তারুণ্যের ভয়াবহ অবক্ষয় : রাষ্ট্র কবে নাগরিকের অভিভাবক হবে?

তারুণ্যের ভয়াবহ অবক্ষয় : রাষ্ট্র কবে নাগরিকের অভিভাবক হবে?

তারুন্য

তারুন্য

মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় আর আইনশৃঙ্খলার ঘোরতর অবনতি যোগ হলে সামাজিক বিপর্যয় কতটা ভয়ঙ্কর এবং যাতনাদায়ক হতে পারে তা আর এখন চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর অবকাশ নেই। চারপাশে শক্তির নৃশংস ব্যবহার, নির্দয় অর্থের অন্বেষণ এবং প্রতিপত্তির দাপটে কোনো শৃঙ্খলই যেন আর টিকে থাকতে পারছে না। ফলে পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছে মনুষ্যত্ব, নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে মানুষের জানমাল-সম্ভ্রম। অবক্ষয়ের স্পর্ধা এতটাই বেড়েছে যে, মনে হচ্ছে মানবতা একটি পরিত্যক্ত বিষয়। বিবেকের কোনো দংশন নেই। প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মমতা এমনকি অপত্য স্নেহও যেন তার মূল্যমান হারাতে বসেছে। ইতিহাস জানাচ্ছে, কোনো সমাজে অবক্ষয় ব্যাপক আকার নিলে সেই সমাজ তারুণ্যের জাগরণের অপেক্ষায় থাকে; কিন্তু আমাদের সমাজ যেন তার বিপরীত। স্বাধীনতার পর প্রায় চার দশকে তারুণ্যের এক বড় অংশ ক্রমাগত বেপথু হয়েছে। তাদের সামনে তেমন কোনো আদর্শিক গন্তব্য দাঁড় করাতে পারেনি আমাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির কর্ণধাররা। ফলে দিনে দিনে ভুলের ঋণভার বৃদ্ধি পেয়েছে চক্রবৃদ্ধি হারে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যেন অবক্ষয়ের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সমাজের, গোটা দেশের।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এ কোন সমাজে বাস করছি আমরা? যেন কোথাও কোনো প্রতিরোধ নেই, মনুষ্যত্বের বিপর্যয়ে কোনো ক্রন্দন নেই, সম্ভ্রমহানিতে কোনো বিচলন নেই। তাহলে সমাজ কি অপশক্তির কাছে, রাষ্ট্রযন্ত্র কি রাজনৈতিক উল্লমম্ফনের কাছে, আইনশৃঙ্খলা কি অর্থ-প্রতিপত্তির কাছে পরাভূত, পরাহত? এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?

এসব জিজ্ঞাসা নতুন কিছু নয়। ক্রমাগত সামাজিক অযাচার ঘনীভূত হচ্ছেই। মানবধর্ম তো বটেই, বিভিন্ন ধর্মীয় মূল্যবোধও সেই অনাচার রুখতে পারছে না। এবার পবিত্র ঈদুল আজহার দিন এবং আগেপরে দেশে এমন কিছু পৈশাচিক ঘটনা ঘটেছে যা যে কোনো সভ্য মানুষকে অপারগতার লজ্জায় নিমজ্জিত করেছে। অবাক হওয়ার কোনোই কারণ নেই, এর প্রতিটি ঘটনার সংগঠক উঠতি বয়সী তরুণ এবং যুবক। তাহলে তাদের অভিভাবক কে বা কারা? বিস্তারিত ঘটনাপ্রবাহের তালিকার দরকার নেই, তিনটি মৃত্যুর ঘটনা আমাদের দুশ্চিন্তাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।

রাজধানীর সবুজবাগের বাসাবোতে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা মাদকসেবী সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন ঈদের দিন রাত ১০টায়। বাসাবোতে তার বাসার সামনে একদল যুবক মাদক সেবনের পাশাপাশি উচ্চৈঃস্বরে গান গাইছিল। ৭৩ বছর বয়স্ক সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা নৈতিক দায়বোধ থেকেই তাদের সেখান থেকে অন্যত্র চলে যেতে বলেছিলেন। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি। একপর্যায়ে মাদকসেবী যুবকরা তাকে মারধর করলে মাথায় আঘাত পেয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। এমনকি ব্যাংক কর্মকর্তার ছেলে বাবাকে নিতে এগিয়ে এলে তাকেও পেটায় সন্ত্রাসীরা। শুধু তাই নয়, অজ্ঞান অবস্থায় তাকে বাসায় নেয়ার পর সন্ত্রাসীরা বাসায় ঢুকে পরিবারের সদস্যদেরও মারধর করে। হামলাকারীরা এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তাই কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বিচারে তাদের কী শাস্তি হবে তা আমাদের জানা নেই। তবে আজীবন শৃঙ্খলার আবহে থাকা সত্তরোর্ধ্ব সচেতন বৃদ্ধ অভিভাবক নিজের অক্ষমতাকে অস্বীকার করে গেলেন জীবন দিয়ে। সমাজ, সরকার ও রাষ্ট্রকে তিনি জানিয়ে গেলেন—সাবধান হও, নইলে খুন হবে!

আরেক মর্মদাহী বিয়োগান্তক ঘটনা ঘটেছে একই দিন, ঈদের দিন। কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে নাতনিকে ইভটিজারদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে বখাটে যৌনসন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন বৃদ্ধ নানা। এই দিনমজুর নানা জীবনসায়াহ্নে এসে অভিভাবকত্বের দায় শোধ করলেন জীবন দিয়ে। গলা টিপে তাকে হত্যা করা হয়েছে। উত্ত্যক্ত মেয়েটির খালা ও নানীর সামনে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে গলাটিপে হত্যা করা হয়। খালা ও নানীকেও বেধড়ক পেটায় বখাটেরা। স্থানীয় লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করে। পুলিশ এক খুনি বখাটের মা-বাবাকে গ্রেফতার করেছে। সম্প্রতি ইভটিজিং বন্ধ করতে সরকার নতুন আইন জারি করেছে। কিছুদিন বখাটেদের কান ধরে ওঠবস করার তামাশায় কাজ না হওয়ায় ইভটিজারদের এক বছর কারাদণ্ড ও জরিমানার ব্যবস্থা করা হয় এই নয়া আইনে। কিন্তু আলোচ্য মৃত্যু প্রমাণ করল, গুরুপাপের লঘু দণ্ড কী ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনতে পারে। সমাজ ও রাষ্ট্র কি এবার অভিভাবকত্বের দায় নিয়ে অভিভাবকহীনতার এই শূন্যতা পূরণ করবে? ঈদের ৩ দিন আগে হাসপাতালে মারা গেছে ১৪ বছর বয়সী কিশোরী রূপা। গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল নবম শ্রেণীর ছাত্রীটি। ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে একটি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী রূপা গণধর্ষণের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারায়। হাসপাতালে সে মারা গেছে। এ ধরনের ঘটনাও তো এ সমাজে নতুন বা অভিনব কিছু নয়। রূপা এক অর্থে মরে বেঁচে গেছে। আর আমাদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে আসামির কাঠগড়ায়।

আলোচ্য তিনটি ঘটনা আমাদের অবক্ষয়ী সমাজের তিনটি নৃশংস পতনের মাত্রার নির্দেশক। সমাজ কতটা অক্ষম হয়ে পড়েছে, কতটা দায়শূন্যতার ব্যাধিতে পঙ্গু হয়ে পড়েছে তার সাক্ষীও বটে। এ ধরনের বিস্তর খুনখারাবি, সম্ভ্রমহানি, জঘন্যতম অপরাধ এখন প্রায় নৈমিত্তিক ঘটনা। যেন আলাদা স্বশাসিত এক রাজ্য বিস্তার করে বসেছে অপরাধীরা। এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠা তো খুব স্বাভাবিক এবং সঙ্গত যে, আইন কি আমাদের নামমাত্র রক্ষাকবজ! দেশে কি কোনো সরকার নেই! রাজনীতি কি শুধু ক্ষমতার মসনদকেই প্রদক্ষিণ করে! সমাজ কোথায় যাচ্ছে, কোন গাড্ডায় সেঁধে যাচ্ছে নতুন প্রজন্ম, কেন যাচ্ছে—এ নিয়ে কি মাথা ঘামানোর পরিবেশ-পরিস্থিতি এখনও সৃষ্টি হতে বাকি আছে? নেই। তাই রাষ্ট্রযন্ত্র তথা সরকারের কাছে আমাদের দাবি, কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করুন—একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র নাগরিকের জানমাল-সম্ভ্রমের সত্যিকার অভিভাবক।

jahan hassan ekush tube bangla desh জাহান হাসান লস এঞ্জেলেস বাংলাদেশ বাংলা আমাদের সময়, আলোচনা, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, জনকন্ঠ, ডেসটিনি, দিগন্ত, দিনের শেষে, নয়া দিগন্ত, প্রথম আলো, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ভোরের কাগজ, মানবজমিন, মুক্তমঞ্চ, যায় যায় দিন, যায়যায়দিন, যুগান্তর, সংগ্রাম, সংবাদ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাত, রাজাকার, আল বদর একুশ

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to তারুণ্যের ভয়াবহ অবক্ষয় : রাষ্ট্র কবে নাগরিকের অভিভাবক হবে?

  1. Sujit Mustafa says:

    লেখাটা পড়ে কষ্ট পেয়েছি। ঘটনাগুলোতো জানতামই। আমি মনে করি শুধু পত্র পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে নয়, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অনুপ্রাণিত করতে হবে সকল সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে প্রেসার গ্রুপ হিশেবে কাজ করতে। শুধুমাত্র একটা বয়ান দিয়ে দায়িত্ব শেষ না করে আমাদের উচিৎ আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে দ্রুত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হলো কিনা সেটা মনিটর করা এবং নিশ্চিত করা। কোঅরডিনেশনে কোন একটি সংস্থাকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। আপনার লেখাটির জন্য ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s