আইপিওর শর্ত শিথিল : শেয়ার সরবরাহ বাড়ানো, না বিশেষ সুবিধা দেয়ার কৌশল

আইপিওর শর্ত শিথিল : শেয়ার সরবরাহ বাড়ানো, না বিশেষ সুবিধা দেয়ার কৌশল
অর্থনৈতিক রিপোর্টার
অবশেষে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে আইপিওর শর্ত শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। বাজারে তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধন ৪০ কোটির পরিবর্তে ৩০ কোটি টাকায় কমিয়ে আনাসহ শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত শিথিল করছে কমিশন। এ সপ্তাহের মধ্যে এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে বিদ্যুত্ ও অবকাঠামোগত খাতের কোম্পানিকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসার সুযোগ করে দেয়ার জন্য শর্ত শিথিলের বিষয়টি বিবেচনা করছে কমিশন। আইপিও শর্ত শিথিল করায় বাজারে শেয়ার সরবরাহ বাড়তে ইতিবাচক ভূমিকা তৈরি হবে বলে মনে করেন বাজারবিশ্লেষকরা। তবে একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, শেয়ার সরবরাহ বাড়াতে না বিশেষ কাউকে সুযোগ দেয়ার জন্য আইপিও’র শর্ত শিথিল করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাজারে ক্রমেই চাহিদা বাড়তে থাকলেও শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোর কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না। বরং শেয়ারবাজারে ফেসভ্যালু পরিবর্তনের মতো নন-ইস্যুকে সামনে আনা হয়। ফেসভ্যালু পরিবর্তনের কারণে কোম্পানির আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন না হলেও কোম্পানির পরিচালকরা এ বিষয়ে বেশ তত্পর হয়ে ওঠেন। আর এতে অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ও এসইসির অতিউত্সাহী মনোভাব নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। কিন্তু এসইসির জনবল বৃদ্ধি, শেয়ার সরবরাহ বাড়ানো, শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলা নিষ্পত্তি, শেয়ারবাজার সংক্রান্ত মামলা বিরোধে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠনের বিষয়গুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি খুব একটা নজর নেই। উপরন্তু গত মার্চে হঠাত্ করেই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠির মাধ্যমে আইপিওর ক্ষেত্রে নতুন কিছু শর্ত আরোপ করে একটি চিঠি ইস্যু করা হয়। যদিও এ ধরনের চিঠি ইস্যুর ক্ষেত্রে এসইসির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনাই করেনি মন্ত্রণালয়। অথচ এসইসির আইন অনুযায়ী, বাজারসংক্রান্ত যে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এসইসির মতামত নেয়ার কথা। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সুপারিশগুলোকে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করে এসইসি। গত ১১ তারিখে জারিকৃত ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির যোগ্যতা হিসেবে কোম্পানির কমপক্ষে ৪০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়। একইসঙ্গে ওই প্রজ্ঞাপনে কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন ৭৫ কোটি টাকার নিচে হলে ওই কোম্পানির জন্য ৪০ শতাংশ শেয়ার ছাড়া বাধ্যবাধক করা হয়। এছাড়া পরিশোধিত মূলধন ৭৫ থেকে ১৫০ কোটি টাকা হলে কমপক্ষে ২৫ শতাংশ অথবা ৩০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি হবে সে পরিমাণ শেয়ার বাজারে ছাড়তে হবে। আর ১৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। তবে বাজারে ছাড়া শেয়ারের মূল্য ৪০ কোটি টাকার কম হতে পারবে না। এসইসির এ সিদ্ধান্তের কারণে শেয়ার সরবরাহে বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি হবে এবং বাজারে শেয়ার ছাড়ার ব্যাপারে কোম্পানিগুলো আগ্রহ হারাবে বলে মত প্রকাশ করেছিলেন বাজার বিশ্লেষকরা। কিন্তু এ ধরনের সমালোচনার মুখেও এসইসি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। আবার প্রশ্নও ওঠে, কমিশনের মতামত ছাড়া মন্ত্রণালয়ের সুপারিশকে প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা কতটুকু যৌক্তিক হয়েছে? কমিশন সরকারের আজ্ঞাবাহী কোনো সংস্থা না হলেও এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জারির ফলে কমিশনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

নানা সমালোচনার মুখে অবশেষে ৯ আগস্ট কমিশন বাজার পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে পরিশোধিত মূলধন কমানোর বিষয়ে সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে পরিশোধিত মূলধন ২৫ কোটি টাকা করার বিষয়ে সুপারিশ করা হলেও অবশেষে কমিশনের বৈঠকে তা ৩০ কোটি টাকা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তাদের মূলধন ১৮ কোটি টাকা হলেই কোম্পানিটি ১২ কোটি টাকার শেয়ার ছেড়ে তার পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা করতে পারবে। এছাড়া শেয়ার ছাড়ার ক্ষেত্রে আরও বেশকিছু শর্ত শিথিল করা হয়। তবে কমিশন বৈঠকের এ সিদ্ধান্ত এখনও কার্যকর হয়নি। কারণ এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চেয়েছে কমিশন। কমিশনের একজন নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইপিও শর্ত শিথিল করা কমিশনের সিদ্ধান্তের বিষয়। কিন্তু ১১ মার্চের প্রজ্ঞাপনটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে নেয়ার কারণে এখন তা পরিবর্তনে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি হওয়া উচিত ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এদিকে কমিশনের আইপিও শর্ত শিথিল করার উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ৪০ কোটি টাকার আইপিও শর্ত এবং ৪০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার বিষয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে কমিশন তা পরিবর্তন না করার ব্যাপারে অনড় ছিল। কিন্তু হঠাত্ করেই কমিশনের পর্যালোচনা কমিটির সভায় এবং কমিশনের সভায় আইপিও শর্ত শিথিল করার পেছনে শুধু শেয়ার সরবরাহ বাড়ানো মূল উদ্দেশ্য কিনা এ প্রশ্ন উঠেছে। বাজারসংশ্লিষ্ট অনেকেই অভিযোগ করছেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতি অনুযায়ী ওয়েস্টিন হোটেলের আইপিওতে ন্যূনতম ৪০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়ার কথা থাকলেও তারা সে শর্ত পূরণ না করেই এসইসির অনুমোদনে প্রসপেক্টাস জমা দিয়েছিল। শর্ত পূরণ করে আবার আইপিও আবেদন করতে বলেছে এসইসি। অ্যাপোলো হাসপাতালের আইপিও একই কারণে অনুমোদন দেয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার জন্যই শর্ত শিথিল করা হচ্ছে।

কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল—কোম্পানি দুটি যখন আইপিওর জন্য আবেদন করেছিল তখন শর্ত অনুযায়ী তাদের ৪০ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়া ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু এখন আইপিওর শর্ত শিথিল করা হলে তারা এ সুবিধা পাবে কিনা? তিনি বলেন, যদি শর্ত শিথিল করা হয় তাহলে তারা অবশ্য সে সুবিধা পাবে। এজন্য তাদের শর্তগুলো কমপ্লাইন্স করে আবেদন করতে হবে। কিন্তু তারা তো আগেই আবেদন করেছিল যখন ৪০ কোটি টাকার শর্ত ছিল—এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কিন্তু ততক্ষণে শর্ত পরিবর্তন হয়ে গেছে। অথচ এর আগে বেসরকারি কোম্পানির ক্ষেত্রে সরাসরি তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধ করা হলেও শুধু নিষিদ্ধের আগে আবেদন করায় বাণিজ্যমন্ত্রীর পারিবারিক দুটি প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এখন আবার কোম্পানিগুলোকে শর্ত শিথিলের সুযোগ দেয়ার বিষয়ে কমিশনের ইতিবাচক মনোভাব অনেক প্রশ্ন জন্ম দিচ্ছে।

অপরদিকে বিদ্যুত্ ও অবকাঠামো খাতের নতুন কোম্পানির (গ্রিনফিল্ড) জন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতির শর্ত শিথিলের প্রস্তাব বিবেচনা করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসইসি। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) প্রস্তাবের ভিত্তিতে গত ২৬ অক্টোবর কমিশনের সভায় এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গত আগস্ট মাসে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বিদ্যুত্ ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের জন্য বিএপিএলসি’র পক্ষ থেকে এসইসিতে একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে বিদ্যুত্ ও অবকাঠামো খাতের নতুন প্রকল্পগুলোকে আইপিওর মাধ্যমে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসার জন্য তিনটি শর্ত থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব করে বিএপিএলসি। তবে এ ধরনের সুযোগ দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন। কারণ শেয়ারবাজারে বর্তমানে চাহিদা সঙ্কটের কারণে অনেকেই তার সুযোগ নিতে তত্পর হয়ে উঠেছেন। নানাভাবে বাজার থেকে টাকা ওঠানোর হিড়িক পড়েছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতি নিয়ে এমনিতেই রয়েছে নানা প্রশ্ন। এরপর আবার শর্ত শিথিল করে বিশেষ কোনো কোম্পানিকে সুযোগ দেয়ার জন্য আইপিও শর্ত শিথিল করা কতটুকু যৌক্তিক হবে তা বিবেচনা করতে হবে।

এদিকে বাজারে চাহিদার কারণে ১৯৯৬-৯৭ সালে অনেক নামসর্বস্ব কোম্পানি বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়েছে বলে গত ৯ অক্টোবর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ডিএসই এবং সিএসই প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেছিলেন। এসব কোম্পানি যারা বাজারে নিয়ে এসেছিল সেসব মার্চেন্ট ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য এসইসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা। ওই সময় বাজারে আসা কোম্পানিগুলো ওটিসি মার্কেটে স্থান পেয়েছে।

এখন আবার বাজারে চাহিদার কারণে যাতে যেনতেন কোম্পানিকে বাজারে আসার অনুমোদন না দেয়া হয়, সে বিষয়ে এসইসিকে সতর্ক থাকারও আহ্বান জানিয়েছিলেন তারা। অপরদিকে বাজারবিশ্লেষকরা বলেন, চাহিদার কারণে যাতে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত প্রিমিয়াম নিতে না পারে তাতেও এসইসির দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থরক্ষার বিষয়ে এসইসির ভূমিকা সবার কাম্য।

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s