রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’ একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।

রাজনৈতিক ‘ইভ টিজিং’
বেলাল বেগ

রাজনীতি

রাজনীতি

লাগুক বা না লাগুক, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান আওয়ামী লীগের উদ্দেশে একটি শব্দ গুলতি ছুড়েছেন। আওয়ামী লীগ নাকি সারা দেশটাকেই ‘ইভ টিজিং’ করছে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, বেড়ে বলেছেন তো! রাষ্ট্র, সমাজ, সভ্যতা ও শিক্ষা-সংস্কৃতির আলোকদীপ্তিকে আরণ্যক অন্ধকার বানিয়ে নিশাচর হিংস্র পশুর মতো আচরণ করে যে রিপুতাড়িত বখাটের দল, সেটাই তো ইভ টিজিং। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগের দুষ্কৃতকারীদের আচরণ এক ধরনের রাজনৈতিক ইভ টিজিং বটে। চকিতে মনে এল তারেক-কোকো, খাম্বা-মামুন, হাওয়া ভবনের প্যান্ডোরার বাঙ্রে কথা। জামায়াত-বিএনপির ওই যুগের তুলনায় আওয়ামী লীগ ভাঙিয়ে খাওয়া এসব কুলাঙ্গার তো নস্যি। আমার চিন্তাস্রোত হাসিনা-খালেদা, আওয়ামী-বিএনপির শৈবালধামে আটকা পড়ে যাচ্ছিল। আমার মনেই হয়নি, আবদুল্লাহ আল নোমান এই জাতির সাংস্কৃতিক মৃত্যুঘণ্টা বাজানো ইভ টিজিং সমস্যাটাকে খেলো বানিয়ে দিয়েছেন।

ক্ষমতার রাজনীতিতে দীর্ঘকাল মদাসক্ত আছেন বলে জাতির কোনো মর্মান্তিক সমস্যার যাতনা বিএনপি নেতাদের অন্তরে দাগ কাটে না। বখাটেদের কামলোলুপ হিংস্রতার মুখে সুন্দর এই পৃথিবীর দিকে চোখের পাপড়ি মেলে ধরার আগে ‘প্রতিকারহীন শক্তি’র অপরাধে যে কিশোরী আত্মহননের পথ বাছাই করল, তার অভিশাপে পুরো সমাজটাই দগ্ধ হতে পারে_এই বোধটা থাকলে ইভ টিজিংকে এমন ফালতু রাজনৈতিক মশকারা বানাতেন না সমাজসচেতন কোনো নেতা। এটা বলার আগে তাঁর একবারও মনে হলো না, অন্তত ইভ টিজিং সমূলে ধ্বংসের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ-বিএনপির হাত মেলানো উচিত ছিল। কেতাবি গণতন্ত্রীরা অভ্যাসবশত এটা আশা করলেও আমরা জানি, জাতির সুখ-দুঃখের কোনো বিষয়ে একমত হওয়া বা থাকা এই দুটি দলের জন্য সম্ভব নয়।

প্রথমে বিএনপির কথা ধরা যাক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুরা, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল, ১৯৭৫ সালে তারা একজোট হয়ে বঙ্গবন্ধু এবং শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে বাংলাদেশ দখল করে এবং কালবিলম্ব না করে গোপনে রাষ্ট্রটির চরিত্র বদলে এটাকে পাকিস্তানি ধারায় ফিরিয়ে দেয়। এই পরিবর্তন চিরস্থায়ী করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়লে বিএনপির জন্ম হয়। বলা বাহুল্য, সেই সময় জনগণের মাঝে জামায়াতে ইসলামীর গ্রহণযোগ্যতা থাকলে বিএনপির হয়তো জন্মই হতো না। যাহোক, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ধ্বংসই যাদের একমাত্র লক্ষ্য, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করাও তাদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জানত, সুযোগ পেলে বিএনপি তাদের ধ্বংস করবে। এ কাজটি তারা করে উঠতে পারছিল না গণতন্ত্রের মুখোশ পরে থাকায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া-ভীতির কারণে। তার পরও শেষ পর্যন্ত গেরিলা কায়দায় বোমা হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার চেষ্টা করে স্বাধীনতাবিরোধীরা। বস্তুত বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জামায়াত-বিএনপির অবিরাম ষড়যন্ত্র ও শত্রুতা এবং তা প্রতিরোধে পরিচালিত আওয়ামী লীগের মরিয়া সংগ্রাম স্বাধীনতার পরদিন থেকেই বাংলাদেশের মানুষের বাঁচার পরিবেশকে সংঘাতময়, হতাশাগ্রস্ত, অস্থির ও অসহনীয় করে রেখেছে। মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন ঐতিহাসিক বাঙালি সমাজ ভেঙে খান খান হয়ে গেল। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি থেকে বস্তির নিঃস্ব ব্যক্তি পর্যন্ত যে কেউ যখন খুশি আইন হাতে নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে ফেলল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তাজুল ইসলাম ছয়টি সন্তানসহ বিরজাবালাকে কেটে টুকরা টুকরা করে তাতে লবণ মিশিয়ে ড্রামে ভরে বিলের নিচে পুঁতে রেখেছিল। সংস্কৃতি চলে গেল বলিউড, মধ্যপ্রাচ্য ও ইয়াংকি মুলুকে, শিক্ষা চলে গেল হুজুরদের জুব্বার নিচে মক্তব-মাদ্রাসায়, ব্যবসা চলে গেল কালোবাজারে এবং মুক্তবাজার বিদেশিদের হাতে। ক্ষমতা রূপ নিল দখলদারিত্বে। পত্রিকার হেডলাইন পেতে লাগল সন্ত্রাসী ও ভাড়াটে খুনিরা। দুর্নীতির আন্তবিভাগীয় প্রতিযোগিতা চলল রাজনীতিতে, প্রশাসনে, পুলিশে, শিক্ষা ক্ষেত্রে, কাস্টমসে, ইনকাম ট্যাঙ্_েকোথায় নয়। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রইল বেশ কয়েক বছর। যেখানে সভ্যতাবিরোধী পরিবেশে রাজাকার-আলবদররা দেশের মন্ত্রী হতে পারে, খুনের বিচার হয় না, খুনিকে পুরস্কৃত করা হয়, সেখানে অল্প বয়সী অর্থ-অস্ত্র-উন্মাদ, ড্যাম কেয়ার বন্য তরুণটির ইভ টিজার হওয়াটাই তো একটা বাহাদুরি ছিল।

ইভ টিজিং_এসিড নিক্ষেপ, গুম, জোড়া খুন, সিরিয়াল কিলিং, নাবালিকা ধর্ষণ, গণধর্ষণ, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, অগি্নসংযোগ, ভাড়ায় খুন প্রভৃতির মতো একটি অপরাধ। একটি নষ্ট সমাজে কোনো একটি অপরাধকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সব নষ্টের উৎস নষ্ট রাজনীতি। আর এই নষ্ট রাজনীতি উপহার দিয়েছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি।

বাংলাদেশ নষ্ট করার মিশন নিয়ে যেহেতু বিএনপির জন্ম, সেহেতু বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতির সবকিছু নষ্ট করাই তার লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের প্রধান দোষ গণতন্ত্রের মুখোশ পরা বিএনপি-জামায়াতকে প্রথম দিন থেকেই প্রতিহত না করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেওয়া। যে জনগণ একাত্তরের নির্বিচারে হত্যা ও ধ্বংসের শিকার হয়েও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছে, দেশের ঘোর বিপদের দিনে জনগণের নিজ সংগঠন আওয়ামী লীগ তাদেরই ডাকল না। তারা দেশের অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ ভুলে গিয়ে ক্ষমতা ভোগের রাজনীতিতে আসক্ত হয়ে পড়ল। বিএনপি আমাদের সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নষ্ট করল, আওয়ামী লীগ এর প্রতি নীরব সমর্থন জানাল। অনেকে বলাবলি শুরু করে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অসহযোগিতামূলক বন্ধুত্ব তিন দশক ধরে বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার আঁস্তাকুড় বানালে আমাদের বহু যুগের লালিত সব স্বপ্ন ও আদর্শ তিরোহিত হয়। সংক্ষেপে এই হচ্ছে স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমাদের পচা অতীতের আরণ্যক সমাজের গন্ধ ব্যবচ্ছেদ। এই সময়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার ‘প্রতিকারহীন’ অসভ্য শক্তি ডাকাতির মতো একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

ঘোর বর্ষায় একটানা মেঘ-বৃষ্টির পর একটা ঝলমলে দিনের মতো আশা, উদ্দীপনা এবং প্রেরণা নিয়ে আওয়ামী লীগের নবযাত্রা শুরু হয়েছে ২০০৮ সালে। এই প্রথম জনগণ ২০২১ সালে পেঁৗছানোর জন্য একটি গন্তব্যের ঠিকানা পেল, পেল পথের দিশা ডিজিটাল বাংলাদেশ। পরিচ্ছন্ন মানুষদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, কৃষি ও কৃষকদের মধ্যে প্রাণ সঞ্চারণ, বন্ধ্যা শিক্ষা ব্যবস্থাকে (ইভ টিজিংয়ের অন্যতম কারণ) ঝাঁকি দিয়ে জাগানো, পার্লামেন্ট চালু রাখা, সংকট ও জাতীয় সমস্যাগুলো সমাধানে আন্তরিক চেষ্টা_এ রকম অসংখ্য উদ্যোগ জনগণের চোখে পড়েছে। সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা দৃঢ়। কিন্তু তার পরও একটি জাগ্রত জনতার দেশের মতো গতিশীল, স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রাণবন্ত পরিবেশ নেই বাংলাদেশে। একটি কারণ হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্যহারা বিএনপির ভাড়াটে নেতাদের দিন-রাত ‘বাঘ পড়েছে’, ‘বাঘ পড়েছে’ বলে চিৎকার করে জনগণকে সন্ত্রস্ত রাখা। এটি অবশ্য ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না কারণ কোকো-তারেক-মামুন-বাবর আর হাওয়া ভবন বিএনপিকে যে কফিনে শুইয়েছিল, তাতে পেরেক ঠুকে দিয়েছে খালেদা জিয়ার বাড়ি রক্ষা আন্দোলন। বিএনপি কখনো জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দল ছিল না, তবে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী হওয়ার মতো এমন ন্যক্কারজনক অবস্থায় আগে কখনো পড়েনি। সরকারকে সমর্থন করা সত্ত্বেও জনগণ কেন সক্রিয়ভাবে সমাজ গঠনে এগিয়ে আসছে না, এটিই হওয়া উচিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল ভাবনা। কারণ এতকালের নষ্ট সমাজ ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণ করার অনুপযোগী।

সমাজ এখনো জেগে না ওঠার কারণ, চেতনার ক্ষেত্রে সরকার ও দলের মধ্যে যোজন যোজন মাইল দূরত্ব রয়েছে। সরকার যেখানে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে, দল সেখানে পচা অতীতের ক্ষমতা দখল রাজনীতির ফেনসিডিল নেশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। সরকার যেখানে নদী উদ্ধার, ভূমি উদ্ধার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদি চাচ্ছে, দল সেখানে নদী দখল, চর দখল, ভূমি দখল, বাড়ি দখল, চাকরি দখল, টেন্ডার দখল ইত্যাদি খাই খাই রোগে আক্রান্ত। জনগণ দলকে চেনে, সরকার চেনে না। তাই তো তারা ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থায় রয়েছে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দলকে ছাড়িয়ে জনগণের কাছে যাওয়ার যে শর্ত গতিশীলতা, যোগ্যতা ও ধনুকভাঙ্গা পণ, তার প্রতিবন্ধতা হচ্ছে, প্রশাসনের মস্তিষ্কে বড় হওয়া আমলাতন্ত্রের টিউমার।

সমাজ ন্যায়-নীতির মাঝে গতিশীল ও কর্মময় না হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ জনগণ কর্তৃক পার্লামেন্টে পাঠানো তাদের ৩০০ নেতা নিজেরাই এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না ডিজিটাল ম্যানেজমেন্ট কী এবং কেন তা একেবারেই অপরিহার্য। অথচ নতুন সমাজ গঠনের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে হলে প্রথম সারিতে দাঁড়াতে হবে তাঁদেরকেই।

নতুন সমাজ গঠনে জনজোয়ার এলে ‘ইভ টিজিং’ খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে, ভেসে যাবে ফালতু রাজনীতির পচা অতীত।
লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী সাংবাদিক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s