’৭২-এর ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে এম এ জলিলের রাজনীতিতে পদার্পণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

মেজর জলিল আধিপত্যবাদবিরোধী এক সংগ্রামী চেতনা

১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলার উজিরপুর থানা সদরে মামার বাড়িতে মেজর জলিলের জন্ম। এর তিন মাস আগেই পিতা জনাব আলী মারা যান।

শুরু থেকে তিনি জীবনের কঠোরতার মুখোমুখি হন। মায়ের স্নেহ-ভালোবাসাই ছিল তার একমাত্র পাথেয়। ১৯৬০ সালে মেজর জলিল উজিরপুর ডব্লিউবি ইনস্টিটিউশন থেকে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন। ওই সময় তিনি পথের কাঙাল ও রীতি নামে দু’টি উপন্যাস লেখেন। তবে পাণ্ডুলিপি দু’টি হারিয়ে যায়।

১৯৬১ সালে জলিল ইয়াং ক্যাডেটে ভর্তি হন। পাকিস্তানের মারিতে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে কাকুলে সামরিক একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কমিশন লাভ করেন এবং আর্টিলারিতে যোগ দেন। ওই বছর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ১২ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে মেজর জলিল সামরিক একাডেমি থেকে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করেন। পরে তিনি মুলতান থেকে ইতিহাসে এমএ ডিগ্রি নেন। অসুস্থ মাকে দেখতে এক মাসের ছুটি নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি দেশে আসেন।

২৫ মার্চের কালরাত পাকিস্তানের চেহারাটাই পাল্টে দেয়। ২৬ মার্চ থেকেই মেজর জলিল মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত বরিশাল ও পটুয়াখালীকে তিনি মুক্ত অঞ্চল হিসেবে রাখতে সক্ষম হন। ৭ এপ্রিল মেজর জলিল খুলনা রেডিও স্টেশন মুক্ত করতে অপারেশন চালান। ২১ এপ্রিল অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সুন্দরবনের পথ ধরে ভারতে যান। ফিরে এসে ৯ নম্বর সেক্টরের প্রধান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮ ডিসেম্বর বরিশালে মেজর জলিলকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। ২১ ডিসেম্বর বরিশাল হেমায়েত উদ্দীন খেলার মাঠে বিশাল জনসভায় তিনি ভাষণ দেন। এই দু’টি জনসভায় অভূতপূর্ব লোক সমাগম হয়েছিল।

স্বাধীনতার পরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সম্পদ ও পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র লুটপাট করে নিয়ে যেতে থাকে। যশোরে লুটের মাল বয়ে নেয়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাড়িবহরকে বাধা দেয়ায় ৩১ ডিসেম্বর মেজর জলিলকে গ্রেফতার এবং যশোর সেনানিবাস অফিসার্স কোয়ার্টারের একটি নির্জন বাড়িতে তাকে আটকে রাখা হয়। তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ

১৯৭২ সালের ৭ জুলাই মেজর জলিল মুক্তি লাভ করেন। সেক্টর কমান্ডারদের প্রায় সবাইকেই খেতাব দেয়া হলেও তাকে বঞ্চিত করা হয়। ’৭২-এর ৩১ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে এম এ জলিলের রাজনীতিতে পদার্পণ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

১৯৭৩ সালে সংসদ নির্বাচনে বরিশালের বাকেরগঞ্জ-উজিরপুরসহ পাঁচটি আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে তার বিজয় ছিল নিশ্চিত। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ তাকে বিজয়ী হতে দেয়নি। বলা যায়, রাজনীতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন মেজর জলিল। ১৯৭৪ সালের ১৭ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও কর্মসূচিতে পুলিশ গুলি করলে জাসদের বহু নেতাকর্মী নিহত হন। মেজর জলিল নিজেও হন আহত। তাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। ২৩ নভেম্বর তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। সামরিক ট্রাইবুøনালে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের ফাঁসি হয়। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য মেজর জলিলের মৃতুøদণ্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। প্রায় সাড়ে চার বছর কারাভোগের পর ১৯৮০ সালের ২৬ মার্চ তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৮২ সালের আগস্ট মাসে তিনি টাঙ্গাইলের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের কন্যা সায়মা আকতারকে বিয়ে করেন। তাদের দুই কন্যা সারাহ ও ফারাহ।

১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর তিনি জাসদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তার কৈফিয়ত ও কিছুকথা গ্রন্থে লিখেছেনঃ ‘দলীয় জীবনে জাসদের নেতাকর্মীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিসর্জন দেয়ার ফলে নৈতিকতা এবং মূল্যবোধে পরিচালিত সমাজদেহ থেকে নিজেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও সমাজে বসবাসরত জনগণকে ঐতিহ্যবাহী ইসলামি সাংস্কৃতিক জীবন এবং মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে মোটেও সক্ষম হয়নি। প্রচলিত পারিবারিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনধারা থেকে কেবল নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে রাখলেই বিকল্প সংস্কৃতি জন্ম নেয় না, বরং এ ধরনের রণকৌশল অবলম্বন সমাজে প্রচলিত নীতি, নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি তাচ্ছিল্য, উপহাস ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, যা প্রকারান্তরে বিপ্লবী আন্দোলনের বিপক্ষে চলে যায়।

‘ইসলাম ধর্ম এ দেশের শতকরা ৯০ জন গণমানুষের কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসই নয়, ইসলাম ধর্মভিত্তিক নীতি-নৈতিকতা, আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব-পর্ব, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং এ দেশের সাধারণ গণমানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনার সাথে ইসলাম ধর্ম অঙ্গাঙ্গিভাবেই জড়িত। জন্ম-পর্ব থেকে শুরু করে জানাজা পর্যন্ত ইসলামের নীতি-নির্দেশের আওতায় নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন। এমন একটি জীবন দর্শনকে অবহেলা, উপেক্ষা কিংবা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে চলার নীতিকে বাস্তবসম্মত কিংবা বিজ্ঞানসম্মত বলা যায় না। প্রগতিশীল আন্দোলনের স্বার্থেই ইসলাম ধর্মের বিজ্ঞানসম্মত মূল্যায়ন অত্যাবশ্যকীয় বলে আমি মনে করি। কারণ ইসলাম শোষণ-জুলুম, অন্যায়, অসুন্দরসহ সব রকম স্বৈরশাসন এবং মানুষের ওপর প্রভুত্বের ঘোর বিরোধী। ইসলাম পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, রাজতন্ত্র উচ্ছেদের নির্দেশ দেয়। সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা ইসলামে নিষিদ্ধ, কারণ সব সম্পদের মালিকানা একমাত্র আল্লাহরই। মানুষ হচ্ছে তার কেবল প্রয়োজন মেটানোর জন্য আমানতদার বা কেয়ারটেকার।’

মেজর জলিল এমন কিছু গ্রন্থ লিখে গেছেন, যা আমাদের জাতীয় জীবনের সন্ধিক্ষণে দিকনির্দেশনার কাজ করবে। তার একটি গ্রন্থের নাম অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা দেশপ্রেমের বলিষ্ঠ ও উচ্চকিত স্লোগানে রূপান্তরিত হয়েছে। তার লেখা আটটি গ্রন্থ হলোঃ ১. সীমাহীন সমর (মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ডায়রি), ২. মার্কসবাদ (প্রবন্ধ), ৩. সূর্যোদয় (রাজনৈতিক উপন্যাস), ৪. কৈফিয়ত ও কিছু কথা (প্রবন্ধ), ৫. দাবী আন্দোলন দায়িত্ব (প্রবন্ধ), ৬. দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন দর্শন (প্রবন্ধ), ৭. অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (প্রবন্ধ), ৮. A Search for Identity (Essays)..
জাসদ থেকে পদত্যাগের মাত্র ১৬ দিন পর মেজর জলিল ‘জাতীয় মুক্তি আন্দোলন’ নামে একটি দল গঠন করেন। এ সময় তিনি মরহুম হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে ‘সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে গৃহবন্দী করা হয়। এক মাস ছিলেন বন্দী। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে ১৯৮৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকার তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রাখে। এর আগে মেজর জলিল লিবিয়া, লেবানন, ইরান, ব্রিটেন ও পাকিস্তানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ইসলামি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৮৮ সালের ১১ নভেম্বর মেজর জলিল পাকিস্তান যান। ১৬ নভেম্বর রাজধানী ইসলামাবাদে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সাথে সাথে তাকে ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। ১৯ নভেম্বর রাত সাড়ে ১০টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ২২ নভেম্বর তার লাশ ঢাকায় আনা হয়। পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেজর জলিলের লাশ দাফনের মাধ্যমে মিরপুরের মুক্তিযোদ্ধা গোরস্থানে লাশ দাফন শুরু হয়েছে। তিনি মা, স্ত্রী ও দুই কন্যা রেখে গেছেন।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s