লাম্পট্যতা রোধে জেল-জরিমানা! কতটা ফলপ্রসু? ‘ইভ টিজার’ বলে বখাটেদের সম্মান না দিয়ে যথার্থ বাংলা শব্দের প্রয়োগ করতে হবে।

লাম্পট্যতা রোধে জেল-জরিমানা! কতটা ফলপ্রসু?
নজরুল ইসলাম টিপু



সুন্দরী চলেছে একা পথে, সঙ্গী হলে দোষ কি তাতে? রাগ করোনা সুন্দরী গো, রাগলে তোমায় লাগে আরো ভাল….। এটি ৩০ বছর আগের বাংলা ছবির একটি হিট গান, গানের সূর সুন্দর হলেও ছবিতে দেখা যায়, একজন নারী একাকী রাস্তায় চলে যাচ্ছে, আরেকজন পুরুষ গাড়ীতে বসে নারীকে উত্যক্ত করে গানটি গাইছে। এখনও কদাচিৎ টিভিতে ছবিগুলো প্রদর্শিত হয়। তখনকার দিনে সমাজ জীবনে এগুলোর কোন প্রভাব ছিলনা, মানুষ ভাবত নিতান্ত আনন্দ বিনোদনের জন্য ছবি দেখা, যার সাথে বাস্তবতার কোন মিল নাই। বর্তমান কালের ছবিতে যে গানগুলো নাচিয়ে দেখানো হয়, সেগুলো না গাওয়া যায়, না দেখা যায়, না শোনা যায়, না লিখা যায়! টিভি খবরের মাঝখানে যদি ফ্লিমের এ্যাড আসে হয় টিভি বন্ধ করতে হয়; নতুবা যে যার মত সে স্থান থেকে ত্যাগ করতে হয়। বর্তমানের প্রচলিত গানের কলি না লিখে ৩০ বছর আগের একটি গানের কলি এখানে তুলে আনলাম; কেননা আমিও ৩০ বছর আগের ইজা টানব। ছবিতেই নারীকে উত্যক্ত করে গানটি গাওয়া হয়েছিল; তখনকার দিনে বাস্তবে কেউ প্রকাশ্যে এটা করলে তাকে লম্পট, লুইচ্ছা, বদমাইশ, বেয়াদব বলার সাথে সাথে, মার-গুথোর পর জুতা কামড়িয়ে মাটি থেকে তুলতে হত। বর্তমান ডিজিটাল যুগে আধুনিক সমাজের কাছে এই ব্যক্তিদের নাম হল ‘ইভ টিজার’! কিছুটা সম্মানজনক শব্দ বটে!

বাংলাদেশে নারী-পুরুষের যৌনতার চাদরে আবৃত প্রেম ব্যতীত সিনেমা নাই। কেউ বানাতে পারেনা, তাদের দাবী বানালে নাকি বাজারে চলবেনা! বাংলা সিনেমায় দেখুন, আঁট-শাট পোষাক পরিহীতা কিছুটা দেমাগী, সুন্দরী মেয়েটি কাউকে পাত্তা না দিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিন করে চলল। ক্লাসে কিংবা কেন্টিনে মেয়েটির দেমাগী ভাব ক্লাসের স্যারদের সামনে নিলর্জ্জ যথারীতি চলে। ক্লাসের আরেক ছাত্র হতে পারে ধনী কিংবা মেধাবী মেয়েটিকে উত্যক্ত করল দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য। ছেলেটি ব্যর্থ হয়ে মেয়েটির কামিজে টান মারে, অমনি মেয়েটি বাম হাতের পাঁচ সিকার একখানি থাপ্পড় ছেলের গালে বসিয়ে দেয়! ব্যস, শুরু হল আসল খেলা, টানটান উত্তেজনা, রক্ত টগবগ করা কাহিনী জমে উঠে। হঠাৎ ছন্দপতন, সে কাহিনী মোড় নেয় প্রেমে, অমর প্রেম। উভয় পক্ষের বাবা-মা মানতে নারাজ, শেষ পর্যন্ত বাবা-মা বুঝতে পারে, তারাই আসলে ভূল করেছিল। ছেলেমেয়েরা কোন ভূল করেনি, তারা ঠিক পথেই চলছিল। পিতা-মাতার কম আকলের কারনে তা বুঝে উঠতে পারেনি, ফলে সানাই বাজল বিয়ে হল। এভাবেই প্রতিটি বাংলা সিনেমার ছবি তৈরী হয়, বুঝানো হয়, মেয়েদের উত্যক্ত করেই প্রেম করতে হয়, মন পেতে হয়। সঙ্গত কারনে দর্শকদের মাঝে উঠতি বয়সের কিছু ছেলেদের উপর এর খারাপ প্রভাব পড়ে। কেউ প্রশ্ন করেনি, মামলা করেনি, আসলেই কি কলেজের অভ্যন্তর ভাগের হালছাল এত বিশ্রি! উত্যক্ত করলে মেয়েরা থাপ্পড় মারেনা, বাস্তবতা হল মেয়েরা পারলে জুতো পিটুনি দেয়। কখনও সিনেমাতে দেখেছেন? উত্যক্তকারী নায়ককে জুতো পিটুনি দিতে? অথছ সেটাই ছিল তার কর্মের প্রাপ্য।

বিগত ১০ বছর আগেও সমালোচনা হত টিভি বিজ্ঞাপনে অযথা মেয়েদের দেখানো হয়, অপ্রয়োজনে তাদের দিয়ে নানা অঙ্গ-ভঙ্গি করিয়ে নেয়া হয়। ভদ্র অভিরুচি সম্পন্ন শিক্ষিত সমাজ থেকে বলা হত গাড়ীর টায়ারের বিজ্ঞাপনে, ব্লেডের বিজ্ঞাপনে, সিমেন্ট, লোহা কিংবা জমির সারের বিজ্ঞাপনের সাথে নারীদের কি সম্পর্ক? কেন তাদের এভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে? রাষ্ট্রিয়ভাবে এগুলো নিয়ে কোন সরকারই ভাবেনি, ভাবার গরজও মনে করেনি। সেটার উত্তরণতো হয়নি বরং এখন সেটা মহামারী আকারে, মিডিয়া জগতে প্রবেশ করেছে। আগে ছিল অপ্রয়োজনে নারীদের উপস্থিতি নিয়ে যত কথা, এখন যোগ হয়েছে নাচ-গান সহ বিভিন্ন উদ্ভট অঙ্গ-ভঙ্গি। এখন সাবানের বিজ্ঞাপনে নারীদের নাচ আছে, বিস্কুটের বিজ্ঞাপনে নারী-পুরুষের লাফালাফি আছে। সিমেন্ট, ময়দা, লাচ্ছা সেমাই, ইট, টিভি, ফ্রিজ, নুডুলস্, বিস্কুট, চুইংগাম, ন্যাপকিন, পাওয়ার টিলার, জৈব সার থেকে শুরু করে কোন বিজ্ঞাপনে ছেলে-মেয়েদের দৃষ্টি কটু লাফালাফি নাই? পানির পিভিসি পাইপের বিজ্ঞাপনে নারী চরিত্র ঢুকাতে হবে, কিছুতেই মাথায় আসছেনা কিভাবে সম্ভব করা যায়। আমার এক মিডিয়া শুভাকাঙ্খির কাছে সাহায্য চাইল এ্যাড ফার্মের বন্ধু, একটু বুদ্ধি পরামর্শ দিতে! খাদ্য পণ্যের বিজ্ঞাপনের একটি সংলাপ এমন, বান্ধবীকে বলা হল, মুখে থাকবে গান, হাতে থাকবে বিস্কুট। ১৫ সেকেন্টের এই বিজ্ঞাপনের ১১ সেকেন্ট চলল বক্ষ প্রদর্শনী নৃত্য, ৪ সেকেন্ট পণ্যের নাম। ক্রিমের ১৫ সেকেন্টের বিজ্ঞাপনে ১৩ সেকেন্ট ধরে মেয়েটি ছেলেদের উত্যক্ত করার দৃশ্য, মাত্র২ সেকেন্টে নিল পণ্যের নাম বলতে! পণ্য সামগ্রীর গুনগত মান, সূলভ, সহজলভ্যতা, উপকারী, দরকারী কিনা কোন কথা বার্তা নাই। প্রায় প্রতিটি বিজ্ঞাপনের আজ এই দশা।

ইদানীং মোবাইল কোম্পানীগুলো যথেষ্ট বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। মোবাইল ডিজিটাল যুগের অমর কীর্তি, চরম বিষ্ময়, যথেষ্ট প্রয়োজন ও উপকারী। এমন একটি প্রয়োজনীয় সৃষ্টির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেও কি, একই উচ্চতার, একই গড়নের, একই আকৃতির একদল তরুনীর মাঝখানে একজন পুরুষকে নাচাতে হবে? বিজ্ঞানের বিষ্ময়কর সৃষ্টি, অতীব প্রয়োজনীয় একটি বস্তুকে পরিচিত করাতে, নারী-পুরুষের বেলাল্লাপনার আয়োজন কি অতি জরুরী? পৃথিবীতে মোবাইল কোম্পানী কি শুধুমাত্র বাংলাদেশের মাটি ফেঁড়ে উদ্ভিদের মত গজিয়েছে? পৃথিবীতে মোবাইলের এ্যাড কি আর কেউ দেয়না? নাকি মোবাইলের প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে কোম্পানীদের গলদঘর্ম হয়? মোবাইলের ব্যবহার আর যাই হোক, এসব দেখে উঠতি বয়সী বাচ্চাদের যে নৈতিক স্খলন ঘটবে, তা কোন বাবা-মা অস্বীকার করতে পারবে না।

আব্বাস উদ্দীন, বশির আহমেদ, আবদুল আলীম, সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, নীনা হামিদ সহ প্রচুর বিখ্যাত গায়ক গায়িকা বাংলাদেশে রয়েছে। তাদের কত জনকে তদানীন্তন বাংলাদেশের মানুষ চোখে দেখেছে? ভাটি অঞ্চলের প্রান্তে কিংবা প্রত্যন্ত গ্রামের নিভৃত পল্লীতে তাদের গান গুলো, পথ চলা পথিকের কন্ঠে টান পড়ত। মানুষ জানত এটা আব্বাস উদ্দীনের ভাটিয়ালী কিংবা আবদুল আলীমের পল্লীগীতি। রূপবানের গানের সূরে নীনা হামিদ প্রতিটি গ্রামের বধুদের কাছে পরিচিত। অথছ তখন ছিলনা টিভি, রেডিও, কেসেট প্লেয়ার, এমপি থ্রির মত সহজলভ্য যন্ত্রাংশ কিংবা ভাল যোগাযোগ ব্যবস্থা। এসব শিল্পীদের মানুষ নামে চিনত, কন্ঠে চিনত, ফলে হৃদয় নিংড়ানো ইজ্জত দিত। এখন ইলেকট্রনিক্স বাদ্যের কারনে বেসুরো গায়ক-গায়িকাদের মেলা কদর বেড়েছে। আগে গানের তালে বাদ্য বাজত, এখন বাদ্যের তালে বেসুরো গলায় শিল্পীকে গাইতে হয়। মিক্সিং করে গলা ও সুরের দুর্বলতাগুলো রিপেয়ার করা হয়। এত কিছু করেও শিল্পীরা আগের মত পরিচিতি পাচ্ছেনা। ফলে গান দেখানোর জন্য আশ্চর্য্য এক ব্যবস্থা চালু হল। শিল্পী নিজে গাইবে, আর মডেল কণ্যা, গায়িকা নামধারী একজনকে কলা গাছের তলায়, সীম বাগানের ঝোপ-ঝাড়ে নৃত্যে করাবে। সেটার জন্য অরুচিকর বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা হবে। ব্যবসা এখন তাতেও ভাল যাচ্ছেনা, ফলে গানের মডেলদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে খোদ গায়িকারাই নিজেই গানের মডেল হয়ে গাইছেন। এখন গায়িকাদের ভাল কণ্ঠ থাকলেই চলেনা, মঞ্চ কাঁপানোর মত লম্প-ঝম্প, নর্তন কুর্দন না করলে চলেনা। সমস্যাটা এখানেই, বাজার দখলের ধান্ধায় এসব গায়িকা কাম মডেল কণ্যারা, নিজেরাই নিজেদের ড্রেস তৈরী করছেন। ড্রেসগুলো আভিজাত্য ও পরিমার্জিত করার চেয়ে বেশী নজর দেয়া হয়, সেগুলো যথেষ্ট উত্তেজক হয়েছে কিনা সেদিকে। সে ড্রেসগুলো পরে গায়িকা কাম মডেল কণ্যারা, নেচে গেয়ে চলছেন অবিরত। কেউ ভাবছেনা, কেউ বলছে না এগুলো আমাদের দেশের সাংস্কৃতির সাথে মানান সই কিনা? দেশের ছেলেমেয়েরা আমাদের সাংস্কৃতির অংশবিশেষ। বড় আফসোস লাগে বাংলার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়া, সম্মান পাওয়া গায়িকা ছাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লার মত দেশ কাঁপানো গায়িকারাও হাল আমলের শিল্পীদের মাঝে বিলীন হয়ে যেতে। অথছ তাদের না দেখেই বাংলার মানুষ শ্রদ্ধা করতে শিখেছিল।

আজ ঘরে ঘরে হিন্দী ছবির সয়লাব। অনেক পরিবার ভাল বাংলা বলতে পারেনা, ইংরেজী বলতে পারেনা, তবে ঠিকই হিন্দী বলতে পারে ও বুঝে। হিন্দী নাটক ও ছবিগুলো সর্বদা সমাজের মধ্যে অসামাজিক নোংমারী ঢুকাতে সিদ্ধহস্থ। প্রায় সব নাটকেই পরকীয়া প্রেমকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়। এক পুরুষের সাথে মা-মেয়ের প্রেম, এক মহিলার সাথে বাবা-ছেলের প্রেম! এসব হচ্ছে ভারতীয় ছবি ও নাটকের উপজীব্য বিষয়। এসব কুৎসিত চিন্তা, নোংরা কাহিনী হলো নাটকের মূল বিষয় বস্তু, সেগুলোকে বাস্তবতার রূপ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। যারা দেখে তারা এক পর্যায়ে দেখতে অভ্যস্থ হয়ে যায়। সেসব গর্হিত কাজকে বর্তমান তরুণ শ্রেনী বাস্তব পক্রিয়া বলে ভাবতে শুরু করে। বর্তমানে নাটকের শিখানো কায়দায় ছেলেরা রাস্তাঘাটে অসহায় নারীদের উত্যক্ত করে চলছে, এগুলো যাদের দেখার দায়িত্ব তারা কিভাবে এই পরিণতির দায় এড়াবেন? বর্তমানে বিয়ের সম্পর্ক করতে গেলে ঘরে কি কি চ্যানেল তারা দেখে থাকেন, খোঁজ খবর নেওয়া অনেকেই জরুরী মনে করেন, অনেকে এদের সাথে আত্মীয়তা করতে দশবার ভাবছেন।

বর্তমানে আমাদের দেশের বিভিন্ন চ্যানেলেও নাটক তৈরীতে ভারতীয় ভূতের আছর পড়েছে। তারা ব্যবসা সফলতার জন্য ভারতীয় পন্থাকে অনুকরন করছে এবং আমাদের চ্যানেলগুলো সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। চ্যানেল গুলোতে অভিনেত্রী, গায়িকা খুঁজার নামে কোটি কোটি টাকা খরছ করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে সেরা গায়িকা-নায়িকা বাছাই হলেই জাতি স্বনির্ভর হবে অচিরেই। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজী-অংকের পিছনে সময় দেবার চেয়ে, গানের পিছনে বেশী সময় ব্যয়কে উপরে উঠার মাধ্যম মনে করছেন। কেননা চ্যানেল গুলোতে তাদের মূল্যই বেশী। একটি চ্যানেলও শিক্ষার ক্ষেত্রে নূন্যতম সময় ব্যয় করেনা। আবার নায়িকা বাছাই পক্রিয়ার রীতি নীতিগুলো আপত্তিকর, তাদের ক্লোজআপ দৃশ্যগুলো আরেকটি অনুষ্ঠান বানিয়ে রগরগে বর্ণনায়, রঙ্গচটা ভঙ্গিতে প্রচার করা হয়। সামাজিক সমস্যার কথা বাদ দিলেও উঠতি যৌবনপ্রাপ্ত বালদের জন্য এসব দৃশ্য দেখে ধর্য্য ধারন করা অবশ্যই কষ্টকর হবে। যারা এসব বানাচ্ছে তাদের কাছে সমাজের চাহিদার কোন দায়বদ্ধতা নেই। তাদের মূল উদ্দ্যেশ্যই হল টাকা বানানো, সমাজ বানানো নয়।

নারীদের উপর এসব প্রতিরোধে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে, মার্শাল আট শেখানো হচ্ছে। একটি ওড়না দিয়ে কিভাবে ছেলেকে কাবু করা যায় শেখানো হচ্ছে। আরো নতুন প্রতিরোধক ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। ছেলেরা যেখানে ছুরি মারছে, এসিড মারছে, শরীরে গাড়ি তুলে দিচ্ছে; সেখানে মার্শাল আর্ট প্রযুক্তি কতটুকু কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে? সরকার ইতিমধ্যে ১ বছরের জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা করেছে। ইতিমধ্যে ছোট খাট শাস্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। এ দ্বারা একটি বখাটে ছেলের বিরুদ্ধে সাময়িক ভীতি তৈরী করা সম্ভব হলেও, একদল বখাটের বিরুদ্ধে কি কাজে আসবে? যে সমাজে দৈনিক হাজার হাজার বখাটে তৈরীর উপকরণ খোলা রেখেছে, সেখানে উপরোক্ত পদ্ধতি কৌতুক ছাড়া বড় কিছু নয়। মার্শাল আর্ট শিখার টাকা যার ঘরে আছে তার কণ্যা যে বখাটের খপ্পড়ে পড়বেনা, বলাই বাহুল্য। গ্রীসের মানুষেরা খুবই ভদ্র, মার্জিত। সেখানে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশী। স্কুল-কলেজের সামনে, কিংবা মহিলা আধিক্য বাসে যেভাবে পুরুষকে নারীরা উত্যক্ত করে ভাবলে শরীর শিউরে উঠে। আমাদের দেশে পুরুষ বেশী বলে নারীরা উত্যক্ত হচ্ছে, যে দেশে নারী বেশী সেখানে পুরুষ উত্যক্ত হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। তাই নারীকে মার্শাল আর্ট শিখিয়ে পুরুষদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা যেমনি চিন্তাশীল গোষ্টির উত্তম কর্মকান্ড হতে পারেনা। বখাটে ছেলেদের জেলে ঢুকিয়ে সাময়িক ফায়দা হলেও, জেল ফেরৎ বখাটেরা মেয়েদের বিরুদ্ধে আরো প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে উঠবে সন্দেহ নাই, তাই দীর্ঘ মেয়াদের জন্য এই পদ্ধতিও কোন সূফল বয়ে আনবেনা।

উপরের কয়েকটি দৃশ্য থেকে উপলব্ধি করা যায়, কিভাবে আমাদের দেশের সাংস্কৃতি কান্ডারী বিহীন নৌকার মত মতো, নদীর স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। কোন নিয়ন্ত্রন নাই, কারো অনুশোচনা নাই, কারো দায়বদ্ধতা নাই। যার কারনে এগুলো দেখে, আকৃষ্ট হয়ে, তরুণ সমাজে দুষ্ট ক্ষতের সৃষ্ট হচ্ছে। তরুণেরা সর্বদাই তরুণ, তাদের কাছে ভাল-মন্দের মানদন্ড রক্ষা করা কষ্টকর। যেখানে, যে যায়গায় তারা হাত দিবে, সেখানেই তারুণ্যের ছাপ রাখবে। এটা তাদের দোষ নয়, ফলে তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারিবারিক শাসন, স্কুল শিক্ষকের ভয়, সামাজিক বদনামের ভীতি দিয়ে তাদের সর্বদা তাড়িত করাতে হয়। তবেই তারা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রশ্ন হল সুশীল ব্যক্তিরা যে সমাজ ব্যবস্থা আমাদের তৈরী করে দিয়েছেন বিগত ৩০ বছর আগ থেকে তার দায় কে নেবে? সমাজ পঁচনের শেষ সীমায় এসে এন্টিবায়োটিক দিলে, কি উপকার হবে সে অংশের; যেটা ইতিমধ্যে পঁচে গেছে? সিনেমা-নাটকে তরুনীদের উত্যক্ত করার দীর্ঘ অপসাংস্কৃতি চালু করে; তরুন-যুবকদের সুপ্ত তারুণ্যকে উসকিয়ে দিয়েছেন, তাদের তারুণ্যের অপরাধ কে কাঁধে নেবে? আজ সাংস্কৃতিক জগতের অপসাংস্কৃতির নোংরামী, পঁচা মগজের সৃষ্ট কদাকার কাহিনীর পরিনাম ও দায়ভার কি তারা নেবে? তারা কি বুঝতে পেরেছে এই পট পরিবর্তনে তাদের অবদানই মূখ্য ভূমিকা রেখেছে?

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, এগুলো মূলত অপসংস্কৃতির প্রভাব, যেগুলো এসেছে আধিপত্যবাদিদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে। পরাশক্তিগুলো সামরিক আগ্রাসনের চেয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে অনেক বেশি সুবিধাজনক ও ফলপ্রসু মনে করে। কেননা সামরিক হামলা চোখে দেখা যায়, শত্রুকে চেনা যায়; এমনকি প্রস্তুতি নেবার সময় পাওয়া যায়। ফ্লিম, ছবি, নাটক, ফ্যাশন শো’র মতো উপকরণ নিয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল আসে ধীরগতিতে। উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে যায়, ফলে জনগোষ্টি দেখতে দেখতে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, প্রতিরোধের সুযোগ হাত ছাড়া হয়। শত্রুর জন্য অপেক্ষার সুযোগ মেলে না। ফলে পুরো জাতি তাদের মনোগত গোলামে পরিনত হয়। অবশেষে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের আড়ালে প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে বাণিজ্যিক ও সামরিক আগ্রাসন। একই উদ্দেশ্যে তালেবানের পতনের পর কারজাই সরকারের সাহাযার্থে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন সাহায্য-সামগ্রী পাঠালেও; ভারত সরকার টিভি, ভি,সি,আর এবং হিন্দী ছবি নিয়ে যায় আফগান জনগনের সাহাযার্থে। আজ বাংলাদেশের আপামর জনতা পতনের কিনারায় দাঁড়িয়ে গেছে; দেশের একটি গোষ্টি অপসাংস্কৃতির মনোগত গোলামে পরিণত হয়েছে।

তাই এগুলো প্রতিকারের জন্য প্রথমেই সাংস্কৃতির পরিমন্ডলের প্রতিটি জোড়ায় হাত দিতে হবে। বিকৃত, কু-রুচিবোধ, অপসাংস্কৃতির পঁচা মগজে নৈতিকতার পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিটি চ্যানেল ও নাট্য ব্যক্তিত্বদের নিয়ে সরকারকে আগে বসতে হবে। মনোবিজ্ঞানী ও ধর্মীয় পন্ডিতদের পরামর্শে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। এটা পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কাজ নয়, ছেলেদের পিটিয়ে, কানধরে উঠ-বস করিয়ে ভীতি তৈরী করা যাবে, সমস্যার উত্তরণ হবেনা। কারন রোগটি হয়েছে মগজে, নৈতিকতার অভাবে। আর নৈতিকতা শিক্ষা দেয় ধর্ম, সকল ধর্মই নৈতিকতার কথা বলে, খারাপ মানুষকে ভাল বানায়। আল্লাহ নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, তোমরা হিজাব তথা শালীন পোশাক পড়, তাহলে তোমরা সম্ভ্রান্ত হিসেবে পরিচিত হবে এবং রাস্তায় তোমাদের উত্যক্ত করা হবেনা। পুরুষদের বলেছেন, তোমরা পর নারীর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করোনা। তিনবারের অধিক তাকালে মহাপাপের ভয় দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের দেখা মাফ হলেও, তার সন্তোষজনক জবাব থাকতে হবে। কেননা সবই তিনি মনিটরিং করছেন? ইসলাম নারী-পুরুষ দুজনকেই পর্দা করতে আদেশ করেছেন, তাদের চরিত্রের মানদন্ড ও সীমানা নির্ধারণ করেছেন।

সকল ক্লাসে সকল ধর্মের বই পড়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। টিভির বিজ্ঞাপনে পরিবর্তন আনতে হবে। যৌন উত্তেজক ছবি পরিহার করে, হাসি-কৌতুকের ছবিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়কে শালীন পোশাক পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। মসজিদে-মন্দিরে চরিত্র গঠন মূলক বক্তব্য ও স্কুলে এ বিষয়ে বিতর্ক প্রতিযোগীতার ব্যবস্থা করতে হবে। নাটক, কার্টুন ছবির মাধ্যমে চরিত্রবান মানুষের কি মর্যাদা ও সম্মান ইত্যাদি বিষয়ে নাটক তৈরী করে প্রচার করতে হবে। আমাদের দেশে ইংরেজী শব্দের প্রতি আকর্ষন ও সম্মান বেশী। অর্থ যত বেমানান হোক, বোধগম্য নাই হোক; ইংরেজীর মত হলেই নিজেকে সম্মানী ভাবে। মানুষ ইংরেজী লিলি নাম রাখে বাংলায় শাপলা রাখেনা, বিউট রাখে সুন্দরী রাখেনা, লোটাস রাখে পদ্ম রাখেনা। তাই বিদেশী শব্দ ‘ইভ টিজার’ বলে বখাটেদের সম্মান না দিয়ে যথার্থ বাংলা শব্দের প্রয়োগ করতে হবে। যে শব্দ শুনলে একজন মূর্খ মানুষের চামড়ায় যাতে আগুন জ্বলে, ঘৃণা তৈরী হয়। লম্পট, লূইচ্ছা, বখাটে শব্দ না হলেও প্রচলিত নতুন বাংলা শব্দ খোঁজে বের করতে হবে। তখনই আমরা একটি সুস্থ যুবক শ্রেনী তৈরী করতে পারব এবং আমাদের কোমলমতি তরুণীরা পথে-ঘাটে, ঘরে-বাহিরে উত্যক্ত হবেনা।

লেখক আমীরাত প্রবাসী।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

2 Responses to লাম্পট্যতা রোধে জেল-জরিমানা! কতটা ফলপ্রসু? ‘ইভ টিজার’ বলে বখাটেদের সম্মান না দিয়ে যথার্থ বাংলা শব্দের প্রয়োগ করতে হবে।

  1. কামরুজ্জামান কামাল বলেছেন:

    আমাদের বিচার বিভাগে আইনের এই রকম একটা ধারা প্রবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবটি আমরা ভাবতে পারি…
    http://www.facebook.com/note.php?note_id=449383292581

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s