব্যবসা, কমিশন বাণিজ্যের অংশীদার, কোনো সরকারি পদ ইত্যাদি থেকে অনেক অনেক দূরে। যেগুলো দেখভাল করা প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালনে ড. ইউনূস তো কোনো বাধা নয়। তবু ড. ইউনূসের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রোশ কেন? খালেদা জিয়ার ওপর প্রধানমন্ত্রীর আক্রোশের কারণ বোঝা যায়। এটা বোঝা যায় না।

‘গ্রামীণ ব্যাংক’ সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রী সমালোচনামুখর। গ্রামীণ ব্যাংকও একটি নোবেল জয়ী প্রতিষ্ঠান। পৃথিবীর খুব কম ‘প্রতিষ্ঠানই’ নোবেল পুরস্কার পেয়েছে। এই পুরস্কারে বাংলাদেশ সম্মানিত। প্রধানমন্ত্রী নিজেও সম্মানিত। অথচ সেই বিরল প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে তিনি যুক্তিহীনভাবে সমালোচনা করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রধান আক্রমণের টার্গেট ‘ক্ষুদ্রঋণ’। এটা খুব রহস্যময়। কারণ, সারা পৃথিবী বাংলাদেশের উদ্ভাবিত ‘ক্ষুদ্রঋণ’ নিয়ে প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত, অথচ এর জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এর সমালোচনায় মুখর। তিনি বলেন, ‘আমি এটা কখনোই সমর্থন করিনি। প্রতিবাদ করেছি।’ তিনি কেন একে সমর্থন করেননি, তার কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক নেতার সমালোচনার মতো শুধু ঢালাও মন্তব্য পাওয়া যায়। রাজনৈতিক নেতারা রাজনৈতিক ইস্যুতে ঢালাও মন্তব্য করে থাকেন। এটা মোটামুটি সহনীয় হয়ে গেছে। কোনো সমালোচনার সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত দেয়া রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রে নেই। (ব্যতিক্রম খুব কম) ঢালাও মন্তব্য করার মধ্যেই তাদের আনন্দ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ক্ষেত্রে অভ্যাসমত তাই করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা হয়তো ভুলে গেছেন ‘ক্ষুদ্রঋণ’ কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, ট্রানজিট বা টিপাইমুখ বাঁধের মতো। এটা বহুল পরীক্ষিত ও বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত একটি অর্থনৈতিক মডেল। বিশ্বের প্রায় সব মহাদেশের ১১০টি দেশে এই ‘গ্রামীণ’ মডেল অনুসরণ করা হয়। বিশ্বের বহু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও ফিন্যান্স শাস্ত্রে ‘মাইক্রো ফিন্যান্স’ পড়ানো হয়ে থাকে। এই মডেল নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। এটা ‘একটি বাড়ি ও একটি খামার’ এর মতো কোনো সরকারি কর্মসূচি নয়, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অবলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

ড. ইউনূস ‘গ্রামীণ’ আইডিয়ার মাধ্যমে একটি নতুন ব্যাংকিং মডেল উদ্ভাবন করেছেন, যার বৈশিষ্ট্য হলো : বিনা বন্ধকিতে গরিব মানুষকে ছোট অংকের ঋণ দেয়া ও প্রতি সপ্তাহে সুদসহ তা পরিশোধ করা। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী যেসব গরিব নারী ও পুরুষ সম্পদের অভাবে (কোলেটারেল) কোনোদিন ব্যাংকের কাছে ঋণ চাইতে পারেনি, তারা আজ ‘গ্রামীণ’ মডেলের বদৌলতে ঋণ নিয়ে আয়-উপার্জন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিতে পারছেন। নিজের একটি ছোট বাড়ি করতে পেরেছেন। সবই ক্ষুদ্রঋণের জন্যই সম্ভব হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি কখনও বাংলাদেশের গরিব মানুষের, বিশেষ করে গরিব, বিত্তহীন নারীদের জীবনে এই পরিবর্তনের কথা শোনেননি? বাংলাদেশের গ্রামে কি আওয়ামী লীগের কোনো শাখা নেই? কোনো নেতা নেই? কর্মী নেই? তারা কি ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের (অন্যান্য এনজিওসহ) ভাগ্য পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেননি? যদি দেখে থাকেন, তাহলে সেই গল্প দয়া করে আপনাদের নেত্রীকে বলবেন।

পৃথিবীর নানা দেশের সরকারপ্রধান ও নীতিনির্ধারকরা বাংলাদেশের গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে গরিব নারীদের ভাগ্য পরিবর্তন দেখে গেছেন। শুধু দেখার সময় হয়নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মনে হয় বেগম খালেদা জিয়ারও দেখার সময় হয়নি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ কয়েকটি সমালোচনার পয়েন্ট তুলেছেন। আমি এখানে একে একে তা নিয়ে আলোচনা করব।

১.প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গরিব মানুষের রক্ত চুষে খেলে ধরা খেতে হয়।’ অন্যান্য ব্যাংক বা এনজিওর কর্মসূচি ছাড়াও শুধু গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৮৪ লাখ। দেশের সব এনজিও মিলিয়ে প্রায় তিন কোটি মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নেয়। এরা সবাই গরিব মানুষ। গ্রামীণ ব্যাংক এ পর্যন্ত (নভেম্বর ২০১০) ৫৭ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেন। এই ঋণ নিয়ে গ্রামের গরিব মহিলারা উত্পাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি ও বন, গৃহপালিত পশু ও মত্স্য, ব্যবসা, ফেরি ব্যবসা ও দোকানদারি ইত্যাদি কাজে খাটান। এর চেয়ে বড় কাজেও তারা ঋণের টাকা খাটান। যেমন : ট্রাক্টর ভাড়া দেয়া, মুরগির খামার, মাছ চাষ, স’মিল, ফার্নিচারের ব্যবসা, মুদি দোকান, মাছের আড়ত, কাপড়ের ব্যবসা, তেলের ব্যবসা ও ওষুধের দোকান ইত্যাদি। এই কাজগুলো করছেন গ্রামের বিত্তহীন নারী ও পুরুষ। যারা ঋণ নেয়ার আগে দু’বেলা ভাত খেতে পারতেন না। যাদের ছেলেমেয়েরা কখনও স্কুলে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেনি। এখন গ্রামীণ ব্যাংকের ‘শিক্ষা ঋণ’ নিয়ে তাদের অনেকের ছেলেমেয়ে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিংও পড়ছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি এসব তথ্যে কোনো উন্নয়ন দেখতে পান না? নাকি পুরোটাই তার ভাষায় ‘ভোজবাজি’? গ্রামের গরিব মহিলাদের এই অবস্থার পরিবর্তনকে প্রধানমন্ত্রী এত ছোট করে দেখতে চান কেন? এই উন্নয়নকেই কি শেখ হাসিনা ‘গরিবের রক্ত চুষে খাওয়া’ বলতে চেয়েছেন? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টিতে গরিব নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা কি ‘রক্ত চুষে খাওয়া?’

দেশের তিন কোটি ঋণ গ্রহীতার মধ্যে হয়তো কেউ কেউ ঋণের টাকা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সবাই মূলধন ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হয় না। কিন্তু তিন কোটি ঋণ গ্রহীতার মধ্যে ৩০০ জনের ব্যর্থতাকে কি ক্ষুদ্রঋণের ব্যর্থতা বলা হবে?

২. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মানুষকে গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হয়েছে।’ কোন মানুষকে? গিনিপিগের মতো ব্যবহার করা হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময়। গ্রামীণ ব্যাংক তো সেই স্তর পেরিয়ে এসেছে ৩০ বছর আগে। এখন গিনিপিগের প্রশ্ন আসছে কেন? তাছাড়া যে ব্যাংকের সদস্য সংখ্যা ৮৪ লাখ, সেখানে গিনিপিগ হবে কে?

৩. প্রধানমন্ত্রী নাম উল্লেখ না করে ড. ইউনূসকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘নিজের আখের গোছাতে গিয়ে ফেঁসে গেছেন।’ ড. ইউনূস নরওয়ের টিভির কথিত অভিযোগে নিজের আখের গুছিয়েছেন কি না তা নিরপেক্ষ তদন্তে বেরিয়ে আসবে আশা করি। তবে আমার জানা মতে, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সরকারি স্কেলে বেতন পেয়ে থাকেন। ব্যাংকের গাড়িতে চড়েন, ব্যাংকের কোয়ার্টারে থাকেন। নোবেল পুরস্কারসহ যাবতীয় আন্তর্জাতিক পুরস্কারের টাকা ‘ইউনূস ট্রাস্টে’ দিয়েছেন। যে ট্রাস্ট গরিব মানুষের কল্যাণে নানা প্রকল্প নিয়ে থাকে। সম্প্রতি তিনি বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে নানা ‘সামাজিক ব্যবসা’ শুরু করেছেন। ড. ইউনূস উদ্ভাবিত ‘সামাজিক ব্যবসার’ অন্যতম শর্ত হলো : এই ব্যবসার মালিক কখনও ব্যবসা থেকে লাভ (ডিভিডেন্ট) নিতে পারবেন না। বিনিয়োগের টাকা ফেরত নিতে পারবেন। ব্যবসার লাভ থেকে ব্যবসা সম্প্রসারণ করা হবে। নতুন নতুন ব্যবসা শুরু করা হবে।

ড. ইউনূসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নানা ‘গ্রামীণ কোম্পানির’ (গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত নয়) পরিচালনা বোর্ডের তিনি অবৈতনিক চেয়ারম্যান। এর একটিও ব্যক্তিমালিকানার প্রতিষ্ঠান নয়। এগুলো হয় সামাজিক ব্যবসা বা ট্রাস্ট কিংবা ফাউন্ডেশন। গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ থেকে অবসর নিলে তিনি প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ও অবসর সুবিধা ছাড়া আর কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন না। অবশ্য বিশ্বজোড়া খ্যাতিও সঙ্গে নিয়ে যাবেন।
এবার শেখ হাসিনা বলুন, ড. ইউনূস ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ ও গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে কীভাবে নিজের আখের গোছাচ্ছেন?

৪. প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংক জনগণের সম্পত্তি। অথচ এখন তাকে এমনভাবে কব্জা করা হয়েছে, এটা যেন ব্যক্তিগত সম্পত্তি।’
গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা বোর্ড, অর্থের উত্স ইত্যাদি কোনো কিছু সম্পর্কেই শেখ হাসিনার পরিষ্কার ধারণা আছে বলে মনে হয় না। সংবাদ সম্মেলনে আসার আগে প্রধানমন্ত্রী যদি অর্থমন্ত্রী বা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে একটু আলাপ করে নিতেন, ভালো হতো। তারা অনেক দিন যাবত্ গ্রামীণ ব্যাংককে জানেন। জনসমক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কোনো ভুল তথ্য বা ধারণা দেয়া ঠিক নয়।

প্রকৃত তথ্য হলো : গ্রামীণ ব্যাংক সত্যিকার অর্থেই জনগণের প্রতিষ্ঠান। কারণ এর ৭৫ ভাগ মালিকানা এর শেয়ারহোল্ডারদের। বাকি ২৫ ভাগ সরকারের। একটি নির্দিষ্ট স্তরের গরিব না হলে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্য হওয়া যায় না। বাংলাদেশে ৭৫ ভাগ মালিকানায় গরিব মানুষের আর কোনো প্রতিষ্ঠান আছে বলে আমার মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী কি জানেন, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা হয়েও গরিবের মালিকানার এই ব্যতিক্রমী শর্তটি তিনি নিজেই যুক্ত করেছিলেন?

একজন সম্পাদক সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন তুলেছেন : ‘আগে গ্রামীণ ব্যাংকে ৬০ শতাংশ সরকারের মালিকানা ছিল। এখন তা ২৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে।’ মনে হয় সম্পাদক সাহেব এটা পছন্দ করতে পারেননি। সরকার যে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মালিকানাও ছেড়ে দিচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিক্রি করে দিতে চাচ্ছে, সরকারি ব্যাংকে পৃথক বেতন স্কেল দিয়েছে, এ ব্যাপারে সম্পাদক সাহেব প্রশ্ন করেন না কেন? নাকি তার এজেন্ডা শুধু গ্রামীণ ব্যাংক? আমরা তো জানি, নাগরিক সমাজের জনপ্রিয় দাবি হলো : সরকার কোনো রকম ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকবে না। সরকার করবে নীতি ও মনিটরিং। প্রশ্নকর্তা সম্পাদক মনে হয় এখনও সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের যুগেই রয়ে গেছেন।
প্রধানমন্ত্রী উত্তরে বলেছেন : ‘গ্রামীণ ব্যাংক যেন আজ ব্যক্তি সম্পত্তি।’ এ কথা প্রধানমন্ত্রী অবশ্য পরোক্ষভাবে ঠিকই বলেছেন। কারণ গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ গ্রহীতা গরিব নারী পুরুষরাই এর মালিক। এরা গরিব হলেও ব্যক্তি তো। এই গরিব নারী ও পুরুষরা গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক হলে শেখ হাসিনার আপত্তি কেন? কে বা কারা মালিক হলে শেখ হাসিনা খুশি হতেন? প্রধানমন্ত্রী কি এ কথা স্পষ্ট করে সাংবাদিকদের জানাবেন?

৫. প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে গরিব মানুষের (ভাগ্য বদলানোর) কথা বলে টাকা আনা হলেও তাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।’
প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান এক সময় ইআরডির সচিব ছিলেন। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা তার সঙ্গে আলাপ করলে ভালো হয়। কোনো দাতা সংস্থা তাদের টাকা সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে আর কখনও টাকা দেয় না। দাতাদের থাকে নিজস্ব অডিট ও মনিটরিং ব্যবস্থা। এ ব্যাপারে ইআরডিরও রয়েছে পৃথক মনিটরিং। বিদেশের টাকা আনা ও খরচ করা খুব সহজ কাজ নয়। এটা রাজনৈতিক দলের চাঁদা সংগ্রহ নয়। যার কোনো রশিদ বা হিসাব থাকে না। এমনকি অডিটও হয় না।
আমার সন্দেহ, আমাদের কর্মব্যস্ত প্রধানমন্ত্রীকে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে অনেক তথ্যই জানানো হয়নি। তিনি হয়তো জানেন না গ্রামীণ ব্যাংক ১৯৯৮ সালের পর থেকে আর কোনো বিদেশি অনুদান গ্রহণ করেনি। কাজেই বিদেশ থেকে গরিব মানুষের অজুহাতে টাকা আনার অভিযোগ থেকে গ্রামীণ ব্যাংক এখন পুরোপুরি মুক্ত। প্রধানমন্ত্রী কি জানেন, বিশ্বব্যাংক বহু চেষ্টা করেও গ্রামীণ ব্যাংককে এক সময় টাকা দিতে পারেনি। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে গ্রামীণ ব্যাংক প্রতি সপ্তাহে ২২৫ কোটি টাকা ঋণ দেয় কীভাবে? গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ দেয় তার সদস্য ও বহিরাগতদের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের মাধ্যমে।

৬. প্রধানমন্ত্রী ক্ষুদ্রঋণের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আমি কখনও এর সমর্থন করিনি। বিরোধিতা করেছি।’
খুব ভালো কথা। ক্ষুদ্রঋণ একটি আইডিয়া, একটি মডেল। সবাই তা সমর্থন করবেন, এটা আশা করা উচিত নয়। সবাই কি সমাজতন্ত্র সমর্থন করেন? করেন না। সমর্থন বা বিরোধিতা নিয়ে বাদানুবাদের কিছু নেই। এটা ব্যক্তি অভিমত। বাংলাদেশের কয়েকজন অর্থনীতিবিদও ক্ষুদ্রঋণ সমর্থন করেন না। তাতে কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষুদ্রঋণ সমর্থন না করা বা বিরোধিতার একটি ভিন্ন তাত্পর্য রয়েছে। তা হলো : তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশের প্রধান নীতিনির্ধারক। নীতির প্রশ্নে তার স্ববিরোধিতা মানায় না। তিনি একদিকে বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ সমর্থন করেন না। অন্যদিকে তার সরকার নানা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, পিকেএসএফ, যুব মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করছে। তদুপরি গ্রামীণ ব্যাংকে রয়েছে সরকারের আংশিক মালিকানা। তার এক মন্ত্রী কিছুদিন আগে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের আর প্রয়োজন নেই।’ তাহলে এত সরকারি প্রতিষ্ঠান ক্ষুদ্রঋণ দিচ্ছে কেন? বন্ধ করে দিলেই তো ভালো হয়। অন্তত আওয়ামী লীগ যত দিন ক্ষমতায় আছে, তত দিন ক্ষুদ্রঋণ দেয়া বন্ধ করা যেতে পারে। সেটাই হবে শেখ হাসিনার কথার সঙ্গে কাজের মিল। তা না হলে একে স্ববিরোধিতাই বলতে হবে।

সারা দেশে সম্ভব না হলেও আপাতত যেসব উপজেলা ও গ্রাম থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাদের উচিত, তাদের নেত্রীর প্রতি সম্মান দেখিয়ে সেই সব গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া। সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকায় ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে ‘গরিব মানুষের রক্ত চুষে খাওয়ার’ এই ব্যবস্থা মেনে নেয়া ঠিক হবে না। সবখানে প্রচার করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গরিব নারীদের এই ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রামীণ ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋণ ও ড. ইউনূস সম্পর্কে যেসব অভিযোগ করেছেন, তা কতটা সত্য বা অসত্য, তা একমাত্র নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসবে। আমার এই সামান্য রচনা প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ সম্পর্কে একজন সাধারণ নাগরিকের পর্যবেক্ষণ মাত্র।

লেখক : একজন উন্নয়নকর্মী
তথ্যসূত্র : বিভিন্ন সংবাদপত্র, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রকাশনা ও গ্রামীণ ব্যাংক কার্যালয়

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to ‘দলীয় নেত্রী’ ও দেশের ‘প্রধানমন্ত্রীর’ মধ্যে যে একটা গুণগত পার্থক্য থাকে তা অনেক সময়ই তিনি বিস্মৃত হয়ে যান

  1. Jatishsmor. NRB says:

    khub bhalo ! nirepekkho, sohoj o sahosi uchcharoner jonne lekhok ke dhanyabad !
    amader borho ek durbhagyo, je amra bhalo manush, guni manush-ke kokhonoy somman janate parini, borong, taderke amra osamman korechi, ghreena janiyechi, onek somoy desh theke bitarhito korechi, na-hoi hotta projonto korar chesta niyechi.ebong hotta korechi o !!!

    Prof. Yunus, ekjon deshopremik manush, ekjon shot o sonishto manush, gota pritibeer kache tini ottonto sommaniyo ekjon guni manush, alokito manush…ei kothata sottikar orthe amar desher khub kom lokei janen..ontoto khub kom sambadik, rajneetik, ebong ninduk lekhokra janen. Amra tar nanan kormo kander sathe ekmot na-hote pari, kintu take obomanona korar, take okothyo bhasai osommansuchok montobyo korar kono karon thakte pare na ! jodi temon kichu tini korei thaken, se jonne ayinanug babostha neya utchit, kintu nischoy galigalaj noi, je kothagulo amra beshkichu din dhore janchi ebong porhchi.

    amader utchit chilo, bohirbishhe tar somman take aro borho o bapokbhabe tule dhorar…kintu seta amra korini, Nobel shanti puroshar paoar etodin poreo amader sarkar take ekhono porjonto ekta sadharon sommano janaini..borong take osomman koreche nanan kotu montobyo kore ! eta sottiy borho dukkher kotha !
    Prof. Yunus jateer ghorbho. tar somman barhle jateer somman barhbe.- emon ekta sohoj sotto kotha ekhon amader sokoler jana uthcit..sheka utchit.

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: