এটাই হওয়ার কথা ছিল? মানুষের ঘুম হারাম করে দেয়া সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সীমাহীন ধৈর্য দেখতে পাই আমরা। ধৈর্য নেই কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে।

এটাই হওয়ার কথা ছিল?

হা সা ন মা মু ন

বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে যেভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে, আইনগত ভিত্তি থাকলেও সেটাকে সরকারের বলপ্রয়োগ বলে মনে হতে পারে। সরকার পক্ষ থেকে অবশ্য আভাস দেয়া হচ্ছিল, নোটিশের মাধ্যমে নির্ধারিত ১২ নভেম্বরের পর তাকে আর ওখানে অবস্থান করতে দেয়া হবে না। এর পক্ষে মামলাটিতে হাইকোর্টের রায়ের কথাও জোর দিয়ে বলা হচ্ছিল। কিছুটা বিস্ময়কর যে, বেগম জিয়ার পক্ষে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করা হলেও সরকারের সম্্‌ভাব্য উচ্ছেদ অভিযান বন্ধে তার কাছে স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়নি। কেন চাওয়া হয়নি, তার কোন ব্যাখ্যা এ পর্যন্ত দেননি বেগম জিয়ার আইনজীবীরা। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- ‘হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন করতে গিয়ে’ সরকারকে যে অভিযান পরিচালনা করতেই হবে, তাকে ঘিরে মানুষের সহানুভূতি কাড়তে ও রাজনৈতিক ইসুø তৈরি করতেই স্থগিতাদেশ চাওয়া হয়নি। এও বলতে হবে, সরকার এর সুযোগ নিয়ে একদিনও দেরি করেনি বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে। সেটি করলে নাকি আদালত অবমাননা হতো!

এমন অনেক দৃষ্টান্তই দেয়া যাবে, যেখানে আদালতের রায় বা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সরকার রীতিমতো গড়িমসি করছে। আদালতের কাছে গিয়ে রায় বাস্তবায়নে সরকারের সময় প্রার্থনার দৃষ্টান্তও কম নেই। ওইসব ক্ষেত্রে হয়তো ব্যাপক মানুষ বা অর্থনীতির স্বার্থ জড়িত। বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে আরও ক’টা দিন পর উচ্ছেদ করলে এমন কী জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন হতো- সংশ্লিষ্টরা কি তা বুঝিয়ে বলতে পারবেন? ঈদের বেশি বাকি নেই। তার চেয়ে বড় কথা, উচ্চতর আদালত মামলাটির শুনানির দিন ধার্য করেছিলেন। সেটিকে এক ধরনের স্থগিতাদেশ ধরে নিয়ে অপেক্ষা করলে তাকে শুধু আদালতের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ বলেই প্রচার করা যেত না- জনগণের মনে হতো, সরকার তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনেও ধৈর্য ধরতে জানে। জনগণ দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যক্ষভাবে ভুগে দাবি জানানোর পরও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মানুষের ঘুম হারাম করে দেয়া সন্ত্রাসীদের বিষয়েও তার সীমাহীন ধৈর্য দেখতে পাই আমরা। ধৈর্য নেই কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে। বিএনপির বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ তোলা যাবে, হয়তো বেশিই যাবে। কিন্তু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ তো আশা করে আছে- কোন না কোন পক্ষ, কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও থেকে ধৈর্যের চর্চাটি শুরু করবেন। ‘সুযোগের সদ্ব্যবহারের’ চেষ্টা থেকে নিজেদের বিরত রেখেও এ চর্চা শুরু করা দরকার। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, বিশেষত আমাদের মতো দেশে যেখানে সরকার সাংবিধানিকভাবেই অনেক বেশি ক্ষমতার অধিকারী, সেখানে তার কাছেই এ দাবি বেশি করে উচ্চারিত হবে।

বোঝাই যাচ্ছিল, বর্তমান সরকার বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে আর থাকতে দেবে না। তাকে ওই বাড়ি বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়াগত ত্রুটি তারা বের করেছেন সফলভাবেই। হাইকোর্টে তা গ্রাহ্যও হয়েছে। হয়েছে বলেই তারা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের দেয়া নোটিশ বাতিল করেননি। বিএনপিরও অনেকে এখন বলবেন, সরকারের অ্যাকশনের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হওয়াটা ঠিক হয়নি। উচ্চ আদালতও সঠিকভাবে চলছে না বলে তারা বলা যায় রোজ বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। অনেকে মনে করেন, বেগম জিয়ার উচিত ছিল সরকারের মনোভাব বুঝে; জনমত, নৈতিকতা ইত্যাদিও বিবেচনায় নিয়ে নোটিশ পাওয়ার পরপরই ওই বাসভবন ছেড়ে দেয়া। বিএনপির একটি অংশ নাকি চাইছিল আদালতে না গিয়ে এ ইসুøতে রাজপথ উত্তপ্ত করতে। দলে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী বেগম জিয়া নিশ্চয়ই ওটা অনুমোদন করেননি। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করাটাও তারই সিদ্ধান্ত নিশ্চয়। স্থগিতাদেশ না নিয়ে তিনি যে ১২ নভেম্বরের পরও ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেটা কার সিদ্ধান্ত? তিনি কি জানতেন না, সরকার তাকে ওই বাড়িছাড়া করতে ব্যগ্র? ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়ে তিনি যেভাবে ওই ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, তাতে মানুষের সহানুভূতি তিনি পাবেন। তবে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত দেশে সরকার সমর্থকদের সহানুভূতি কতটা তার পক্ষে যাবে, সে প্রশ্ন রয়েছে। এমন মানুষও কম নেই, যারা মনে করেন একজন নিহত রাষ্ট্রপতির বিধবা স্ত্রী হিসেবে তিনি অনেক বেশি পেয়েছেন ও নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভেতরেও এমন মনোভাবের লোক সময়ান্তরে বেড়ে গেছে বলেই মনে হয়। আর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তো অনেকদিন ধরেই বলে আসছেন, বিডিআর বিদ্রোহে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করা হবে সেখানে।

পরে যাই করা হোক, আপাতত বেগম জিয়ার নামে বরাদ্দ ওই বিশাল বাড়ি ও জমি দখলে নিয়েছে সরকার। সুপ্রিমকোর্টে নিষ্পত্তির পর অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যে কাজটি তারা নির্বিঘ্নেই করতে পারতেন, সেটি করেছেন দৃষ্টিকটুভাবে। প্রকৃত ঘটনা ঢেকে রাখতে কিছুটা বিকৃত প্রচারণারও আশ্রয় নেয়া হয়েছিল বলতে হবে। এ নিবন্ধ যেদিন লেখা হচ্ছে, সেদিন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকে বিএনপিও এর যথাযথ জবাব দেয়নি। ঈদের বাজারে লোকে যখন গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটছে এবং কোরবানির পশু পরিবহনেও ব্যস্ত অনেকে, তখন এ ধরনের কর্মসূচি কেউ পছন্দ করবে না। সকাল-সন্ধ্যার হরতালকে অর্ধদিবস করা হলেও বোঝা যেত, তারা রাজনৈতিক বিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন। জনস্বার্থে দীর্ঘ সময়ের জন্য ডাকা হরতাল পালনেরও সামর্থø কি অর্জন করতে পেরেছে বিএনপি? বেগম জিয়াকে ওভাবে উচ্ছেদের প্রতিবাদে কিছু অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটালেও দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভও সংঘটিত করতে পারেননি তারা।

সরকার নাকি ভেবেছিল, ঈদের আগে বিএনপি ওই উচ্ছেদের প্রতিবাদে অন্তত হরতাল ডাকবে না। বিএনপি ও বেগম জিয়াও কি ভেবেছিলেন, সুপ্রিমকোর্টে শুনানির আগে সরকার ক্যান্টনমেন্টের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করবে না? দু’পক্ষই যদি তাই ভেবে থাকে, তাহলে বলতে হবে তারা পরস্পরকে কম চেনে। তবে দু’দলই এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের চেনা। জনগণের অন্তত বড় দলনিরপেক্ষ অংশটি চায়, চেনা দৃশ্যপটে তারা কিছু পরিবর্তন অন্তত আনুন।
হাসান মামুনঃ সাংবাদিক

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s