সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সাদা হাতি

সম্রাট জাহাঙ্গীর ও সাদা হাতি

মাহবুব আলম

White Elephant

White Elephant


A white elephant is an idiom for a valuable possession of which its owner cannot dispose and whose cost (particularly cost of upkeep) is out of proportion to its usefulness or worth.

বৈদিক আর্যরা এদেশে আসার আগে হাতি দেখেনি। ঋগে¦দে ‘হস্তী’ শব্দটি মাত্র পাঁচবার পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুজায়গায় হাতিকে মৃগের অর্থাৎ হরিণের মতো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে মনে করা হয় হাতি নামক প্রাণীটি আর্যরা নতুন দেখেছে। এই বিচিত্র দর্শন প্রাণীটিকে মৃগ বলেই ধারণা হয়েছিল তাদের। কারণ শিকারে পারদর্শী আর্যরা মৃগকে ভালোভাবেই চিনত। হাতিকে হাতওয়ালা মৃগও নাম করা হয়েছিল, শুঁড়ওয়ালা মৃগ কোথাও বলা হয়নি। সংস্কৃতে হাতির অনেক প্রতিশব্দ আছে যেমনÑ করী, গজ, দ্বি-মাতঙ্গÑএর একটি শব্দও ঋগে¦দে এমনকি ঐরাবত শব্দটিও নেই। এসব প্রমাণ থেকে মনে করা হয় হাতি আর্যদের জন্য ছিল একটি নতুন প্রাণী। পরে হাতি তাদের সমাজে এবং মহাভারতের যুগে বিশাল ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।

উপমহাদেশে আগত প্রথম মুসলিম অভিজাতরা নিজের দেশে হাতি চোখেও দেখেননি। মুঘলদের আদি বাসস্থানে হাতির নাম নিশানা ছিল না। ঘোড়াই ছিল তাদের প্রধান যুদ্ধাস্ত্র ও চলাচলের বাহন। হাতির সঙ্গে তাদের প্রথম পরিচয় এদেশের মাটিতে পা দিয়ে। প্রাণীটির রাজকীয় মহিমার বিস্ময় উদ্রেককারী শক্তি এবং বিশাল আকার মুঘলদের নজর কেড়েছিল। সারা হিন্দুস্তান থেকে বাছাই করা হাতি মুঘল বাহিনীতে ভর্তি করার রেওয়াজ চালু হলো। আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায় সম্রাট আকবরের নিজের ব্যবহারের জন্য সর্বদা একশ সুশিক্ষিত হাতি প্রস্তুত থাকত। তিনি যে হাতিতে আরোহণ করতেন সে হাতি তিনি নিজেই চালাতেন, মাহুতকে ডাকা হতো না। হাতির দাঁতের ওপর পা রেখে পিঠে উঠে নিজের বিচিত্র বিদ্যা দেখিয়ে অনেক হস্তীবিশারদকে চমৎকৃত করতেন বাদশা আকবর। ইসলাম খান বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের সঙ্গে জয়লাভ করার পর পরাজিত ভূঁইয়াদের শর্ত মোতাবেক সব পুরুষ দাঁতাল হাতি মুঘল সুবেদারের প্রতিনিধির হাতে তুলে দিতে হয়। মুসা খান থেকে খাজা ওসমান ও অন্য ভূঁইয়াদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া সব হাতি শাহী দরবারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাহাঙ্গীরের সময় মুঘলদের বঙ্গ বিজয় সম্পন্ন হলে বাংলার সেরা হাতিগুলো মুঘল রাজধানীর হাতিশালায় পাঠানো শুরু হয়। মুঘল সম্রাটদের হাতির প্রতি প্রবল আকর্ষণ তাদের স্মৃতিকথা এবং মুঘল ঐতিহাসিকদের লেখায় স্থান করে আছে। জঙ্গলে খেদা দিয়ে বন্য হাতি ধরে রাজধানীতে পাঠানোর জন্য সুবেদারদের নিয়মিত নির্দেশ পাঠাতেন তারা। রাজ্যের যেখানেই হাতি পাওয়া সম্ভব, সেখান থেকেই হাতি সংগ্রহ করে আর শত্রুপক্ষের কাছ থেকে হাতি ছিনিয়ে নিয়ে মুঘল দরবারে পাঠানো ছিল সুবেদারদের অন্যতম দায়িত্ব। কামরূপ পাহাড়ে, আসামে বা ত্রিপুরায় বাংলায় মুঘলদের হাতির ক্ষুধা মেটাতে কম যুদ্ধবিগ্রহ হয়নি। বাহারীস্তান-ই-গায়বী ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের স্মৃতিকথা তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরীতে এ নিয়ে অনেক তথ্য রয়েছে।

Nur-ud-din Salim Jahangir (Persian: نورالدین سلیم جهانگیر)সম্রাট জাহাঙ্গীর

Nur-ud-din Salim Jahangir সম্রাট জাহাঙ্গীর

সম্রাট জাহাঙ্গীরের হাতিশালে উৎকৃষ্ট হাতির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু সফেদ হাতি বা সাদা হাতি তার একটিও ছিল না। সাদা হাতি যে শুধু উপমহাদেশেই বিরল তা নয়, মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডেও এর সংখ্যা খুবই নগণ্য। প্রকৃতিপ্রেমিক ও পশুপাখি সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু সম্রাট জাহাঙ্গীর সাদা হাতি নিয়ে কৌতূহল ও আগ্রহ হবেন তা খুবই স্বাভাবিক।
তিনি সম্ভবত তার গোয়েন্দা বিভাগ থেকে জানতে পেরেছিলেন, আরাকান রাজ বা মগরাজা মেঙ্গ খামৌঙ্গ (১৬১২-১৬২২) একটি দু®প্রাপ্য সাদা হাতির অধিকারী। বিদেশি বণিকদের কাছ থেকেও সম্রাট মগরাজার এই বিরল সম্পদের সন্ধান পেয়ে থাকতে পারেন। এই হাতিটিই হয়তো পর্তুগিজ পাদরি সিবাস্টিয়ান মানবিক ১৬৩০-এ তার আরাকান ভ্রমণের সময় দেখেছিলেন বলে মনে করা হয়।

ড. আবদুল করিম তার হিস্ট্রা অব বেঙ্গল/মুঘল পিরিয়ড ভলু-২-এ মগরাজার সাদা হাতি সম্পর্কে কিছু চিত্তাকর্ষক তথ্য দিয়েছেন, যা এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।
সাদা হাতি একটি অতি বিরল প্রাণী। বৌদ্ধ ধর্ম শাস্ত্রে এর সুমহান মর্যাদা। বৌদ্ধদের বিশ্বাস, গৌতম বুদ্ধ তার পূর্বজন্মে সাদা হাতি রূপে জন্মেছিলেন। সাদা হাতির অধিশ্বর বিশ্বের সার্বভৌমত্বের দাবিদার হওয়ার যোগ্য। সাদা হাতি নির্ণয় করার জন্য বহু প্রাচীনকাল থেকেই রয়েছে একটি বিশেষ বিদ্যা বা পদ্ধতি। এই পদ্ধতি অনুসারে দুটি পরীক্ষার মাধ্যমে সাদা হাতি চেনা হয়ে থাকে। প্রথমত সাদা হাতির পেছনের পায়ের পাঁচটি নখ থাকতে হবে, যেখানে সাধারণ হাতির রয়েছে চারটি নখ।

দ্বিতীয়ত, সাদা হাতির গায়ে পানি ঢাললে তার চামড়া লালচে হয়ে ওঠে। পানির সংস্পর্শে কালো হাতি আরো কালো রং ধরে। সাদা হাতির প্রসঙ্গটি নেহাত গালগল্প নয়। সে সময়ের কয়েক বিদেশি পর্যটক তাদের লেখায় নিজেদের সাদা হাতি দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে গেছেন। র‌্যাল্ফ্ ফিচ ১৫৮৬-এ ব্রহ্ম দেশের পেগুতে একটি সাদা হাতি দেখেছেন বলে লিখেছেন। হাতিটিকে শ্যামদেশ (থাইল্যান্ড) থেকে লুট করে আনা হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়। তবে পয়সা খরচ করে এই প্রাণীটিকে দেখতে বাধ্য হয়ে ফিচ কিছুটা আশ্চর্য হয়েছিলেন। মানরিক এবং ফিচ উভয়ই এই হাতিটির আদর যতœ ও বিলাসের বহর দেখে তাজ্জব বনে গিয়েছিলেন। তারা দেখতে পেলেন সোনার মঞ্চে রেশম এবং নরম কুশনের মধ্যে হাতিটাকে রাখা হয়েছে। তার খাবার তৈরির কাজে বহু ভৃত্য নিয়োজিত। এর সব খাবার ও পানীয় সোনা এবং রূপার পাত্রে পরিবেশন করা হয়। এর জন্য আগে দাস-দাসী মোতায়েন আর হাতিটির প্রাত্যহিক স্নান পর্বের জন্য রয়েছে চোখে পড়ার মতো ভৃত্য বাহিনী। এমন একটি বিরল প্রাণী সংগ্রহে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মতো বিজ্ঞান-মনস্ক মানুষ যে আগ্রহী হবেন তাতে আর আশ্চর্য কী।

Nur-ud-din Salim Jahangir (Persian: نورالدین سلیم جهانگیر)

Nur-ud-din Salim Jahangir Mahal

১৬২২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুঘলরা আরাকান রাজের ভূখ- আক্রমণ করেনি। (ইসলাম খানের বারো ভূঁইয়াদের দমনের পর বাংলায় মুঘল শাসন পুরোপুরি কায়েম হয়।) ১৬১১ ইসলাম খান ভুলুয়া দখল করলে ভুলুয়ার রাজা অনন্ত মাণিক্য আরাকানে গিয়ে আশ্রয় নেন। তখন থেকেই ফেনী নদী মুঘল আর মগরাজ্যের সীমানা হিসাবে চিহ্নিত হয়। চট্টগ্রাম তখন মগদের দখলে। এখান থেকে তারা দক্ষিণ বঙ্গে হামলা ও লুটপাট করে থাকে। বারো ভূঁইয়াদের পতনের পর জাহাঙ্গীর বাংলার সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেলেন। প্রথমেই তার দৃষ্টি পড়ে আরাকান রাজ্যের দিকে। বাংলার দু-দুজন সুবেদারের প্রতি তার আদেশ ছিল আরাকান রাজ্য জয় করে মগরাজার সাদা হাতিটিকে মুঘল রাজধানীতে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। একটি বিরল প্রজাতির প্রাণীর জন্য যুদ্ধের আশ্রয় নেয়া অবিশ্বাস্য মনে হলেও ঘটনাটি কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সত্য। বাহারীস্তান-ই-গায়বীর লেখক মির্জা নাথন, যিনি সেই সময়ে মুঘল সেনাপতি হিসাবে বাংলায় কর্মরত ছিলেন। তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় সম্রাটের আদর্শ দুটি তুলে ধরেছেন তার লেখায়। সুবেদার কাশিম খানের প্রতি সম্রাটের আদেশ ছিল নিম্নরূপ :

‘সুবেদার কাশিম খানকে আরো চেষ্টাশীল এবং অধিক কর্মতৎপর হতে হবে যাতে সর্ব ইচ্ছা পূরণকারী মহান আল্লাহর অনুগ্রহে তিনি আরাকান অভিযানকে একটি আনন্দময় পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। মগরাজার সাদা হাতিটিকে বন্দি করে মহান শাহীদরবারে পাঠানোর জন্য আদেশ করা হলো তাকে। এহেন গৌরবময় কৃতিত্বে ইতিহাস এই বিজয়ী সন্তানের (সুবেদার কাশিম খান) নামে জাহাঙ্গীর নামায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’ (বাহারীস্তান-ই-গায়বী)। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশিম খানকে নিজের সন্তান বলে অভিহিত করতেন।

King Jahangir's Tomb

King Jahangir's Tomb

সুবেদার কাশিম খানের শাসনামলের গোড়া থেকেই মুঘল সেনা এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে অন্তর্কলহ সবার শাসনকার্যে বিঘœ সৃষ্টি করে। সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোও একে একে মুঘলদের আক্রমণ করতে শুরু করে। তার আসাম অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। মগরাজা মুঘল ভূখ- বিশেষ করে ভুলুয়া আক্রমণ করলে বারবার পরাজিত হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে তাকে। মগরাজা মেঙ্গ খামৌঙ্গ এই পরাজয়ে নিজেকে অপমানিত বোধ করে আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। ইতিমধ্যে তার শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী বার্মার সঙ্গে বিরোধ মিটে গেছেÑ অতএব সব দিক দিয়ে মুক্ত হয়ে মগরাজার এক বিরাট সৈন্যবাহিনী নিয়ে ভুলুয়ার নোয়াখালী শাসনকর্তা সরহাদ খানকে আক্রমণ করে। এর আগেই মগরাজার গুপ্তচররা তাকে জানিয়েছে, সরহাদ খানকে সাহায্য করার জন্য ঢাকা থেকে সে মুঘল সৈন্যরা এসেছিল তারা চলে গেছে। সরহাদ খানও পূর্ববর্তী বিজয়ের অন্ধকার আয়াসে দিন কাটাচ্ছিলেন। শত্রুরা যখন ভুলুয়ার কাছে পৌঁছেছে তখন তার টনক লড়ল। বরাবরের মতো এবারও মগরাজার বিরুদ্ধে ভুলুয়ায় যুদ্ধ করা তার সুবিধাজনক মনে না হওয়ায় তিনি তার পরিবার-পরিজন সরিয়ে ডাকাতিয়া খালে চলে আসেন। কাশিম খান খবর পেয়েই সৈন্য ও রণতরীসহ এক বিশাল মুঘল বাহিনী পাঠিয়ে দিলেন। যুদ্ধে মগরাজা টিকতে না পেরে পানিতে গিয়ে হাতিসহ এক বৃহৎ পঙ্কিল ডোবায় পড়ে যান। রাজা সেই বিপজ্জনক অবস্থা থেকে নিজেকে মুক্ত করার আগেই সরহাদ খান ও তার সৈন্যরা তাকে ঘিরে ফেলেন। একটি লোকও যাতে পালিয়ে যেতে না পারে সেদিকে তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখে। এবার মগরাজা শান্তি প্রস্তাব পাঠান। মির্জা নাথন লিখেছেন, ‘ভোর থেকে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত মগরাজা এমন অবস্থায় হাতির ওপর ছিলেন যে এমন একটু স্থান ছিল না যেখানে নেমে তিনি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে পারেন। রাতে রাজা একটি মাদী হাতিতে চড়ে পালিয়ে যান। রাজাকে পালিয়ে যেতে দেওয়ার জন্য মুঘল সৈন্যরা সারারাত সতর্কতার ভান করে। সরহাদ খান সকালে রাজার ফেলে যাওয়া সম্পদ, হাতি সংগ্রহ ও রাজার মগ সৈন্যদের বন্দি করে সুবেদারের কাছে বিজয় বার্তা পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু পলায়নপর মগরাজা এবং তার সৈন্যদের পিছু না নিয়ে তিনি ভুলুয়া ফিরে এলেন। ড. আবদুল করিম লিখেছেন, মগরাজাকে কেন সরহাদ খান বন্দি করেননি তা এক রহস্য। রাজাকে পালানোর সুযোগ করে দেওয়ার জন্য সরহাদ খানকে দায়ী করে মির্জা নাথন লিখেছেন :

‘রাখাঙ্গের (আরাকানের) মতো একটি রাজ্য আল্লাহ এমন সহজভাবে জয় করিয়েছেন, ঘোড়া চালিয়েই শুধু তার দখল করা সম্ভব ছিল এবং রাজাকে বন্দি করে জীবিত অবস্থায় শ্বেত হাতিসহ শাহী দরবারে পাঠানো যেত।’ নাথন দুঃখ করে আরো লিখেছেন, জনগণ জানতে পারত যে একজন রাজা যিনি পুরুষানুক্রমে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছেন তাকে একজন শাহী কর্মচারী পরাজিত করেছে। ‘কিন্তু সরহাদ খান বরাবরই ব্যবসায়ী মনোবৃত্তি নিয়ে এবং ভীরুর মতো ব্যবহার করেছেন। তিনি নগদ লাভের জন্যই সন্তুষ্ট থাকতেন।’ অশ্বারোহণ বিদ্যার কৌশল দিয়ে রাখাঙ্গের মতো একটি দেশ শাহী কর্মচারীদের অধীনে আনার ঘটনাটি চমৎকারভাবে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হতো। সরহাদ খানের নামও যুগ-যুগান্তর রোমাঞ্চকর কাহিনীতে পরিণত হতো। তিনি এভাবে কাজ করতে পারেননি। তাই অখ্যাত হয়ে রইলেন তিনি।’

'Hiran Minar' or Deer Tower was built during the reign of Jahangir & Shah Jahan, 1606, to honor the memory of a pet hunting antelope of the king.

'Hiran Minar' or Deer Tower was built during the reign of Jahangir & Shah Jahan, 1606, to honor the memory of a pet hunting antelope of the king.

আরাকান রাজার সাদা হাতির প্রতি সম্রাটের লোলুপ দৃষ্টি সুবেদারের অজানা ছিল না। হাতিটি দখল করার জন্য তার পরিকল্পনা নাথন উল্লেখ করেছেন এমনিভাবে।
এখন আমাদের সামনে কোনো অভিযান নেই। মগরাজা বারবার ধৃষ্টতা দেখানোর জন্য মোটেই অনুতপ্ত নন। এ ক্ষেত্রে তাকে উপযুক্ত শান্তি প্রদান করা যুক্তিসঙ্গত। রাখাঙ্গ অধিকার করে শ্বেত হস্তীটি হস্তান্তর করে তা শাহী দরবারে পাঠানোর জন্য সম্রাট বারবার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এবার মগরাজ্য অধিকার করার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কাশিম খান নিজেই যুদ্ধ পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর ছেড়ে ভুলুয়ায় রওনা হন। কিন্তু গোড়াতেই তিনি একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুন্নবীকে অগ্রগামী বাহিনীর সেনাপতি করে অভিযানে পাঠালেন তিনি। নবীর সঙ্গে বেশ কয়েকজন নামজাদা এবং অভিজ্ঞ মনসবদারদের পাঠানো হলো যাদের মধ্যে সরহাদ খান, শেখ জামানও ছিলেন। এরা সুবেদারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তার অধীনে যুদ্ধ করাটাকে সম্মানহানিকর মনে করতেন। ফলে তাদের সহায়তা থেকে আবদুন্নবী শুরু থেকে বঞ্চিত হলেন। সুবেদার নিজে ফেনী নদীতীরে তাঁবু গেড়ে যুদ্ধের গতিবিধি পর্যালোচনা করছিলেন।

আরাকান রাজ চট্টগ্রাম দুর্গ সুরক্ষিত জেনেও নিজে বিশাল বাহিনীসহ রাখাঙ্গ থেকে চট্টগ্রাম চলে এলেন। মুঘল চররা খবর দিলেন মগরা চট্টগ্রাম থেকে অগ্রসর হয়ে কাটঘরে এসে ঘাঁটি গেড়েছে। এবং তাদের প্রস্তুতি তখনো অসম্পূর্ণ। এ সময় আক্রমণ করলে কাটঘর দুর্গ ও মগ অগ্রগামী বাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব হবে। অগ্রগামী মুঘল বাহিনী মগদের অবিলম্বে আক্রমণ করল। মির্জা নাথন লিখেছেন, প্রথম থেকেই সরহাদ খান এবং শেখ জামাল শঠতার আশ্রয় নেন।’

Emperor Jahangir, Ca.1603, Imperial Mughal paintings-LOS Angles CCU Museum of Art, Calfornia

Emperor Jahangir, Ca.1603, Imperial Mughal paintings-LOS Angles CCU Museum of Art, Calfornia

যুদ্ধে যখন মুঘল বাহিনীর জয় সুনিশ্চিত তখন কয়েকজন মনসবদার সরহাদ খানের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এই অজুহাতে যুদ্ধ বন্ধ করে রাতের বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দেন আবদুন্নবীকে। আবদুন্নবী অনভিজ্ঞ সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন বলে তাদের অজুহাতের কারণ বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি তাদের কথায় প্রতারিত হয়ে সেখানে তাঁবু গেড়ে রাতে বিশ্রাম করেন। ভোরে আর আপ্রাণ চেষ্টা করেও কাটঘর দুর্গ দখল করা সম্ভব হয়নি। বরং মগরা মুঘলদের অগ্রবর্তী বাহিনীর পেছনে এর খাদ্যদ্রব্য আনার জন্য পশ্চাৎগমনকারী সরহাদ খানের সামনের দিকে এক শক্ত দেয়াল গড়ে তোলেন। এতে মুঘল অগ্রগামী বাহিনী এবং পেছনের রসদ সরবরাহকারীদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে পড়ে। মুঘল বাহিনী দুর্গের প্রবেশদ্বারের খাদের তীর পর্যন্ত পৌঁছলেও ততক্ষণে তাদের রসদ ও খাদ্য সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এদিকে বর্ষা দ্রুত এগিয়ে আসছে। অতএব বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধ বন্ধ করে নিরাপদে কাশিম খানের কাছে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কাশিম খানের এই ব্যর্থ অভিযানের সময়কাল ১৬১৬ ও ১৬১৭-এর শীতকাল। কাশিম খান ফেনীতে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থেকে সরহাদ ও জামাল খানের ষড়যন্ত্র বুঝতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। ঐতিহাসিকদের অভিমত, তার পক্ষে শুষ্ক মওসুমে মাত্র ২০-২৫ মাইল দূর থেকে মুঘল অগ্রগামী বাহিনীকে মঘ প্রতিরোধ ভেঙে রসদ এবং খাদ্য পাঠানো মোটেই অসাধ্য ছিল না। সুবেদার ইসলাম খানের সময় হলে এ রকম নৈবাক্যপূর্ণ ঘটনা কখনো ঘটত না। ফলে আরাকান জয় এবং সেই সাদা হাতি দখল অসম্পূর্ণ রয়ে গেল।

কাশিম খান যতদিন বাংলার সুবেদার ছিলেন, ততদিন তার ঐকান্তিক চেষ্টা সত্ত্বেও মগরাজাকে হারিয়ে সেই সাদা হাতি ধরে আনা সম্ভব হয়নি। চট্টগ্রামসহ আরাকান রাজ্যও মুঘল বাহিনীর নাগালের বাইরে রয়ে গেল। ১৬১৭-এ পদচ্যুত হয়ে কাশিম খান বাংলা ছেড়ে গেলে সুবেদার নিযুক্ত হন ইব্রাহীম খান। ফতেহজঙ্গ তার নিয়োগের সময় মগরাজ্য জয় করে শ্বেত হাতিটি দখল করার শাহী নির্দেশ দেওয়া হয় তাকে।

One of the hundreds of arches in the Mosque - so typical of Mughal architecture.

One of the hundreds of arches in the Mosque - so typical of Mughal architecture.

দীর্ঘদিন ধরে মগদের লুটতরাজে বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ অতিষ্ঠ। সঙ্গে জুটেছিল পর্তুগিজ জলদস্যুরা। ১৬১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা এসে এদের শাস্তি দেওয়ার জন্য ইব্রাহীম খান তোড়জোড় শুরু করলেন। এমন সময় খবর এলো মগরাজা বিশাল রণতরী নিয়ে মুঘল এলাকা আক্রমণে উদ্যত। ইব্রাহীম খাঁ আক্রমণ পরিচালনা করবেন না ভেবে মগরাজা প্রবল পরাক্রমে এগোতে থাকেন। রাজা নিশ্চিন্ত ছিলেন, মুঘল বাহিনীকে পরাজিত করে ফিরে যেতে সমর্থ হবেন। কিন্তু ইব্রাহীম খানকে বিশাল বাহিনীসহ দ্রুত উপস্থিত হতে দেখে রাজা যুদ্ধ না করে নিজরাজ্যে ফিরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলেন। মগরাজার পিছু ধাওয়া করা উচিত হবে কিনা এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো।

মির্জা নাথন সুবেদারকে পরামর্শ দিলেন, এদেশের আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখেই মগরাজার বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, যাতে যুদ্ধের মওসুমফল মুঘল পক্ষের অনুকূল হয়। পরামর্শটি সুবেদারের যুক্তিসঙ্গত মনে হলো। ভীষণ ঝড়-বৃষ্টির মওসুম শুরু হওয়ায় অভিযান না চালিয়ে জাহাঙ্গীরনগরের ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

ইব্রাহিম খান বুঝতে পেরেছিলেন আরাকানে অভিযান চালাতে হলে প্রথমেই মগদের অধিকৃত চট্টগ্রাম দুর্গ দখল করা সামরিক কারণে অপরিহার্য। চট্টগ্রাম দখল করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো ত্রিপুরা রাজ্যের ভেতর দিয়ে বা এর সীমান্ত ঘেঁষে অভিযান চালানো। অতএব মগরাজ্য দখল করায় আগেই ত্রিপুরা অধিকার করতে হবে। সুবেদার আগেই এসব ভেবেই ত্রিপুরা রাজ্য দখল করেছিলেন এবং সেখানে মির্জা নুরুল্লাকে দায়িত্ব দিয়ে এসেছিলেন। ইব্রাহীম খানকে ত্রিপুরা থেকে নুরুল্লা চিঠি নিয়ে জানালেন’, ‘ত্রিপুরার রাজা যে পথ দিয়ে মগরাজ্যে অভিযান চালিয়েছিলেন সে পথ দেখিয়ে শাহী বাহিনীকে আরাকান নিয়ে যাওয়ার জন্য ত্রিপুরার অধিকারীরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত প্রস্তুত হয়ে আছে।’ এহেন প্রতিশ্রুতির পরিপ্রেক্ষিতে ইব্রাহীম খান এক বিশাল রণতরী, অশ্বারোহী সৈন্য, হাতি পদাতিক বাহিনী নিয়ে আরাকান রওনা হন। মির্জা নুরুল্লা এবং কয়েকজন ত্রিপুরাবাসী তার পথ প্রদর্শক হিসাবে যোগ দিলেন। এই বিশাল প্রস্তুতি থেকে প্রমাণিত হয়, ইব্রাহীম খান সম্রাটের আরাকান বিজয়ের আদেশকে বাস্তবায়িত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু এত ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও তার এই অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।

Emperor Jahangir visiting the holy man Jadrup, Late 18th Century, Provincial Mughal paintings-LOS Angles CCU Museum of Art, Calfornia

Emperor Jahangir visiting the holy man Jadrup, Late 18th Century, Provincial Mughal paintings-LOS Angles CCU Museum of Art, Calfornia

ভুল পথ অনুসরণ করে আরাকান যাওয়ার সিদ্ধান্তই এই বিপর্যয়ের কারণ। নুরুল্লা সুবেদারকে যে পার্বত্য রাস্তা দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তা ছিল মির্জা নাথনের ভাষায়Ñ ‘পিপড়ে পক্ষে ও দুর্ভেদ্য এক গহিন জঙ্গলের পথ। সমস্ত পথটি ইব্রাহীম খান তার সৈন্যদের সঙ্গে নিজে জঙ্গল পরিষ্কার করে এগিয়ে ছিলেন। অনেক দূর এগিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন যে নতুন রাস্তা তাকে বাতলে দেওয়া হয়েছে তা বিশাল বাহিনীর চলাচলের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত। এমন সংকীর্ণ পাহাড়ি জলপথে ছোট রণতরীও চালানো দুষ্কর। ঘোড়াগুলোও আর এগোতে পারছিল না। খাদ্যদ্রব্য ও রসদ সরবরাহ অক্ষুণœ রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তার বিশাল বাহিনী রোগ এবং অনাহারের কবলে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। এহেন বৈরী পরিস্থিতিতে অভিযান অসম্পূর্ণ রেখে ফিরে আসা ছাড়া ইব্রাহীম খানের আর কোনো উপায় ছিল না। ডা. আবদুল করিম মনে করেন ফেনী নদী পার হয়ে ইব্রাহীম খানের উচিত ছিল আধুনিক মিরসরাই, নিজামপুর সীতাকু হয়ে বাড়বকু- পৌঁছে অতর্কিতে চট্টগ্রাম আক্রমণ করা। মগরাজ্য অভিযানে তার পূর্ববর্তী সুবেদার কাশিম খান এই রাস্তা অনুসরণ করেছিলেন। সে সময় শেখ কামাল আর শেখ আবদুল ওয়াহিদ যদি শঠতা না করতেন তাহলে কাশিম খানের আরাকান অভিযান সম্ভবত ব্যর্থ হতো না। এ রাস্তাটি অনুসরণ না করার কারণেই ইব্রাহীম খানকে অজস্র সৈন্য, হাতি, ঘোড়া, বহু রণতরী হারিয়ে ফেনী নদীর তীরে অর্থাৎ মুঘল সীমান্তে ফিরে আসতে হয়েছিল। ব্যাপক ও বিশাল প্রস্তুতি সত্ত্বেও তার আরাকান অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এবং মুঘল বাহিনী মনোবলেও হয়ে পড়ে দুর্বল। জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলা থেকে আরাকান বিজয়ের এবং সাদা হাতি দখলের প্রচেষ্টা সফল হয়নি। ১৬২৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট মারা যান। এরপরও মগদের দস্যুবৃত্তি এবং হামলায় কোনো ভাটা পড়েনি। বরং মগরাজা থিরি থুধমমার সময়ে মগরা নদীপথ ধরে ১৬২৫ সালে ঢাকা পর্যন্ত হামলা করেছিল। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খান শেষ পর্যন্ত মগদের শায়েস্তা করে চট্টগ্রাম অধিকার করেন। চট্টগ্রাম দখল করে তিনি অনেক বাঙালি বন্দিকে মুক্তি দেন। এরপর মগরা আর কখনো চট্টগ্রামে পা রাখতে সাহস করেনি।

কিন্তু যে সাদা হাতি নিয়ে এত যুদ্ধবিগ্রহ, সেই সাদা হাতির কি হলোÑ এ প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর মুঘল ইতিহাস আরাকানের সাদা হাতি নিয়ে একেবারে নিশ্চুপ। সেই সাদা হাতি হয়তো চিরদিনের জন্যই মুঘলদের অধরা থেকে গেল।
অলঙ্করণ : জাহান হাসান

jahan hassan ekush tube bangla desh জাহান হাসান, লস এঞ্জেলেস. বাংলাদেশ. বাংলা, আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর, একুশ, প্রবাস, প্রবাসী, ঠিকানা, ইউএসএ, আমেরিকা, অর্থনীতি, প্রেসিডেন্ট ওবামা,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র,

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s