তারা কোথায় যায়? দরকার স্বপ্ন দেখা ও দেখানোর মতো বাতিওয়ালা-স্বপ্নের জাদুকর

তারা কোথায় যায়?
ফসীহ বণিক

নদী ভাঙন

নদী ভাঙন

নদী টেনে নেয় যাদের জমি-জিরেত, বাড়িঘর এবং আশার শেষ বাতিঘর তারা কী নিয়ে বেঁচে থাকে আর তাদের ঠাঁইবা হয় কোথায়? কেউ রাজধানীর সিগন্যাল স্টপে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির কাচের আব্রুর রঙিন চশমায় উঁকি দিয়ে হাত পেতে থাকা কোনো অভাগীর করুণ চাহনিতে এর উত্তর খোঁজেন। আর কেউবা রেললাইনের ধারে কোনো মস্তানের গড়ে তোলা ও তোলা জায়গিরে আঁতিপাঁতি করে খোঁজেন ছিন্ন পাতার শতদল একসাথ করার মতো করে; মুখে শোনা বয়ানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন আর ভাবেন, আমি যারে খুঁজি এই কি সেই? এসব হতভাগা-হতভাগিনীর কারো কারো ঠাঁই যে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে হয় তার একটা হিসাব তো পূর্ব ইউরোপে কমিউনিস্ট জুজু বুড়ি বিদায় নেওয়ার পর পশ্চিম ইউরোপ-আমেরিকার ব্রোথেলগুলো এবং ভবঘুরেদের রগরগে কাহিনীর মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে কেউ একজন শান্তা যদি শেষ পর্যন্ত নর্দমা ফুঁড়ে বেরিয়ে আলো ছড়ান, তখন আমরা সভ্য মানুষরা নিজেদের লাজলজ্জা ঝেড়ে ফেলে অর্থ-মোক্ষ লাভের নেশায় তার শরণাগত হতে দ্বিধা করি না। এই দুনিয়ায় ‘সারভাইবাল ফর দি ফিটেস্ট’ আপ্তবাক্যকেই আমরা প্রায় সবাই জীবনের সার করে নিয়েছি কি-না! তা না হলে আমাদের ফি বছর নদীভাঙনের শিকার হাজার হাজার আশ্রয়হীন মানুষের জন্য আমরা এখনও দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারিনি কেন?

আমরাই তো বিভিন্ন উপলক্ষে নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ দিই। দেশটি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থান হওয়ার পরও কীভাবে নিত্য ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনকে মোকাবেলা করে সোনার দেশে পরিণত হয়েছে, তার ইতিহাস তো এখন ওয়েভ এবং স্যাটেলাইটের কল্যাণে তামাম দুনিয়ার মানুষের দৃষ্টি ও শ্রবণসীমার মধ্যেই। কীভাবে তারা ইয়া বড় বড় কংক্রিটের বাঁধ দিয়ে সমুদ্র-নদীকে বশ করেছে তা কিন্তু আরব্য রজনীর গল্পের চেয়ে কোনো অংশে কম শিহরণ জাগানিয়া নয়। হাজার হাজার বছর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাঁধ দেওয়া ও পানি আসা-যাওয়ার পথ তৈরি করে ভূমিকে সমুদ্র-নদীগর্ভ থেকে তুলে নিজেদের ভবিষ্যৎ সবধরনের নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করেছেন। মানুষ অসাধ্যকে সাধন করতে পারে বলেই সে আধুনিক সভ্যতার তকমা গায়ে জড়াতে পেরেছে। এই সভ্যতার দানকে গ্রহণ করে আধুনিক নেদারল্যান্ডস তাদের দেশের সীমানাকেও অনেক দূর বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। আর আমরা ফি বছর নদীভাঙনকে রোধ করতে পারি না। এ যেন ‘তোমাতে-আমাতে চোখের দেখা, তবুও যোজন যোজন দূর’_ কবিতার চরণের মতো। তারা যা পারে আমরা তা পারি না। কেউ কেউ যেমনটা বলেন, এটা কি আমাদের জনগণের বাঙালিসুলভ আলস্য বাতিকের ফলশ্রুতি! তাহলে এই জাতি ফেব্রুয়ারিতে, মার্চে সঙ্গিনের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল কী করে সামনাসামনি? এই জাতি দিকদিশা পেলে সমুদ্র মন্থন করে অমৃতও তুলে আনতে পারে। সাহস, বীর্য কোনোটারই অভাব নেই। একটু যা অপরের কাসুন্দি ঘাঁটতে ভালোবাসি আমরা, এই যা।

আমরাও পারি। তবে এজন্য দরকার স্বপ্ন দেখা ও দেখানোর মতো বাতিওয়ালা-স্বপ্নের জাদুকর। যিনি আমাদের তার শৌর্য-বীর্য, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, লোভ-লালসাহীন-নির্মোহতা গুণে সংকীর্ণতাকে ভুলিয়ে সবাইকে এক দেহ এক মন-প্রাণ করে নেবেন। কিন্তু কবে দেখা মিলবে তেমন ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের? সেই পর্যন্ত কি একটি জাতি নিশ্চেষ্ট থাকতে পারে?

যারা সরকারে থাকেন এবং যাদের ওপর উন্নয়ন পরিকল্পনার ভার ন্যস্ত তারা কি তাদের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একটা সামান্য অংশ এসব নদীভাঙনের শিকার হতভাগ্যদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় নিয়োজিত করতে পারেন না?
আটপৌরে গৃহস্থ বাড়ি পদ্মায় টেনে নেওয়ার মাঝে যে সুদীর্ঘকালের মানব বসতির হাসি-কান্না, জীবনের চালচিত্রের ইতিহাস বুকফাটা আর্তনাদ হয়ে নদীর ঢেউয়ে আছড়ে পড়ে, তার মূল্য কি কোনো অংশে কম! এসব আমাদের কর্তাব্যক্তিদের হৃদয় কন্দরে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করে কি?

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s