টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই : বিটিভি সরকারের নেতা মন্ত্রীদের দেখায়। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো তাদের মালিক এবং বউ বাচ্চাদের দেখায়।

টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই
মহিউদ্দিন আহমদ

বাংলা টিভি

বাংলা টিভি

জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন উপলৰে তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেল হুমায়ূন আহমেদের কাহিনী ও পরিচালনায় ‘নন্দিত নরকে’ পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিটি দেখতে আজ শনিবার সকাল থেকে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’ মোতাবেক ছবিটি শুরু হওয়ার কথা ছিল দুপুর ১টা ০৫ মিনিটের দিকে। তখন থেকেই শুরম্ন হয় বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্য। একটানা চলল এই নির্যাতন ৩০ মিনিটের মতো। ছবিটি ‘নন্দিত নরকে’ নয়, ‘আমার আছে জল’_ শুরু হলো ১টা ৩৫-এর দিকে। তাও ভাবলাম, ঠিক আছে, হুমায়ূন আহমেদেরই ছবি তো, কিন্তু চলল ১টা ৫০ পর্যন্ত। তারপর আবার পুরো ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন নির্যাতন। ২টায় শুরু হলো দুপুরের খবর। চলল ২টা ৩০ পর্যন্ত। তারপর শুরু হলো বিটিভির খবরের পুনর্প্রচার। কয়েক মাস ধরেই বিটিভির খবরের নামে এই অত্যাচার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর উপর। দেশে বিটিভিরই একমাত্র ‘টেরিস্ট্রিয়াল’, সম্প্রচার। শুরু থেকে একুশে টিভিরও এই সুবিধা ছিল। কিন্তু জামায়াত-জাতীয়তাবাদী জোট ২০০১-এর অক্টোবরে ক্ষমতায় এসে কয়েক মাসের মধ্যেই পুরো একুশে টেলিভিশনটাকেই বন্ধ করে দিল। বিএনপি-জামায়াতের পতনের পর কয়েক বছর আগে ‘একুশে’ টিভি যখন আবার পুনপ্রচার শুরু করল, তখন তার ‘টেরিস্ট্রিয়াল’ সুবিধাটুকু ‘একুশে’কে আর দেয়া হলো না। সুতরাং বিটিভিরই ‘টেরিস্ট্রিয়াল’ সম্প্রচারের একচেটিয়া অধিকার, মানে মনোপলি। তারপর কয়েক বছর ধরে বিটিভির ‘বিটিভি ওয়ার্ল্ড’ নামের আর একটি চ্যানেলে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে আসছে। তারপরও বিটিভির খবর প্রাইভেট চ্যানেলগুলোতে প্রচার করতে হবে কেন, তার কোন ব্যাখ্যা নেই। গ্রামেগঞ্জে যেখানেই বিদু্যত সংযোগ আছে, সেখানেই বিটিভির অনুষ্ঠানমালা দেখা যায়। তাহলে আরও বারো চৌদ্দটি প্রাইভেট চ্যানেলে বিটিভির এই খবর আবার দেখাতে হবে কেন? মানুষজনকে এই ‘খাদ্যটি’ খেতে বাধ্য করা হচ্ছে কেন?

প্রাইভেট চ্যানেলগুলোর বিজ্ঞাপনগুলোর সঙ্গে যখন বিটিভির এই ‘নিউজ বুলেটিন’ও প্রচার করতে হয়, তখন দর্শকদের ওপর নির্যাতনের মাত্রাটা আরও বাড়ে। যেমন দেখলাম আজ শনিবার। বিটিভির আরোপিত দুপুরের খবর চলল এই প্রাইভেট চ্যানেলটিতে অপরাহ্ন ৩টা পর্যনত্ম। তারপর আবার এই প্রাইভেট চ্যানেলটির নিয়মিত প্রতিদিনের ‘শীর্ষ খবর’। পাঁচ মিনিটের শীর্ষ খবর শেষে হুমায়ূন আহমেদের ছবিটি আবার শুরম্ন হলো ৩টা ০৫ মিনিটে। মানে, পুরো একঘণ্টা পনেরো মিনিট পর। তারপর প্রায় প্রতি ১০ মিনিট পর পর ১০ মিনিটের বিজ্ঞাপন যন্ত্রণা। ছবিটি শেষ হলো বিকাল ৫টায়। মানে পৌনে দু’ঘণ্টা, দু’ঘণ্টার ছবি দেখতে লাগল পুরো চারটি ঘণ্টা! নাগরিক জীবনের এতসব যন্ত্রণা, বিদু্যতের যন্ত্রণা, পানি গ্যাসে যন্ত্রণা, যানজটের যন্ত্রণা; এখন টিভি চ্যানেলগুলোর যন্ত্রণা। ঈদের দিন এবং তার আগে পরের কয়েকদিন এই যন্ত্রণার কোন সীমা পরিসীমা থাকবে না।

॥ দুই ॥
গত রোজার ঈদের অনুষ্ঠানমালায় টিভি চ্যানেলগুলো দর্শকদের ওপর কেমন বিজ্ঞাপন যন্ত্রণা চালিয়েছিল তার একটি নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের এক সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান। গত ৮ নবেম্বর সোমবার দৈনিক ‘সমকাল’-এ “কৌন্ বনেগা ক্রোড়পতি” শিরোনামের লেখাটির কয়েকটি লাইন এমন : “গত ঈদে আমি একটি নাটক দেখতে বসেছিলাম। নাটক দেখছিলাম, সে সঙ্গে প্রায় ১০ মিনিট পর পর বিজ্ঞাপনও দেখছিলাম। এক পর্যায়ে দেখা গেল, নাটকের যে মূল চরিত্র বা নায়ক একটা ভয়ঙ্কর অবস্থায় পতিত হয়ে সেখান থেকে নিজেকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নাটকটির এই পর্যায়ে এমন টানটান উত্তেজনা যখন অনুভব করছিলাম তখনই পর্দায় একটি লেখা ভেসে উঠল, বিজ্ঞাপন ও রাতের সংবাদের পর নাটকের বাকি অংশ দেখতে পাবেন। এর মানে আরও ৫০ মিনিট পর নাটকের বাকি ১০ মিনিট। আর দেখার ধৈর্য হলো না।” মুসত্মাফিজুর রহমান সাহেব গত ঈদের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন উপরে উদ্ধৃত কয়েকটি লাইনে। আর আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা কোরবানির ঈদের ৪ দিন আগের। টিভি চ্যানেলগুলোতে ঈদের দিনগুলোতে বিজ্ঞাপন যন্ত্রণার ওপর ঈদের কয়েকদিন পর তখন এই দৈনিক জনকণ্ঠেও একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

দেখা যাচ্ছে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো ঈদ এবং বিশেষ দিনগুলোতে তাদের অত্যাচারের মাত্রাটা বাড়িয়ে দেয়। অত্যাচার নির্যাতন বাড়িয়ে দেয় জনপ্রিয় অন্যসব অনুষ্ঠানেও। যেমন আজ দেখলাম হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার আছে বলে’ ‘ফিচার’ ছবিটির প্রচারের সময়।

বিজ্ঞাপন ছাড়া টিভি চ্যানেলগুলো চালানো যাবে না, এই কথাটি দেশের প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ, মানে পাগল ও শিশু ছাড়া আর সকলেই জানে। বিজ্ঞাপনের টাকা ছাড়া টিভি চ্যানেলের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনভাতা, প্রাইভেট প্রোডাকশন কোম্পানিগুলো থেকে নাটক সিরিয়াল, গান বাজনার অনুষ্ঠান ক্রয়, কিছুই সম্ভব নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতি ঘণ্টায় কত মিনিট বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দ থাকবে? বিজ্ঞাপনের এমন আধিক্যের কারণে একটি নীতিমালা এখন জরম্নরী হয়ে পড়েছে। নাটক অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন? নাকি বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক অনুষ্ঠান প্রচারিত হবে, তা দর্শকদের জানা দরকার। এই তথ্যটি দর্শকদের জানার অধিকার রয়েছে।

আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো মানুষজনের বিভিন্ন অধিকারের প্রশ্নে যথার্থভাবেই সরব এবং সক্রিয়। কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলোই যখন মানুষজনের অর্থাৎ দর্শকদের অধিকারে হামলা করছে, সেখানে এই ৰতিগ্রসত্ম মানুষগুলোর প্রতিকার কোথায় পাওয়া যাবে?
এই প্রতিকারটি আমাদের সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়টি দিতে পারে। প্রতি ঘণ্টার অনুষ্ঠানে কত মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচার করা যাবে তথ্য মন্ত্রণালয় তা ঠিক করে দিতে পারে। অথবা প্রতিটি চ্যানেল এককভাবে তার নিজের অনুসরণের জন্য, অথবা সব প্রাইভেট টিভি চ্যানেল, সকল চ্যানেলের জন্য প্রযোজ্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে। কোন চ্যানেল এই নীতিমালা লঙ্ঘন করলে, লঙ্ঘনকারী সেই চ্যানেলের বিরম্নদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও থাকতে হবে এই নীতিমালায়। দুনিয়ার সকল উন্নত দেশেই অনুষ্ঠান প্রচারের সময় এবং তার ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় নির্ধারণ করা আছে। অনেক উন্নয়নশীল দেশেও তার প্রচলন শুরম্ন হয়েছে।

তথ্য অধিকার আদায়ে এবং রৰায় আমাদের গণমাধ্যমগুলোর সাথে যে কোন গণতন্ত্রমনা মানুষ একাত্মতা প্রকাশ করবে। কিন্তু কত ঘণ্টার টিভি প্রোগ্রামে কত সময় বিজ্ঞাপনের জন্য নির্ধারিত থাকবে, এই তথ্যটা জানাও শ্রোতা-দর্শকদের অধিকার।

॥ তিন ॥
দর্শকদের পছন্দ অপছন্দের তোয়াক্কা করছে না আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো। তাইতো চ্যানেল মালিকরা দর্শকদের অনুভূতিগুলোর প্রতি এমন অবজ্ঞা দেখাতে পারে। টিভি চ্যানেলগুলোর মালিকরা তাদের এই চ্যানেলগুলোতে বিশাল পরিমাণের পুঁজি বিনিয়োগ করেছেন। সুতরাং তারা লাভ করবেন তা প্রত্যাশিত। কিন্তু বিজ্ঞাপনের এত আধিক্যের কারণে আবার কী, তারা লুণ্ঠনের মানসিকতাতেই বেশি তাড়িত হচ্ছেন। নিউজ বুলেটিনগুলোর বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতার ব্র্যান্ড প্রচারিত হচ্ছে এখন। মাত্র আধঘণ্টার একটি বুলেটিনে এখন আরও আটটি বিজ্ঞাপনও দেখা যাচ্ছে। পুরনো চ্যানেল একটির এক মালিক নাকি খবর পাঠকদের সু্যট, পাঞ্জাবিতে এবং খবর পাঠিকাদের বাড়িতেও বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানির ‘লোগো’ লাগাতে চাইছেন। ক্রিকেট খেলোয়াড়দের আমরা এখন যেমন দেখি।

একদিকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপনের বাজারটি বড় নয়। এই বাজারটিতে ভাগ আছে প্রিন্ট মিডিয়া, রেডিও এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার। পত্রপত্রিকার সংখ্যা বাড়ছে। এখন এক ঢাকা শহর থেকেই ২০১টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। এই তথ্যটি পাওয়া যাবে আমাদের চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের ২০০৮-এর বার্ষিক সাময়িকী প্রতিবেদনে। পত্রিকার সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে এফএম রেডিও এবং টিভি চ্যানেলের সংখ্যাও। একজন সাধারণ দর্শকও তাহলে একটি অতি সাধারণ প্রশ্ন করতে পারে, বিজ্ঞাপনের বাজার এত সীমিত জেনেও প্রাইভেট সেক্টরের কিছু লোক পত্রপত্রিকা প্রকাশে এবং টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স যোগাড়ে এত আগ্রহী, এত মরিয়া কেন?

এই দেশের মানুষ দেখতে পাচ্ছে, গণমাধ্যমের মালিক হওয়ার পর অন্যান্য ৰেত্রেও ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটছে। কেউ কেউ অবশ্য পয়সাওয়ালা হওয়ার আগেই পত্রিকার মালিক ছিলেন। কিন্তু দুটো পুরনো প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মালিকদের একজন ওষুধ কোম্পানি খুলে রমরমা ব্যবসা করছে। আর অন্য চ্যানেলটির অন্য এক মালিক তার স্ত্রীর গানের অডিও ক্যাসেট, সিডি এবং ডিভিডির দোকানও খুলে বসেছেন। আত্মীয়-স্বজনকে তুলে ধরার নির্লজ্জ অপচেষ্টা, অপতৎপরতাও চলছে কতগুলো চ্যানেলে। তাহলে বিটিভির দোষ কি? বিটিভি সরকারের নেতা মন্ত্রীদের দেখায়। প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো তাদের মালিক এবং বউ বাচ্চাদের দেখায়।

॥ চার ॥
মূলত বিজ্ঞাপনের নির্যাতনের কারণে, ঠিক কখন কত বছর আগে টিভিতে একটি নাটক দেখেছি, তা মনে করতে পারছি না। হুমায়ূন আহমেদের ছবি বলে অনেক বছর পর আজকের ছবিটি দেখতে আগ্রহী হয়েছিলাম। এই ছবিটিতে আবার পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ‘চ্যালেঞ্জারও’ ছিলেন। পীযূষের সাথে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা আছে, ‘চ্যালেঞ্জারকে’ আমি কোনদিন সামনাসামনি দেখিনি। কিন্তু তার অভিনয় আমার ভাল লাগত। অল্প বয়সেই মানুষটি কিছুদিন আগে মারা গেলেন। ভাবলাম ছবিটি দেখলে তাঁর প্রতি একটু শ্রদ্ধাও জানানো হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতাটা সুখের হলো না।

বিটিভিকে অনেক কারণেই তুলোধুনো করা যায়। কিন্তু এই বিটিভিতে সেই ৮০ এবং ৯০ এর দশকে যে সিরিয়ালগুলো প্রচারিত হয়েছে সেগুলো নিয়ে এখনও মানুষজন আলোচনা করে। মমতাজ হোসেনের লেখা এবং খ. ম. হারম্ননের প্রযোজনায় বিটিভিতে মধ্য ৮০’র দশকে প্রচারিত ‘শুকতারা’ নাটকের সিরিয়ালটির কথা একেবারেই ভুলতে পারি না। একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন প্রয়াত আলী আহসান সিডনী। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা রম্নমীর কথাও ছিল এই নাকটটিতে। ছিল জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইটির কথা। শুকতারা নাটকটির এই পর্বটি যখন প্রচারিত হয়, জাহানারা আপা তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তাঁর ছোট ছেলে জামীর কাছে। তাই তিনি তখন শুকতারার এই পর্বটি দেখার সুযোগ পাননি। কিন্তু আমি সব পর্ব তখন ভিসিআরে ভিডিও করে বিদেশে আমাদের সব দূতাবাসে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রশাসন অনুবিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল আমি তখন। পরে জাহানারা আপা দেশে ফিরে শেরে বাংলা নগরের মিনিস্টার্স হোস্টেলে আমার সরকারী বাসায় শহীদ রম্নমী এবং জাহানারা আপার উপর প্রচারিত ‘শুকতারা’র এই পর্বটি দেখানোর ব্যবস্থা করেছিলাম এক সন্ধ্যায়। দেখতে দেখতে কেঁদেছিলেন তিনি তখন। শুকতারার মতো আর একটি সিরিয়ালও কি তারপর হয়েছে? এখন তো ‘টেকনোলজি’র ৰেত্রে আমরা অনেক বেশি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং টিভি চ্যানেলগুলো সংখ্যায় এখন প্রায় বিশ পঁচিশ।

সেইসব দিনে ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এইসব দিনরাত্রি’ এবং ‘কোথাও কেউ নেই’-এর মতো ধারাবাহিক নাটক হয়েছে, এই সিরিয়ালগুলোর জন্য তখন মানুষজন অপেৰা করত সেই বিশেষ দিনটির জন্য।
১৯৮৫’র অক্টোবর ১৫ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অডিটরিয়ামে কয়েক শ’ ছাত্র জড়ো হয়েছিল ‘শুকতারা’ দেখতে। বর্ষা বাদল ছিল তখন। রাতে যখন ‘শুকতারা’ নাটকটি দেখছে ছাত্ররা তখনই ধসে পড়ল অডিটরিয়ামটির ছাদ। আর এই দুর্ঘটনায় মারা গেল ৩৬ জন ছাত্র।
মমতাজ হোসেন এখনও লেখালেখি করে যাচ্ছেন। খ.ম. হারম্ননও এখন ‘বৈশাখী’ টেলিভিশনটির দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যক্তি। কিন্তু তারপরও ‘শুকতারা’ নেই, নেই ‘সকাল সন্ধ্যা’, ‘এই সব দিনরাত্রি’ বা ‘কোথাও কেউ নেই’। তাহলে আমাদের অগ্রগতিটা কি হলো?

অগ্রগতি হয়ত আছে, কিন্তু আমি জানি না। জানি না_কারণ আমি দু’তিনটি চ্যানেলে খবর দেখার চেষ্টা করি। চ্যানেল আই-এর খবর দেখি কোন কোনদিন, যেদিন সাঈদুর রহমান খবর উপস্থাপন করে। সাঈদুর রহমান খবরের পাঠক হিসাবে আমার প্রিয়। তার উপর চৌদ্দ পনেরো বছর আগে দৈনিক ‘সংবাদ’-এ আমার একটি কলামও প্রকাশিত হয়েছিল,_ “প্রজন্ম ৭১ এর সাঈদুর রহমান বনাম বেঙ্মিকোর সালমান রহমান।” একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সাঈদুর রহমান তার বাবা-মা এবং তিন ভাইবোনকে শহীদ হতে দেখেছে। তারা তখন নীলফামারীর সৈয়দপুরে।

॥ পাঁচ ॥
আমাদের কোন কোন বিজ্ঞাপন নির্মাতা তাদের বিজ্ঞাপনে রম্নচিহীনতা দেখিয়ে যাবে। ‘ওয়াশিং লিকুইড’-এর কার্যকারিতা দেখাতে সেই বিজ্ঞাপনে ‘কমোড’ দেখাতে হবে? ‘কমোড’ কোন দেখানোর জিনিস হতে পারে? তারপর একটি প্রাইভেট ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে দেখি বৃষ্টিতে ভিজছে একটি শিশু ছাত্র। সে তারই একই স্কুলের হয়ত। তারই একই ক্লাসের ছাত্রীর গাড়িতে একটি ‘লিফ্ট্’ চাইছে। কিন্তু গাড়িতে উপবিষ্ট ছাত্রীটি বৃষ্টিতে ভেজা ছাত্রটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে, শিশু ছাত্রটিকে গাড়িতে উঠতে দিচ্ছে না। একটি শিশু আর একটি শিশুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে, এই দৃশ্যটি দেখে আর সব ছোট শিশু কি শিৰা পাচ্ছে? মনে হয় শিশুরা যে বেশি সংবেদনশীল, এই কথাটি এই বিজ্ঞাপন নির্মাতার জানা নেই।

অথচ এমন সব নিম্নমানের বিজ্ঞাপন চিত্রের বিপরীতে কিছু বিজ্ঞাপনে যে ক্রিয়েটিভিটি দেখি, তা আমাদের দেশের কিছু তরম্নণ সম্পর্কে আমাকে খুবই আশাবাদী করে তোলে। এর মধ্যে একটি, আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়। তবে এখন আর দেখি না। কয়েক বছর আগে ক্রিকেট সিজনে প্রায়ই দেখতাম বিভিন্ন চ্যানেলে। এই বিজ্ঞাপন চিত্রে দেখা যায় গ্রামের উদোম গায়ের কতগুলো ক্রিকেটপাগল শিশু ক্রিকেটের ব্যাট বানানোর তীব্র আগ্রহে তাল গাছে উঠেছে, তালগাছ থেকে তালপাতার ডাল কাটছে, মাটিতে সেই ডাল নামিয়ে সেই ডাল থেকে ব্যাট বানাচ্ছে বাঁ হাতে দা দিয়ে কুপিয়ে। তারপর তারা গ্রামের একটি খোলা মাঠে ক্রিকেট খেলছে। এই শিশুগুলো আমাকে দারম্নণভাবে অনুপ্রাণিত করত, যখন এই বিজ্ঞাপনটি আমি দেখতাম।

কয়েক বছর আগের আর একটি বিজ্ঞাপন চিত্র, ‘চ্যালেঞ্জার’ ছিলেন এটিতে। বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, কতগুলো শিশু কিশোর ফুল চুরি করছে একটি বাড়ির বাগান থেকে। ‘চ্যালেঞ্জার’ তখন তাদের তাড়াচ্ছেন। কিন্তু সেই শিশু কিশোরগুলোই যখন একুশে ফেব্রম্নয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার জন্য ফুল চুরি করছে, ‘চ্যালেঞ্জার’ একটু দূর থেকে কিন্তু কিশোরদের এই চুরি কাজটি দেখে একটু একটু হাসছেন। তাঁর এই হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি এই বাচ্চাগুলোকে দোয়া করছেন।

॥ ছয় ॥
আমি যখন বিদেশে যাই, আমি সেই দেশের টিভির খবর এবং বিজ্ঞাপন দেখার চেষ্টা করি। টিভির খবর যদি দেশের প্রেসিডেন্ট প্রাইম মিনিস্টারকে দিয়ে শুরম্ন হয়, তাহলে বুঝতে হবে, সেই দেশটি আমাদের জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল এরশাদ জামানায় আছে। বিরোধী দলের খবর যত কম থাকবে, বুঝতে হবে সেই দেশের সরকারটি বিরোধী দলগুলোর প্রতি অসহনশীল। তারপর বিদেশী চ্যানেলে বিজ্ঞাপন। বিদেশী টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত ‘মালয়েশিয়া ট্রুলি এশিয়া’বিজ্ঞাপনটিতে মালয়েশিয়ায় ‘টুরিস্ট’ আকর্ষণ করার চেষ্টা আছে। মানে সেই দেশে পর্যটকদের আকর্ষণ করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে।

বিজ্ঞাপনে টুথপেস্ট দেখানো হচ্ছে, নাকি মোটর গাড়ি?
কম্পিউটার, আইফোর্ড, এমপি থ্রি-ফোর এবং এ জাতীয় উন্নত বিশ্বের সর্বসাম্প্রতিক ‘প্রডাক্ট’গুলোর বিজ্ঞাপন লুঙ্গি, শাড়ি, পায়জামা, কোর্তা, গামছার? আমিরাত এয়ারলাইন্স এবং কাতার এয়ারলাইন্স-এর বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হবে এই আরব দেশগুলোর মানুষজন বিমানযাত্রী এবং কার্ব পরিবহনের জটিল ব্যবস্থায়ও অনেক সাফল্য, অনেক অগ্রগতি মাত্র কয়েক বছরেই অর্জন করে ফেলেছে। সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স এবং থাই এয়ারলাইন্সের বিজ্ঞাপনগুলো দেখলে বিশ্বাস জাগে তাদের ফ্লাইটগুলো ঠিক সময় আকাশে এবং ঠিক সময়ই গনত্মব্যেও পেঁৗছে। এই বিমান কোম্পানিগুলো ইউরোপ আমেরিকার বিমান সংস্থাগুলোর গায়ে তীব্র প্রতিযোগিতা করে বিশাল পরিমাণের মুনাফাও অর্জন করে চলেছে। এই বিজ্ঞাপনগুলো থেকে সেই দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি ধারণাও পাওয়া যায়।

‘জি বাংলায়’ সৌরভ গাঙ্গুলীর উপস্থাপনায় ‘দাদাগিরি’ অনুষ্ঠানটি এ দেশের দর্শকদের কাছেও এত জনপ্রিয় কেন তা কি আমাদের চ্যানেলওয়ালারা একটু ভেবে দেখেছেন? এই অনুষ্ঠানটিতেও বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় ফাঁকে ফাঁকে। কিন্তু একটানা পাঁচ মিনিটেরও বিজ্ঞাপন কি প্রচারিত হয় এই অনুষ্ঠানটিতে এবং এই চ্যানেলটিতে? বিজ্ঞাপন যত ক্রিয়েটিভই হোক না কেন, টিভি চ্যানেলগুলোতে বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা, নির্যাতন থেকে ‘ফ্রীডম’, মুক্তি চাই।

উত্তরা, ঢাকা; শনিবার ১৩ নবেম্বর ২০১০

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s