নারী নির্যাতনের হঠাৎ মহামারীর কারণ কি?

নারী নির্যাতনের হঠাৎ মহামারীর কারণ কি?
আহসান মোহাম্মদ

নারী নির্যাতন

নারী নির্যাতন



১.গত মাসখানেকের পত্রিকার দিকে তাকালে মনে হবে হঠাৎ করেই কোন একটা বর্বর বাহিনী তাদের সকল শক্তি ও লাম্পট্য নিয়ে আমাদের মেয়েদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে। পাড়ায় পাড়ায় শুরু হয়েছে ইভ-টিজিং এর মহোৎসব। শত শত মানুষের সামনে জোর করে স্কুলগামী একটা মেয়েকে চুমু দেয়া, রাস্তায় গাছের সাথে প্রকাশ্য দিবালোকে বেধে রেখে বিবস্ত্র করা, বখাটেপনায় বাধা দিলে শিক্ষক কিংবা মেয়েটির মাকে হত্যা করা – এই ধরণের কোন না কোন খবর প্রতিদিনই পত্রিকাতে আসছে।

সকলের মনেই প্রশ্ন উঠছে, মেয়েদেরকে উত্যক্ত ও নির্যাতন করা হঠাৎ করে মহামারী আকার ধারণ করলো কেন?

এই ধরণের দুই-একটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলেই প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যাবে।

ত্রিশে অক্টোবরে প্রথম আলোর একটি রিপোর্টে আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য ও প্রথম আলোর রিপোর্টারের মহানুভবতার কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে,

“বখাটেদের উৎপাতে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাভার ব্যাংক কলোনির বাসিন্দা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী আবদুর রশীদ। কিন্তু বিয়ের এক দিন আগে গত বৃহস্পতিবার অন্তত ৩০ জন সন্ত্রাসী ওই বাসায় হানা দিয়ে আবদুর রশীদের মেয়ে সাহিরা শাওলিন শৈলীকে অপহরণের চেষ্টা চালায়।

কথা ছিল শুক্রবার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন হবে। সকাল থেকেই বখাটে সোহাগ কনের বাবা ও বরকে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। হুমকির মুখে বরের বাড়ির লোকজন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। দুপুর ১২টায় বিয়েতে অপারগতা প্রকাশ করে খবর পাঠানো হয় কনের বাসায়। তখন ওই বাসায় বিয়ের আয়োজন চলছিল।”

খবরের এই অংশটুকু মনোযোগ দিয়ে পড়লে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে পড়ে:

ক. একজন সরকারী কর্মকর্তা, অফিসার্স কোয়ার্টারে থেকেও তার মেয়েকে বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারছেন না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার সাহায্যে এগিয়ে আসছে না।

খ. বখাটেরা অফিসার্স কোয়ার্টারে এসেও হামলা করার সাহস পাচ্ছে।

রিপোর্টের পরের অংশ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।

“প্রতিবেদক বিষয়টি জানান সাভারের সাংসদ তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদকে। সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পাওয়া যায় তাঁর কাছ থেকে। সাংসদের নির্দেশে একে একে কনের বাসায় উপস্থিত হন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) সাভার থানার একাধিক কর্মকর্তা। গ্রেপ্তার করা হয় বখাটে যুবক সোহাগের বাবা মজিবর রহমানকে।”

এই অংশ পড়ে বোঝা গেলো জাদুর কাঠি কোথায়। সংসদ সদস্য নির্দেশ দেয়া মাত্র ওসি এসে মেয়েটির বাসায় হাজির, সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার বখাটে যুবক সোহাগের বাবা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ওসি সাহেব এতোদিন কেন বখাটে বা তার বাবাকে গ্রেফতার করেননি? উত্যক্ত করার ঘটনা ঘটছিল বেশ কিছুদিন ধরে, কোনভাবেই কিছু না হওয়ায় একজন প্রকৌশলী তার মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি বহুবার পুলিশের দরজায় ধর্ণা দিয়েছেলেন। পুলিশ তখন কিছু করেনি কেন? বখাটেরা মেয়েটাকে অপহরণ করতে তার বাসায় হামলা চালায়। পুলিশ তখন বখাটে বা তার বাবাকে গ্রেফতার করেনি কেন?

উত্তরটা সহজ। পুলিশ তখন কিছুই করতে পারেনি, কেননা, এমপি সাহেব তাদেরকে কোন কিছু করার নির্দেশ দেননি।

ওসি সাহেবেরা সব সময়েই এমপি মহোদয়দের তোয়াজ করে চলেন। রাজনৈতিক সরকারের সময়ে এটি হয়তো একেবারে দূর করা কষ্টকর। এমপি বললে গ্রেফতার করা হয়, এমপি বললে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু, এমপির নির্দেশ না পেলে কোন কিছুই করা হয় না – এটি বাংলাদেশে হয়তো এই প্রথম।

২.এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকারদলীয় কর্মীদের দ্বারা সরকারী কর্মকর্তাদের অপদস্ত হওয়ার নানা খবর প্রায়ই প্রকাশিত হচ্ছে। বলা দরকার যে, সরকার যাদেরকে কোন না কোনভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি অতি বিশ্বস্ত মনে করছে না, তাদেরকে ওএসডি করে রাখা হচ্ছে। দলীয় বিশ্বস্ততার সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই কেবলমাত্র ডিসি, এসপি, ওসি – এই সব পদে থাকতে পারছেন। ফলে, তারাও সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন, সরকারী দলকে সন্তষ্ট রাখতে।

কিন্তু, পাবনার ডিসি কোনভাবেই কুল রক্ষা করতে পারলেন না। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের হামলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষা ভণ্ডুল হয়ে যায়। চরমভাবে লাঞ্ছিত হন জেলা প্রশাসক মনজুর কাদিরসহ অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তারা। দৈহিক নির্যাতনের শিকার হন নারী কর্মকর্তারাও।

সরকার সমর্থক পত্রিকা সমকালের রিপোর্টে বলা হয়েছে,

“প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট ইশরাত ফারজানা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি আমার ছোট সন্তানকে নিয়ে পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছিলাম। ৩ বছরের শিশুকে নিচে রেখে তৃতীয় তলায় হলে ছিলাম। এ সময় দেড়-দুইশ’ যুবক লাঠিসোটা নিয়ে স্কুলের গেট ভেঙে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায়। তারা আমার সামনে সদরের ইউএনও আবদুল হালিমকে মারতে মারতে নিচে নামায়। আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে গায়ে হাত তোলে।”

বিষয়টি মিডিয়াতে আসলে আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এই ঘটনায় তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তখন বিদেশে ছিলেন। সকলেই আশা করছিলেন, তিনি এবার লাগামহীন দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিবেন।

কিন্তু, তিনি প্রশাসনকে একটা উল্টো বার্তা পাঠালেন। প্রকাশ্যে বললেন, একহাতে তালি বাজে না। যারা সরকারী কর্মকর্তাদের মারধোর করলো, প্রথম শ্রেনীর নারী ম্যাজিস্ট্রেটের গায়ে হাত তুললো, তাদেরকে সাজা দেয়ার বদলে লাঞ্ছিত, নির্যাতিত সরকারী কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হলো। সরকারী কর্মকর্তাদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাটি ছিল স্পষ্ট ও কঠোর। তিনি বলে দিলেন, সরকারী দলের যে কেউ যা কিছু ইচ্ছা করতে পারবে, কোন ধরণের বাধা দিলে চাকরী থাকবে না।

এই সময়েই ঘটে আরো কয়েকটি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ঘটনা।

ক. রাষ্ট্রপতি ফাসির দন্ডপ্রাপ্ত ২০ জন খুনের আসামীকে ক্ষমা করে দেন। তাদেরকে আবার ফুলের মালা দিয়ে সম্বর্ধনা জানান একজন মন্ত্রী।

খ. প্রকাশ্য দিবালোকে সাংবাদিক ও টিভি ক্যামেরার সামনে আওয়ামী লীগের নেতারা পিটিয়ে হত্যা করে নাটোরের উপজেলা চেয়ারম্যানকে। সকল দৈনিক পত্রিকায় এই হত্যাকান্ডের ছবি ছাপা হয় এবং সকল টিভি চ্যানেলে পিটিয়ে মারার ভিডিও প্রচারিত হয়। ছবি এবং ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, জেলা আওয়ামী লীগের নেতা জাকির হোসেনের নেতৃত্বে পিটিয়ে ও কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী এইবার সবথেকে মারাত্মক বার্তাটি পাঠান। তিনি প্রকাশ্যে বলেন যে, এটি যে বিএনপির অন্ত:কলহের ফল নয়, তা কে বলবে! ফলে, আওয়ামী লীগের কর্মীরা বুঝে গেলো, যত বড় অপরাধই তারা করুক, এমনকি টিভি ক্যামেরার সামনে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা হলেও তাদের কেশাগ্র কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

৩. মানবদেহের যেমন নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে, তেমনি প্রতিটি সমাজেরও অপরাধ প্রতিরোধে অন্তনির্হিত শক্তি থাকে। বাংলাদেশের জন্য সেটি ছিল ধর্মীয় শক্তি। পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে কাজ করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে তরুনদের মধ্যে ধর্মপ্রবনতা বেড়েছে এবং তারা একটি সামাজিক প্রতিরোধ শক্তি হিসাবে কাজ করেছে।

কিন্তু, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত সব কিছুর বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ধার্মিক তরুনদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে কারাগারে। কোরআন শরীফের তাফসীর, ইসলাম ধর্মের উপর বিভিন্ন বই-পত্র রাখার অপরাধে প্রায়ই গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং এই সকল বইগুলোকে জেহাদী বই হিসাবে দাবী করছেন আমাদের পুলিশ কর্মকর্তারা। আসলেই এখন মানুষ কোরআন শরীফ লুকিয়ে রাখছে। যেহেতু সমাজের এই ধর্মপ্রবণ অংশটি এখন দিন কাটাচ্ছে চরম ভীতির মধ্যে, তাই তাদের পক্ষ থেকে সামাজিক অপরাধগুলোর বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ আসতো, তা আসতে পারছে না।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s