অর্থহীন যুদ্ধের দশম বর্ষ শুরুতে ওবামার জন্য লিখিত বক্তব্য ঃ মাইকেল মুর ●

অর্থহীন যুদ্ধের দশম বর্ষ শুরুতে ওবামার জন্য লিখিত বক্তব্য

মাইকেল মুর

মাইকেল মুর

মাইকেল মুর ●

প্রিয় আমেরিকাবাসী

নয় বছর আগের এই দিনে আমরা আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিলাম। আমার বয়স তখন সবে চল্লিশ। সে অনেকদিন আগের কথা। এতোটা আগের যে এখন অনেকে স্মরণই করতে পারবেন না, কেন সেদিন আমরা ওখানে গিয়েছিলাম। আমার মনে হয় সবাই সেদিন ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে এবং ধরে তার বিচার করতে চেয়েছিল। কিন্তু আফগানিস্তান দখলের প্রথম মাস কিংবা তার কাছাকাছি সময়েই সে পালিয়ে যায়। সে গেল তো গেলই। আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম। পেছন ফিরে তাকাতে গেলে এখন মনে হয়, এ সবের কোনো মানেই ছিল না।

আমাদের অভিযানের পক্ষে নতুন একটা অজুহাত দাঁড় করানোর জন্য আমরা আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় মৌলবাদীদের উৎখাতের সিদ্ধান্ত নিলাম এবং আমরা সেটা করলাম। তবে ওসামার মতো তারা কিন্তু কখনো একেবারে পালিয়ে যায়নি। কেন যায়নি? কারণ তারা যে আফগান, এটি তাদেরই দেশ এবং বিস্ময়করভাবে আরো বহু আফগান তাদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিল। বর্তমানে মাত্র ২৫ হাজার সশস্ত্র তালিবান যোদ্ধা রয়েছে। আপনারা সত্যি সত্যি কি মনে করেন, ক্ষুদ্র একটি সেনাবাহিনী ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি জাতিকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বশে আনতে কিংবা দমিয়ে রাখতে পারে? তাহলে ভুলটা কোথায়?

সত্যি বলছি, এর কোনো উত্তর আমার জানা নেই। আমার জেনারেলরাও আমাদের এই অভিযানের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাকে কোনো সঠিক ধারণা দিতে পারছেন না। ভালো কথা, আমরা যদি আল কায়দাকে নির্মূল করার জন্যই সেখানে গিয়ে থাকি তারাও তো এখন নেই। সিআইএ আমাকে জানিয়েছে, দেশজুড়ে ১০০ আলকায়দাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার জেনারেলরাও আমার কাছে স্বীকার করেছেন :

১। তালিবানকে হারানোর কোনো কৌশলই আর আমাদের জানা নেই। গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে তাদের সমর্থন করে এবং দেশের অধিকাংশ অঞ্চলের চেহারাটাই তাই।

২। আমরা গত নয় বছর যাবত সেখানে আছি বটে তবে বাস্তবতা হলো আমাদের কিংবা আফগান সরকারের নয়, দেশটি এখন পুরোপুরিই তালিবানের নিয়ন্ত্রণে। নয় বছরে আমরা আফগানিস্তানের মাত্র ৩ শতাংশ এলাকা থেকে তালিবানকে তাড়াতে পেরেছি।
মাত্র ৩%!! (আপনাদের মনে করিয়ে দেয়ার জন্যই বলছি, ডি-ডে’র পর থেকে ইউরোপজুড়ে নাৎসিদের পরাজিত করতে মাত্র ১১ মাস সময় লেগেছিল।)

৩। আমাদের সৈন্য এবং কমান্ডাররা আফগানদের ভাষা, সংস্কৃতি এবং আচার-আচরণ রপ্ত করার জন্য এখন অবধি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সেখানকার সাধারণ মানুষ আমাদের সৈন্যদের বিশ্বাস করে না। (বিশেষত কারণে অকারণে তারা বহু বেসামরিক আফগানকে হত্যা করার পর থেকে।)

৪। আফগানিস্তানে আমাদের বসানো সরকারটি অবিশ্বাস্য রকমের দুর্নীতিপরায়ণ। জনগণ তাদের একেবারেই বিশ্বাস করে না। প্রেসিডেন্ট কারজাইকে অবসাদ কাটানোর জন্য ওষুধ সেবন করতে হয়। আমাদের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, সে নাকি কথাবার্তায় প্রায়ই বেসামাল হয়ে পড়ে এবং স্বভাবের দিক থেকেও পাগলাটে। তার ভাই তালিবানের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ এবং শোনা যায় পপির (হেরোইন) প্রায় পুরো ব্যবসাটাই নাকি তার হাতে। হেরোইন, পপি আফগান অর্থনীতিতেও একটা ভূমিকা রাখছে।

আফগান যুদ্ধ এখন একেবারেই তালগোল পাকিয়ে আছে। বিদ্রোহ ক্রমেই বাড়ছে। আর বাড়বেই বা না কেন? বিদেশি সৈন্যরা তাদের দেশে আক্রমণ চালিয়েছে, দেশটি দখল করে রেখেছে! ৯/১১-এর জন্য দায়ী ব্যক্তিরা তো এখন আর সেখানে নেই। সুতরাং আমরা কেন সেখানে আছি? কেন প্রতিদিন আমাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে? এর কোনো কারণ কেউই ব্যাখ্যা করতে পারবে না।

হ্যাঁ, আমি অবশ্য এর পেছনে একটি কারণই খুঁজে পেয়েছি। আর সেটি হলো, কোটি কোটি ডলারে প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের পকেট ভরে যাওয়া। এটা কি একটা কারণ হতে পারে সেখানে আমাদের অবস্থানের? এভাবে কি হ্যালিবার্টনকে ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া যায়?

এটিই এখন সময়, আমাদের সৈন্যদের ফিরিয়ে আনার। আর দেরি করা যায় না। আর একজন আমেরিকানের মৃত্যু কাম্য হতে পারে না। তাদের মৃত্যু আমাদের নিরাপত্তা দেয় না এবং আফগানিস্তানে তারা গণতন্ত্রও আনতে পারবে না।

তালিবানকে পরাজিত করা আমাদের কাজ হতে পারে না। এটি আফগান জনগণের কাজ, যদি তারা তা করতে চায়। দুনিয়ার বহু দেশেই বহু গোষ্ঠী এবং নেতা আছে যারা দুষ্কর্ম করে বেড়াচ্ছে। আমরা একসঙ্গে গোটা তিরিশেক দেশ দখল করে নিয়ে সেখানাকর খারাপ শাসকগুলোকে বিতাড়িত করতে পারি না। ওটা আমাদের কাজও নয়।

আমরা আফগানিস্তানে অবস্থান করছি এবং দেশটি এখনো আমাদের জয় করা হলো না- এর মতো কারণ দেখিয়ে আমি আর সেখানে থাকতে চাই না। জয় করার মতো আসলে কিছুই নেই। চেঙ্গিস খান থেকে শুরু করে লিওনিদ ব্রেজনেভ পর্যন্ত কেউই সেখানে বিজয়ী হতে পারেনি। সুতরাং আমাদের সৈন্যরা ঘরে ফিরে আসছে।

ভুয়া একটি ভীতির ওপর ভিত্তি করে আমি মার্কিন জনগণের সঙ্গে ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ অংশগ্রহণ করতে রাজি নই। আসলেই কি সেখানে সন্ত্রাসীরা আছে? হ্যাঁ। আবারও কি তারা আঘাত হানবে? দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, হ্যাঁ। তবে সন্ত্রাসী এসব কর্মকান্ড মাত্রায় খুবই কম। এগুলো কোনোভাবেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনপ্রণালীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কিংবা সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করা থেকে আমাদের বিরত রাখতে পারবে না। আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো কি অথবা দেশকে আমরা কিভাবে কতোটা নিরাপদ রাখবো সে ব্যাপারেও এদের কোনো ভূমিকা থাকার সুযোগ নেই। আমাদের প্রত্যেকেরই উপার্জনের ভালো একটি পথ থাকবে, পরিবারগুলোর জন্যে থাকবে চমৎকার বাসগৃহ, তারা তাদের সন্তানদের নিয়মিত স্কুল-কলেজে পাঠাতে পারবে। থাকবে সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা। আর এসবের সব কিছুরই নিশ্চয়তা বিধান করবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সরকার। এসবের জন্য আপনাদের লোভী, মুনাফাখোর বীমা কোম্পানিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। আর এটিই হবে প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তা।

আর ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কেই বা কী বলা যায়? নয়টি বছর পার করে দিলাম অথচ ডাইলোসিস করে বেঁচে থাকা ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির এই আরবটিকে আমরা খুঁজে বের করতে পারলাম না। এমনকি বলা হয়েছে, কেউ যদি তার সন্ধান দিতে পারে তবে তাকে আড়াই কোটি ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। আপনাদের কি মনে হয় না, এতদিনে কেউ না কেউ এই সুযোগটি নিত?

লাদেন সম্পর্কে আমি যা জানি তা হলো : ওসামা বিন লাদেন একজন কোটিপতি। আর ধনীদের সম্পর্কে আমার ধারণা হচ্ছে, টানা নয়টি বছর তাদের কেউ গুহায় বাস করতে পারে না। বিন লাদেন হয় মারা গেছে নয়তো এমন এক স্থানে লুকিয়ে আছে যেখানে তার অর্থই তাকে রক্ষা করছে। অথবা সে এতদিনে তার বাড়ি ফিরে গেছে।

এই মুহূর্তে আমাদের যা করণীয় তাহলো, এই যুদ্ধে আমাদের যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারবর্গের প্রতি আমি আমার সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। এদের অধিকাংশই ৯/১১-এর পর চাকরিতে যোগ দিয়ে দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছিলেন। কারণ আমরা আক্রান্ত হয়েছিলাম। কিন্তু কোনো দেশ আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়নি। আমরা মুষ্টিমেয় কিছু ধর্মীয় উগ্রবাদীর হামলার শিকার হয়েছিলাম। তবে অর্ধেক পৃথিবী পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার সামরিক যান আর লাখ লাখ সৈন্য নিয়ে এসে কিছু তস্করকে পর্যুদস্ত করা আপনাকে মানায় না। এমন করাটা নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। আজ রাতের মতো এখানেই শেষ করছি। ঈশ্বর আপনাদের সহায় হোন, আমি কিন্তু একজন মুসলমান নই।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s