সিনেমা আবিষ্কারের ১১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও যদি সিনেমা নামক নন্দনকলার এই দিকটি আমাদের দেশে আজও উপেক্ষিত থাকে তাহলে আগামী দিনগুলোতে আদৌ আমরা সুস্থ, সুন্দর, ভালো এবং নান্দনিক ছবি নির্মাণ করতে পারব কি না সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়:বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র

বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-১ম পর্ব

চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্র

Publish On 04/11/2010 ফ্লোরা সরকার ●

‘The time of pain is the time of the making’. ~Theodorous Angelopoulas.Filmmaker, Greece.

‘নৈতিকতা হচ্ছে ভবিষ্যতের নান্দনিকতা’- ভ্লা.ই.লেনিন।

[1]বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রকে বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে আলোচনা করলে আমরা বিশ্ব চলচ্চিত্র থেকে কতটা দূরে বা কাছে অবস্থান করছি তা অনুধাবন করা সহজ হবে। দূরত্বের মাপকাঠির এই ফলাফল হয়তো আমাদের বিশ্ব চলচ্চিত্রের কাছে নিয়ে যেতে সহায়ক হবে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে তা অনুধাবন করতে পারি। কারণ সিনেমা আবিষ্কারের ১১৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও যদি সিনেমা নামক নন্দনকলার এই দিকটি আমাদের দেশে আজও উপেক্ষিত থাকে তাহলে আগামী দিনগুলোতে আদৌ আমরা সুস্থ, সুন্দর, ভালো এবং নান্দনিক ছবি নির্মাণ করতে পারব কি না সে বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায়। সন্দেহের সেই বিন্দু থেকেই শুরু করা যায়। যেহেতু বিশ্ব চলচ্চিত্রের আলোকে আমাদের আলোচনার সূত্রপাত তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত সম্যক ধারণা নেওয়ার পর আমরা তার আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করব। তাই শুরুতেই হলিউডের চলচ্চিত্রজগতে চলে যাওয়া যাক। কেননা সিনেমার সূত্রপাত ফরাসি দেশে ঘটলেও শুরুর আগেও কিছু শুরু থাকে আর সেই শুরুটা আমরা মার্কিন মুলুকেই ঘটতে দেখি।

চেষ্টাটা অনেক দিন ধরেই চলছিল। কী করে স্থির ছবিকে চলমান এবং গতিময় করা যায়-সেই সমস্যার প্রাথমিক সমাধান করলেন অ্যাডওয়ার্ড মুইব্রিজ। আদতে ব্রিটিশ হলেও থাকতেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকার সময় ১৮৭৩ সালে তিনি পরপর ২৪টি ক্যামেরা বসিয়ে একটি ছুটন্ত ঘোড়ার ছবি তুললেন। ছবিকে চলমান করার এটিই সম্ভত প্রথম প্রয়াস। মুইব্রিজ তার যন্ত্রের নাম দিলেন জুপ্রাস্কিস্কোপ। এভাবে চলন্ত ছবিকে ধরে রাখার আরও বেশকিছু যন্ত্র আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে উনণততর আরও যন্ত্র আবিষ্কার হতে থাকল। অবশেষে অগস্তে লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের নামে দুই ফরাসি ভাই মিলে তৈরি করলেন সিনেমাটোগ্রাফ। ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের সেই দিনটিতে প্রথম দর্শকরা পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে সিনেমা দেখলেন এবং সেই দিন থেকেই বিজ্ঞানী ও চলন্ত ছবির খেলনা বিক্রি করা ব্যবসায়ীদের হাত থেকে সিনেমা সেসব কুশলীদের হাতে চলে গেল যাদের আমরা বলি প্রযোজক, পরিবেশক ও দর্শক।

প্রথম দিকের বেশির ভাগ ছবি নিউইয়র্কে নির্মিত হলেও ১৯০৭ সালের দিকে ফিল্ম নির্মাতাদের চোখ পড়ল ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণে মেক্সিকো সীমান্তঘেঁষা হলিউডে। নির্বাক যুগের ফিল্ম নির্মাতাদের মধ্যে যিনি সব থেকে সৃজনক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেন সেই ডেভিড ওয়ার্ক গ্রিফিথ নির্মাণ করেন ‘বার্থ অব এ নেশন’ (এই ছবিটি গ্রিফিথকে এনে দেয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি), ইনটলারেন্সসহ আরো অনেক ছবি। ইনটলারেন্স ছবির মূল প্রতিপাদ্য ছিল-অসহিষ্ণুতাই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বড় বিষবৃক্ষ, অসহিষ্ণুতাই মানুষকে ঠেলে দেয় অশান্তি এবং হিংসার পথে। এ সময়ে ওয়েস্টার্ন ছবির চাহিদাই ছিল সব থেকে বেশি। যা পরবর্তীতে পৃথিবীর আরো দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তা ছাড়া সিরিয়াস এবং অ্যাকশনধর্মী ছবির পাশাপাশি কমেডির চাহিদাও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল যথেষ্ট।

সেই স্বর্ণযুগের কমেডি ছবির শ্রেষ্ঠতম ফসল চার্লস স্পেনসার চ্যাপলিন (চার্লি চ্যাপলিন) অভিনীত প্রথম ছবি ‘মেকিং আ লিভিং’ তৈরি হলো ১৯১৪ সালে। প্রথম দিকে অন্যের ছবিতে অভিনয় করলেও পরের দিকে নিজেই ছবি পরিচালনায় যান এবং একে একে দ্য ট্র্যাম্প, গোল্ডরাশ, মডার্ন টাইমসসহ প্রায় আশিটি ছবি নির্মাণ এবং একই সঙ্গে অভিনয় করেন। ভাঁড়ামি নয়, হাসির অন্তরালে যে করুণা গোপন থাকে সেই করুণ রসে দর্শকের মন আর্দ্র করাই ছিল চার্লির উদ্দেশ্য। সেই সময়ে আরো কিছু কমেডি অভিনেতার আবির্ভাব ঘটে যেমন-হ্যারাল্ড লয়েড, লরেল ও হার্ডি, বাস্টার কিটন।

ওয়েস্টার্ন বা কমেডির মতোই মার্কিন চলচ্চিত্রের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধারা তথ্যচিত্র। এ ব্যাপারে প্রথমেই আসে রবার্ট ফ্ল্যাহার্টির নাম। বস্তুত তিনি হচ্ছেন তথ্যচিত্রের জনক। তার সব থেকে বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘নানুক অব দ্য নর্থ’ মুক্তি পায় ১৯২২ সালে। এরপর ‘মোয়ানা’, ‘টাবু’ ‘হোয়াইট স্যাডোস অব দ্য সাউথ সি’সহ বেশকিছু তথ্যচিত্র। বিশ্বে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মনোহরণকারী প্রথম চরিত্র যদি হয় চার্লি চ্যাপলিন তাহলে দ্বিতীয়টি ওয়াল্ট ডিজনির মিকি মাউজ। অ্যানিমেটেড কার্টুন ছবির স্রষ্টা সেই ওয়াল্টার এলিয়াস ডিজনির প্রথম ছবি ‘অ্যালিস ইন কার্টুনল্যান্ড’ (১৯২৪) ব্যর্থ হলেও মিকি মাউজ চরিত্রের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ডিজনির ছবি প্রসার ঘটে যায়। সবাক যুগের আমেরিকার প্রথম ছবি ‘দ্য জ্যাজ সিঙ্গার’ মুক্তি পায় ১৯২৭ সালে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯২৯ সালের ‘মহামন্দার’ আগে পর্যন্ত গোটা মার্কিন সাম্রাজ্যে চলচ্চিত্রের যে প্রসার ঘটে তা কল্পনাতীত। তবে মন্দার খুব বেশি প্রভাব মার্কিন চলচ্চিত্রে পড়ল না। ১৯৩০ সালে নির্মিত হলো পৃথিবী বিখ্যাত ছবি লুইস মাইলস্টোনের ‘অল কোয়ায়েট ইন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ইউরোপের মতো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেভাবে না পড়ায় ছবির গতি অব্যাহত থাকল। তবে পরিবর্ধিত সমাজবোধের ঢেউ ছবির গায়ে এসে লাগল বেশ ভালোভাবেই। চল্লিশের দশকে নির্মিত হতে লাগল নতুন ধারার ছবি-‘দ্য নিও রিয়ালিজম’। এ ধারায় যোগ দিতে লাগলেন জন ফোর্ড, বিলি ওয়াইল্ডার, ওরসনওয়েল্সসহ আরো অনেক নির্মাতা। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে স্টুডিও সিস্টেমের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয় হলিউডের তথাকথিত স্বর্ণযুগ। তা ছাড়া টেলিভিশনের আবির্ভাবও সে জন্য কতকটা দায়ী। ষাটের দশকে বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক সংস্থার অধিগ্রহণ শুরু হয় চলচ্চিত্র সংস্থার ওপর। আশির দশকে বিজ্ঞাননির্ভর ছবির নতুন জোয়ার ওঠে। স্টিভেন স্পিলবার্গের মতো পরিচালকের আবির্ভাব ঘটে। নির্মিত হয় ‘ইটি’, ‘জুরাসিস পার্ক’ এর মতো বিখ্যাত ছবি। বর্তমান পর্যন্ত যা অব্যাহত আছে। তবে হলিউডি ছবির প্রধান যে বৈশিষ্ট্য প্রথম থেকে লক্ষ্য করা যায় তা হচ্ছে-বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা।

পৃথিবীর প্রথম নারী চিত্রপরিচালক একজন ফরাসি-নাম আলিস গি ব্লাশে। লুমিয়ের ভাতৃদ্বয় তথ্যচিত্র এবং বাস্তববাদী সিনেমার জন্মদাতা হলেও মেলিয়ে ছিলেন ফরাসি দেশের প্রথম গল্পনির্ভর থিয়েট্রিকাল সিনেমার নির্মাতা। প্রথম দিকে তাদের চেষ্টায় ফরাসি সিনেমা এগিয়ে গেলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ছবি করার মতো অর্থবান বড় কোনো কোম্পানি আর রইল না। কিন্তু অর্থের এই অভাবই ফরাসি সিনেমায় একটি অন্তর্বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে বড় মূলধনের অভাবে ছবি করতে যারা এগিয়ে এলেন তাদের বেশির ভাগই ছিলেন শখের বসে আসা প্রযোজক, যাদের অনেকেই আর দ্বিতীয় ছবি করেননি। পরিচালকরা পেলেন অবাধ স্বাধীনতা এবং ছবিতে শুরু হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নতুন স্টাইল। ইমপ্রেশনিজম, সুরিয়ালিজম, দাদাইজম ইত্যাদির প্রভাবে নির্মিত হলো অনেক আভঁ গার্দ ছবি যা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে চর্চার উপযুক্ত। সে সময়ের আভঁ গার্দ স্টাইলের ছবির মধ্যে রনে ক্লের ‘Entr’acte’ (১৯২৪) এবং সালভাদর দালি ও লুই বুনুয়েলের যৌথভাবে নির্মিত ‘An Andalusian Dog’ (১৯২৮) অন্যতম। ওই একই বছরে নির্মিত কার্ল থিওডর ডেয়ারের ‘The Passion of Joan of Arc’ সেই দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি।

ফরাসি দেশে সবাক চিত্র আসার পর একমাত্র জঁ ককতো ছাড়া বাকি সবাই আভঁ গার্দ ঐতিহ্য ত্যাগ করে গল্প বলার রীতিতে পূর্ণ দৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ শুরু করলেন। ফরাসি সিনেমার সবচেয়ে পরিচিত ও আলোচিত যুগ হলো ‘নুভেল ভাগ’ বা ‘নব তরঙ্গ’, যার শুরু হয় ষাটের দশকে। ‘নুভেল ভাগ’ আন্দোলনটির অন্যতম ভিত্তি ‘কলমের মতো স্বাধীনভাবে ক্যামেরা ব্যবহারের তত্ত্ব’। নব তরঙ্গপন্থীদের মতে পরিচালক একজন illustrator, creator নন। অঁদ্রে বাজ্যাঁ, বুনুয়েল, গোদার, ফ্রঁসোয়া ত্রুফো এই ধারার ছবির পুরোধায় ছিলেন। তাই গোদারের কাছে সিনেমা আবেগশূন্য বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণ আর বুনুয়েল সমাজের অন্তরসারশূন্যতা বারবার নিরাবরণ করেছেন। নব তরঙ্গ গোষ্ঠীভুক্ত না থাকলেও রবের ব্রেসঁ ছিলেন ফরাসি তথা বিশ্ব চলচ্চিত্রে একক ও অনন্য চিত্রপরিচালক। বর্তমান সময়ের ফরাসি সিনেমার সবচেয়ে স্বতন্ত্র পরিচালক রাউল রুইজ। রুইজের দেশ চিলি হলেও ১৯৭৪ সালে ফ্রান্সে আসেন এবং আধুনিক লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যে ছবি নির্মাণ করেন। এ ছাড়া আছেন জঁ ক্লোদ ব্রিসো, মোরিস পিয়ালাসহ আরো অনেকে। ভালো সিনেমা সম্পর্কে জনসচেতনতাই ফরাসি সিনেমার বড় সম্পদ।

ইতালির ছবির জগতে ‘নিউ রিয়ালিজম’ বা ‘নয়া বাস্তববাদী’ আন্দোলনের আগে অনেক ধারার ছবি প্রচলিত ছিল। যেমন পৌরাণিক ফিল্ম, কমেডি ফিল্ম, ‘ফাম ফাতাল’ ‘হোয়াইট টেলিফোন ফিল্ম’ ইত্যাদি। ফাসিতন্ত্রে দুই ধরনের ছবি তৈরি হতো-‘পিঙ্ক’ ও ‘ব্ল্যাক’। ‘ব্ল্যাক’ ফিল্ম ছিল প্রকৃত ফাসি ফিল্ম আর ‘পিঙ্ক’ ফিল্ম চলতি ভাষায় ‘হোয়াইট টেলিফোন’ নামে পরিচিত ছিল : পাতি সেন্টিমেন্ট, কোমল রোমান্স আর চড়া মেলোড্রামায় ভরা অনেকটা আমাদের দেশের তথাকথিত বাংলা ছায়াছবি এবং টিভি নাটকের মতো। তুলনামূলক শিল্পের বিচারে, নির্বাক ও ফাসিস্ত চলচ্চিত্রের চরিত্র ছিল অপেরাধর্মী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নয়া-বাস্তববাদী আন্দোলন তাকে মুক্ত করে যেখানে নিয়ে গেল সেখানে ছিল না কোনো সৌন্দর্যের স্থান। বিশ্বযুদ্ধে নির্মম পরাজয়ের পর ইতালি বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ও অবমানিত। আলবার্তো লাতুয়াদা একবার লিখেছিলেন, ‘আমাদের পোশাক শতছিন্ন? তবে দেখুক সবাই এই ছিন্ন পোশাক। আমরা পরাজিত তবে দেখা যাক এই পরাজয়ের চেহারা’। রোসেলিনি নেমে পড়লেন একেবারে রাস্তায়, আন্তোনিওনি নির্মাণ করলেন স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি ‘পিপল অব পো রিভার’। তবে নয়া-বাস্তববাদের প্রধান প্রবক্তা, দার্শনিক ও তাত্ত্বিক হিসেবে ডি সিকা এবং জাভাতিনিকেই ধরা হয়। ডি সিকার বিখ্যাত ছবি ‘বাইসাইকেল থিভস্’ সম্পর্কে ফরাসি নন্দনতাত্ত্বিক অঁদ্রে বাজাঁ বলেছেন ‘বাইসাইকেল থিভস’ বিশুদ্ধ চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রথম নিদর্শন। এতে না আছে কোনো অভিনেতা না কোনো কাহিনী না কোনো সেট। অর্থাৎ বাস্তবের নিখুঁত ভ্রম সৃষ্টিতে (তথাকথিত) সিনেমাই আর নেই। এভাবে নয়া-বাস্তববাদীদের হাত ধরে আমরা জাভাতিনি, রোসোলিনি, আন্তনিওনি, ফেলিনি, ডি সিকার মতো বিখ্যাত পরিচালকদের পাই। যাদের হাত ধরে ইতালির আধুনিক পরিচালকরা তাদের ছবি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছেন।

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পোলিশরা প্রধানত সাহিত্যনির্ভর ছবি নির্মাণ করেন। সামাজিক প্রসঙ্গটাই জরুরি নির্মাতাদের কাছে। বিষয় হিসেবে যুদ্ধকে তারা ভোলেননি। কিন্তু যুদ্ধকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হতে লাগল। পরাজয়ের মুখে আত্মোৎসর্গ রূপে নয়, জোর দেওয়া হলো জয়ের সম্ভাবনার ওপর, বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ওপর। ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাছে সম্পূর্ণ আটকে থাকা, সরকারি শাসনে নিয়ন্ত্রিত ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বড় রকমের পরিবর্তন ঘটল। এতে ছবি করিয়েদের মধ্যে একটা পারস্পরিক নির্ভরতা যেমন নিয়ে এল তেমনি পরিচালকরা প্রশাসনের কর্তৃত্বমুক্ত হয়ে কাজ করার স্বাধীনতা পেলেন। বিশ্ব পেল ওয়াজদা, রোমান পোলানস্কি, ক্রিস্তফ জানুসি, ক্রিজটফ কিয়েসলোভস্কির মতো মহান পরিচালকদের। হাঙ্গেরির ছবিগুলোতে অতীত এবং বর্তমানের বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। দৈনন্দিন সমস্যা থেকে দূরে গিয়ে সিনেমা এখানে পলায়নী-মনোবৃত্তির পরিচয় দেয়নি বরং সমকালীন সমস্যাকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে অনুধাবন করতে চেয়েছে এখানকার সিনেমা। যে কারণে গেজা রাদভানি নির্মিত ‘Somewhere in Europe’ (১৯৪২) ইতালীয় নয়া-বাস্তববাদী ছবি Rome, Open city ev Bicycle Thieves এর সমতুল্য ধরা হয়। ১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরীয় চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয় জলটান ফাবরি। ষাটের দশকে আরো কিছু তরুণ পরিচালকের আগমন ঘটে যারা পূর্বসূরিদের ধারায় ছবি নির্মাণ অব্যাহত রাখেন। চেক চলচ্চিত্রের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি জানানো হয় ষাটের দশকের গোড়ায়। এই সময়ে ফরাসি নবতরঙ্গের ঢেউ এসে লাগে সেখানে। এখানকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নারী চিত্রপরিচালক চিটিলোভা। বুলগেরীয় চলচ্চিত্র শুরু থেকেই সাহিত্যনির্ভর। যারা ছবি করছিলেন তারা বুঝে গিয়েছিলেন যে সিনেমার জন্য প্রবাদ, পুরাণ, ইতিহাস, লোককথা বা জাতীয় সংগ্রামের দিকেই হাত বাড়াতে হবে। ১৯৫১ সালে জানডভের ‘এলার্ম’ ছবি থেকেই শুরু হলো বুলগেরীয় চলচ্চিত্রের নতুন যুগ। যুগোশ্লাভিয়ার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছোট কিন্তু এই ছোট ইন্ডাস্ট্রি অনেক বড় কান্ডকারখানা করেছে। সত্তরের দশকে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে তাদের ছবি দেখাবার পর ভেনিসেই বলতে শোনা যায়-‘One of the Greats among the small.’

ইউরোপের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ডেনমার্কের কার্ল থিয়োডোর ড্রেয়ারকে নির্বাক যুগের শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৯৫৫ সালের ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভেলে তার নির্মিত ‘ওয়ার্ড’ ছবিটি পুরস্কৃত হয়। অপর একটি দেশ সুইডেনে আমরা পাই সিনেমার রাজার রাজা ইঙ্গমার বার্গম্যানকে। বার্গম্যানের ছবি সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবহিত যা একটু কম অবহিত তা হলো বার্গমানের নির্মিত বিখ্যাত ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’ ছবির সেই বুড়ো চরিত্রের ইসাক বোর্গ যিনি করেছিলেন সেই চিত্রপরিচালক ভিক্টর সিস্ট্রোমকে (১৮৭৯-১৯৬০) সুইডিশ ছবির জনক বলা হয়।

১৯০৭ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে রাশিয়ায় হাজারের বেশি কাহিনী চিত্র তোলা হয়, কিন্তু তার মধ্যে স্মরণীয় ছবি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ১৯২১ সালে লেনিনের ‘নয়া অর্থনীতি’ ঘোষণার পরপরই বিদেশী ছবির আমদানি ঘটে। একে একে মস্কো এবং দেশের অন্যত্র রাষ্ট্রীয় ও সমবায়ভিত্তিক ফিল্ম কোম্পানি গড়ে উঠতে থাকে। বিশের দশক ছিল সোভিয়েত চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ, তেমনি বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক স্মরণীয় দিকচিহ্ন। নির্মিত হলো ‘ক্রেন্স আর ফ্লাইং’ এর মতো যুগান্তকারী সৃষ্টি। আগমন ঘটল, সের্গেই আইজেনস্টাইন, আলেকজান্দার দভঝেঙ্কো, পুদোভকিনের মতো বিশাল মাপের চিত্রপরিচালকদের। আইজেনস্টাইনের বিখ্যাত মনতাজ তত্ত্ব যেন ফিল্ম ফর্ম এবং ফিল্ম সেন্সকে বদলে দিল। তার নির্মিত স্ট্রাইক, ব্যাটলশিপ পটেমকিন, ইভান দ্য টেরিবলসহ সব ছবি এখনো চলচ্চিত্র স্কুলগুলোতে ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্যে দেখানো এবং শেখানো হয়। ১৯৩০ সালে মুক্তি পায় দভঝেঙ্কোর কালোত্তীর্ণ ছবি ‘আর্থ’। পঞ্চাশের দশকে চেখভ, কুপরিন, গোর্কির পাশাপাশি শেকস্পিয়রের ধ্রুপদী সাহিত্যের চিত্ররূপ দেওয়া হয়। পুদোভকিন করলেন গোর্কির ‘মাদার’ ও য়ুৎকেভিচ ‘ওথেলো’। এর পরের প্রজন্মে আমরা তারকাভস্কির মতো বড় মাপের পরিচালককে পাই। তারকাভস্কি যেন সেলুলয়েডে মোড়া মহাকাব্যিক কবি।

আমেরিকা, ইউরোপ, পূর্ব ইউরোপ, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং সোভিয়েত রাশিয়ার চলচ্চিত্রের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও তাদের বিশ্বনন্দিত চিত্রনির্মাতাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এ পর্বের আপাত সমাপ্তি এখানে। এর পরের পর্বে আমরা এশিয়া, অফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার চলচ্চিত্র সম্পর্কে আলোচনার পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার আশা রাখছি।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: