ইভ টিজিং বন্ধে চাই মুগুর নীতি

ইভ টিজিং বন্ধে চাই মুগুর নীতি

ওয়ালি-উর রহমান

ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে সরকার শেষ পর্যন্ত যুৎসই অস্ত্রই বেছে নিয়েছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে চালু হয়েছে মোবাইল আদালত। যারা ইভ টিজারদের ১ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদন্ডের নির্দেশ দিতে পারবেন। সঙ্গে থাকতে পারে জরিমানা। অনাদায়ে কারাদণ্ড। পাশাপাশি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের সাজা সম্বলিত নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতি চলছে। আমাদের এই জংলি সমাজে ইভ টিজিং চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের সমাজপতিরা তা সহ্য করে আসছে অবলীলাক্রমে। ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে প্রতিবছর প্রাণ হারাচ্ছে এমন নারীর সংখ্যা কম নয়। সমাজ নেতাদের কাছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ইভ টিজারদের বদলে নির্যাতনের শিকার নারীদের নিগৃহীত হয়েছে। তাদের কেউ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। পড়াশুনা বন্ধ, ইভ টিজিংয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাল্যবিয়ের শিকার হওয়ার ঘটনা তো অসংখ্য। নাটোরে ইভ টিজারের হাতে কলেজ শিক্ষক মিজানের হত্যাকাণ্ড এ প্রসঙ্গটিকে সামনে এনেছে। সংবাদ মাধ্যমেও এটি খবর হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। ফরিদপুরের মধুখালিতে ইভ টিজারদের হাতে এক স্কুল ছাত্রীর জননীর প্রাণ হারানোর ঘটনা জনমতকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

এ কথা ঠিক দুনিয়ার সব দেশেই ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটে। তবে আমাদের দেশে ইভ টিজিংয়ের নামে যা হয় তা আসলে যৌন নির্যাতন। নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও কম নয়। যৌন হয়রানি নামের এই ক্যান্সারের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে ইভ টিজার নামের ইতর জীবদের বিরুদ্ধে সব মানুষের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মহাজোট সরকার ইভ টিজারদের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালাচ্ছে। এটি একটি প্রশংসনীয় দিক। তবে শুধু মোবাইল কোর্ট দিয়ে কাজ হবে না। প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও মাঠে নামাতে হবে। কারা স্কুল কলেজগামী ছাত্রী এবং কর্মজীবী নারীদের যাতায়াতের পথে উত্ত্যক্ত করে তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে যারা ইভ টিজিংয়ে যুক্ত তারা সুস্থ সমাজের বাসিন্দা নয়। তারা একই সঙ্গে নানা অপরাধেও জড়িত। আর এদের সংবদ্ধতার শুরু ইভ টিজিংকে কেন্দ্র করে।

ইভ টিজিং আইলার মতো আমাদের সমাজ দেহকে তছনছ করে দিচ্ছে। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে একেকটা সাজানো পরিবারকে। তাদের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার কিশোরী স্কুল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। নারী শিক্ষার পেছনে সরকার শত শত কোটি টাকা ব্যয় করলেও তা ব্যর্থ করে দিচ্ছে বখাটে নামের জানোয়াররা।

আমাদের দেশে প্রতিটি অঘটনের পর হৈ চৈ ওঠে। অপরাধের প্রতিকারের তাগিদ সৃষ্টি হয়। তারপর কিছুটা থিতিয়ে গেলেই উবে যায় দায়বোধ। আশার কথা সরকার ইভ টিজিংয়ের বিনাশ সাধনকে তাদের কর্তব্য বলে বেছে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন_ ইভ টিজিংয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেছেন_ মেয়েদের হয়রানি রোধে আইনের যেমন প্রয়োজন, তেমনিভাবে পারিবারিকভাবে অনুশাসন নিশ্চিত করা দরকার। সামাজিক আন্দোলনও জোরদার করতে হবে। এর আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন উত্ত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে আইন আরও কঠোর হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ইভ টিজারদের সামজিকভাবে প্রতিহত করতে ইভ টিজিং সচেতনতা বিষয়টি পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

ইভ টিজিং রোধে আইন ও সালিস কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ড. হামিদা হোসেন, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানমও শক্ত ভূমিকা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন। ইভ টিজিং রোধে সামাজিক আন্দোলন ও আইনের প্রয়োগ প্রসঙ্গে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ইতোমধ্যে ১০ দফা প্রস্তাব রেখেছেন। আমি তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করছি। ইভ টিজিং বন্ধে একটি জাতীয় নীতি ও গাইড লাইন প্রণয়নের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছে জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। তারা একই সঙ্গে ইভ টিজিং রোধে প্রতি পাড়া-মহল্লায় দুই মাসের মধ্যে প্রতিরোধ কমিটি গঠনে সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন রেখেছে।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী কোনো নারীর শালীনতার অমর্যাদা অভিপ্রায়ে কোনো মন্তব্য, অঙ্গভঙ্গি বা কোনো কাজ করা হলে সেজন্য এক বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশের ৭৮ ধারায়ও এক বছরের শাস্তির বিধান রয়েছে। এছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে বিশেষ আইনে কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ আছে যা যথেষ্ট নয়। এই যৌন হয়রানির প্রবণতা দিন দিন এতটাই বাড়ছে যে সেটা সামাজিক ব্যাধি ক্যান্সারের মতো সন্ত্রাসে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় প্রচলিত আইনে যে শাস্তির বিধান আছে তা যথেষ্ট নয়। শাস্তির মেয়াদ বাড়াতে হবে। এটা নিয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আইন করতে হবে। রিট আবেদনে বলা হয়েছে আইন করে ইভ টিজিং বন্ধ করা যাবে না। তাই এর বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।

দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারায় ইভ টিজিংয়ের সংজ্ঞা ও শাস্তির সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ আছে। রিট আবেদনে ইভ টিজিংয়ের সংজ্ঞা ও শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারার সংশোধনে আইন কমিশনের সুপারিশ তুলে ধরে বলা হয়েছে কোনো মহিলাকে উত্ত্যক্ত করার শাস্তির মেয়াদ সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ৭ বছর করতে হবে। সেই সঙ্গে আমি বলব যে, এই যৌন হয়রানিতে আক্রান্ত হয়ে যারা আত্মহুতি দিবে বা আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবে সেই হত্যায় প্ররোচিতকারীর শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হোক। যেহেতু আত্মহত্যায় প্ররোচিতকারী হত্যাকারীর সমান। সেই সঙ্গে আরো বলব বখাটের, উত্ত্যক্তকারীর মা বাবাকেও এই আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়ার বিধান করা হোক।

এ লেখাটি যখন লিখছি বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি প্রতিবেদনের দিকে দৃষ্টি গেল। তাতে বলা হয়েছে ইভ টিজিং বন্ধে কঠোর শাস্তির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ইভ টিজিংকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত ও সুস্পষ্ট করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে এ আইনের ১০ ধারার পর যে (ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে ইভ টিজিং ‘যৌন হয়রানিমূলক অপরাধ’ বলে গণ্য হবে এবং এ জন্য সর্বোচ্চ সাত বছর শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে দেশে স্কুল ও কলেজগামী ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় তা বন্ধের জন্য গত ১৭ জুলাই মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আইন সংশোধনের কথা বলা হয়। এ জন্য মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করে। গত ১১ নভেম্বর মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় প্রস্তাবিত সংশোধনীটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন প্রস্তাবিত এ সংশোধনীর বিষয়ে সংস্থাপন, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, অর্থ, সমাজকল্যাণ, ধর্ম, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, তথ্য এবং আইন মন্ত্রণালয়কে আগামী ২৪ নভেম্বরের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে। এরপর এটি মন্ত্রিসভার নীতিগত সম্মতির জন্য পাঠানো হবে। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে এ সম্পর্কিত বিল উত্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের প্রস্তাবিত এ সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায়-ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো নারী বা শিশুর পথরোধ করে অথবা অশালীন কোনো মন্তব্য বা শব্দ করে অথবা অশোভন অঙ্গভঙ্গি বা বস্তু বা চিত্র বা সাংকেতিক চিহ্ন বা চিহ্ন প্রদর্শন করে অথবা ইন্টারনেট বা টেলিফোন বা সেলফোন বা এসএমএস বা অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে আলোকচিত্র গ্রহণের মাধ্যমে নারী বা শিশুকে উত্ত্যক্ত করে বা অপমান করে বা বিরক্ত করে শালীনতার অমর্যাদা ঘটায় বা উক্ত নারী বা শিশু দেখতে বা শুনতে পায় তা যৌন হয়রানিমূলক অপরাধ বলে গণ্য হবে। এ জন্য ওই ব্যক্তি অনধিক ৭ ও অনূ্যন ১ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’

বর্তমানে বলবৎ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় অবৈধ যৌনকর্মের জন্য তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এতে বলা আছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে তার যৌন কামনা চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে তার শরীরের যে কোনো অঙ্গ বা কোনো বস্তু দ্বারা কোনো নারী বা শিশুর যৌন অঙ্গ বা অন্য কোনো অঙ্গ স্পর্শ করেন বা কোনো নারীর শ্লীলতাহানি করেন তাহলে তার এই কাজ হবে যৌন পীড়ন এবং তজ্জন্য উক্ত ব্যক্তি অনধিক দশ বৎসর কিন্তু অনূ্যন তিন বৎসর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন।’

আমি মনে করি ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানি বন্ধে যেমন কুকুর তেমন মুগুর নীতি অবলম্বনের কোনো বিকল্প নেই। কড়াকড়ি আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি ইভ টিজিংয়ের সঙ্গে জড়িতরা কখনো যাতে সরকারি চাকরি এবং নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ না পায় তেমন আইনি বিধান প্রণয়নের বিষয়টিও ভাবা যেতে পারে।

লেখক : কূটনীতিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদীর বিশ্লেষক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s