অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার সত্ত্বেও আরো গোপন তথ্য ফাঁস: উইকিলিকসে বাংলাদেশ বিষয়ে ২১৮২ নথি

অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার সত্ত্বেও আরো গোপন তথ্য ফাঁস

সবকিছুর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী :অস্ট্রেলিয়া

যৌন অপরাধের মামলায় প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার হওয়া সত্বেও থামানো যাচ্ছে না তার সাড়া জাগানো সৃষ্টি ওয়েবসাইট-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশের লাখ লাখ গোপন নথি ফাঁস করে দুনিয়াজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলা উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা অ্যাসাঞ্জ মঙ্গলবার ব্রিটেনে গ্রেফতার হন। সুইডেনের একটি গ্রেফতারি পরোয়ানায় তাকে আটক করা হয়। দু’জন মহিলার উপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ আগেই পরোয়ানা জারি করেছিল।

তবে অস্ট্রেলিয়া বলেছে, উইকিলিকসে আড়াই লাখ কূটনৈতিক গোপন নথি ফাঁস হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী, সংবাদমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নন। অ্যাসাঞ্জকে সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে তার দেশ অস্ট্রেলিয়া। খবর বিবিসি, এপি ও এএফপির।

যৌন অপরাধের অভিযোগ জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ব্রিটেনে গ্রেফতার হলেও গতকাল বুধবার তার প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস আরো গোপন তথ্য ফাঁস করেছে। ওয়েবসাইটের এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, সামনে আরো গোপন তথ্য প্রকাশ্যে আনবে উইকিলিকস। উইকিলিকস মুখপাত্র ক্রিস্টিন রাফসোন টুইটারে এক ক্ষুদ্রবার্তার সহায়তায় গতকাল বলেন, নতুন আরো গোপন তথ্য ফাঁস করা হয়েছে। আমাদের মিডিয়া পার্টনাররা সময়মতো এগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারবে। করপোরেট সেনসরশিপ আরোপ করে কিংবা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না। উইকিলিকস অনলাইনে আছে। সম্পূর্ণ ওয়েবসাইটটি ৫০০ এর বেশি স্থান থেকে অনুলিপি করা আছে। তাই সাইটটি বন্ধ হবার আশংকা মিথ্যা।’ উইকিলিকস সর্বশেষ যে গোপন তথ্য ফাঁস করেছে তাতে আছে ব্রিটেন-লিবিয়া কুটনৈতিক সম্পর্ক, লকারবি বোমারু মেগরাহি ইসু্য, সৌদি যুবরাজ সম্পর্কিত তথ্য, ইত্যাদি।

মঙ্গলবার লন্ডন পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়, অনৈতিক বলপ্রয়োগের একটি ধারা, যৌন নিপীড়নের দুইটি ধারা ও ধর্ষণের একটি ধারায় সুইডিশ কর্তৃপক্ষ অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। এ অপরাধগুলোর সব কয়টি ২০১০ সালের আগস্টে ঘটেছে। একারণে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র দায়ী ঃ অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেভিন রাড বলেছেন, উইকিলিকসে আড়াই লাখ কূটনৈতিক নথি ফাঁস হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী, সংবাদমাধ্যমটির প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ নন। কেভিন রাড বলেন, এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি আরও বলেন, তথ্যপ্রবাহে তার সম্পর্কে যে সমালোচনা হয়েছে করা হয়েছে তা নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। কেভিনের এ অবস্থানকে সমর্থন করেছেন প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড। কেভিনের মন্তব্যেরও প্রশংসা করে গিলার্ড বলেন, ‘তিনি অত্যন্ত চমৎকার কাজ করছেন।’

উইকিলিকসের স্রষ্টা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ লন্ডনে গ্রেফতার

বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক অ্যাসাঞ্জ

বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক অ্যাসাঞ্জ


অবশেষে প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়ল যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় দোসররা। দুই সুইডিশ নারীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে গ্রেফতার করা হল বর্তমানে বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করা ওয়েবসাইট ‘উইকিলিকসের’ স্রষ্টা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে। বিবিসি, পিপিআই।
বেশ কিছুদিন ধরেই ব্রিটেনে বসবাসকারী অ্যাসাঞ্জ মঙ্গলবার তার আইনজীবীদের নিয়ে লন্ডনে মেট্রোপলিটন পুলিশ কার্যালয়ে আত্মসমর্পণ করেন। এর পরই তাকে সুইডেনে জারি হওয়া ওয়ারেন্টের আওতায় গ্রেফতার দেখায় পুলিশ। তাকে এরপর ওয়েস্ট মিনিস্টার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে তোলা হয়। সেখানে অ্যাসাঞ্জের আইনজীবীরা তার জামিন আবেদন করলে তা প্রত্যাখ্যান করেন আদালত। আদালতে অ্যাসাঞ্জ জানান, তাকে জোর করে সুইডেনে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাবেন তিনি। এদিকে আদালতে পাঁচ বিশিষ্ট ব্রিটিশ নাগরিক অ্যাসাঞ্জের জামিনদার হতে চান। এদের মধ্যে রয়েছে প্রখ্যাত সাংবাদিক জন পিলগার, সমাজকর্মী ও কিংবদন্তী ক্রিকেট তারকা ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা। ৩৯ বছর বয়স্ড়্গ অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক অ্যাসাঞ্জ একজন পেশাদার কম্পিউটার হ্যাকার। পেন্টাগনসহ মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক হ্যাক করে বিশ্ব রাজনীতির লাখ লাখ গোপন তথ্য বের করে আনেন তিনি। এরপর উইকিলিকস নামক ওয়েবসাইটটি তৈরি করে ওইসব তথ্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন অ্যাসাঞ্জ। ফাঁস হয়ে যায় মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথিত ধারক ও বাহক যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নানা গোপন কাহিনী। জনগণ আঁতকে উঠেন ইরাকসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র অত্যাচার-নির্যাতনের কথা শুনে। কিভাবে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানের কুকীর্তির তথ্য ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাদের নিজেদের ইশারায় নাচায় এ তথাকথিত বন্ধুপ্রতিম দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। একের পর এক নোংরা কাহিনী ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আঁতে ঘা লাগে এই বিশ্ব পরাশক্তির। হুমকি-ধমকি দিয়ে উইকিলিকসকে ডোমেইন বরাদ্দ দেয়া প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করে তাদের ডোমেইন প্রত্যাহার করে নিতে। এতে সফলও হয় তারা। বন্ধ হয়ে যায় উইকিলিকস। কিন্তু তা মাত্র কয়েকঘণ্টার জন্য। এরপর ওয়েব ঠিকানা সামান্য পরিবর্তন করে আবারও সচল হয় উইকিলিকস। এরই মধ্যে ২০০৯-এ সুইডেনে দায়ের হওয়া ওই যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করা হয়। অ্যাসাঞ্জ অবশ্য বরাবরই নিজেকে নির্দোষ ও একে যুক্তরাষ্ট্রের সাজানো নাটক হিসেবেই দাবি করে আসছিল। ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময়ের পরম বন্ধু সাদ্দামকে কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বের জন্য হুমকি আখ্যা দিয়ে ফাঁসিতে ঝোলানো এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনার জন্য নিজেদের সৃষ্টি করা তালেবান ও আল কায়দাকে প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর নির্মূল করতে উঠেপড়ে লাগা যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ইতিহাস ঘাটলে অ্যাসাঞ্জের দাবিকে চিরায়ত সত্যের মতোই মনে হবে। তবে ঘটনা যাই হোক, সত্যের জয় হবে এমনই প্রত্যাশা সবার।

————————————————————————————————————————
বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক অ্যাসাঞ্জ গ্রেফতার
তথ্য ফাঁস নয়, অভিযোগ যৌন নিপীড়নের

বিশ্ব তথ্যযুদ্ধের নায়ক ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে গতকাল মঙ্গলবার ব্রিটেনে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে লাখ লাখ মার্কিন গোপন তথ্য ফাঁসের জন্য নয়, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তথাকথিত যৌন নিপীড়নের অভিযোগে। গতকালই তাকে আদালতে হাজির করার পর জামিনের আবেদন খারিজ করে দেয়া হয়। গ্রেফতারের প্রতিক্রিয়ায় উইকিলিকসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এতে আমাদের গোপন ফাইল প্রকাশ বন্ধ হবে না। খবর বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স ও অন্যান্য সূত্রের।
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড জানিয়েছে, অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি থাকায় লন্ডনের পুলিশ গতকাল সকালে তাকে গ্রেফতার করেছে। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড আরো বলেছে, অ্যাসাঞ্জ নিজেই তার আটকের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। লন্ডন পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অনৈতিক বলপ্রয়োগের একটি ধারা, যৌন নিপীড়নের দু’টি ধারা ও ধর্ষণের একটি ধারায় সুইডিশ কর্তৃপক্ষ অনলাইন পত্রিকাটির সম্পাদক অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। সব অপরাধ ২০১০ সালের আগস্টে ঘটেছে।’ এর আগে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে সুইডেন সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
আলজাজিরা জানায়, মিডিয়ার খবরে বলা হয়, আগস্টে সুইডেন সফরকালে অ্যাসাঞ্জ দুই নারীর সাথে শুয়েছিলেন। তাদের একজনের উদ্ধৃতি দিয়ে একটি সুইডিশ পত্রিকা একটি অদ্ভুত তথ্য জানায়। বলা হয়, সম্মতিক্রমেই সেক্স শুরু হলেও শেষটা নাকি হয় ‘বলপূর্বক’। তবে পেন্টাগনের মদদে এই অভিযোগ আনা হয়েছে বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তা ওই নারী প্রত্যাখ্যান করেন। এএফপি জানায়, ওই দুই নারী ছিলেন উইকিলিকসের স্বেচ্ছাসেবী। অ্যাসাঞ্জ চলতি বছরের প্রথম দিকে বেশ কিছু দিন সুইডেনে ছিলেন।
অ্যাসাঞ্জ অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করে এটিকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে তার আইনজীবী বর্ণনা করেছেন রাজনৈতিক চমক হিসেবে।
গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা পর গতকালই তাকে আদালতে হাজির করা হয়। কালো গাড়িতে করে তাকে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করার সময় রাস্তাটি বন্ধ করে দেয়া হয়। গ্রেফতারের পর তাকে আলাদাভাবে রাখা হয়েছিল বলেও বিভিন্ন সূত্র জানায়।
সুইডিশ কৌঁসুলিরা অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বেশ জটিলতায় পড়েছেন। প্রথমে তারা যে মামলাটি করেছিলেন, সেটা তারা প্রত্যাহার করেন। তারপর আবার তারা অভিযোগের তদন্ত শুরু করেন।
উইকিলিকসের মুখপাত্র হরাফনসন গতকাল রয়টার্সকে বলেন, অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি হামলা। উইকিলিকস কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আগের মতোই একইভাবে কাজ করে যাবো। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের কোনো বিষয় নিয়ে আমাদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসবে না।
এর আগে অ্যাসাঞ্জ নিজেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন, তাকে গ্রেফতার করা হলে তার সহকর্মীরা আরো ভয়াবহ তথ্য ফাঁস করে দেবে। তার কাছে গুয়ানতানামো বেসহ মারাত্মক সব তথ্য এবং আফগানিস্তানে মার্কিন বিমান হামলায় বেসামরিক লোকের প্রাণহানির ভিডিওচিত্রও আছে বলে তিনি দাবি করেন। উইকিলিকসের মুখপাত্র বলেন, উইকিলিকস লন্ডন ও অন্যান্য গোপন স্থান থেকে একটি গ্রুপের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
বিবিসি জানায়, গ্রেফতারের আগে অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী মার্ক স্টিফেনস জানিয়েছিলেন, ‘পুলিশের কাছে তার স্বেচ্ছায় যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি।’ তিনি জানান, তার মক্কেল অভিযোগগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে ও নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। সোমবার রাতে ব্রিটিশ পুলিশ তাকে জানিয়েছিল, তারা সুইডিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা পেয়েছে।
মার্ক স্টিফেনসের উদ্ধৃতি দিয়ে আলজাজিরা জানায়, উইকিলিকসের তথ্য ফাঁসে ক্ষুব্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রই এসব অভিযোগ উত্থাপনের জন্য চাপ দিয়ে আসছিল।
অ্যাসাঞ্জের লন্ডনভিত্তিক আইনজীবী জেনিফার রবিনসন বলেন, তার মক্কেল তাকে সুইডেনে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ প্রতিরোধ করবেন। কারণ তিনি আশঙ্কা করছেন, তাকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হতে পারে। তবে আইনি জটিলতা থাকায় তাকে শিগগিরই সুইডেনে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে না বলে আইনজীবীরা দাবি করেছেন।
উল্লেখ্য, ইরাক, আফগান যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লাখ লাখ গোপন নথি উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হলে বিপাকে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। গত ৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পাইপলাইন, যোগাযোগ ও পরিবহন, ক্যাবল লোকেশন, স্যাটেলাইট ও বিএই সিস্টেম প্লান্টসহ বেশ কিছু গোপন স্থাপনার তালিকা প্রকাশ করে উইকিলিকস। এতে ওই সব স্থাপনা এখন সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার মুখে রয়েছে। এসব তথ্য ফাঁসের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে অন্য দেশগুলোর কাছে দুঃখও প্রকাশ করতে হয়। আরো অনেক বিশ্বনেতার তোপের মুখেও পড়েন জুলিয়ান।
৩৯ বছর বয়সী অস্ট্রেলীয় নাগরিক অ্যাসাঞ্জকে আশ্রয় না দিতে মিত্র দেশগুলোর প্রতি ওয়াশিংটন আহ্বান জানায় বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। সোমবার ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ যুক্তরাজ্যসহ স্পর্শকাতর অবস্থানের তথ্য ফাঁস করায় উইকিলিকসের সমালোচনা করে বলেছিলেন, তারা সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সারাহ পলিন অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে রক্তমাখা হাতে মার্কিনবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ আনেন। অ্যাসাঞ্জের নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়া সরকারের কাছ থেকেও তার সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড ইতোমধ্যে অ্যাসাঞ্জের সমালোচনা করেছেন। তিনি নথি প্রকাশকে বেআইনি কাজ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ইন্টারনেট সার্ভিস যোগানদাতা প্রতিষ্ঠান উইকিলিকসকে সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তারা সুইস সার্ভার নিতে বাধ্য হয়। সোমবার সুইস কর্তৃপক্ষ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় অ্যাসাঞ্জ তার আবাসস্থল সম্পর্কে ভুল তথ্য দেয়ার অভিযোগে অ্যাসাঞ্জের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। এতে এক সপ্তাহে অ্যাসাঞ্জ এক লাখ ইউরো হারিয়েছেন। পোস্ট ফিনান্সের ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়, জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের সাথে সব ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ তার স্থায়ী নিবাস হিসেবে জেনেভা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তার সুইজারল্যান্ডে বসবাসের কোনো প্রমাণ না থাকায় তিনি পোস্ট ফিন্যান্সের সাথে ভোক্তার সম্পর্ক রাখার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। এ কারণে ব্যাংক তার অ্যাকাউন্ট জব্দ করার অধিকার রাখে।
উইকিলিকস এক বিবৃতিতে জানায়, গত সপ্তাহে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিশোধের বড় প্রতিষ্ঠান পেপ্যাল জার্মান দাতব্য সংস্থা ওয়াও হল্যান্ড ফাউন্ডেশনের ৬০ হাজার ইউরো জব্দ করেছে। এ প্রতিষ্ঠান পরোক্ষভাবে উইকিলিকসকে সহায়তা করে থাকে।
সম্প্রতি ওবামার পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করে অ্যাসাঞ্জ বলেন, যদি দেখা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের গোয়েন্দা লাগানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেন তাহলে তার পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, যিনি এমন কাজের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি যদি আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে একটি মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে দেখতে চান তাহলে তাকে পদত্যাগ করা উচিত।
প্রকাশিত ওই নথিগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হলো, জাতিসঙ্ঘের কর্মকাণ্ড গোপনে মনিটরিং করা, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে বলা হয়েছিল তিনি যেন জাতিসঙ্ঘ কর্মকর্তার টেলিফোন, ই-মেইল ও ক্রেডিট কার্ডসহ যাবতীয় বিষয়ে গোয়েন্দা লাগিয়ে রাখেন।
চমস্কির স্বাক্ষরঃ এএফপি জানায়, বিখ্যাত মার্কিন বুদ্ধিজীবী, ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের পক্ষাবলম্বন করে তাকে সমর্থনের আহ্বান জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জুলিয়ান গিলার্ডের কাছে পাঠানো একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলোজির (এমআইটি) অধ্যাপক ও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির কড়া সমালোচক নোয়াম চমস্কি ওই চিঠিতে গিলার্ডকে তিনি এ বিষয়ে দৃঢ়তাপূর্ণ বিবৃতি দেয়ার জন্যও বলেন। অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন আইনজীবী, লেখক ও সাংবাদিক এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
চিঠিতে লেখা রয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার বংশোদ্ভূত অ্যাসাঞ্জকে লক্ষ্য করে ক্রমবর্ধমান সহিংস বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্বাক্ষরকারীরা বলেন, উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতার নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে স্প্যারো ও মানবাধিকার আইনজীবী লিজি ও’শেরার লিখিত চিঠিটিতে গিলার্ডকে অবাধে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার অস্ট্রেলিয়ার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়।

————————————————————————————————————————
উইকিলিকসে বাংলাদেশ বিষয়ে ২১৮২ নথি

কালের কণ্ঠ, Sun 5 Dec 2010
ওয়েবভিত্তিক সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিসহ গোটা বিশ্বের যে আড়াই লাখ নথি ফাঁস করার মিশনে নেমেছে, তার মধ্যে দুই হাজার ১৮২টি বাংলাদেশবিষয়ক। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা পর্যন্ত উইকিলিকস তার ওয়েবসাইটে ৬৮৩টি নথি প্রকাশ করেছে। বাকিগুলো গুরুত্ব বুঝে পর্যায়ক্রমে আগামী কয়েক মাসে প্রকাশ করা হবে বলে উইকিলিকসের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, ১৯৬৬ সাল থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে দেশটির ২৭৪টি দূতাবাসের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া নথি ওয়েবসাইটটি প্রকাশ করতে যাচ্ছে। তবে উল্লেখযোগ্য নথিগুলোর উৎস দেখানোর জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশিত লেখচিত্রে (গ্রাফ) ৪৫টি দূতাবাস স্থান পেয়েছে। সেগুলোর মধ্যে ৩৭ নম্বর অবস্থানে আছে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস।

উইকিলিকস সূত্রে জানা গেছে, প্রকাশিত ও প্রকাশিতব্য নথির মধ্যে আট হাজার ৩২০টি চীনবিষয়ক, সাত হাজার ৯৫টি আফগানিস্তানবিষয়ক, পাঁচ হাজার ৮৭টি ভারতবিষয়ক এবং চার হাজার ৭৭৫টি পাকিস্তানবিষয়ক। গতকাল বিকেল পর্যন্ত প্রকাশিত নথির চারটিতে বাংলাদেশের নাম এসেছে। এগুলোর মধ্যে দুটি প্যারিসের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে এবং বাকি দুটি ইসলামাবাদের দূতাবাস ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো। ইসলামাবাদের যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে পাঠানো নথিতে বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বার আস্তানা থাকতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে। প্যারিসের দূতাবাস থেকে পাঠানো নথিতে ২০০৬ সালের সন্ত্রাসবিরোধী প্রতিবেদনের বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মরক্কো থেকে আসা কমপক্ষে ২০ জন ইমামকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা এতে মদদ দেওয়ার অভিযোগে ২০০৬ সালে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া হয়েছে। প্যারিসে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের নথিতে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশে ডিএনএ পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তর থেকে পাঠানো নথিতে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের ব্যাপারে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এ পর্যন্ত ফাঁস হওয়া এমন সাতটি নথি রয়েছে যেগুলোর অনুলিপি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে এসেছে। এগুলো হলো শ্রীলঙ্কায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ বিষয়ে ‘শ্রীলঙ্কা ওয়ার ক্রাইম অ্যাকাউন্টিবিলিটি : দ্য তামিল’, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন ইস্যুতে পাকিস্তান সরকারকে চাপে রাখার বিষয়ে ‘টেরর ফিন্যান্স : এমবাসি প্রেসেস গভর্নমেন্ট অব পাকিস্তান অন ইউএন ১২৬৭’, ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার না করতে আমেরিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনের কাছে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের অনুরোধ বিষয়ে ‘মোশাররফ টেলস ম্যাককেইন : ডোন্ট পুল আউট ফ্রম ইরাক’, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল স্কুমেকার এবং দেশটির রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বৈঠক বিষয়ে ‘প্রেসিডেন্ট মোশাররফ ব্রিফস জেনারেল স্কুমেকার অ্যান্ড’, আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের আন্ডার সেক্রেটারি রিচার্ড বাউচারের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বৈঠক প্রসঙ্গে ‘মোশাররফ টেলস বাউচার অ্যাবাউট পাকিস্তানস প্ল্যান ফর’, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি সভার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বৈঠক বিষয়ে ‘প্রেসিডেন্ট মোশাররফ মিটস স্পিকার পেলোসি’ এবং ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশে লস্কর-ই-তৈয়বার আস্তানা থাকতে পারে বলে ধারণা পোষণ বিষয়ে ‘প্রিজার্ভিং ইনফরমেশন শেয়ারিং’

—————————————————————————————————-
নিজেদের রক্ষায় পদক্ষেপ নিয়েছে উইকিলিকস কর্তৃপক্ষ

প্রথম আলো, Sun 5 Dec 2010
উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, তাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের গোপন বার্তা প্রকাশের পর থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অ্যাসাঞ্জ বলেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা যেকোনো হুমকি থেকে নিজেদের বাঁচাতে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছেন।
গত শুক্রবার অজ্ঞাত স্থান থেকে অনলাইনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ এসব কথা বলেন। তাঁর এ সাক্ষাৎকার ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ান-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এদিকে অ্যাসাঞ্জ নতুন করে আরও তথ্য প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছেন। গার্ডিয়ানকে তিনি বলেছেন, ভিনগ্রহের প্রাণী (এলিয়েন) ও অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু (ইউএফও) সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তথ্যও তিনি প্রকাশ করবেন। তিনি তরুণ মার্কিন সেনা ব্রাডলি ম্যানিংকে �অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক� বলে আখ্যায়িত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা শাখার এই সেনাই সে দেশের গোপন দলিলপত্র উইকিলিকসের কাছে পাচার করেছেন। পুলিশ চলতি বছরের মে মাসে ম্যানিংকে গ্রেপ্তার করে।

অ্যাসাঞ্জ বলেছেন, তাঁকে কেউ হুমকি দিলে তা হত্যার প্ররোচনা হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি বলেন, �আমাদের জীবনের হুমকির বিষয়টি সবারই জানা। পরাশক্তির সঙ্গে পেরে উঠতে এ বিষয়ে আমরা যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি।� নিজের নিরাপত্তাব্যবস্থা এরই মধ্যে বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
অ্যাসাঞ্জের আইনজীবী বলেছেন, যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তাঁর মক্কেলকে সুইডেনের কাছে হস্তান্তরের সব প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে তিনি লড়বেন। তিনি আরও বলেন, তাঁর বিশ্বাস, বিদেশি শক্তিগুলো সুইডেনকে এ ব্যাপারে প্রভাবিত করছে।
এদিকে সুইডেন কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা এরই মধ্যে ব্রিটেনের কাছে অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজপত্র হস্তান্তর করেছে। ১০ দিনের মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মাইক হুকাবি বলেছেন, যে ব্যক্তিই গোপন মার্কিন দলিল প্রকাশ করুক না কেন, তার বিচার করতে হবে।
আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর গোপন দলিল প্রকাশ করে উইকিলিকস বিশ্বব্যাপী আলোচনার ঝড় তোলে। সর্বশেষ তারা বিপুল পরিমাণ গোপন মার্কিন কূটনৈতিক বার্তা প্রকাশ করে। এ নিয়ে উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের তোপের মুখে পড়ে।

এর পর থেকেই তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অ্যাসাঞ্জ দাবি করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিল ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার দি ইনডিপেন্ডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাসাঞ্জ সম্ভবত দক্ষিণ ইংল্যান্ডের কোনো এক জায়গায় অবস্থান করছেন। ব্রিটেনের পুলিশ তাঁর অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছে।

—————————————————————————————————-

আত্মপক্ষঃ রহস্যজনক প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস

এবনে গোলাম সামাদ

সম্প্রতি উইকিলিকস (WikiLeaks) ওয়েবসাইট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছে। এসব গোপন তথ্য উইকিলিকস কিভাবে সংগ্রহ করতে পেরেছে সেটা বিস্ময়কর। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়, আরো অনেক রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করছে উইকিলিকস। তাই উইকিলিকসের ফাঁস করা তথ্য যে বানোয়াট, তা কোনো রাষ্ট্রই বলছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পাকিস্তানের পরমাণু চুল্লি থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার এটা হতে দেয়নি। উইকিলিকস এই তথ্য ফাঁস করেছে পাকিস্তানের একজন সরকারি মুখপত্র বলেছেন, উইকিলিকসের দেয়া তথ্য যথার্থ। উইকিলিকসের ফাঁস করা সব তথ্যই মনে হচ্ছে বস্তুনিষ্ঠ আর এর আছে দালিলিক ভিত্তি। কী করে একটি প্রতিষ্ঠান এত দলিল সংগ্রহ করতে পারল, সেটা অনেকের কাছেই মনে হচ্ছে বিস্ময়কর।

উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জি (Julian Assange) একজন অস্ট্রেলীয় নাগরিক। তার জন্ম সে দেশে। অ্যাসাঞ্জি বলেছেন, তার সাথে সর্বক্ষণ কাজ করে মাত্র পাঁচজন। আর এ ছাড়া যারা কাজ করে তারা কেউই সার্বক্ষণিক নয়। প্রায় ৮০০ লোক পৃথিবীর নানা দেশ থেকে সহযোগিতা করছে অ্যাসাঞ্জিকে। উইকিলিকস নাম দুটো শব্দকে একত্রে মিলিয়ে তৈরি। উইকি (Wiki)শব্দটা হাওয়াই দ্বীপের ভাষা থেকে পাওয়া। শব্দগত অর্থ হলো দ্রুত। আর খপথর শব্দটা ইংরেজি। এর একটা মানে হলো ফাঁস করা। শব্দগত অর্থে তাই উইকিলিকস বলতে বোঝাচ্ছে ‘দ্রুত ফাঁস করা’। অ্যাসাঞ্জি ঘোষণা করেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হচ্ছে প্রধানত বিভিন্ন দেশের সরকারের গোপন তথ্য ফাঁস করা। যাতে বিভিন্ন দেশের সরকারকে সেসব দেশের মানুষের কাছে হতে হয় জবাবদিহিতার মুখোমুখি। উইকিলিকস বস্তুনিষ্ঠভাবে বিভিন্ন দেশের সরকারের স্বরূপ করে চলবে উন্মোচন।

উইকিলিস প্রতিষ্ঠানের মালিক অ্যাসাঞ্জি নন। এর মালিক হলো সানশাইন প্রেস (The Sunshine Press)। উইকিলিকস শুরু হয়েছে ২০০৬ সালে। কিন্তু মাত্র এই কয় বছরে তা হয়ে উঠেছে বিশেষ আলোচ্য ও তথ্যের উৎস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের New York Times, বিলাতের The Guardian, জার্মানির Der Spiege , এবং ফ্রান্সের Le monde Gog এসব পত্রিকা খুবই নামকরা। আর হালকা ধরনের নয়। এসব পত্রিকায় ছাপানো হচ্ছে উইকিলিসের ফাঁস করা তথ্য। আর বিভিন্ন দেশের পাঠক সমাজের কাছে তা গৃহীত হচ্ছে নির্ভরযোগ্য হিসেবে। উইকিলিকস সম্প্রতি ফাঁস করেছে, সৌদি আরবের বাদশা আবদুল্লাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেন, সে যেন ইরানের পরমাণু স্থাপনায় আঘাত করে। বাদশা আবদুল্লাহ চেয়েছেন ইরানের পরমাণু স্থাপনার ধ্বংস। উইকিলিকসের দেয়া এই তথ্য ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে নিশ্চয় সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটাবে। খবরটি এমনই এক সময় উইকিলিকসের পক্ষ থেকে ফাঁস করা হলো, যখন বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ইরান ও সৌদি আরব তাদের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে ইচ্ছুক।

উইকিলিকস দাবি করেছে, তার হাতে আছে আফগানিস্তানের ওপর ৭৬ হাজার ৯০০ দলিল, যা সে প্রকাশ করবে আফগানিস্তান সম্পর্কে মার্কিন নীতিকে উন্মোচিত করার জন্য। উইকিলিকস বলেছে, চীনের লক্ষ্য হচ্ছে দুই কোরিয়াকে এক করে একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা এবং সেখান থেকে মার্কিন সৈন্যের অপসারণ। উইকিলিকস সেটা বলেছে, চীনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গোপন বক্তব্য উদ্ধৃৃত করে। প্রশ্ন উঠেছে উইকিলিকস এত সব গোপন তথ্য কী করে সংগ্রহ করতে পারছে? এসব তথ্য সংগ্রহ করতে নিশ্চয় তার ব্যয় করতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তার এই অর্থের উৎস জানা যাচ্ছে না। সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, তথ্য প্রচারের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক ব্রাডলি ম্যানিংকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেফতার করা হয়েছে। তিনি গোপন তথ্য দিয়েছেন অ্যাসাঞ্জিকে। অ্যাসাঞ্জি বলেছেন, ব্রাডলি ম্যানিংয়ের মামলার সব খরচ তিনি বহন করবেন উইকিলিকসের পক্ষ থেকে। এই মামলায় প্রচুর অর্থ লাগবে। অ্যাসাঞ্জি এই অর্থ কোথা থেকে পাবেন তা নিয়ে দেখা দিচ্ছে প্রশ্ন। অর্থাৎ উইকিলিসককে যে ধরনের প্রতিষ্ঠান বলা হচ্ছে সে তা নয়। এর পেছনে আছে একটা শক্তিমান চক্র। যারা সাহায্য করে চলেছে অ্যাসাঞ্জিকে।

উইকিলিকসের কোনো সদর দফতর নেই। উইকিলিকসের কাজ চলেছিল সুইডেনকে নির্ভর করে। কিন্তু সুইডেনে অ্যাসাঞ্জির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে যৌন হয়রানির। অ্যাসাঞ্জির বয়স ৩৯। তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল। অনেকে বলছেন, অ্যাসাঞ্জিকে বিপাকে ফেলার জন্যই করা হয়েছে এই মামলা। প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে, তিনি একজন যৌন বিকারগ্রস্ত মানুষ। শোনা যাচ্ছে অ্যাসাঞ্জি এখন আছেন বিলাতে, কিন্তু বিলাতের পুলিশ নাকি তাকে ধরতে আগ্রহী নয়। তাই তিনি এখনো ধরা পড়েননি। বিলাতের পুলিশ কেন তাকে ধরতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, সেটা স্পষ্ট নয়। অ্যাসাঞ্জিকে মনে হয় রক্ষা করার চেষ্টা হচ্ছে কোনো বিশেষ মহল থেকে। উইকিলিকসের জন্ম বেশি দিন হয়নি। ২০০৬ সাল থেকে শুরু হয়েছে এর কর্মকা । কিন্তু ইতোমধ্যেই তা প্রতিষ্ঠা পেতে পেরেছে একটা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সে দেশে অ্যাসাঞ্জির বিরুদ্ধে মামলা করা হবে গোপন তথ্য চুরি করার অভিযোগে। কিন্তু অ্যাসাঞ্জি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপস্থিত থেকে এই কাজ করনেনি। তাই মার্কিন আদালতে এই মামলার বৈধতা নিয়ে থাকবে প্রশ্ন। অন্য দিকে ব্রিটেনে তার বিপক্ষে কোনো মামলা করা যাবে না, কারণ তিনি ব্রিটেন থেকে কোনো তথ্য চুরি করেননি। এ ছাড়া ব্রিটেনের আইন বলে (বিল অব রাইটস-১৬৮৯ খ্রিঃ) মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। সংবাদপত্রে বিলাতে কোনো খবর ছাপাতে বাধা নেই। বিলাতের আইনে তাই অ্যাসাঞ্জিকে বলা যাচ্ছে না কোনোভাবেই অপরাধী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও আইন আছে খবর জানার অধিকারের। অ্যাসাঞ্জির বিরুদ্ধে মামলা উঠলে নিশ্চয় এই অধিকার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে গোপন তথ্য সংরক্ষণের কড়াকড়ি। কিন্তু তথাপি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হতে পারছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সচিব) বলেছেন, অ্যাসাঞ্জি যা করছেন তা হলো তথ্য সন্ত্রাস। আর এই তথ্য সন্ত্রাসের ফলে কেবল যে মার্কিন স্বার্থই বিপন্নই হচ্ছে তা নয়, তার মিত্রদেরও পড়তে হচ্ছে বিপাকে। ফলে বিশ্বশান্তি বিপন্ন হতে পারে। বিপন্ন হতে পারে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা। অ্যাসাঞ্জি ঘোষণা করেছেন, উইকিলিকসের হাতে আছে এমন দলিলপত্র যা প্রকাশিত হলে মানুষ জানতে পারবে মার্কিন ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা। তিনি এসব দলিল প্রকাশের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। অ্যাসাঞ্জি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি কী করে এত দূর ক্ষমতাধর একজন ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারলেন, সেটা থাকছে অজ্ঞাত। সে যা হোক, উইকিলিকস হয়ে উঠেছে সারা বিশ্বের পত্রপত্রিকার বিশেষ খবর। উইকিলিকস যদি বিভিন্ন দেশের খবর ফাঁস করে চলতে পারে, তবে নিশ্চিতভাবেই তা প্রভাবিত করতে সক্ষম হবে বিশ্ব রাজনীতির ধারাকে।

লেখকঃ প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ,চ্যানেল আই, বাঙ্গালী, বাংলা ভিশন, এনটিভি,এটিএন বাংলা, আরটিভি, দেশ টিভি, বৈশাখী টিভি, একুশে টিভি, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, জাহান হাসান, বাংলা, বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস, লিটল বাংলাদেশ, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,অর্থ, বাণিজ্য, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, সুখ, টেলিভিশন, বসন্ত উৎসব, Jahan, Hassan, jahanhassan, Ekush, bangla, desh, Share, Market, nrb, non resident, los angeles, new york, ekush tube, ekush.info

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: