রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি : সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী?

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাশ টেনে ধরবে কে?
আবু সাঈদ খান

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি।

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন

এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। ক’দিন আগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী এক বল্পুব্দ এসেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, সবকিছুতেই এখন রাজনীতি। বললাম, তাতে ক্ষতি কী? তিনি বললেন, অপরাধীরাই আজ রাজনৈতিক দলের আশ্রয়ে আছে। তারাই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। আগে অপরাধীদের সামাজিকভাবে বয়কট করা যেত, আজ আর তা যায় না। পুরো দল তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। এই আলাপ যেদিন হয়েছিল, সেদিনেরই একটি দৈনিকে দেখলাম মর্মান্তিক এক ঘটনা। কোম্পানীগঞ্জের এক গ্রামে বিধবা মহিলা একমাত্র সন্তান বন্ধনকে নিয়ে বাস করতেন। গ্রামের এক যুবক তাকে ৫০০ টাকার নোট দেখিয়ে কুপ্রস্তাব দিলে তিনি যুবকের অভিভাবকের কাছে অভিযোগ করেন। পরিণামে তাকে শাস্তি দিতে ওই যুবক ও তার দুই সহযোগী বন্ধনকে মারধর করে। বিধবা মা ছুটে গিয়ে ছেলেকে উদ্ধার করেন। কিছুক্ষণ পর বন্ধন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া যায় এক ইটভাটার পাশে। মাটিতে পড়ে সে যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। অবশেষে হাসপাতালে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। তিন বছর আগে ওই বিধবার ১৮ বছরের এক মেয়ে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে নিখোঁজ হয়। দুই মাস ধরে অপর ছেলে চন্দনের (২০) সন্ধান নেই। বন্ধনের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তির ওপর দখলদারদের থাবাও প্রসারিত হয়েছে।

ঘটনার হোতা মফিজ ও তার দুই সহযোগী ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের কর্মী। শোকে ক্ষতবিক্ষত অসহায় ওই বিধবা মহিলার সাধ্য কোথায় এই দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার? আইনিভাবেও প্রতিকার যে কত কঠিন, তা সহজেই আন্দাজ করা যায়।
শুধু একজন মফিজ নয়, গ্রামবাংলার হাজারো মফিজ এখন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রয়েছে। আর যাদের দাপট আরও বেশি, তারা মফিজ নয়_ ক্যাডার বা বস। আরও ক্ষমতাধর, ভয়ঙ্কর। বলা বাহুল্য, এরা কেবল ক্ষমতাসীন দলে নেই, বিরোধী দলেও আছে। তবে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের আশ্রয়ে দুর্বৃত্তদের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিএনপির আমলে তাদের কর্মীদের দৌরাত্ম্য ছিল, এখন অপরাধ সংঘটনে এগিয়ে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মীরা।

এ ক্ষেত্রে দুই বনেদি দলের কারোই নিজেদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অপরাধ বেড়েছে, না কমেছে_ তা নিয়ে দুই দলের বিতর্ক শুনছি। এ এক কঠিন প্রশ্ন। এর সুরাহা হওয়া কঠিন। পুলিশের কাগজপত্রে অপরাধের সব তথ্য-প্রমাণ থাকে না। আর থাকলেও যথার্থভাবে সেই তথ্য প্রকাশের রেওয়াজ নেই। কাগজপত্র ধ্বংস করলেও কৈফিয়ত দিতে হবে, এমন জবাবদিহিতার বালাইও নেই। এ প্রসঙ্গে সামরিক শাসনামলের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। সে সময় কিছু কিছু থানাকে অপরাধমুক্ত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এর মানে কি সেখানে অপরাধ ঘটত না? ঘটত তো বটেই। তবে তা রেকর্ডভুক্ত করা হতো না।

সে যা-ই হোক, রাজনীতির সঙ্গে অপরাধের যোগ অতীতেও ছিল। পাকিস্তান আমলে শিক্ষাঙ্গন ও শহর এলাকায় মুসলিম লীগের পোষ্য গুণ্ডা বাহিনীর দৌরাত্ম্য ছিল। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ পণ্ড করাই ছিল তাদের কাজ। তবে তারা অপরাধ সংঘটিত করত। সেই সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে তখন আওয়ামী লীগ-ন্যাপসহ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদ জানাত। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিরোধ গড়ে তুলত। অপরাধ সংগঠন এত সহজ ছিল না।

সামরিক শাসনামলে শিক্ষাঙ্গনে পোষ্য বাহিনী গঠন করা হয়। অভিযোগ আছে, জেনারেল জিয়াউর রহমান ছাত্রদের নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানিয়ে নগদ অর্থ ও প্রলোভন দেখিয়ে সরকার সমর্থক পোষ্য বাহিনী গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালু করেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক নেতাদের মাথা কেনার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বহু মেধাবী ছাত্রের মাথাও খাওয়া হয়েছিল। মেধাবী ছাত্র অভি ছিল তারই রিত্রুক্রটমেন্ট, পরে তিনি এরশাদ সরকারের ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ নামে যে সংগঠন গড়ে তোলা হয়, তা ছিল মূলত ছাত্রনামধারী গুণ্ডা বাহিনী। আর গুণ্ডা বাহিনী নতুন বিশেষণে বিশেষিত হয় ক্যাডার বাহিনী হিসেবে।

সেই বাহিনীর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতন হয়; কিন্তু এরশাদের সৃষ্ট ক্যাডারদের নিয়ে দুই প্রধান দলের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ এবং বিএনপির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদলে তাদের বরণ করে নেওয়া হয়। তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলো প্রতিবাদ করে, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়। কিন্তু কিছুতেই এর প্রতিকার হয়নি। এভাবেই গণতন্ত্রের রথযাত্রায় বহু অপকর্মের হোতা নতুন বাংলা ছাত্রসমাজের ক্যাডাররা শামিল হয়। এদের সংস্পর্শে গণতন্ত্রের দাবিদার দল দুটির ছাত্র সংগঠন নতুনভাবে সজ্জিত হয়। গড়ে ওঠে দুই দলের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী। তখন ছাত্রকর্মীদের অস্ত্র ধারণের মধ্য দিয়ে দুই দলের মধ্যে, এমনকি একই সংগঠনের দুই গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। তা এখনও অব্যাহত আছে। এই অস্ত্রের খেলা কেবল ছাত্র অঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকেনি_ অন্যত্র ছড়িয়ে পড়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এই অস্ত্রবাজরা, যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এখন এর বিকেন্দ্রীকরণও ঘটেছে। এই দুর্বৃত্তায়ন গণতন্ত্রের পথে বড় হুমকি।

এই দুর্বৃত্তরা এতই শক্তিশালী, এখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাদের কাছে জিম্মি। দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে কালো টাকার মেলবন্ধন ঘটেছে।

রাজনীতিতে কালো টাকার মালিক ও সামরিক-বেসামরিক আমলারা ব্যাপকভাবে আসছেন, জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই। তারা এ ধরনের ক্যাডারদের ওপরে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হচ্ছেন। এখন ক্যাডাররা ভোট করে, মিছিল করে বিরোধী দলকে মোকাবেলা করে। ফলে তারা রাজনীতির জন্য অপরিহার্য শক্তি। একশ্রেণীর রাজনীতিক তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন; হয়ে উঠেছেন গডফাদার। ওই গডফাদার আর ক্যাডারদের আধিপত্যের কারণে ত্যাগী ও মেধাবীরা রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। নীতি ও আদর্শ অপসৃত। পেশি আর কালো টাকা আজ অপ্রতিরোধ্য। বলা বাহুল্য, মৌসুমি এই রাজনীতিকদের লক্ষ্য জনসেবা নয়, প্রতিপত্তি ও বাণিজ্য।

সম্প্রতি ক্যাডার ও গডফাদার শব্দ দুটি কলঙ্কিত বলে প্রতিভাত হওয়ায় নতুন এক শব্দ চালু হয়েছে। সেটি বস বাহিনী। এখানে সবাই বস। আছে বসের বস। মধুখালীতে চাঁপা রানীর হত্যাকারী রনি স্থানীয় বস বাহিনীর সদস্য। ওই বস বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুবলীগের সঙ্গে জড়িত। খুঁজলে দেখা যাবে, ইভ টিজার থেকে শুরু করে দখলবাজ, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ প্রায় সব অপরাধীর খুঁটি ক্ষমতার জমিনে আঁটা আছে। এর মানে এই নয় যে, বিরোধী দলের ক্যাডাররা হাত-পা গুটিয়ে রেখেছে। তবে বোধগম্য কারণেই তাদের তৎপরতা কম। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খুঁটির জোর ছাড়া এখন দাপট দেখানো যায় না।

এ প্রসঙ্গে বলতেই হয়, যে দল ক্ষমতায় আসে, সেই দলের দাপট বাড়ে। তারাই বাজিকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। বিরোধী দলের ক্যাডারদের কেউ কেউ বোল ও ভোল পাল্টিয়ে সরকারি দলে ঢুকে পড়ে। যারা পারে না, তাদের হতে হয় ‘ওএসডি’। ওএসডি মাস্তানরা ওএসডি সরকারি কর্মকর্তাদের মতো অপেক্ষার প্রহর গোনে, কবে তাদের দল ক্ষমতায় আসবে। আর তারা সুদে-আসলে সব পুষিয়ে নেবে।

রাজনীতির এই দুর্বৃত্তায়নের বিস্তার শহর-গ্রাম সর্বত্রই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে এদের সম্পর্ক সদা মধুর, তা নয়। রাজনীতিকরা তাদের কখনও দমানোর চেষ্টা করেন না, তাও বলা যাবে না। কিন্তু এদের নিরস্ত্র করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

রাজনীতিতে এখন চালু আছে বাজার সংস্কৃতি। এখানে একশ্রেণীর নেতাকর্মী আসছে কিছু পেতে, দেশ-জাতিকে কিছু দিতে নয়। দল যখন ক্ষমতায় যায়, তখন পাওয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু কিছু নেতার ভাগ্য বদলে যায়। এসব দেখে কর্মীদের আর তর সয় না। তারা শুরু করে দেয় দখলবাজি-টেন্ডারবাজি। এই মওকায় ভাগ বসানোর সুযোগ নেই উঠতি তরুণদের। তারা মেতে ওঠে ইভ টিজিং বা যৌন সন্ত্রাসে। গ্রামের কর্মী মফিজরা বসে নেই। প্রমাণ করছে, তারাও পারে। দুর্বল প্রতিবেশীর জমি ও কন্যা দুই-ই আজ তাদের টার্গেট।

সর্বত্র ছড়িয়ে পড়া এই দুর্বৃত্তদের রাশ কে টেনে ধরবে_ দল, না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী? এখানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা ভিন্ন দুর্বৃত্তদের দাপট বন্ধ হবে না, তা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই।

আবু সাঈদ খান : সাংবাদিক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s