বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?


বাংলাদেশে কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে?
মোহাম্মদ শাহজাহান

Published: 2010-10-23

ঢাকা মহানগরীতে ট্রাফিক জ্যাম

Traffic JAM in Dhaka


বেশ ক’বছর আগের ঘটনা। ঢাকার রাস্তাঘাটের চালচিত্রের উপর একটি টিভি প্রতিবেদনের রিপোর্ট দেখছিলাম। রিপোর্টার জনৈক রিকশাওয়ালাকে তিনি কেন ট্রাফিক নিয়ম ভেঙ্গে বেপরোয়া গতিতে তার রিক্সা চালিয়ে নিয়ে গেলেন এ প্রশ্ন করলে, রিক্সাওয়ালা মহোদয় বুক চিতিয়ে দুর্বিনীত ভংগীতে তাকে যে জবাবটি দিয়েছিলো, তার সে জবাবেরই অংশ উপরে উদ্বৃত এ লেখাটির শিরোনাম।

বাংলাদেশে কে নিয়ম মেনে চলে? একটি অতি স্বাভাবিক কিন্তু পীড়াদায়ক প্রশ্ন বটে। এক কথায় এর জবাব হতে পারে, না, কেউই এখানে নিয়ম মেনে চলেনা। কারণ নিয়ম ভাংগাটাই যেন এখন এখানে রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরো বিশদভাবে বললে বলতে হয়, নিয়ম কানুন যা আছে বাংলাদেশে সব কিতাব আছে, বাস্তবে ঐসব নিয়ম পালনের প্রয়োজনীয়তা কোথায়ও পরিলক্ষিত হয়না।

রিক্সাচালকের উপরোক্ত বাক্যের মাধ্যমে আমাদের দেশের বর্তমান সমাজের একটি অতি সত্য কিন্তু তিক্ততম অবস্থার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে। সোজা কথায় বলতে হয় সমাজের একেবারে উপরতলা হতে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে নিয়মনীতি ভাংগার এ প্রতিযোগিতা চলছে, অবিরাম গতিতে। আর সেকারণেই একজন রিক্সাচালক হয়েও লোকটি অত্যন্ত নির্বিকার ও দৃঢ় ভংগীতে কথাগুলো উচ্চারণ করে গেছে। রিক্সাচালক হয়েও দেশের ভেঙ্গে পড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তার এ প্রতীতি জম্মেছে যে তার এমন অপ্রিয় সত্য ভাষন শুনে কেউ একথা বলবেনা, ‘বলে কি লোকটা, চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি’। প্রকৃতপক্ষে তার এই অপ্রিয় সত্য ও বেপরোয়া মন্তব্যের মাঝেই প্রোথিত আছে, আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় এবং ধ্বসে পড়া রাজনৈতিক অবস্থার একটি বাস্তব চিত্র।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয় নিয়ম কেন ভাঙ্গা হয়, নিয়ম ভাঙ্গার সাহস কোথা থেকে আসে, তখন এর জবাবে বলা যায়, ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তা, স্বার্থপরতা এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ এবং লালসা চরিতার্থ করার বাসনা হতে, সর্বোপরি মানুষের মধ্যে পরকাল ও সর্বশক্তিমানের প্রতি ভয়ডরের অভাবেই সাধারণতঃ মানুষ নিয়ম ভাংগে, নিয়ম ভেংগে অবৈধ উপায়ে অপরের স্বার্থের হানি ঘটিয়ে বিভিন্ন সুবিধাদি হাতিয়ে নেয়। ছোট ছোট নিয়ম বা আইন ভাংতে ভাংতে একদিন সে অতি বড় ক্রিমিনাল (গডফাদার) হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তার ভয়ে কম্পমান থাকে এলাকার জনগন। সরকারের আইন কানুনের ভয়ের চাইতেও বেশী প্রভাবশালী ও ক্ষমতাময় প্রভাব বিস্তার করে এসব গডফাদারগন নিজ নিজ এলাকায়। এ মহাযজ্ঞে শক্তি ও সাহস যুগিয়ে চলে আমাদের বর্তমান সমাজের অস্থিরতা, নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক পটভূমি, সরকারের কোন কোন মন্ত্রী-উপদেষ্টা কর্তৃক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্বন্ধে অসত্য ও বিরূপ মন্তব্য করে অন্যায়কারীদেরকে আস্কারা দেয়া, ভগ্নপ্রায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো ইত্যাদি। আজ যারা সমাজের উচ্চাসনে বসে আছেন, অলংকৃত করে আছেন দেশের বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বড় বড় পদ, অথবা বড় বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতি, তাঁরা কেউই (হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া) দেশের পবিত্র সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়মনীতি ভাংগার ক্ষেত্রে অপর কারো থেকে পিছেয়ে নেই।

নিয়ম ভাংগার এ ম্যারাথন দৌড়ে সবাই চায় তার সামনের ব্যক্তিটিকে কিভাবে ল্যাং মেরে পিছিয়ে দেয়া যায়, কিভাবে তার প্রতিবেশীকে টাকা পয়সায়, অর্থ-সম্পদে, সামাজিক প্রতিপত্তিতে, দৈনন্দিন আদান প্রদানে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া যায়, কিভাবে এমন ক্ষমতাধর হওয়া যায় যে, সমাজের অন্য সবাইকে তার পেছনে জ্বি হুজুর, জ্বি হুজুর বোল বলিয়ে নিজেকে একজন কেউকেটা জাতীয় কিছু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়। নিয়ম ভাংগার এই দৌড়ে তার দ্বারা সমাজে কি কি সব অনাচার ও অপরাধ ছড়াচ্ছে,বা দেশ ও জাতির জন্য তা কি ভয়াবহ পরিনাম ডেকে আনছে, তা সে ভাবতেও চায়না, বরং সত্যি কথা বলতে কি, দেশের চাইতেও সে এখানে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থটাকেই বড় করে দেখছে। তার এই স্বার্থপর নীতি চরিতার্থ করার পথে সে যাকেই পাবে তাকেই কুচলে দিতে তার বিবেকে এতটুকু বাঁধবেনা, হোক না সে আপন রক্ত সম্পর্কেরই কেউ, নিজের মায়ের পেটের ভাই, স্বামী (মহিলার ক্ষেত্রে), কিংবা স্বয়ং তার জম্মদাতা অথবা জম্মদাত্রী মা।

যারা শুধুমাত্র নিজ স্বার্থ চরিতার্থের জন্য, নিজের ভবিষ্যৎ আরাম আয়েশের পথ সুগম করার লক্ষ্যে সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধভাবে অর্থের পাহাড় গড়ে, এবং অন্যদিকে তার উপর ন্যস্ত দায়িত্বে অবহেলা করে সরকার তথা দেশের জনগনের অর্থ এবং সম্পত্তির সীমাহীন অপচয় করে চলে, তারা কোনভাবেই রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রের বড় বড় পদ দখল করে রাখার যোগ্য হতে পারেনা। বরং তাদের স্থান হওয়া উচিৎ পুরান ঢাকার লোহার গেট দেয়া লাল ইটের তৈরী বড় দালান। তাদের প্রথম অপরাধ, তারা জনগনের খেদমতের প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় বসে জনগনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতায় লিপ্ত হয়। তাদের দ্বিতীয় অপরাধ, তারা অসৎ উপায়ে দেশের খেটে খাওয়া জনগনের ট্যাক্সে গঠিত সরকারের তহবিল তসরূপ করে দেশকে আরো গরীব হবার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়, এবং তাদের সবচেয়ে বড় অপরাধ, তারা উচ্চপদস্থ কর্মচারী হয়েও অসৎ পন্থা অবলম্বন করেন বলে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অন্য সব কর্মচারীগনও অনিয়মের গলিঘুপচিতে চলতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং তাদের বসদের পদাংক অনুসরণ করে গোটা সিস্টেম এর মধ্যেই অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, এবং অসততার সয়লাব ক্যান্সারের মত ছড়িয়ে দিয়ে, দেশের সার্বিক প্রশাসন ব্যবস্থাকে একেবারে পংগু করে ছাড়ে।

এটাতো একটি সহজ সরল বিষয় যে, কোন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্তা যদি নিজে ঘুষ খেতে অভ্যস্ত হন, তবে ক্রমে ক্রমে তার অধীনস্থ সব কর্মকর্তা এবং কর্মচারীরাই ঘুষ খাওয়াটাকে জায়েজ মনে করে নির্বিবাদে সে অপকর্মটিকে নিজেদের দৈনন্দিন অফিসিয়াল কর্মসূচীর একটি অংগ বানিয়ে নিবে। ঠিক যেমন একজন পিতা যদি নিজে নামাজী না হন তাহলে তার সন্তান সন্ততি কেউই নামাজী হতে পারেনা। দু’টি ক্ষেত্রেই পরবর্তীদের চাইতে পূর্ববর্তীদের পাপ দ্বিগুন হবে, কারণ প্রথমতঃ বড় হিসাবে তাদের দায়িত্ব ছিল অন্যায় অনিয়মকে প্রশ্রয় না দেয়া, কোথাও কোন অন্যায় ঘটতে দেখলে তা রোধে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া। তাতো তিনি করেনই নি, বরং উল্টো নিজেই অনিয়মের পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছেন, এবং এভাবে তার অধীনস্থদেরও এর প্রতি আহবান করেছেন। ফলে তারাও তাকে অনুসরণ করেছে। ফলশ্রুতিতে নিজের পাপের বোঝা যেমন তাঁরা কাঁধে নিচ্ছেন তেমনি অপরের করা পাপেরও সমান অংশীদার হচ্ছেন। পবিত্র হাদিস শরীফেও আছে, মানুষের একাধারে করতে থাকা ছোট ছোট অন্যায় বা ভূলগুলোই ক্রমান্বয়ে তাকে বড় অন্যায়ের প্রতি টেনে নিয়ে যায়। আর তার দ্বারা সংঘটিত অন্যায় কাজ তার উত্তরসূরীদের মাঝে সংক্রমনে যেহেতু তারই অবদান বেশী, তাই পরবর্তিদের অন্যায় কর্মের পাপের বোঝা অন্যায়কারীর সাথে সাথে তাদের উপরও সমান ভাবে বর্তাবে।

রিক্সাওয়ালার উচ্চারিত সে কথাটুকুতে ফিরে যাই। একমাত্র ট্রাফিক নিয়মকানুন ভাংগার ক্ষেত্রেই যদি একটু তীক্ষ্ণ নজর দেয়া যায় তো দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ নিয়ম ভাংগার ক্ষেত্রে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপের শিরোপা জিতে নিয়েছে। দূর্নীতিতে বিশ্বসেরা হওয়ার রেকর্ড তো কাগজে কলমে বেশ কয়েকবারই হতভাগা এ দেশের কপালে জুটেছে। ৫/৬ বছর পুরনো এক সমীক্ষা মতে ঢাকা শহরে প্রায় চার লক্ষ রিকশার কোন বৈধ লাইসেন্সই নেই। এভাবে খোঁজ নিলে দেখা যাবে অন্যান্য যানবাহনেরও বহু সংখ্যকের বৈধ লাইসেন্স ও জরুরী কাগজপত্রে ভীষন ঘাটতি রয়েছে। কাগজপত্র থাকলেও সেসব কতটুকু খাঁটিঁ সে ব্যাপারটিও আবার বিবেচনার দাবী রাখে। অসহ্য ট্রাফিক জ্যামের কারণে বাসে করে মিরপুর হতে গুলিস্তানের দূরত্ব পাড়ি দিতে আপনার কম পক্ষে দেড় থেকে দু’ ঘন্টা সময় লাগবেই। অথচ জ্যামবিহীন রাস্তায় এ দূরত্ব অতিক্রম করতে আধা ঘন্টার বেশী সময় লাগার কথা নয়। আবার নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে এ দেড় দু’ ঘন্টা সময়ে একজন বাসযাত্রীকে কি কি ভোগান্তির সম্মূখীন হতে হবে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নীচে দেয়া গেলঃ

বাস, কার বা সি.এন.জি-গুলোর যথাস্থানে না দাঁড়িয়ে প্রায় সিকি কি.মি. জুড়ে এলোমেলোভাবে দাঁড়ানো, সি.এন.জি/ট্যাক্সি ক্যাবগুলো মিটার ব্যবহার না করা ও মিটারের চাইতে দ্বিগুন-তিনগুন ভাড়া হাঁকা, ট্রাফিক রুলের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গাড়ী চালানো, সামনের গাড়ীকে ওভারটেক করতে গিয়ে মারাত্মক সব দুর্ঘটনার জম্ম দেয়া (কদিন আগের সাভারের আমিনবাজারের দুর্ঘটনাটি ছিল এ ওভারটেকেরই করুণ পরিণতি), নির্দিষ্ট স্টপেজে না দাঁড়িয়ে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, বিরতিহীন লেবেল এঁটে দিয়ে যাত্রীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নিয়ে প্রায় সবক্ষেত্রেই সবিরাম গাড়ি চালানো, অফ-পিক আওয়ারে স্টপেজগুলোতে দু’মিনিটের বিরতিস্থলে দশ-পনের মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ানো, মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে বাস চালানো, পুরুষ যাত্রী কিংবা বাস চালক নির্বিশেষে মহিলা সীটের প্রতি কোন সম্মান না দেখিয়ে, নারী-পুরুষের ঠেলাঠেলিতে আর গাদাগাদিতে গাড়ীতে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি, কোন স্টপে যাত্রীদের অবতরন শেষ না হতেই গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে দেয়া যাতে করে নারী ও শিশু যাত্রীরা অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়, মা-বোনদের হাত ধরে হেলপারদের অযথা টানাহেঁচড়া করার অশোভনীয় দৃশ্য।

আরো আছ। মটরযানের সাথে পাল্লা দিয়ে রিক্সাগুলোর মাঝরাস্তা বরাবর অথবা রাস্তার প্রায় সবটুকুই দখল করে চলাচল করা, যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে উল্টো তাদেরকেই দু’কথা শুনিয়ে দেয়া, কে কার আগে গন্তব্যে পৌঁছাবে এ প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সিগন্যালের মোড়ে চতুমূর্খী রিক্সা, বাস ও কারের জট পাকিয়ে দিয়ে ত্রাহি মধূসুদন অবস্থার সৃষ্টি, আর কতো বলবো? একবিংশ শতাব্দিতে এসেও ঢাকা শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যে এখনো মান্ধাতা আমলেরই প্রতিনিধিত্ব করে চলছে, সে ব্যাপারটি দেখার ও যেন কেউ নেই। রাস্তাঘাটের হতদরিদ্র অবস্থার কথা এখানে আর বলছিনা, মনে হয় সময় এসেছে, নাগরিকদের নাগরিক সুবিধার অবর্তমানে সরকারকে ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করার জোর প্রচারণা চালানোর। সেদিন বেশী দূর নয়।

মহানগরীর রাজপথে চলাকালীন যাত্রীসাধারণের দূর্ভোগের একটি খন্ডচিত্র আমি আমার স্বল্পজ্ঞানের পরিধিতে সবার জন্য তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ফিরিস্তিখানা আর বেশী দীর্ঘ করে ট্রাফিকের যন্ত্রনায় এমনিতেই কাতর নগরবাসীর মনের জ্বালা আর বাড়াতে চাইনা। ‘কোন হালায় নিয়ম মাইন্যা চলে’, জনৈক রিক্সাচালকের এ উক্তির সূত্র ধরে আগামীতে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের আরো কিছু অনিয়ম তথা নিয়ম ভাংগার ইতিকথা সহৃদয় পাঠক-পাঠিকাবৃন্দের সাথে সমভাবে ভাগাভাগি করে নেয়ার ইচ্ছা রেখে শেষ করছি।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা


অর্থনীতি : উদীয়মান শক্তি আফ্রিকা

আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক
০০ জাকিরুল ইসলাম

মহামন্দার ধাক্কায় ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় ধনী রাষ্ট্র যেখানে ধরাশায়ী সেখানে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগাণ্ডায় প্রবৃদ্ধি অর্জনের হার ২ শতাংশ যা তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর চেয়েও বেশি। চলতি এবং আগামী ২০১১ সালে এ হার আরো বেশি হবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতি বিশেস্নষকরা। আইএমএফের ভবিষ্যদ্বাণী মতে উলিস্নখিত সময়ে আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ যা এশিয়ার বাইরের কোন অঞ্চলের চেয়ে সর্বাধিক। এমনকি ব্রাজিল, রাশিয়া, মেক্সিকো ও ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর চেয়েও বর্ধিত অংকের।

এ প্রসঙ্গে আইএমএফ যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ব্যাখ্যা করেছে তা হলো মাথাপিছু আয়। দেখা গেছে, আফ্রিকানদের মাথাপিছু গড় আয় ভারতীয়দের চেয়ে বেশি। আফ্রিকা ডজনখানেক দেশে জাতীয় মাথাপিছু গড় আয় চীনের চেয়েও বেশি। আরো আশ্চর্যের বিষয় আফ্রিকার দেশগুলোতে লোভনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের নেই তেল ও হীরার মতো কাঁচামালের বিকিকিনি। গত চার বছরে আফ্রিকার দেশগুলোতে যে জিডিপি অর্জিত হয়েছে তার দুই তৃতীয়াংশের মূলে ছিল ব্যক্তি পর্যায়ের পণ্য উৎপাদন এবং সেবাখাত।

গত বছর বিশ্বজুড়ে মহামন্দা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্ব মিডিয়ার নজর কেড়েছে এশিয়ার দুই দেশ চীন ও ভারত কিন্তু আফ্রিকার কোন কোন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঈর্ষণীয় হারে অর্জিত হলেও তা থেকে গেছে সবার অগোচরে। দুনর্ীতির রাহুগ্রাস সত্ত্বেও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব আর তাতে মূল ভূমিকা রেখেছে বিনিয়োগবান্ধব অবকাঠামো। তাই কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) সংশোধিত রিপোর্ট যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে তা রীতিমতো হতবাক করার মতো। রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রেট লেকের পাশর্্ববতর্ী বিশেষ করে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় এমনকি হর্ন অব আফ্রিকা (আফ্রিকার সৃঙ্গ) নামে পরিচিত খরাপীড়িত অঞ্চলে তাক লাগানো প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। এদেশের অর্জিত প্রবৃদ্ধি এশিয়ার শক্তিধর দুই দেশ চীন ও ভারতকেও চমকে দিয়েছে।

আইএমএফ রিপোর্টে বলা হয়েছে বিশ্বব্যাপী তাতে আফ্রিকার একশ কোটির মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতিমধ্যে পেঁৗছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। অবাক করার মতো বিষয়, মধ্য আয়ের শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে এমন লোকের মধ্যে বেশিরভাগই শিক্ষক, ট্যাক্সিচালক, গৃহপরিচারিকা এমনকি রাস্তার ধারে অস্থায়ী অবকাঠামোতে বসে ব্যবসা করে এমন ক্ষুদে দোকানীর সংখ্যাও অনেক।

আফ্রিকা রাইজিং গ্রন্থের লেখক বিজয় মাজাবান তার ব্যাখ্যায় উলেস্নখ করেছেন, দুনর্ীতি ও অপশাসনের জন্য বদনাম থাকলেও তুলনামূলকভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে আফ্রিকায় ঘটে গেছে অর্থনৈতিক বিপস্নব। আর তার সাথে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো। ফলে কেনিয়া ও বোতসোয়ানার মতো দেশে বিশ্বমানের স্কুল ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এসেছে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা।

বিশ্বব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ‘আফ্রিকা ইনফ্রাস্টাকচার কান্ট্রি ডায়াগনস্টিক’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মাধ্যমে আফ্রিকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ শতাংশ। তাছাড়া এয়ারলাইন্স ও স্থলপথে পণ্য পরিবহন এবং টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ার বাজারে ছাড়ায় দ্রুত পরিবর্তন এসেছে সংশিস্নষ্ট খাতগুলোতে। যেমনটি হয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে চীনে এবং ভারতে। আরো একটি বিষয় উলেস্নখ্য ঐ সমীক্ষায় বলা হয়েছে বুরুন্ডি ও মালাউয়ে দক্ষ জনশক্তির বড়ই অভাব। তবে ঘানা, বোতসোয়ানা ও দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থা ভিন্ন। উলিস্নখিত দেশ তিনটিতেই শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি দিন দিন বেড়েই চলছে। কয়েকটি রিপোর্টে এ ব্যাপারে মিলেছে অভূতপূর্ব তথ্য। জানা গেছে, শুধু গত বছরই বিদেশে শিক্ষা সমাপনী শেষে নাইজেরিয়ায় ফিরেছে ১০ হাজার দক্ষ ভোক্তাজীবী। এঙ্গোলায় প্রতি বছর ফিরছে উলেস্নখযোগ্য দক্ষ পেশাজীবী, যারা দেশে ফিরে স্থানীয় শ্রমবাজারে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। এসব পারিপাশ্বর্িক অবস্থায় বিশ্বের কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণা, ভারতের পরই দক্ষ জনশক্তির অঞ্চল হবে আফ্রিকার দেশগুলো। যার পথ বেয়ে দ্রুতই আরো বিকশিত হবে অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। অক্সফোর্ডের অর্থনীতিবিদ পল কোলিয়ারের সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা রিপোর্টে বিশেষজ্ঞদের ধারণাকে আরো পাকাপোক্ত করেছে।

কেননা তার রিপোর্টে উলেস্নখ করা হয়েছে ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ৯৫৪টি আফ্রিকান কোম্পানী অর্জিত মুনাফা গড়ে ১১ শতাংশ। একই সময়ে সমান সংখ্যক চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশীয় কোম্পানীর চেয়ে যা বেশি। কারণ হিসেবে দেখানো হয়, এশিয়ার তুলনায় সহজলভ্য ও কম খরচে শ্রমিক নিয়োগ। এর মধ্যে আফ্রিকান মোবাইল অপারেটরদের মুনাফার হার বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একইভাবে ইউনিলিভার, নেসলে ও সুইসপোর্ট ইন্টারন্যাশনালের মতো বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর মুনাফার পরিমাণও ঈর্ষণীয়। তাই ২০০৮ সালে সারাবিশ্বে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ২০ শতাংশ কমে গেলেও আফ্রিকায় এ চিত্র উল্টো। ঐ বছর আফ্রিকার দেশগুলোতে বরং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। অর্থের অংকে যা ৬১ দশমিক ৯ বিলিয়ন (৬ হাজার ১৯০ কোটি) ডলার। সর্বশেষ শিল্প ও বাণিজ্য বান্ধব আফ্রিকা দুনর্ীতির বেড়াজাল থেকে বের হয়ে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিধর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

বড় হলে দুরারোগ্য রোগের কারণ হবে ক্ষুধামান্দ্য : একটি শিশুকে লেখাপড়ায় ‘ফার্স্ট’ করানোর পেছনে না ছুটে তাকে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার পেছনে সবার দৃষ্টি দেয়া উচিত


বড় হলে দুরারোগ্য রোগের কারণ হবে ক্ষুধামান্দ্য

নগর শিশু

Nogor Sishu নগর শিশু

নগর শিশুর প্রতিদিন- ৪

০০ আসিফুর রহমান সাগর

ব্যস্ত শহর জীবনে মা-বাবার সবচেয়ে বড় সমস্যা কি? সবাই একবাক্যে বলবেন, ‘আমার সন্তান কিছুই খেতে চায় না। ডাক্তার দেখিয়েও কোন লাভ হয় না। কি যে করি?’

শিশু খেতে চায় না,- এ অভিযোগ বোধকরি শহরের প্রতিটি মা-বাবার। আলাপকালে এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক মনজুর হোসেন বললেন, ‘শিশুরা খেতে চায় না পিতা-মাতার এ অভিযোগের অন্ত নেই। কিন্তু কেন শিশু খেতে চায় না সেটা কি তারা ভাবেন? খেলাধুলা করলে, ছুটোছুটি করলে শিশুদের খাওয়ার চাহিদা বাড়ে, কিন্তু শহরের শিশুদের খেলাধুলা আর ছুটোছুটি করার সে সুযোগ কই? শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অভাবে শিশুরাও অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। প্রতিদিন দৌড়াদৌড়ি, হুটোপুটি না করলে শরীরের কোন পরিশ্রম হয় না। ফলে তাদের খিদেও পায় না। খিদে না পাওয়া, কম খাওয়া আর খেলাধুলার অভাবে এই শিশুদের মধ্যে ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। ফলে মায়েরা দিনরাত দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ সমস্যা বড়দের তৈরি করে দেয়া তার জীবন-যাপন পদ্ধতির। বেশিরভাগ বাবা-মাই জানেন না যে, শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণেই শিশুর মধ্যে এ ধরনের ক্ষুধামান্দ্য দেখা দেয়। শিশু বয়সের এই সমস্যা বড় হওয়ার পর গুরুতর অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং যারা একটি শিশুর বৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অর্থাৎ মা-বাবা, স্কুল কতর্ৃপক্ষ তাদের আরো বেশি দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে। একটি শিশুকে লেখাপড়ায় ‘ফার্স্ট’ করানোর পেছনে না ছুটে তাকে সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, বুদ্ধিমান মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার পেছনে সবার দৃষ্টি দেয়া উচিত বলে মত দেন শিশু বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মনজুর হোসেন বলেন, ক্ষুধামান্দ্যর পাশাপাশি স্কুলে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ‘ওবেসিটি’ বা ওজন বেড়ে যাওয়া সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করছে। শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিক খাবার না খেয়ে ‘ফাস্ট ফুড’ আসক্তির ফলেই ‘ওবেসিটি’ হচ্ছে। তিনি জানান, এর ফলে শিশুদের মাঝে দেখা দিচ্ছে পুষ্টিহীনতা। তারা দিন দিন নির্জীব হয়ে পড়ছে। যেকোন কাজে বা খেলাধুলায় আগ্রহ হারাচ্ছে তারা। এর ফলে শিশুদের শ্বাসকষ্ট, এজমার সমস্যা দেখা দেবে। এই শিশুরা বড় হলে তাদের মাঝে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি হবে। যার কারণে উচ্চ রক্তচাপসহ হার্টের নানা রোগ দেখা দেয়ার আশঙ্কা থাকে।

শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের ভবিষ্যৎকে এই রোগভোগের দিকে ঠেলে না দিয়ে এখন থেকেই সচেতন হতে হবে। একটি শিশু তার স্কুলেই দিনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। ফলে স্কুলে শিশুটির জন্য প্রতিদিন শারীরিক পরিশ্রম হয় এ ধরনের খেলার ব্যবস্থা রাখতে হবে। খোলা মাঠ না থাকলে ইনডোর খেলা যেমন টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল প্রভৃতি খেলার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। এতে তাদের শারীরিক পরিশ্রম হবে।

ডা. মনজুর বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষের উচিত স্কুলে খেলাধুলার পাশাপাশি ক্যাম্পিং ও আউটিং-এর ব্যবস্থা রাখা। এতে শুধু নির্দিষ্ট সময় নয়, একটা দীর্ঘ সময় ধরে কাজের অভিজ্ঞতা হবে শিশুদের। এটা তার মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধির সহায়ক। এতে শিশু আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠবে।
——————————————————————————————————————————

Nogor Sishu নগর শিশু

Nogor Sishu নগর শিশু

রাজধানীর শিশুপার্ক ও শিশুদের বিনোদন

পবিত্র দুই ঈদ ও জাতীয় উৎসব উদযাপনের সময় রাজধানীর শিশুপার্কগুলিতে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এই পার্কগুলিই তাহাদের চিত্ত-বিনোদনের প্রধান ভরসা হইয়া ওঠে। এক রিপোর্টে দেখা যায় যে, শাহবাগস্থ শহীদ জিয়া শিশুপার্কে সাধারণ কর্মদিবসে নিম্নে ১০ হাজার এবং ছুটি বা উৎসবের দিনগুলিতে দুই লক্ষ টাকারও বেশি আয় হয়। কিন্তু আয় অনুযায়ী বিনোদনের সুযোগ-সুবিধা তো বাড়েই না, বরং দিন দিন তাহা আরও সংকুচিত হয়। অভিভাবকদের এ সংক্রান্ত অভিযোগের অন্ত নাই। আলোচ্য শিশুপার্কটি অত্যন্ত সুপরিচিত হইলেও জরাজীর্ণ রাইডগুলির কারণে এখন অনেকের কণ্ঠে ধ্বনিত হইতেছে হতাশার সুর। অধিকাংশ রাইড মেয়াদোত্তীর্ণ, অনাকর্ষণীয় ও বিপজ্জনক। মেরামত বা জোড়াতালি দিয়া আর কতদিনই বা চালানো যায়! টগবগ টগবগ ঘোড়ার ভাঙ্গা হাতল, লম্ফঝম্পের ছিঁড়িয়া যাওয়া ক্যানভাস, রেলগাড়ির শতচ্ছিন্ন আসন, সন্ধ্যায় অপর্যাপ্ত আলো ইত্যাদি সমস্যা যেন দেখার কেহ নাই। নূতন রাইড সংযোজন দূরের কথা, বেবিসাইকেল চালনা ও চাকা পায়ে চলা খেলা দুইটির কোন অস্তিত্বই এখন নাই। অন্যান্য রাইডেও আছে পর্যাপ্ত খেলনার অভাব। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরিয়া শিশুপার্কের প্রকৃত সংস্কার ও উন্নয়ন না থাকায় আসলে অনেক সমস্যারই সমাধান হইতেছে না।

শুধু শহীদ জিয়া শিশুপার্কই নহে, অপরাপর শিশুপার্কের অবস্থাও তথৈবচ। অনেক শিশুপার্ক খাতা-কলমে থাকিলেও বাস্তবে তাহার অস্তিত্ব নাই বা থাকিলেও দুর্দশাগ্রস্ত। অযত্ন ও অবহেলায় প্রায় পরিত্যক্ত। রাজধানীর বিলুপ্ত শিশুপার্কগুলির একটা ছোট্ট তালিকা দেওয়া যাইতে পারে। যেমন- লালমাটিয়া নিউ কলোনি শিশুপার্ক, বকশীবাজার শিশুপার্ক, মতিঝিল বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন শিশুপার্ক, সায়েদাবাদ শিশুপার্ক, টিকাটুলি শিশুপার্ক, আজিমপুর শিশুপার্ক, উত্তরা ১ নং সেক্টরের শিশুপার্ক এবং মিরপুর ২ ও ৬ নং সেক্টরের শিশুপার্ক। এসব শিশুপার্ক রক্ষায় সংশিস্নষ্ট কতর্ৃপক্ষের পাশাপাশি স্থানীয় নাগরিকদেরও ব্যর্থতা সীমাহীন। ঈদ আসিলেই শিশুপার্কের প্রয়োজনীয়তা অধিক হারে অনুভূত হয়। ঈদ চলিয়া গেলে সারা বৎসর ইহা লইয়া কেহ তেমন আর উচ্চবাচ্য করেন না। তবে আশার কথা এই যে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ঢাকা শহরে অনেক চিত্তাকর্ষক ও মনোরম শিশুপার্ক বা বিনোদন কেন্দ গড়িয়া উঠিয়াছে। কিন্তু সেইসব স্থানে শিশু-কিশোরদের লইয়া আনন্দ-উৎসব করা ব্যয়বহুল বলিয়া বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য তাহা সাধ্যাতীত। এমতাবস্থায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ছড়াইয়া-ছিটাইয়া থাকা সরকারি পার্কগুলিকে শিশু-কিশোরদের জন্য অধিকতর বিনোদন উপযোগী করিয়া গড়িয়া তোলা একান্ত প্রয়োজন।

এই উপলক্ষে সর্বাগ্রে পার্কগুলিকে বেদখলমুক্ত করিতে হইবে। অতঃপর তাহা সুরক্ষায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণপূর্বক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলিতে হইবে। ঢাকা শহরে ৯০টিরও বেশি পার্ক রহিয়াছে। ইহার তত্ত্বাবধায়ক সিটি করপোরেশন, রাজউক, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ একেক সংস্থা। পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত পার্ক বা মাঠ-ঘাটের অভাবে রাজধানীর শিশু-কিশোররা দিন দিন ইট-পাথরের এই শহরে গৃহবন্দী হইয়া পড়িতেছে। ইহাতে তাহাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হইতেছে মারাত্মকভাবে যাহা দেশের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দুঃসংবাদবহ। গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিলে ইহা জাতীয় উন্নয়নেরও প্রতিবন্ধক। তাই এ ব্যাপারে সরকার ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঠিক উপলব্ধি ও পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত দরকার। সেই সঙ্গে সর্বসাধারণের সচেতনতা ও নাগরিক আন্দোলনও জরুরি।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

মানসিক রোগীর সংখ্যা দেশে ১৬ শতাংশ : পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী


দেশে ১৬ শতাংশ লোক মানসিক রোগী ঢাবিতে গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান

বাংলাদেশে মানসিক রোগী

mental health in bangladesh

০০ বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, বিশ্বের ৬০ ভাগ লোক বিষণ্নতায় ভুগছে। বাংলাদেশে ১৬ দশমিক ১ ভাগ পূর্ণবয়স্ক লোক এবং ১৮ দশমিক ৩৫ ভাগ শিশু-কিশোর মানসিক রোগ ও সমস্যায় ভুগছে। এত বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও তাদের চিকিৎসা দেয়ার জন্য দেশে মাত্র ১২৩জন সাইকিয়াট্রিস্ট রয়েছেন। এছাড়া, ৩২জন চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী ও ১০১জন অকুপেশনাল থেরাপিস্ট রয়েছেন।

গতকাল বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি (বিসিপিএস) এবং ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দু’দিনব্যাপী গণসচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব তথ্য দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে দু’দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা আরো বলেন, দেশে সাইকিয়াট্রিক নার্সিং এবং সাইকিয়াট্রিক সোস্যাল ওয়ার্কের জন্য কোন প্রশিক্ষণ কোর্স নেই। বাংলাদেশে মানসিক রোগ বিষয়ে অজ্ঞতা ও কু-সংস্কার এবং মানসিক রোগীর প্রতি অবহেলা সর্বত্র বিদ্যমান। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে সর্বত্র সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো: গোলাম রব্বানী, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক ড. রোকেয়া বেগম, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মো: জহির উদ্দিন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ছাড়া সুস্থ সমাজ ও জাতি গঠন সম্ভব নয়। শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় সচেতনতা গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এক্ষেত্রে পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি পারিবারিক নির্যাতন ও সহিংসতা বন্ধ করে পরিবারের শান্তি বজায় রাখার জন্য সকলের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, সরকার শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রত্যেক স্কুলে একজন করে কাউন্সেলর নিয়োগের চিন্তা করছে।

ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরাই সামাজিক সহিংসতা, দুর্নীতি, ইভটিজিং, প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত এসব লোককে সুস্থ করে সুন্দর জাতি গঠন করা সম্ভব।

উলেস্নখ্য, দু’দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় গোলটেবিল আলোচনা, কর্মশালা ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় বিভিন্ন মানসিক অবস্থা পরিমাপের সুযোগ রয়েছে।

দেশে মানসিক রোগী দেড় কোটি!

Sunday, 29 August 2010 সোলায়মান তুষার:

দেশে পরিণত বয়সের দেড় কোটিরও বেশি লোক মানসিক রোগী। বিপুল সংখ্যক মানুষ সমস্যায় থাকলেও তাদের চিকিৎসার জন্য তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। পাবনার হেমায়েতপুরে অবস্থিত একমাত্র হাসপাতালটি মানসিক রোগীর ভারে নতজানু। তাতেও নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। কয়েকটি সংস্থার জরিপে দেশে পরিণত বয়সের এক কোটি ৫৯ লাখ ১৮ হাজার ৬২৭ জন মানুষ মানসিক রোগে ভোগছেন।

এরমধ্যে গুরুতর অর্থাৎ একেবারে পাগল ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৮ জন। এছাড়া উদ্বেগজনক জটিলতায় ভোগছেন ৮৩ লাখ ৫ হাজার ৩৭০ জন। বিষণ্নতায় ভোগছেন ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ১৭৯ জন। মাদকাসক্ত পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার ২৪০ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে। সংস্থাগুলো যৌথভাবে দেশের ১৮ বয়সের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষের ওপর জরিপ করে। জরিপ অনুযায়ী ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে ১৬.১ ভাগ মানুষ মানসিক সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে উদ্বেগজনিত ৮.৪ ভাগ, বিষণ্নতায় ৪.৬ ভাগ, গুরুতর মানসিক সমস্যায় ১.১ ভাগ ও মাদকাসক্ত রোগে ভোগছেন ০.৬ ভাগ মানুষ।

জাতিসংঘের ২০০৯ সালের জরিপ অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৯০ লাখ। উইকিপিডিয়ায় ‘ডেমোগ্রাফিক অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক লেখা থেকে জানা গেছে, দেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সের লোকের সংখ্যা মোট নয় কোটি ৩৭ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৮ জন। এরমধ্যে পুরুষ চার কোটি ৭৮ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৪ জন। মহিলা চার কোটি ৫৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৪ জন। যা মোট জনসংখ্যার ৬১ ভাগ। আর ৬৫ বয়সের ঊর্ধ্বে জনসংখ্যা ৫০ লাখ ৯৩ হাজার ১৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ২৭ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৮ জন। আর মহিলা ২৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৫ জন। যা মোট জনসংখ্যার চার ভাগ। জন্মের পর থেকে ১৪ বছর বয়সের লোকজন মোট জনসংখ্যার ৩৪.৬ ভাগ। জরিপে এ সংখ্যা ধরা হয়নি। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ লোকের চিকিৎসার জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক নিয়োজিত আছেন। জরিপ অনুযায়ী প্রতি এক লাখ রোগীর জন্য মাত্র ০.৪৯ ভাগ চিকিৎসক কর্মরত। এরমধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োজিত ১১৫ জন। যা প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য ০.০৭ ভাগ। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় ইনস্টিটিউট রয়েছে একটি। তাতে ১৫০টি শয্যা রয়েছে। মানসিক হাসপাতাল রয়েছে একটি। তাতে পাঁচশ’ শয্যা রয়েছে। প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার মাত্র ০.৪ ভাগ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অন্তবিভাগ রয়েছে ৩১টি। তাতে ৮১৩টি শয্যা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভাগ রয়েছে একটি। তাতে ২০টি শয্যা রয়েছে। সাইকিয়াট্রিক চাইল্ড গাইডেন্স ক্লিনিক রয়েছে দুটি। মাদকাসক্তি বিষয়ে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে চারটি ও বেসরকারি ১৬৪টি। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সরকারি ব্যয় স্বাস্থ্য বাজেটের ০.৪৪ ভাগ।

মনোবিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষ বিচিত্র ধরনের সমস্যায় ভোগে। এরমধ্যে ৪৪টি সমস্যা উল্লেখযোগ্য। ১০ থেকে ১২টি সমস্যা গুরুতর। যেসব সমস্যা মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায় তার মধ্যে রয়েছে, উদ্বেগ, হতাশা ও বিষণ্নতা, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা, এডজাস্টমেন্ট সমস্যা, সম্পর্কগত সমস্যা, অহেতুক ভয়, বিশ্বাসের অভাব, মনোযোগের সমস্যা, মনোগত সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মেহজাবিন হক বলেন, মানসিক সমস্যা দেখা দেয়ার পর যত্ন নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার দিক দিয়ে আমরা খুবই পিছিয়ে আছি। তিনি বলেন, সমপ্রতি যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে তা একপ্রকার মানসিক রোগ থেকেই হয়েছে।

মানুষের বিকৃত রুচির দিকে প্রবণতা বাড়ছে। এটা একটা সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি তাতে কারও সুস্থ থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, আমাদের হাজারও রকম সমস্যা রয়েছে। এসবের সঙ্গে মানসিক সমস্যা যোগ দিয়ে আরও প্রবল আকার ধারণ করেছে। সমপ্রতি যেসব সমস্যা দেখা দিয়েছে তাতে এটাই উপলব্ধি করা যাচ্ছে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষা দরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র পরামর্শক সালেহ সিদ্দিকী বলেন, অনেক ধরনের রোগী রয়েছে। তিনি বলেন, যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর থেকে সমস্যা আরও বাড়ছে। মানুষ ক্রমেই শহরমুখী হচ্ছে। এরফলে প্রায় প্রত্যেকের মধ্যে একপ্রকার সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি দেশে সমপ্রতি যে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছে তা মানসিক সমস্যার জন্যই।

বিশেষ প্রতিবেদন
দীর্ঘস্থায়ী রোগ মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে

দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক রোগ মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, হূদরোগ বা ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হলে অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ একপর্যায়ে মানসিক রোগীতে পরিণত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুরারোগ্য বা প্রাণঘাতী জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের হতাশা দূর করার দায়িত্ব একাধারে চিকিৎসক, পরিবার ও সমাজের। কিন্তু দেশে এ ব্যাপারে সচেতনতা ও ব্যবস্থা কোনোটিই নেই বললেই চলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতিবছর বিশ্বের ৬০ শতাংশ মৃত্যুর কারণ হূদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও শ্বাসযন্ত্রের রোগ। সময়ের পরিবর্তনে জীবনাচরণসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশেও এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হলে মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। রোগের গতিপ্রকৃতি, বিছানায় পড়ে থাকা, চিকিৎসার ব্যয়ভার, দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রণা—এসবের কথা ভেবে মানুষ শঙ্কিত বোধ করে। অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। গভীর হতাশা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানসিক রোগেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল বলেন, দেহ-মন এক সুতোয় বাঁধা বলেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক রোগের সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা। পরিবার ও সমাজের অসচেতনতা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অমনোযোগের কারণে শারীরিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য-জটিলতা চোখের আড়ালে থেকে যায়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ কমিটির উদ্ধৃতি দিয়ে মোহিত কামাল বলেন, এই অসচেতনতা ও অমনোযোগের কারণে আগামী ১০ বছরে বিশ্বে ৩৮ কোটি ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে অসহায়ভাবে। এর বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটবে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশগুলোয়।

হূদরোগের আতঙ্ক: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হূদরোগ বিশেষজ্ঞ সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের (হূদযন্ত্রে হঠাৎ রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়া) পর অনেক মানুষ ভয় পায়। অনেকে মনে করেন, “আমি মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছি। যেকোনো সময় মারা যেতে পারি। আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারব না।” আসে হতাশা। এগুলো সাধারণ প্রবণতা।’

তিনি বলেন, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাকের পর ৭০ শতাংশ রোগীই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।

পরামর্শ দিয়ে সজল ব্যানার্জি বলেন, এসব রোগীকে জীবনের আলো দেখানোই চিকিৎসকের দায়িত্ব। হূদরোগ চিকিৎসার পাশাপাশি হতাশা কমানো চিকিৎসারই অংশ। তিনি বলেন, ‘আমি আমার রোগীদের বলি, “এটা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার যে আপনি বেঁচে আছেন। তবে আপনার ভয়ের কিছু নেই। আমার পরামর্শ মেনে চললে নতুন জীবন ফিরে পাবেন।”

সজল ব্যানার্জি জানান, রোগী ও তাঁর পরিবারের লোকদের সঙ্গে পরামর্শ (কাউন্সেলিং) করা দরকার। সময় নিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, সমস্যা সম্পর্কে বোঝাতে হবে। এই কথা বলা চিকিৎসারই অংশ।

এ বিশেষজ্ঞ জানান, একটি ক্ষুদ্র অংশের হতাশা এতটাই গভীর হয় যে তাদের মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। শরীর দেখেন হূদরোগ চিকিৎসক আর মনের চিকিৎসা করেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।

যন্ত্রণা থেকে হতাশা: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ আলী হোসেন বলেন, ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী অসহনীয় যন্ত্রণায় ভোগেন। ওষুধে অনেক সময় সেই যন্ত্রণার উপশম হয় না। ডাক্তার, হাসপাতাল, চিকিৎসা সবকিছুর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন রোগী। আসে হতাশা।

আলী হোসেন বলেন, রোগীর সমস্যা যেন পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন, সেই উদ্যোগ চিকিৎসককেই নিতে হয়। তিনি দুটি উদাহরণ দেন। অনেকের পরীক্ষার আগে হাঁপানি দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষার ভয় দূর করার দায়িত্ব নিতে হবে পরিবারকে। অনেক বয়স্ক মানুষের ক্রনিক ব্রংকাইটিস আছে। শীতের সময় তা বাড়ে। অনেক সময় মানসিক কারণেও রোগটি বেড়ে যায়। সুতরাং পরিবারের এখানেও দায়িত্ব নেওয়ার আছে।

দীর্ঘদিন থেকে যক্ষ্মা রোগীদের চিকিৎসা করছেন আলী হোসেন। তিনি বলেন, এমডিআর যক্ষ্মায় (মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট—বহু ওষুধ প্রতিরোধী) আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে হতাশ হয়ে পড়েন। নিয়মিত ১৮ থেকে ২৪ মাস ওষুধ খেতে হয়। ওষুধের খরচ, হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যাতায়াত রোগী এবং পরিবারকে হতাশ করে তোলে। আলী হোসেন বলেন, এসব রোগী ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানো চিকিৎসক ও সমাজের দায়িত্ব। শুধু ওষুধ বা অস্ত্রোপচারে মানুষ সুস্থ হয় না। মানসিক সহায়তা বড় দরকার। প্রয়োজনে রোগীকে মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে।

সমাজের মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আলী হোসেন আরও বলেন, সমাজেরও প্রস্তুত হওয়ার দরকার আছে। কেউ মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে গেলে অনেকেই তাঁকে মানসিক রোগী বা ‘পাগল’ ভাবতে শুরু করেন। তাঁর মতে, এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।

স্থূলতা থেকেও বিষণ্নতা: বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত মোটা মানুষ কোনো কাজ ঠিকমতো, সময়মতো করতে পারে না। কাজের মান ঠিক থাকে না। মোটা মানুষ এ জন্য অনেক সময় পিছিয়ে পড়েন। এসব কারণে অনেকে সমাজ ও পরিবারের কাছে নিজেকে অপাঙেক্তয় মনে করে। একসময় তারা হতাশ হয়ে পড়ে।

খাজা নাজিমউদ্দিন বলেন, ঘামের কারণে অতিরিক্ত স্থূল মানুষের শরীরের অনেক স্থানে ঘা বা চর্মরোগ হয়। সহজে তা ভালো হয় না। ডায়াবেটিস রোগীদের বারবার প্রস্রাব করতে হয়। অনেকের রাতে ভালো ঘুম হয় না। এ থেকেও হতাশা জন্মে।

এ দেশে স্থূলতা বিষয়ে পরিসংখ্যানের ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন খাজা নাজিমউদ্দিন। তবে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থূলতায় আক্রান্তের হার দ্রুত বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, স্থূলতার জন্য কাজ করতে না পারা মানুষ শুধু খায় আর ঘুমায়। এতে তাদের খাওয়া বেড়ে যায়। একসময় তারা মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।

মোটা মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি—এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে নাজিমউদ্দিন জানান, বাংলাদেশে প্রায় ছয় শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছে।

মোহিত কামাল বলেন, প্রতি চারজন ডায়াবেটিস রোগীর মধ্যে একজন বিষণ্নতায় ভোগে। বিষণ্নতার কারণে তাদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে ৩০ শতাংশ। আবার ডায়াবেটিসের সঙ্গে বিষণ্নতা যুক্ত হলে চিকিৎসা-খরচ বেড়ে যায় ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ।

এসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সবাই একবাক্যে বলেছেন, ক্লিনিক ও হাসপাতালে কাউন্সেলিংয়ের আয়োজন বাড়াতে হবে। এ ছাড়া জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগকে ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য শেয়ার বাজার Jahan Hassan Ekush bangla desh Share Market

৭০ কোটি টাকার শেয়ার বাজারে ছেড়ে তুলে নিতে যাচ্ছে সাড়ে নয়শ’ কোটি টাকা : রাতারাতি এই অর্থের মালিক হবেন তিনটি পরিবার।


৭০ কোটি টাকার শেয়ার ছেড়ে তুলে নিচ্ছে হাজার কোটি

ঢাকা ষ্টক একচেঞ্জ

ঢাকা ষ্টক একচেঞ্জ


এম আবদুল্লাহ
দেশের পুঁজিবাজারে শেয়ার সঙ্কট ও বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহকে পুঁজি করে নবাগত কোম্পানিগুলো লুটে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। প্রিমিয়াম বাণিজ্য ও বুক বিল্ডিং পদ্ধতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ফতুর করা হচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের। এর মধ্যেই ঝুঁকির মুখে পড়া বাজারকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে আরও নাজুক পরিস্থিতির দিকে। সর্বশেষ বাজারে শেয়ার ছাড়ার অনুমতিপ্রাপ্ত দুই কোম্পানি মবিল-যমুনা লুব্রিকেন্ট ও এম আই সিমেন্ট ৭০ কোটি টাকার শেয়ার বাজারে ছেড়ে তুলে নিতে যাচ্ছে সাড়ে নয়শ’ কোটি টাকা। ১০ টাকা ফেসভেল্যুর শেয়ারের সঙ্গে প্রিমিয়ামের নামে যোগ করা হচ্ছে এক হাজার থেকে চৌদ্দশ’ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি অর্থ। দুই কোম্পানি সাড়ে নয়শ’ কোটি টাকায় ৭ কোটি শেয়ার বিক্রি করলেও বিনিয়োগকারীরা মুনাফা পাবে ৭০ কোটি টাকার ভিত্তিতে। বাকি ৮৮০ কোটি টাকাই যাবে কোম্পানি দু’টির পরিচালকদের পকেটে। রাতারাতি তারা এই অর্থের মালিক হবেন। দুই কোম্পানির এই অর্থের প্রায় পুরোটাই পাবে তিনটি পরিবার। মবিল-যমুনার ২৫ শতাংশ পাবে রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা ওয়েল কোম্পানি। আর এ সুবাদে সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে সহজেই সবকিছু অনুমোদন করে নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কোম্পানি দু’টিতে পরিচালকদের নিজস্ব বিনিয়োগের পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা। পুনর্মূল্যায়নের নামে সম্পদের অতিমূল্যায়ন, মনগড়া লাভ দেখিয়ে নিজেদের নামে বোনাস শেয়ার ইস্যু করে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর মতো নানান কৌশলে পুঁজিবাজারে থেকে মোটা দাগে অর্থ তুলে নেয়া হচ্ছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বর্তমান বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারকে অতিমূল্যায়িত এবং ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করলেও সেই অতিমূল্যায়িত কোম্পানিগুলোর উদাহরণ টেনেই নতুন কোম্পানি উচ্চহারে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতি অনুযায়ী নির্দেশক মূল্য নির্ধারণে একই খাতের অন্য কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য ভিত্তি হিসেবে ধরার নিয়ম থাকায় পরিকল্পিতভাবে ওইসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়ানোর ঘটনাও ঘটছে বলে বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কম সময়ে অধিক লাভবান হওয়ার স্বপ্নে সারাদেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী নিজেদের সব সঞ্চয় নিয়ে এখন শেয়ারবাজারের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এরই সুযোগ নিচ্ছে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়াধীন কোম্পানিগুলো।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ আবু আহমদ এ প্রসঙ্গে আমার দেশকে বলেছেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের লাভবান করার কথা বলে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে উল্টোপাল্টা হচ্ছে। বাজারে শেয়ার স্বল্পতার সুযোগ নিচ্ছে কোম্পানিগুলো। পর্যাপ্ত শেয়ার থাকলে এত উচ্চ প্রিমিয়ামের মাধ্যমে এত টাকা বাজার থেকে তুলে নিতে পারতো না। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সভাপতি শাকিল রিজভী এ ব্যাপারে আমার দেশকে বলেন, প্রিমিয়ামের নামে শত শত কোটি টাকা তুলে নেয়ার বিষয়টি আমাদেরকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এ ব্যাপারে আমি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্যও বলেছি। তিনি বলেন, বুক বিল্ডিংয়ের বিদ্যমান পদ্ধতি পুনর্মূূল্যায়ন করা এবং প্রিমিয়াম বাণিজ্যের লাগাম টেনে ধরা উচিত। এদিকে প্রিমিয়ামসহ যে মূল্যে শেয়ার ছাড়া হবে সেই দরকে ভিত্তিমূল্য ধরে পরবর্তীতে মুনাফা বণ্টনের বিধান করা যায় কিনা তাও ভেবে দেখার কথা বলেছেন ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা। নতুন অনুমোদনপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলো এ পর্যন্ত অর্জিত মুনাফাকে পরিশোধিত মূলধন আকারে শেয়ারে পরিণত করেই যেখানে বাজারে আসছে, সেখানে কোন যুক্তিতে তারা এক হাজার থেকে চৌদ্দশ’ এমনকি আঠারোশ’ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করবে—এ প্রশ্ন উঠেছে জোরেশোরে। এর আগে ডাইরেক্ট লিস্টিং-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়া খুলনা পাওয়ার কোম্পানি (কেপিসিএল) ১০ টাকার শেয়ার প্রিমিয়ামসহ ১৯৪ টাকা ২০ পয়সায় বিক্রি করেছে। এ শেয়ার এখন লেনদেন হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। বিনিয়োগকারীরা এ নিয়ে হা-হুঁতাশ করেও কোনো কিনারা পাচ্ছেন না।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি : বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি একটি নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করে প্রাইস ডিসকোভারির জন্য বিডিং আহ্বান করবে। বিডিং-এ অংশ নেবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে মার্চেন্ট ব্যাংকার, বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, সরকার অনুমোদিত পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ড, ইন্সুরেন্স কোম্পানি, স্টক ডিলার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এ খাতের জন্য বরাদ্দকৃত শেয়ারের ১০ শতাংশের বেশি চাইতে পারবে না। কোম্পানি নির্ধারিত নির্দেশক মূল্যের ভিত্তি হিসেবে ৪টি মেথড ব্যবহার করার কথা। চারটি মেথড হচ্ছে—শেয়ারপ্রতি নেট এসেট ভেল্যু নিরূপণ, শেয়ারপ্রতি কোম্পানির অতীত মুনাফা, ভবিষ্যতে শেয়ারপ্রতি সম্ভাব্য আয় এবং একই খাতের কোম্পানিগুলোর বর্তমান বাজার দর। এ চারটিকে গড় করে যে অংক পাওয়া যায় তাকে নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু এ চারটি মেথড অনুসরণের ক্ষেত্রে নানা কারসাজি ও ম্যানিপুলেশনের অভিযোগ উঠছে। বিশেষ করে এসেট ভেল্যু নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অতিমূল্যায়ন, অতীত মুনাফা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে গরমিল, ভবিষ্যত্ আয় প্রাক্কলনের বেলায় উচ্চাভিলাষী মুনাফা প্রদর্শন এবং একই খাতের কোম্পানির বর্তমান বাজার দর প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে দর বাড়ানো ইত্যাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে মবিল-যমুনা লুব্রিকেন্ট ও এমআই সিমেন্টের ক্ষেত্রে।

পরের ধাপে শেয়ার ছাড়ার প্রাথমিক অনুমোদনপ্রাপ্ত কোম্পানি প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রাইস ডিসকভারির লক্ষ্যে বিডিং আহ্বান করে। এসইসি ও দুই স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে অনলাইন সিস্টেমে বিডিং-এর সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে কোম্পানির নির্দেশক মূল্য থেকে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বেশি কিংবা ২০ শতাংশ কম দর প্রস্তাব করা যায়। প্রাপ্ত দরে নির্দিষ্টসংখ্যক শেয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুকূলে বরাদ্দ দেয়া হয়। এই বিডিং-এ প্রাপ্ত দরই ওই কোম্পানির শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য হিসেবে নির্ধারিত হয়। ওই মূল্যে আইপিও’র মাধ্যমে সাধারণের কাছে নির্ধারিতসংখ্যক শেয়ার বিক্রি করা হয়। আইপিওতে বরাদ্দকৃত শেয়ার যে দিন থেকে ট্রেডিং শুরু হবে তার ১৫ ট্রেডিং দিবস পর প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার বাজারে বিক্রি করা যাবে। আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো যে দর প্রস্তাব করছে তা তাদের পরিচয় ছাড়াই অনলাইনে প্রচারিত হবে। প্রস্তাবিত দরের ২০ শতাংশ অগ্রিম জমা দিয়ে দরপ্রস্তাব পেশ করতে হবে। বিডিং-এ সর্বোচ্চ দর : বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে এ পর্যন্ত যে কয়টি কোম্পানি বাজারে এসেছে তার সব কয়টিই কোম্পানির নির্ধারিত নির্দেশক মূল্যের সঙ্গে বিডিং-এর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ যুক্ত হয়ে মূল্য নির্ধারিত হয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিডিং-এর মাধ্যমে মূল্য নির্ধারণের যে উদ্দেশ্য ছিল তার সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের জন্য শেয়ার কিনছে না বলে সর্বোচ্চ দর দিয়েই নিচ্ছে। জানা গেছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা জমা নিয়ে বিডিং-এ অংশ নেয় প্রতিষ্ঠানগুলো। নিজেদের কোনো টাকা বিনিয়োগ করে না তারা। ফলে নির্দেশক মূল্যের ২০ শতাংশ বেশি বা সর্বোচ্চ মূল্যে কিনতে তারা দ্বিধা করছে না। আর সে মূল্যই বিবেচিত হচ্ছে যুক্তিযুক্ত মূল্য হিসেবে।

মবিল-যমুনা লব্রিকেন্ট : বাজারে তীব্র শেয়ার সঙ্কটের মুখে সম্প্রতি জ্বালানি খাতের মবিল-যমুনা লুব্রিকেন্ট বাংলাদেশ লি. শেয়ার ছাড়ার অনুমতি লাভ করে এসইসি থেকে। এ কোম্পানির চেয়ারম্যান জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাহ উদ্দিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইস্টকোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে. চৌধুরী। কোম্পানির ২৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক রাষ্ট্রায়ত্ত যমুনা ওয়েল কোম্পানি। বাকি ৭৫ শতাংশ আজম জে. চৌধুরী ও তার পরিবারের। প্রসপেক্টাসে প্রদর্শিত মালিকানার হিসেবে ইস্টকোস্ট সিকিউরিটিজ-এর নামে ৭৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার দেখিয়ে আজম জে. চৌধুরী ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে দশমিক ২ শতাংশ শেয়ার দেখানো হয়েছে। কিন্তু ইস্টকোস্ট (ইসি) সিকিউরিটিজ-এর শতভাগ মালিকানা আজম জে. চৌধুরী পরিবারের এবং তিনি নিজে ইসি সিকিউরিটিজ-এর চেয়ারম্যান।

এ কোম্পানির ইনডেকটিভ প্রাইস নির্ধারণ করা হয়েছে ১২৭ টাকা। এর মধ্যে ১০ টাকা অভিহিত মূল্য ও ১১৭ টাকা প্রিমিয়াম। আগামী ৭ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিডিং অনুষ্ঠিত হবে। নিয়ম অনুযায়ী ২০ শতাংশ কম-বেশি দর প্রস্তাব করা যাবে। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় এ কোম্পানির বিডিং-এ ২০ শতাংশ বেশি দরে অর্থাত্ ১৫২ টাকায় মূল্য স্থির হওয়া প্রায় নিশ্চিত। ফলে কোম্পানি ৪ কোটি শেয়ারের বিপরীতে বাজার থেকে পাবে ৬০৮ কোটি টাকা। অথচ অভিহিত মূল্য অনুয়ায়ী ৪০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়ছে কোম্পানিটি। মোট ১৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন দেখিয়ে ১৪ কোটি শেয়ারের ২৯ শতাংশ বাজারে ছাড়া হচ্ছে।

পুঁজিবাজারে ছাড়া ৪ কোটি শেয়ারের মধ্যে বুক বিল্ডিং-এ অংশগ্রহণকারী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকাররাি ৮০ লাখ, প্রবাসী বাংলাদেশীরা ১০ শতাংশ বা ৪০ লাখ, মিউচুয়াল ফান্ড খাতের জন্য ১০ শতাংশ বা ৪০ লাখ এবং আইপিও লটারির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ২ কোটি ৪০ লাখ বা ৬০ শতাংশ শেয়ার পাবে।

কোম্পানির স্থায়ী সম্পদের তালিকায় জমির দাম দেখানো হয়েছে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। ভবন ১০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যন্ত্রপাতি ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, মেশিনারি ২৬ কোটি ৫৪ লাখ, ফার্নিচার ও যানবাহন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। ব্যাংক লোনসহ কোম্পানির মোট দায়-দেনার পরিমাণ ১০৭ কোটি টাকা।

উচ্চহারে প্রিমিয়াম নেয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে জ্বালানি খাতে একই ধরনের ৪টি কোম্পানির শেয়ারের বর্তমান বাজার মূল্য দেখানো হয়েছে। এতে ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টের ৭০২ দশমিক ৩২, যমুনা ওয়েলের ৪০৬ দশমিক ৮৭, পদ্মা ওয়েলের ৭৪২ দশমিক ৩২ এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২৮২ দশমিক ৩২ টাকা গড় দর উল্লেখ করা হয়েছে। ৪টি কোম্পানির গড় বাজার দর দেখানো হয়েছে ৫৩৩ দশমিক ৪৫ টাকা। পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসই ও সিএসই’র বিবেচনায় ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর দরকে অতিমূল্যায়িত বলে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করেছে। অথচ সে দরকেই মবিল-যমুনা তাদের প্রিমিয়াম নির্ধারণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নির্দেশক মূল্যের সার-সংক্ষেপে শেয়ার প্রতি নীট এসেট ভেল্যু ১১ দশমিক ৭৩ টাকা, কোম্পানির ভবিষ্যত্ সম্ভাব্য আয়ভিত্তিক পিই ১৬৪ দশমিক ২১ এবং একই খাতের চার কোম্পানির গড় বাজার মূল্য ৫৩৩ দশমিক ৪৫ কে যোগ করে গড় নির্দেশক মূল্য দেখানো হয়েছে ২৩৬ দশমিক ৪৬ টাকা।

শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, ৭৫ কোটি টাকায় এলপিজি টার্মিনাল প্লান্ট, ১৩৭ কোটি ৫২ লাখ টাকায় ক্রুড ওয়েল ট্যাংকার ক্রয়, ১১৭ কোটি ২৫ লাখ টাকায় প্রধান কার্যালয়ের জন্য জমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণ, ২১ কোটি টাকায় এন্টি-ফ্রিজ ম্যানুফেকচারিং প্লান্ট এবং ২৫০ কোটি টাকায় হোয়াইট ওয়েল প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন করা হবে। এসব খাতে মোট ৬০২ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাতভিত্তিক যে ব্যয় পরিকল্পনা দেখানো হয়েছে তা মনগড়া। তাছাড়া প্রধান কার্যালয়ের জমি ও ভবন নির্মাণের ১১৭ কোটি টাকাই অনুত্পাদনশীল খাতে ব্যয় হবে। ২৫০ কোটি টাকায় যে হোয়াইট ওয়েল প্রসেসিং প্লান্ট করা হবে, তা আলাদা কোম্পানির নামে করা হবে বিধায় ভবিষ্যতে ওই কোম্পানিরও যে শেয়ার ছাড়া হবে না, তা কে নিশ্চিত করবে।

মবিল-যমুনা লুব্রিকেন্ট কোম্পানির ২০০৯ সালে মুনাফা দেখানো হয়েছে ৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০০৮ সালে মুনাফা হয়েছে ৪০ কোটি ২৮ লাখ টাকা। চলতি সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ৩ মাসে মুনাফা করেছে ১২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। যে কোম্পানির বার্ষিক মুনাফা ৩৪ কোটি টাকা, সে কোম্পানি অতিরিক্ত ৬০৮ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন হিসেবে যোগ করে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ৪০ কোটি টাকার ওপর কত শতাংশ মুনাফা দিতে পারবে—সে প্রশ্ন তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা।

অভিযোগ ও উত্থাপিত প্রশ্নের ব্যাপারে মবিল-যমুনা কোম্পানির চেয়ারম্যান জ্বালানি সচিব মেজবাহ উদ্দিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজম জে চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও তারা সেলফোন ধরেননি। কোম্পানির গুলশানের কার্যালয়ে ফোন করলে কথা বলার মতো দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা নেই বলে জানানো হয়।

এমআই সিমেন্ট : সর্বশেষ ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে বিডিং সম্পন্ন হয়েছে ক্রাউন সিমেন্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এমআই সিমেন্ট লিমিটেডের। তারা ১০ টাকা ফেসভেল্যুর ৩ কোটি শেয়ার বাজারে ছাড়তে যাচ্ছে। ১০ টাকার শেয়ারে তারা ৮৩ টাকা প্রিমিয়াম যোগ করে নির্দেশক মূল্য নির্ধারণ করেছে ৯৩ টাকা। বিডিংয়ে নির্দেশক মূল্যের ২০ শতাংশ বেশি দর লাভ করে এই কোম্পানির শেয়ারমূল্য দাঁড়িয়েছে ১১১ দশমিক ৬০ টাকা। এ মূল্যে কোম্পানি ৩ কোটি শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে তুলে নেবে ৩৩৬ কোটি টাকা। প্রসপেক্টাসে যে তথ্য-উপাত্ত দেয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় এমআই সিমেন্টের উদ্যোক্তাদের নিজস্ব পরিশোধিত মূলধন ২০ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ টাকা মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা। এছাড়া জমি বাবদ ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এবং বোনাস শেয়ার ইস্যু করে ৪২ কোটি ৬৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন দেখানো হয়েছে। বোনাস শেয়ার ইস্যু করা হয়েছে গত ২১ ডিসেম্বর। এ হিসেবে কোম্পানিটির সর্বমোট পরিশোধিত মূলধন ৭০ কোটি টাকা। ফেসভেল্যু অনুযায়ী ১০ টাকার ৩ কোটি শেয়ার থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহের পর পরিশোধিত মূলধন ১০০ কোটি টাকায় উন্নীত হবে বলে জানানো হয়েছে। কোম্পানি বলেছে, উল্লিখিত মেথড অনুসরণে তাদের নির্দেশক মূল্য হওয়ার কথা ১১৬ টাকা ৮২ পয়সা; কিন্তু তারা তা কমিয়ে ৯৩ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ নির্দেশক মূল্য যথার্থ বলে দাবি করেছে কোম্পানিটি।

কোম্পানির ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানানো হয় যে, ১৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা জমি ক্রয় ও এর উন্নয়ন করা হবে। ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে ভবন। ১৮৮ কোটি টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে মেশিনারি আমদানি করা হবে। ৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে দেশি মেশিন ক্রয় বাবদ। ৭২ কোটি ৬০ লাখ টাকা খরচ হবে গাড়ি ক্রয়ে। এছাড়া জরিপ ও পরিকল্পনা প্রণয়নে ৪৪ লাখ, বৈদ্যুতিক কাজসহ কারখানা চালুতে ৮ কোটি ১৫ লাখ, ফার্নিচার ও অন্যান্য খরচ ৫০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে। মোট ৩৩৫ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগের এ হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে কোম্পানির এ পর্যন্ত স্থাপিত ৩টি ইউনিটে ব্যয় হয়েছে অনধিক ৭০ কোটি টাকা, সেখানে ৪র্থ ইউনিট স্থাপনসহ কিছু ইকুইপমেন্ট কিনতে কেন ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে? বর্তমানে ৩টি ইউনিটের দৈনিক উত্পাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৮শ’ টন। উত্পাদন ক্ষমতা আরও ৫ হাজার ৮শ’ টন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। তাতেও ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব ধোপে টেকে না। অনুরূপ ক্ষমতার অন্যান্য সিমেন্ট কোম্পানির বিনিয়োগ বিশ্লেষণে এর যথার্থতা মেলেনি।

মোল্লা গ্রুপ ও জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদারস গ্রুপ যৌথ উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে। মুন্সীগঞ্জের মোক্তারপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে ৮ একর ৪১ শতাংশ জমির ওপর তাদের কারখানা। অ্যাসেটের হিসাবে জমির মূল্য প্রকৃত দামের তিনগুণ দেখানো হয়েছে বলে মুন্সীগঞ্জের স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

কোম্পানির আর্থিক হিসাবে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে মুনাফা হয়েছে ১৮ কোটি ৭৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা। তার আগের বছরে কোম্পানি লাভ করেছে ৯ কোটি ৫৩ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ২০০৯ সালের ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে মুনাফা দেখানো হয়েছে ১১ কোটি ১৫ লাখ ৪৭ হাজার টাকা।

কোম্পানির পরিচালকদের ২৮ কোটি টাকার বিনিয়োগকে বার্ষিক মুনাফা ও বোনাস শেয়ার যোগ করে ৭০ কোটি টাকা দেখিয়ে তার সঙ্গে পুনর্মূল্যায়ন খাতে ২৬ কোটি ৩৫ লাখ, রিটেইনেড আর্নিং বাবদ ১৪ কোটি ৮ লাখ টাকার হিসাব দেখিয়ে মোট নিট সম্পদ দেখানো হয়েছে ১১০ কোটি ৪৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। এই সম্পদমূল্যকে ৭ কোটি শেয়ারে ভাগ করে প্রতি ১০ টাকার শেয়ারের অনুকূলে নিট সম্পদমূল্য নিরূপণ করা হয়েছে ১৫ টাকা ৭৮ পয়সা।

জমি, কারখানা ও তিনটি ইউনিট বিল্ডিং খাতে খরচ ২৮ কোটি ৮৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা পুনর্মূল্যায়নের নামে নিমিষেই দ্বিগুণ হয়ে ৫৫ কোটি ২১ লাখ ৪৮ হাজার হয়ে গেছে। এখানে মূল্যবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে ২৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
কোম্পানির চেয়ারম্যান মুন্সীগঞ্জের উত্তর ইসলামপুরের জাহাঙ্গীর আলম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নারায়ণগঞ্জের আলহাজ খবির উদ্দিন মোল্লা।

কোম্পানি যে ৩ কোটি শেয়ার বাজারে ছাড়ছে, তার ২০ শতাংশ অর্থাত্ ৬০ লাখ বুকবিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের, ১০ শতাংশ বা ৩০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য, ১০ শতাংশ মিউচুয়াল ফান্ডের জন্য এবং অবশিষ্ট ৬০ শতাংশ বা ১ কোটি ৮০ লাখ শেয়ার পাবেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা আইপিওর মাধ্যমে।

এমআই সিমেন্ট কোম্পানির ব্যাংক ঋণ রয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকার। তন্মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ২০ কোটি ১৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এছাড়া ১৮ কোটি ৯২ লাখ টাকার ট্যাক্স দেনা রয়েছে কোম্পানিটির।

সম্ভাব্য ভবিষ্যত্ মুনাফা : কোম্পানির ভবিষ্যত্ প্রাক্কলিত মুনাফা দেখানো হয়েছে প্রসপেক্টাসে। তাতে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩১ কোটি ৮৯ লাখ, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫৫ কোটি ৮৮ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৯০ কোটি ১৮ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০৩ কোটি ২২ লাখ টাকা নিট মুনাফা প্রাক্কলন করা হয়েছে। শেয়ারবাজার থেকে নেয়া ৩৩৬ কোটি টাকাসহ মোট পরিশোধিত মূলধনের ওপর উল্লিখিত প্রাক্কলিত মুনাফা বণ্টন করা হলে তা হবে খুবই অনুল্লেখযোগ্য।

এমআই সিমেন্ট তাদের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে যেসব কোম্পানির পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাতেও কারসাজি ও অসত্য তথ্য দেয়া হয়েছে। সমমূলধনের কোম্পানির তথ্য দিতে গিয়ে সামিট এলায়েন্স পোর্টের ব্যাপারে বলা হয়েছে, বিগত ৬ মাসে ওই কোম্পানির গড় মূল্য ছিল ২ হাজার ১০৬ টাকা ৪২ পয়সা এবং ইপিএস ছিল ১৯ দশমিক ৯৩ টাকা। প্রকৃতপক্ষে বিগত ৬ মাসে কোম্পানিটির গড় মূল্য ছিল ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা এবং ইপিএস ছিল ৩ দশমিক ৬৭ টাকা। কোম্পানিটি গত জুলাই মাসে তাদের ফেসভেল্যু ১০০ টাকা থেকে পরিবর্তন করে ১০ টাকা করে। এমআই সিমেন্ট তাদের ১০ টাকা ফেসভেল্যুর শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণে সামিট এলায়েন্সের ১০০ টাকা ফেসভেল্যুর ইপিএস যোগ করেছে। ২০০৯ সালে সামিট এলায়েন্সের পিই রেশিও ৫১ দশমিক ৮৩ হলেও দেখানো হয়েছে ১০৫ দশমিক ৬৯। একইভাবে ইস্টার্ন হাউজিং, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স ও এস আলম কোল্ড রোলেড স্টিলের ৬ মাসের গড় মূল্য, ইপিএস ও পিই রেশিওর হিসাবে তথ্য বিকৃতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। উল্লিখিত ৩টি কোম্পানির শেয়ারই ১০০ টাকা ফেসভেল্যুর। ১০ টাকা ফেসভেল্যুর শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সূচকগুলো সে হারে কমিয়ে দেখানো হয়নি। ফলে সমমূলধনের ওইসব কোম্পানির গড় পিই রেশিও দেখানো হয়েছে ৫০ দশমিক ১৪।

এ অভিযোগের ব্যাপারে গতকাল এমআই সিমেন্টের সেনা কল্যাণ ভবনের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে চেয়ারম্যান ও এমডি এ অফিসে বসেন না বলে জানানো হয়। শেয়ার সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোম্পানির চিফ ফাইন্যান্স অফিসার মুক্তার হোসেন তালুকদারের সঙ্গে কথা বললে তিনি উল্লিখিত সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার মতে, যথার্থভাবে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ কোটি টাকার শেয়ার ছেড়ে ৩৩৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে এতদিন চালিয়েছি, এ টাকাতো নিতেই পারি। এ পর্যন্ত অর্জিত মুনাফা পরিচালকরা বোনাস শেয়ার আকারে নিয়ে নেয়ার পর কেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রিমিয়াম দিতে হবে জানতে চাইলে তিনি অন্যান্য কোম্পানির প্রিমিয়ামের উদাহরণ টানেন।

ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীরা বলছেন, এসইসির উচিত প্রিমিয়ামের একটি নির্দিষ্ট হার বেঁধে দেয়া। কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় খেয়ালখুশিমত প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। কোম্পানির প্রকৃত সম্পত্তি ও আয়ের চেয়ে প্রিমিয়াম নেয়া হচ্ছে অনেক বেশি। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। আগামী ৪-৫ বছরের সম্ভাব্য আয়ের হিসাব কষে প্রিমিয়ামের হার বাড়িয়ে যেভাবে আগাম নিয়ে নেয়া হচ্ছে, তা একধরনের লুটের পর্যায়ে পড়ে। এতে করে কোম্পানি ভবিষ্যতে লোকসানি হয়ে গেলেও পরিচালকদের কোনো ক্ষতি নেই।

প্রিমিয়ামবাণিজ্য : সাম্প্রতিক অতীতে প্রিমিয়ামবাণিজ্য শুরু হয় মালেক স্পিনিংয়ের শেয়ার থেকে। কোম্পানিটি ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার থেকে ১৫ টাকা প্রিমিয়াম নেয়। অর্থাত্ ১৫০ শতাংশ লাভ অগ্রিম তুলে নিয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।

গ্রামীণফোন ১০ টাকার শেয়ারে প্রিমিয়াম নিয়েছে ৬০ টাকা। মোট ৭০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে ১০ টাকার শেয়ার। অর্থাত্ শুরুতেই ৬০০ শতাংশ লাভ যোগ করা হয়েছে। আবার ম্যারিকো শেয়ারপ্রতি প্রিমিয়াম নিয়েছে ৮০ টাকা। অর্থাত্ ৮০০ শতাংশ। এ দুটি শেয়ারে বিনিয়োগকারীরা সাময়িকভাবে কিছুটা লাভে থাকলেও বাজার সংশোধন হলে দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

দেশে El Toro এল তোরোঃ মেক্সিকান রেস্তোরাঁ


দেশে El Toro এল তোরোঃ মেক্সিকান রেস্তোরাঁ

el toro


কাওছার শাকিল | তারিখ: ১৭-১০-২০১০
স্প্যানিশ ভাষায় ‘এল তোরো’ মানে হলো ষাঁড়। সে কারণেই হয়তো এল তোরো রেস্তোরাঁর দরজা খুলতেই মাথার ওপর চোখে পড়ল একটা ষাঁড়ের মাথা। অবশ্য দেখতে একটু কষ্টই হবে, কারণ ভেতরের আলোর পরিমাণ খুব কম। সে জন্য ভেতরে ঢুকে প্রথমে একটু উশখুশ করতে হয়। খানিকক্ষণ বসলে যেই আঁধারটা চোখে সয়ে আসে, আর তখন বেশ ভালোই লাগে।

বেশ সুন্দর করে সাজানো রেস্টুরেন্টটা। দেয়ালে অদ্ভুত অদ্ভুত পেইন্টিং ঝোলানো। বসার চেয়ারে মেক্সিকান মোটা সুতোর কাপড়। দেয়ালে মরিচা মরিচা রং। জায়গাটা অবশ্য খুব বেশি বড় নয়। গুলশান-১-এর ১৩৮ নম্বর রোডের এ রেস্টুরেন্টে সব মিলিয়ে ৮০ জন বসতে পারে একসঙ্গে।

খাবারের অর্ডার দিতে মেনু হাতে নিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হলো। জীবনভর বাংলা খাবার খাওয়া মানুষ, বড়জোর দু-চারটে চায়নিজ খাবারের নাম মুখে আসে। কিন্তু এ মেনু দেখে আন্দাজ করার উপায় নেই কোনটা কী বস্তু। তাই রেস্তোরাঁর লোকজনের সঙ্গে পরামর্শ করতে হলো পদ বাছতে।

প্রথম যেটা টেবিলে এল তার নাম নাচোস স্পেশাল। মানে হলো ‘বিশেষ নাচো’। কিন্তু নাচো জিনিসটা কী? নাচো হলো ময়দায় তৈরি মচমচে এক ধরনের চিপস। তার সঙ্গে থাকে ‘পিন্টো বিনস’-এর ভর্তা। খুবই সুস্বাদু এই শিম আনা হয় আমেরিকা থেকে। নাচোর প্লেটের মাঝখানে গোল করে বসানো থাকে সাওয়ার ক্রিম গার্নিস। মুড়মুড়ে চিপসে ভরিয়ে ভরিয়ে টক-নোনতা স্বাদের এই জিনিসটাও খেতে বেশ মজা। তার সঙ্গে থাকে পেঁয়াজের কচিপাতা কুচি আর নানা রকম মসলা।

পরের অ্যাপেটাইজার পদটির বেশ রাশভারি নাম, চাঙ্কি চিকেন ক্যাসাদিয়া। ময়দায় দিয়ে এক ধরনের রুটি তৈরি করা হয়, মেক্সিকান ভাষায় যার নাম হলো তরতিয়া। তার মাঝখানে নানা মসলায় রান্না করা মুরগির কিমা আর পনিরের পুর দেওয়া থাকে। খেতে বেশ স্বাদ।

মুখের রুচি বাড়ানোর পদ দুটির পর ‘বুরিতো দে ব্লাংকা’র স্বাদটা নিতে পারেন। কেননা এটি বেশ মুখরোচক একটা পদ। বুরিতো হলো ফ্লাওয়ার তরতিয়ায় তৈরি অনেকটা সরমা টাইপের একটা খাবার। ভেতরে মুরগির মাংস, টমেটো, ক্যাপসিকাম আর পনির থাকে। সঙ্গে খানিকটা করে মেক্সিকান রাইস আর পিন্টো বিনের ভর্তাও থাকবে।

তবে এল তোরো রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে তাদের গ্রিলড ফাহিতা সিজলিং চেখে দেখতে ভুলবেন না যেন। খাবারের সাজগোজ আর পরিবেশনের ঢং দুটিই দারুণ! মসলা মাখা মুরগির বুকের হাড় ছাড়া মাংস কয়লায় পুড়িয়ে নেওয়া হয় প্রথমে। তারপর পাউরুটির মতো পাতলা পাতলা ফালি করে গরম লোহার তাওয়ার ওপর পেঁয়াজ আর ক্যাপসিকামের টুকরোর মাঝখানে সাজিয়ে টেবিলে রাখা হয় বাঁশের সুন্দর ঝুড়িতে করে। মাংসের টুকরো পাতে নেওয়ার সময়ও দেখবেন গরম ভাপ উঠছে তখনো। এর সঙ্গে থাকে তিনখানা বাটার তরতিয়া, মেক্সিকান রাইস আর স্ম্যাশড বিন। সব মিলিয়ে মাখিয়েজুখিয়ে খেতে খুবই ভালো লাগে।

কাচের মগের মাঝখানে ছাতা আর চারধারে চিনি ছিটিয়ে ভারি সুন্দর করে সাজিয়েগুছিয়ে শরবত পরিবেশন করা হয় এখানে। মেক্সিকান খাবারের টক ঝাল মসলা থেকে যদি একটু বিরতি নিতেই হয়, তাহলে এক ফাঁকে চুমুক লাগাতে পারেন পিনা কোলাদা অথবা পিচ মেলবায়।

দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় দুজন মিলে পেট পুরে খাওয়া যাবে এখানে। গুলশানের মতো অভিজাত জায়গায় বনেদি এই মেক্সিকান রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে খাবারের পরিমাণের তুলনায় দামটা একটু চড়া লাগতে পারে আপনার কাছে। তবে এল তোরোর খাবারের স্বাদের কাছে সে ভাবনা আপনার উড়ে যাবে নিমিষেই।
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য jahan hassan bangla desh Share Market

ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির জন্য রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার- এই তিন চক্রকে দায়ী করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।


তদবির নিয়ে নানা অভিজ্ঞতা ব্যাংকে দুর্নীতির কারণ রাজনৈতিক প্রভাব

বিশেষ প্রতিনিধি | তারিখ: ১৭-১০-২০১০
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর দুর্নীতির বড় কারণ রাজনৈতিক প্রভাব। মূলত, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদের যোগসাজশেই ব্যাংক খাতে দুর্নীতির সৃষ্টি হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চাপ সৃষ্টি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নেন এবং ওই ঋণ আর ফেরত দেন না। আর এসব ক্ষেত্রে ইউনিয়নের নেতারা রাজনৈতিক দলের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়। এ সময় অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার বজলুল হক বলেন, খেলাপি ঋণের জন্য বেশি দায়ী সরকার। সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন খাতে ঋণ দেওয়া হয়। এসব ঋণ আর পরিশোধ করা হয় না, ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বাড়ে। আরও রয়েছে সুদ মওকুফের নির্দেশ।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) উদ্যোগে গতকাল শনিবার ‘শিল্পঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি: রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক এই সেমিনার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয়। বিশিষ্ট সাংবাদিক জাহিদুজ্জামান ফারুকের সঞ্চালনায় সেমিনারে মূল নিবন্ধ উপস্থাপন করেন কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। সভাপতিত্ব করেন আইবিএফবির সভাপতি মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী।

তদবিরের নানা অভিজ্ঞতা: খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ মূল নিবন্ধে তদবির ও রাজনৈতিক চাপের একাধিক উদাহরণ দেন। যেমন, রাষ্ট্রপতি থাকার সময় এরশাদ নিজেই একজন ব্যবসায়ীকে পাঁচ কোটি টাকা ঋণ দিতে এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে (এমডি) টেলিফোনে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ঋণ-প্রস্তাবটি পরীক্ষা করে ঋণ না দেওয়ার সুপারিশ করলে তাঁকে ওএসডি করা হয়। এরপর ওই জিএমের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু তদন্তে তা-ও মিথ্যা প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতি নতুন করে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। কিন্তু এর পরই গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদ পদ ছাড়তে বাধ্য হলে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই জিএমকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, জিয়ার সময় সাইফুর রহমান অর্থমন্ত্রী হয়ে তাঁকে শিল্প ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সে সময় শিল্প ব্যাংকে তাঁর কোনো কার্যালয় বা গাড়ির সুবিধা ছিল না। কেবল বোর্ডসভা হলে ১০০ টাকা করে দেওয়া হতো। তিনি ১২টি সভা করে ১০টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিলেন। কেননা, প্রতিটি ঋণ-প্রস্তাব বেশ সময় নিয়ে ভালোভাবে দেখতেন, গরমিল থাকায় অনেক প্রস্তাবের অনুমোদন দেননি। এরপর এরশাদ ক্ষমতায় এলে চেম্বারের প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করে বলে আসে, মোজাফ্ফর আহমদ থাকলে দেশে শিল্পায়ন হবে না। এরপর তাঁকে অপসারণ করা হয়। তিনি এ বিষয়ে বলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান সৎ ও সাহসী হলে অনেক অনিয়ম আটকানো সম্ভব। দলের হয়ে গেলে আর কাজ হবে না।
এক ঋণ-প্রস্তাবে ৫১টি ফোন: সেমিনারে বর্তমান সময়ের উদাহরণ দিয়ে খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, তাঁর ব্যাংকে আসা একটি ঋণ-প্রস্তাবের জন্য প্রথমে টেলিফোনে তদবির করেন একজন বর্তমান মন্ত্রী। কিন্তু প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য না হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় তদবিরের পালা। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব মিলিয়ে ঋণটি অনুমোদন দেওয়ার জন্য ৫১টি ফোন আসে। সর্বশেষ ফোন করেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মন্ত্রীর তদবির সত্ত্বেও কেন ঋণ দেওয়া হলো না জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত জানান। সব শুনে অর্থমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন, ‘আপনি বের করে দিলেন না কেন?’

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের অভিজ্ঞতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক খোন্দকার বজলুল হক নিজেকে একজন প্রান্তিক ব্যাংকার হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, খেলাপি ঋণের জন্য বেশি দায়ী সরকার নিজেই। সত্তরের দশকে পাটশিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আশির দশকে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির নামে মাত্র ২০ শতাংশ ইক্যুইটিতে ঋণ দেওয়া হয়। এরপর তৈরি পোশাক খাতকে অগ্রাধিকার বানিয়ে আবার ঋণ দেওয়া হয়। এর বেশির ভাগ অর্থেরই অপচয় হয়েছে। এতে কিছু ব্যক্তির লাভ হয়েছে, দেশেরও হয়তো কিছু লাভ হয়েছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক নিজেই। তিনি বলেন, এখন আবার পাট খাতের পুনর্জাগরণের কথা বলা হচ্ছে। সরকার অগ্রণী ব্যাংককে বলেছে, ১০০ কোটি টাকার সুদ মওকুফ করতে হবে। এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ এখন ১৯ শতাংশ। এভাবে সুদ মওকুফ করলে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। তিনি বলেন, এখন আর তেমন প্রকৃত ব্যবসায়ী দেখা যায় না। হয় রাজনীতি করে এখন ব্যবসায়ী, অথবা ব্যবসা করে এখন রাজনীতিবিদ হয়েছেন। এ ধরনের প্রভাবশালীরা চাপ সৃষ্টি করে ঋণ নিয়ে আর ফেরত দেন না।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আরও বলেন, চামড়া পাচার হয়ে যাচ্ছে বলে এবং পত্রিকায় লিখে লিখে এই খাতে ঋণ দেওয়ার একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়। তারপর চাপ আসে ঋণ দেওয়ার জন্য। সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর এপেক্স, বে ট্যানারিসহ কিছু প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়। আর বেশির ভাগই, যাঁরা বড় ব্যবসায়ী নামে পরিচিত, তাঁরা আর অর্থ ফেরত দেন না। এসব ব্যক্তিকে ১৫ দিন ব্যাংকে দেখা যায়, বাকি ১১ মাস ১৫ দিন চেহারাই দেখা যায় না। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ব্যাংক থেকে চামড়া কেনার নামে ঋণ নিয়ে জমি কিনে রেখেছেন বা অন্য খাতে ব্যয় করেছেন।

ট্রেড ইউনিয়নের দৌরাত্ম্য: খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, দুর্নীতির বড় কারণ ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা। এ জন্য প্রয়োজন ট্রেড ইউনিয়নকে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গসংগঠন হিসেবে আর না রাখা। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একবার একজন এমডিকে নাজেহাল করায় তিনি সে সময়ের রাষ্ট্রপতি এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন, সেই ট্রেড ইউনিয়নের নেতা সেখানেই আছেন এবং এরশাদ তার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন। আরেকবার সোনালী ব্যাংকের ইউনিয়ন নেতা জামালউদ্দিনের বিরুদ্ধে নালিশ করার পর এরশাদ শাপলা চত্বরে জনসভা করে তাঁকে ছোট ভাই বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি জানান, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্স নানা ধরনের সুপারিশ করলেও মন্ত্রিসভা তা গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, ব্যাংকে কর্মচারী নিয়োগ বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন। বেসরকারি ব্যাংকে এ ধরনের পদ আর নেই।

পরিচালনা পরিষদে কারা: খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে সামগ্রিকভাবেই দুর্নীতি হয়ে থাকে। এসব ব্যাংকের বড় দুর্বলতা হলো, এগুলোর মালিক সরকার। সরকার কিছু ব্যক্তিকে মনোনীত করে পরিষদে নিয়োগ দেয়। এদের বড় অংশ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা। যেমন, কৃষি ব্যাংকেই আছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তিনজন কর্মকর্তা। এ কারণে কৃষি ব্যাংককে অনেকে এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারিত শাখা হিসেবে ঠাট্টা করেন। ব্যবসায়ী মহল থেকেও সরকার কাউকে কাউকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। সরকার নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু আপত্তি হচ্ছে, এমন কিছু লোককে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাঁরা বিভিন্ন সরকারের মুরিদ হিসেবে পরিচিত। তাঁরা কতটুকু স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করবেন, তা চিন্তার বিষয়।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ সুপারিশ করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালক হওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করে দেবে। সেখান থেকে নিয়োগ দেবে সরকার। আর ঠিক করে দেওয়া প্রয়োজন, পরিষদে একজন বিশেষজ্ঞ থাকবেন, একজন সাবেক ব্যাংকার থাকবেন, একজন প্রশাসনে অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকবেন—এভাবে। তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়তো হবে।

তদবিরকারীর তালিকা প্রকাশ: সাবেক সচিব ও জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সোহেল আহমেদ চৌধুরী বলেন, সরকারি ব্যাংকে দুর্নীতির মূল কারণ তদবির। এসব ব্যাংকে শুধু ট্রেড ইউনিয়ন নয়, অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাও অনিয়ম, দুর্নীতি করেন।
খোন্দকার ইব্রাহিম প্রস্তাব দিয়ে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিতে পারে যে, লিখিত বা মৌখিক যেকোনো ধরনের তদবির এলে ঋণ-প্রস্তাবকে অযোগ্য বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংক এসব তদবিরের তালিকা সংরক্ষণ করবে বা ডায়েরিতে লিখে রাখবে। এসব তালিকা পত্রিকায় প্রকাশও করা যেতে পারে।

তবে সোহেল আহমেদ চৌধুরী মনে করেন, এভাবে হয়তো সম্ভব হবে না। এর পরিবর্তে তিনি প্রতি দুই মাস পর ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদকে সংবাদ সম্মেলন করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই সংবাদ সম্মেলনে কাকে কাকে ঋণ দেওয়া হলো এবং কাদের দেওয়া হলো না, তা প্রকাশ করতে হবে।
তবে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই তার গ্রাহক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়মিতভাবে সভা করতে হবে।

দুর্নীতি বেসরকারি ব্যাংকেও: সেমিনারে সব বক্তাই বলেন, সামগ্রিক ব্যাংক খাতের দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। সোহেল আহমেদ চৌধুরী বলেন, বেসরকারি ব্যাংকেও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতি হচ্ছে। আরও আছে পারস্পরিক সমর্থন দিয়ে সুবিধা নেওয়া। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি গ্রুপ বড় ঋণ-প্রস্তাব নিয়ে এলে দেখা যায়, বিপক্ষ গ্রুপ বাধা দেয় না। এরপর বিপক্ষ গ্রুপ আবার প্রস্তাব নিয়ে আসে এবং তখন অন্যরা বাধা দেয় না।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, শুধু সরকারি খাতে নয়, বেসরকারি খাতেও অনেক দুর্নীতি হয়। সরকারি ব্যাংকের ‘স্পনসরড ক্যাপিটালিস্টরা’ অনেকেই পরে বেসরকারি ব্যাংকের উদ্যোক্তা বনে গেছেন। এঁদের সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজ নিলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে। ব্যাংকিং খাতে সুদ মওকুফ এবং অবলোপনের যে সংস্কৃতি রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ত্রিমুখী যোগসাজশ: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ত্রিমুখী যোগসাজশে দুর্নীতি হয়। যেমন, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার। সরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকে দুর্নীতি হচ্ছে এখন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক, নিউজ টুডে-এর সম্পাদক রিয়াজউদ্দিন আহমেদও এই ত্রিমুখী যোগসাজশের কথা উল্লেখ করে বলেন, এখন সংসদের দিকে তাকালে আর প্রকৃত রাজনীতিবিদ পাওয়া যায় না। ৯০ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ ছাড়া উপায়ও নেই। কারণ মনোনয়ন কিনতে হয়। আর এখান থেকে বাণিজ্য ও দুর্নীতি শুরু হয়।

সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান শেলী বলেন, দুর্নীতি দূর করতে হলে সেটা ওপর থেকে শুরু করতে হবে। চিকিৎসককে আগে নিজের চিকিৎসা করতে হবে। তা না হলে দুর্নীতি কমবে না।

কারা প্রশিক্ষণ পান: মোজাফ্ফর আহমদ ব্যাংকে গবেষণা কর্মকাণ্ড বাড়ানো ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ সময় উদাহরণ দিয়ে বলেন, ব্যাংকিং বিষয়ে একবার যুক্তরাজ্যে নয় মাসের প্রশিক্ষণে ব্যাংকারদের বাদ দিয়ে পাঠানো হয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ডেস্কের সেকশন অফিসারকে। কেন তিনি যাবেন, জানতে চাইলে সেই কর্মকর্তা বলেছিলেন, তিনি একাই ছয়টি ব্যাংক চালান, আর ব্যাংকার চালান একটি ব্যাংক। সুতরাং তাঁরই যোগ্যতা বেশি।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের এমডির বেতন আট লাখ টাকা করার নিন্দা জানিয়ে বলেন, শুধু একজনের বেতন বাড়ালে সমস্যা আরও বাড়ে। এতে করে ব্যাংকের অন্যরা তাঁর বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন। এখন অবশ্য এই বেতন কমানো হয়েছে।

প্রথম আলোর সেই ছবি: রিয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রশ্ন করে বলেন, কিছুদিন আগে প্রথম আলোয় একটি ছবি ছাপা হয়। তাতে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এক ব্যাংকের একজন এমডি গ্রাহকের দেওয়া হেলিকপ্টারে করে ঋণ-প্রকল্প মূল্যায়ন করতে গেছেন। এটা এমডি করতে পারেন কি না—এর জবাব দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘আমি হলে ওই দিনই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতাম। সরকার কেন কিছু করল না, আমি জানি না।’