শূন্যতার ছেঁড়াপাতা

শূন্যতার ছেঁড়াপাতা

-ফারাহ্ সাঈদ

শূন্যতার ছেঁড়াপাতা

শূন্যতার ছেঁড়াপাতা

শীতের রাত। সুনসান স্টেশন। ট্রেনের অপেক্ষায় গোটাকয়েক মানুষ। রূপা ওয়েটিং রুমে এসে বসলো। টিমটিমে বাল্বটা যে কোনো সময় খুলে পড়তে পারে। এই আলোতে মাঝবয়েসি এক ভদ্রলোক খুব মনোযোগ দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। দুটো টিকটিকি পালা করে দেয়াল ঘড়িটার চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। ঘড়ির সময়টা মিলিয়ে নিলো রূপা, ১০ মিনিট স্লো। এটাতো তার বুয়েট হোস্টেলের ঘড়ি নয় যে ১৫ মিনিট ফাস্ট থাকবে সবসময়!

বাড়ি থেকে একটু আগেই বেড়িয়ে পড়েছিলো আজ। মা এবারো সঙ্গে দিতে চেয়েছেন ছোট্‌দাকে। ও একাই চলে এসেছে। বাড়ির কথা মনে করতে ভালো লাগছে না রূপার। ট্রেন আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই। ব্যাগপত্র পাশের চেয়ারটা রেখে দিয়েছে। ওর শুধু ঘুম পাচ্ছে… চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসছে বার বার।

‘আপনার ব্যাগটা একটু সরাবেন?’

তন্দ্রাছন্ন রূপা চমকে উঠল, ‘ওহ হ্যা!’ ওয়েটিংরুমে তৃতীয়ব্যক্তির আগমন। রূপা লক্ষ্য করলো অবশিষ্ট চেয়ারটির হাতল ভাঙা। ৯ টা ৩০… ট্রেন আসতে আর বেশি বাকি নেই। প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে। অন্যকারোই তেমন তাড়া নেই।

‘আইজকা টেরেন লেইট, আপনি কই যান আফা?’ ১০/১২ বছরের একটা ছোট্ট ছেলে বলে উঠলো।

‘কখন ছাড়বে জানো?’

‘মাস্টার সাহেবরে জিগান!’

রূপা দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেলো স্টেশনমাস্টারের কামরার দিকে।

‘ট্রেন কতোক্ষণ লেট?’ কথাটা তার কানে পৌছালো না বোধহয়। ‘মাস্টার সাহেব, ট্রেন কখন আসবে আপনি জানেন কিছু?’

‘আপনি এইখানে ক্যান? ওয়েটিং রুমে যান’

‘এখানে না এলে আমি জানতেই পারতাম না! ‘

‘আমি কী করুম, মাইকটা অকেজো হইয়া আছে আইজ তিনদিন।’ পান চিবুতে চিবুতে কথাটা বললো স্টেশন মাস্টার। পৃথিবীর কোন ব্যপারেই যার কোন মাথা ব্যথা নেই! রূপা ওয়েটিংরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবছে কী করে কাটবে এই সময়টুকু।

একটা চেয়ার ফাকাঁ আছে এখনো, ভাগ্যিস কেউ এসে বসে পড়ে নি। তৃতীয়ব্যক্তি বেশ আরাম করেই চেয়ারে বসে আছেন। রূপা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, ‘সাবধান, বেশি নড়াচড়া করবেন না কিন্তু, ভেঙে পড়তে পারে।’ কী সব ভাবছে রূপা ! কলি সঙ্গে থাকলে বোধহয় বলেই বসতো। মেয়েটা বড় হবে না কোনোদিন।

‘আফা, চা খাইবেন?’ পিচ্চি ছেলেটা পাশে এসে দাড়ালো।

‘খেলেতো ভালোই হয়।’ ব্যাগ খুলে পয়সা দিতে চাইলে ছেলেটা বলেলা, ‘পরে দিয়েন আফা’। ‘স্যার আপনি চা খাইবেন?’ রাশভারি লোকটা পত্রিকার আড়াল থেকেই বললেন, ‘না।’

‘ছোটো স্যার, আপনে চা খাইবেন?’

সম্বোধনটা শুনে হাসি পেলো রূপার। ‘রঙ চা হবে, তাহলে দুকাপ।’

‘আইচ্ছা আনতাসি’।

এ ঘরে মশার আগমন বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে পায়ের কাছটায়। আর ভাল লাগছে না…!  ১৫ মিনিটে ৭/৮ বার ঘড়ির দিকে তাকিয়েছে রূপা !

‘ঘড়িটা বন্ধ, ওদিকে তাকিয়ে লাভ নেই।’ ছেলেটা বলেই ফেললো। ‘সেটাতো খেয়াল করি নি।’

‘ঘড়ি দেখলেই কি ট্রেন চলে আসবে ? স্থির হয়ে বসুন!’ এক পলক তাকালো সে, নড়েচড়ে বসলো রূপা। চা এসে গেছে। রূপা ট্রে থেকে কাপটা তুলতেই ছেলেটা বলল ‘ওটা রঙ চা, আপনার জন্যে নয়। প্রথম থেকেই লক্ষ্য করছি আপনি খুব অস্থির হয়ে আছেন।’

‘আসলে ছুটির শেষে প্রতিবারই বাড়ি ছাড়ার সময় এমন হয় আমার।’ কথাটা বলে লজ্জা পেলো রূপা!

 

শূন্যতার ছেঁড়াপাতা

শূন্যতার ছেঁড়াপাতা

 

‘শোন, একঘণ্টা পরে আবার দু’কাপ, বুঝলি; লেবু আনতে পারবি? বিশ টাকার একটা নোট পিচ্চির পকেটে গুজে দিয়ে বল্ল ‘বাকিটা তোর বকসিস!’

‘অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন?  আপনি ছুটি শেষে ফিরে যাচ্ছেন আর আমি ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি।’ মৃদু হেসে বলেলা ছেলেটা।

‘কতোদিন থাকবেন ঢাকায়?’

এক সপ্তাহ, বেশিও থাকতে পারি। নতুন পোস্টিং হয়েছে আপনাদের এলাকায়।’

‘আপনি শহরের মানুষ, কেমন লাগছে আমাদের এই ছোট্ট মফস্বল শহরে ?’

‘অন্যরকম…। প্রথম ঢাকা ছেড়ে কোথাও থাকা হচ্ছে। বন্ধুদের আড্ডাটা মিস করি।’

‘ঢাকায় কি করছেন আপনি?’

‘পড়াশোনা। এইতো আর বছরখানেক বাকি।’

পিচ্ছি দুটো রঙ চা নিয়ে হাজির, একঘণ্টা পার হয়ে গেছে তাহলে।

‘এটা আপনার জন্য’ একটা কাপ রূপার দিকে এগিয়ে দিলো সে।

‘আপনি এতো চা খান, সাংবাদিক কিংবা কবি-সাহিত্যিক ননতো’।

‘ওসব আর হতে পারলাম কই!’

‘আমি পড়াই, লেখালেখির একটু ঝোক আছে বই কি’। আপনার কাছে কোন বই আছে এখন? পড়তে ইচ্ছে করছে!’

‘বই আছে, কিন্তু আপনাকে দেবো না। বই পড়লে আমার সাথে কথা বলবে কে? হেসে উঠলো রূপা, রাতের নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে কাঁচভাঙা শব্দে ভেসে যাচ্ছে রূপাদের নীরব স্টেশন।

রাতের সাথে শীতের প্রকোপ বাড়ে। মায়ের বোনা নীল শালটা গায়ে জড়ালো রূপা। চা খেয়েও ঘুমের রেশ কাটে নি ওর। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এলো প্রায়। দূর থেকে ভেসে আসে শব্দ। একটা মানুষের শব্দ। দ্রুত নিঃশ্বাসের ওঠানামা। গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়!

‘আফা, স্যার জানি কেমন করতাসে’ পিচ্চির কথায় চমকে উঠে রূপা।

‘সেকি, কী হয়েছে আপনার?’

ছেলেটি কোনো কথা বলতে পারে না। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ওর। শুধু ইশারায় পায়ের কাছে ব্যাগটা দেখালো। রূপা ব্যাগটা খুলেছে, কিন্তু কি কিসের জন্যে তা বুঝে উঠতে পারছে না। জামাকাপড়, পানির বোতল… না না এসবের কিছু নয়! হাতড়ে পেলো চারকোণা একটা বক্স, ইনহেলার! হলের এক মেয়েকে প্রায় দেখে ঐ জিনিশটা নিতে! রূপা সঙ্গে  সঙ্গে খুলে ধরলো ছেলেটার মুখের কাছে। ধীরে ধীরে কিছুটা স্বস্তি পেল ছেলেটা। পানির বোতলে চুমুক দিতে দিতে তাকালো রূপার দিকে, ‘কী ভাবছেন? বেচেঁ আছি কিনা? মাঝে মাঝে এমন হয় আমার বিশেষ করে শীতের সময়। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।’

ট্রেন এসে গেছে। রূপা প্ল্যাটফর্মের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিচ্চিটা ওর ব্যাগপত্র ট্রেনের কামরা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এলো। এই শীতের রাতে পাতলা জামা গায়ে সে থর থর কাপছেঁ। হাত নেড়ে বিদায় জানালো রূপাকে।ওর নামটাও জানা হয়নি । জানালার ধারে বসে আছে রূপা , চারিদিকে আঁধারের উকিঝুকি। অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারের কী আশ্চর্য এক মায়া আছে! শূন্যতার মাঝেও তন্দ্রাহত হতে পারে নি সে।

[-ফারাহ্ সাঈদ, লস এঞ্জেলেস]

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: