ভারত থেকে ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিআরটিসি: সাপস্নায়ার্স ক্রেডিটের জালে বাংলাদেশ

সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটের জালে বাংলাদেশ

আদিব ফয়সাল

সাপস্নায়ার্স ক্রেডিট বা সরবরাহকারী ঋনের জাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না বাংলাদেশ। আশির দশকের চেয়ে সাপস্নায়ার্স ক্রেডিটে ঋণ নেয়ার হার কমলেও তা একেবারে বন্ধ হয়নি। সরবরাহকারী ঋণ বা সাপস্নায়ার্স ক্রেডিটকে বলা হয় কঠিন শর্তের ঋণ। এ ধরণের ঋনের সুদহার বেশি থাকে, পরিশোধের সময়সীমা থাকে কম, পাশাপাশি ঋনের টাকা খরচে পণ্য কিনতে হয় ঋণদানকারী দেশ থেকে। ফলে খুব কম দেশই এ ধরণের ঋণ নিতে আগ্রহী হয়।

এছাড়া ঋণদাতা দেশ থেকে পণ্য ও যন্ত্রপাতি কিনতে হয় বলে এর মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। ফলে নানা ভাবে দুর্নীতির অভিযোগও উঠে। কিন্তু বাংলাদেশ বরাবর সরবরাহকারী ঋণ নিতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর থেকে ২০০৯ সালের জুন পর্যন- বাংলাদেশ ৯৪ বার সরবরাহকারী ঋণ নিয়েছে। এর পর সর্বশেষ বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাকেও বলা হচ্ছে সরবরাহকারী ঋণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত ’বৈদেশিক সম্পদ প্রবাহ’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন পর্যন- ২১টি দেশ এবং সংস্থা থেকে সরবরাহকারী ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেওয়া হয়েছে চীন থেকে। ২০ বার ঋণ নেয়া হয়েছে চীন থেকে। ভারত থেকে নেওয়া সরবরাহকারী ঋণের সংখ্যা ১৮ বার। রাশিয়া থেকে নেওয়া হয়েছে ১০ বার এবং নেদারল্যান্ড থেকে ৮ বার।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ প্রথম সরবরাহকারী ঋণ নিয়েছিলো অস্ট্রিয়া থেকে। সিলেট পাল্প মিল চালুর জন্য এই ঋণ নেয়া হয়। এরপর ঋণ নেয়া হয় মস্ড়্গো থেকে তখন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জন্য পুরাতন জাহাজ কিনতে ১৯৭৩ সালে ৫৪ লাখ ৩৬ হাজার ডলার ঋণ নেয়া হয়। ১২ দশমিক ১৬ শতাংশ সূদহারে এই ঋণ পরিশোধ করতে হয় পাঁচ বছরে।

চীন থেকে প্রথম সাপস্নায়ার্স ক্রেডিট নেওয়া হয় ১৯৮৪ সালে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) চারটি বস্ত্রকলের জন্য ৯ আগস্ট চারটি চুক্তি করে। বিটিএমসি ১৯৮৬ সালে আবারও চীনের কাছ থেকে চারবার সরবরাহকারী ঋণ নেয়। সব কটি ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ছিল ৭ শতাংশ। তবে প্রথম চারটি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে দুই বছরের বাড়তি সময়সহ আট বছরে, আর পরের চারটি ঋণ নয় বছরে। এরপর থেকে চীন থেকে সরবরাহকারী ঋণ নেয়া অব্যাহত ছিলো। বিদুøত খাতের জন্য চীন থেকে পাঁচবার ঋণ নেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিদুøৎকেন্দ্র নির্মাণ, ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন, সারকারখানা এবং বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি প্রকলের জন্য একাধিকবার সরবরাহকারী ঋণ নেওয়া হয় চীন থেকে। এসব ক্ষেত্রে সুদহার ছিল সাড়ে ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। সব মিলিয়ে চীন থেকে সরবরাহকারী ঋণ নেওয়া হয়েছে ৮৩ কোটি ৬৬ লাখ ৪১ হাজার ডলার। এর মধ্যে এখন পর্যন- বাংলাদেশ পরিশোধ করেছে ১০ কোটি ৭২ লাখ ৩২ হাজার ডলার।

ভারত থেকে বেশির ভাগ সরবরাহকারী ঋণ নেয় বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এর বাইরে পরিবহন খাতের জন্য ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বিআরটিসি। ভারত থেকে প্রথম সরবরাহকারী ঋণ নেওয়া শুরু ১৯৭৪ সালে। এ বছরের ১৬ মে চারটি ঋণচুক্তি করা হয়েছিল। ভারত থেকে নেওয়া প্রথম সরবরাহকারী ঋণ ছিল এক কোটি ৮৩ লাখ ৬৪ হাজার ভারতীয় রুপি। এ পর্য- ভারত থেকে নেওয়া হয়েছে ৯২ কোটি ২০ লাখ ৬৩ হাজার রুপি বা ২৯ লাখ ৮৩ হাজার ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছে ৯২ কোটি নয় লাখ ৩৬ হাজার রুপি বা ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ডলার। ভারতের পর রাশিয়া থেকেই সরবরাহকারী ঋণ সবচেয়ে বেশি এসেছে। আর এর অধিকাংশ ঋণই নেওয়া হয়েছে আশির দশকে, এরশাদের সময়ে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বা এখনকার রাশিয়া থেকে ১০ বারই সরবরাহকারী ঋণ নেওয়া হয়েছে বিদুøৎ খাতের জন্য। এসব ঋণের সুদহার ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশ এবং পরিশোধ করতে হয়েছে নয় থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। রাশিয়া থেকে নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ৩৮ কোটি ১৭ লাখ ৩৫ হাজার ডলার। এর মধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে ৩৭ কোটি ৭১ লাখ ৫৬ হাজার ডলার।

রাশিয়া থেকে প্রথম ঋণ নেওয়া হয় ১৯৮১ সালের ১৬ সেপেম্বর। ঘোড়াশাল বিদুøৎকেন্দ্রের জন্য নেওয়া হয় সাত কোটি পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ডলার। ১৯৮৩ সালে এই ঘোড়াশালেরই আরেকটি ইউনিটের জন্য নেওয়া হয় সাত কোটি ৩৪ লাখ ৪৭ হাজার ডলার। রাশিয়া থেকে ১০ বার নেওয়া ঋণের মধ্যে নয়বারই নেওয়া হয় ঘোড়াশাল বিদুøৎকেন্দ্রের জন্য, একবার নেওয়া হয় সিদ্ধিরগঞ্জ বিদুøৎকেন্দ্রের জন্য। এর মধ্যে সর্বশেষ ২০০০ সালে নেওয়া ঋণের অর্থ এখনো পাওয়া যায়নি। এছাড়া অষ্ট্রেলিয়া, সাবেক চেকোশেস্নাভেকিয়া থেকে বাংলাদেশ এধরনের ঋণ নিয়েছে। নেদারল্যান্ড থেকে বাংলাদেশ সরবরাহকারী ঋণ নেয় আটবার। বিমান চলাচলে ফকার কেনা এবং শুরু করে বস্ত্রস্ত্র ও চামড়াশিলের জন্য এসব ঋণ নেওয়া হয়। ১৯৭৮ থেকে শুরু করে ১৯৮৯ সালের মধ্যে নেওয়া এসব ঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, ৫ থেকে ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন-। পরিশোধ করতে হয়েছে ১০ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। সব মিলিয়ে এই দেশটি থেকে নেওয়া হয় পাঁচ কোটি ৭৯ লাখ ৪৩ হাজার ডলার। নরওয়ে, উত্তর কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, রুমানিয়া, যুক্তরাজ্য এবং সুইডেন থেকেও বিপুল অঙ্কের সাপস্না্‌য়ার্স ক্রেডিটে ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখন যে অবস্থানে তাতে সাপস্নায়ার্স ক্রেডিটে ঋণ নেয়ার আর কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন না অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। বরং এই ঋনের জাল থেকে বেরিয়ে আসার এখন সময়। কারণ বিশ্বব্যাংক এডিবির মতো প্রতিষ্টান বাংলাদেশকে ঋণ দিতে হচ্ছে। এ কারনে ভারত থেকে ১০০ কোটি ডলারের ঋনের সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী দেশগুলো সব সময় এই ধরনের ঋনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়। কারণ সূদের অঙ্কের পাশাপাশি নিজ দেশ থেকে পন্য কেনার লাভ থাকে। সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান চীনের সাথে সাপস্নায়ার্স ক্রেডিটের ঋনের সিদ্ধা- বাতিল করায় সে সময় চীন সরকারের সাথে বিএনপি সরকারের সম্পর্ক যথেষ্ট খারাপ পর্যায়ে গিয়েছিলো। এ কারনে বাংলাদেশের এখন পর্যালোচনার সময় এসেছে এ ধরনের ঋনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s