প্রায় ১ কোটি লোক বিদেশে কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ স্ফিত হয়ে আছে

দায়িত্ব দেশের অধিকার আমাদের!

সৈয়দ রেজাউল হায়াত

ব্যাবসা-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার সম্প্রতি ৮১ জন ব্যবসায়ীকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৩৯ জনকে সিআইপি করা হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে অবদানের জন্য, বাকিদের করা হয়েছে পদাধিকার বলে ব্যবসায়ীদের সংগঠন থেকে। সিআইপিরা বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ, সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য প্রবেশ পাস, জাতীয় অনুষ্ঠান ও মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের নাগরিক সংবর্ধনায় আমন্ত্রণ, ব্যবসাসংক্রান্ত ভ্রমণে বিমান, রেলপথ, সড়কপথ ও জলপথে সরকারি যানবাহনে আসন সংরক্ষণ এবং বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র সুবিধা পাবেন। এসব সুযোগ-সুবিধা তাদের প্রাপ্য। তাদের অর্জনের জন্য আমরাও তাদের অভিনন্দন জানাই।

দেশ এবং সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যে সুবিধার জন্য ব্যবসায়ীদের আরও কি কি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন সেগুলো এ খবরে প্রকাশিত হয় নি। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশেষ করে শিল্পায়নে বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল সংগ্রহের জন্য সরকার তাদেরকে শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানির সুবিধা দিয়ে থাকেন। ব্যবসায়ীদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজিকরণ করা হয়েছে এবং দেশের পণ্য বিদেশে বিপণনের জন্য সরকার প্রয়োজনে লবিস্ট নিয়োগ করেন। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে বাণিজ্যিক শাখা রয়েছে, যারা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিদেশি ব্যবসায়ীদের যোগাযোগে সহযোগিতা করে, বায়ারস অ্যান্ড সেলারস মিটিং এবং বাংলাদেশি পণ্যের প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বিদেশি চেম্বারস অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং এফবিসিসিআই-এর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী দৈনিক বাজার মূল্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখনই কোনো বিদেশ সফর করেন. ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের স্বার্থে তার সঙ্গে একটা বিরাট ব্যবসায়ীদলও বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পান। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক দামে বিপণন করা এবং ক্রমান্বয়ে তার বিকাশ ঘটাতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করতে কোনো সরকারই কর্পণ্য করেননি।

এতকিছু সত্ত্বেও সম্প্রতি একটি সম্মাননা অনুষ্ঠানে সুপরিচিত একজন ব্যবসায়ীর বক্তব্য শুনে মনে হলো, ব্যবসায়ীদের জন্য এ গরিব দেশের আরও অনেক দায়িত্ব আছে। তিনি দাবি করেছেন, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ব্যবসায়ীদের কম শুল্কে গাড়ি কেনার সুযোগ দেওয়া হোক। তাদের এ দাবিকে যৌক্তিক মনে হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তাদের কথাও বিবেচনা করা উচিত।

বর্তমানে সরকারিভাবে প্রায় ৭৫ লাখ, বেসরকারি পরিসংখ্যানে প্রায় ১ কোটি লোক বিদেশে কর্মরত আছেন। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ স্ফিত হয়ে আছে। দক্ষ ও অদক্ষ সেসব শ্রমিকের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা আনয়নের ফলে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ সংকটে পড়তে হয়নি। আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য সবসময়ই কয়েক বিলিয়ন ডলার আমাদের মজুদ থাকে। এটা নিশ্চয়ই দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সেই শ্রমিকরা বিমান বন্দরে কি ধরনের ব্যবহার পায়, দেশে আসা-যাওয়ার সময় দেশ এবং বিদেশে কিরকম বিড়ম্বনার শিকার হয় এটা কারোই অজানা নয়। বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের কদর থাকলেও শ্রমিক কিংবা সাধারণ লোকদের প্রবেশে কড়াকড়ি থাকে। একইভাবে দেশেও যখন তারা নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয়, তখন দাবি করা সত্ত্বেও প্রতিকার পায় খুবই কম। কৃষিখাত আমাদের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে। এ খাতে শুধু পণ্য রপ্তানিকারকদের সম্মানিত করা হয়েছে। অথচ পণ্য উৎপাদনকারী কৃষক, কৃষি গবেষক ও বিজ্ঞানীরা উপেক্ষিত থেকে গেছেন। তারাও নিশ্চিতভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার, তাদের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ বলা যাবে না। আমরা জানি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দুই মেয়াদেই কৃষি এবং খাদ্যক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি লাভ করেছে এবং বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে গেছে। কৃষিক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই যেমন এই কৃতিত্বের দাবিদার, যারা এ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের কথাও উল্লেখ করতে হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের পৈতৃক বাড়িটি জনসাধারণের জন্য একটি ট্রাস্টকে দান করেছেন। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেন। সরকারের দেওয়া শুল্কমুক্ত গাড়ি কেনার সুবিধাও তিনি গ্রহণ করেননি বলে শুনেছি। ব্যক্তিগত লোভলালসা মুক্ত রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবন এই দুই নেত্রীকে উচ্চতর সোপানে নিয়ে গেছে। সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও অন্যান্য সুযোগ পাওয়ার জন্য তাদের অনেক যুক্তি আছে। তারা অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে নির্বাচন করেন, নির্বাচনী এলাকা এবং ঢাকায় তাদের দুইটি স্থাপনা রাখতে হয়, কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজখবর রাখতে হয়, সংসদ কার্যাবলীতে অংশগ্রহণ ও আইন প্রণয়নে ব্যস্ত থাকতে হয় এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকিও করতে হয়। কাজেই এটা একটা সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে বিবেচিত। কয়েক যুগ আগেও রাজনীতি বা সংসদ সদস্য হওয়া কোনো পেশা ছিল না। ছিল হয়তো নেশা, অথবা জনসেবার সুযোগ। সেজন্যেই ব্রিটিশ এবং পাকিস্তান আমলে এমনকি বাংলাদেশ হওয়ার পরও যতদূর জানা আছে তারা বেতন পেতেন না, পেতেন সম্মানী। এটা তাদের কোনো সার্বক্ষণিক পেশা ছিল না। জনসেবার কাজে যতটুকু সময় দিতেন সে সময়ের জন্য সম্মানসূচক কিছু ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা করা হতো। তখন যারা সংসদ সদস্য হতেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো পেশা ছিল। তাদের অধিকাংশই ছিলেন আইনজীবী, বিভিন্ন পেশায় কর্মরত উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি অথবা ত্যাগী সমাজসেবক। তারা পাওয়ার জন্য রাজনীতি করতেন না, জনগণকে কিছু দেওয়া ও সেবার জন্য রাজনীতি করতেন। অবিভক্ত ভারত থেকেই আমরা যদি দেখি পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, ডক্টর রাধাকৃষ্ণ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। মহাত্মা গান্ধী ও মওলানা ভাসানী ক্ষমতার রাজনীতি করেননি। সুযোগ থাকলেও ক্ষমতায় যেতে চাননি। কিন্তু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অবহেলিত, দরিদ্র ও নির্যাতিত জনগণের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সীমিত সম্পদের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা সত্ত্বেও কোনোদিন দেশ বা জনগণ থেকে কিছু নিতে চাননি। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি জনগণের ভালোবাসার ঋণ শোধ করে গেছেন। তিনি মানুষকে ভালোবেসেছেন নিঃস্বার্থভাবে, আর বিনিময়ে পেয়েছেন মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা। তিনি প্রায়শ বলতেন, ‘আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি, দেশের মানুষ আমাকে ভালোবাসে।’

বর্তমান প্রেক্ষাপট হয়তো ভিন্ন। যেজন্য আমরা বিভিন্ন সচ্ছল পেশার লোকজনও মনে করি দেশের উচিত আমাদেরকে অনেক কিছু দেওয়া। তবে সব দায়িত্ব দেশ পালন করবে আর আমরা শুধু নাগরিক অধিকার-সুবিধাগুলো ভোগ করে যাব_ এমন মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। যেটুকুই সরকার ও দেশ দেয় তাতে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারি না, আমরা আরও চাই। সরকারি অফিসাররা বেতন-ভাতা পান, অনেকে বাড়ি-গাড়ি পান, তাছাড়াও রয়েছে সরকারের দেওয়া অনেক সুযোগ-সুবিধা। চাকরি শেষে রয়েছে পেনশনের ব্যবস্থাও। তবুও তাদের দাবি_ নির্ধারিত বেতনভোগী হিসেবে আরও পাওনা রয়েছে। সরকার নামমাত্র মূল্যে তাদের জমি বরাদ্দ দেয়, যা তারা অনেক বেশি দামে হয় বিক্রি নতুবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। এই জমি নদীপারের কোনো খাস জমি নয়, নয় দূর-দূরান্তের অথবা বন-জঙ্গলের কোনো পরিত্যক্ত জমি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, কক্সবাজারসহ দেশের বড় বড় শহরের গরিব জনগণের কাছ থেকে অধিগ্রহণ করা জমি। সরকারের জমি অধিগ্রহণ করা সম্পর্কিত আইনটিও খুবই নিষ্ঠুর। যার কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণত আদালতেও চ্যালেঞ্জ করা যায় না। সরকার চাইলেই যে কোনো লোকের বাড়ি-ভিটা, জমি যেকোনো সময় ওই আইনের আওতায় নোটিশ দিয়ে অধিগ্রহণ করতে পারে। এই অধিগ্রহণকৃত জমির জন্য যে ক্ষতিপূরণ জমির মালিক পায়, সেটা দিয়ে তাদের কোনো কাজ হয় বলে মনে হয় না। দেখা যাচ্ছে, গরিবের বাড়ি-ভিটা নিয়ে তাকে নিঃস্ব করে অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন এবং ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছে তা নামমাত্র মূল্যে সরকার বরাদ্দ দিচ্ছে। এই বরাদ্দ এখন আর সরকারি অফিসারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বেসামরিক-সামরিক অফিসার ছাড়াও রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, অবস্থাপন্ন প্রবাসী বাঙালি ও বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও পাচ্ছেন। রবীন্দ নাথের ভাষায়_ ‘এ জগতে হায় সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।’

সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন প্রকল্পের ঋণ বরাদ্দে বিশ্ব ব্যাংক ও অন্যান্য দাতাদের বিভিন্ন শর্তাবলী নিয়ে আমি অনেক আপত্তি করেছি এবং দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে প্রচণ্ড দেনদরবার করেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ দর কষাকষি ব্যক্তি পর্যায়ে তিক্ততার সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকার কারণে এসব ক্ষেত্রে আমরা আমাদের অবস্থানে অনড় থাকতে পেরেছি। অবশ্য জমি অধিগ্রহণসম্পর্কিত দাতাদের একটি অবস্থানকে আমার কাছে সঠিক মনে হয়েছিল। জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে দাতাদের শর্ত ছিল_ যে জমি অধিগ্রহণ করা হবে, তার সঠিক বাজার মূল্য দিতে হবে, বাজার মূল্য সরকারি অফিসের ওপর নির্ভর না করে নির্ধারিত একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ঠিক করবে। সরকারি ও বেসরকারি লোকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে এই ক্ষতিপূরণ ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকদের কাছে পেঁৗছে দিতে হবে। জমির মূল্য ছাড়াও পরবর্তী ১০ বছরে ফসল বিক্রির যে পরিমাণ টাকা জমির মালিক পেতেন, তার সমপরিমাণ টাকাও তাকে দিতে হবে। জমিতে গাছপালা এবং ফল থাকলে তারও ক্ষতিপূরণ তার প্রাপ্য। অধিগ্রহণের ফলে আশপাশের কোনো লোক, যদি ব্যবসায়িক বা অন্যান্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাদের ব্যবস্থাও করতে হবে। শর্তগুলোর সবই গরিববান্ধব হলেও শুরুতে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তা নিয়েই প্রচণ্ড অনীহা ছিল। সরকারের টাকা সাশ্রয়ের নামে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে বঞ্চিত করা কোনো জনগণের সরকারের কাম্য হতে পারে না। জমি মালিকদের সনাতনী ব্যবস্থায় তিন বছরের সরকারি বাজার মূল্যের একটি গড় ধরে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হতো। তবে তারা প্রকৃত মূল্যের ১০ শতাংশও পেত না। বাড়ি-ভিটা এবং কৃষি জমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত লোক যখন ১০ ভাগের এক ভাগ ক্ষতিপূরণ পায়, তখন তার মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকা ছাড়া কোনো উপায় অবশিষ্ট থাকে না। যিনি ভুক্তভোগী শুধু তিনিই এ অবস্থা বুঝতে পারবেন। দাতাদের নীতি হচ্ছে, যার জমি যেদিন অধিগ্রহণ করা হবে, সেদিনের অবস্থা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত জমি মালিকের অবস্থার কোনো অবনমন হবে না। বর্তমানে এ নীতিই সরকারে স্বীকৃত। জমি অধিগ্রহণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত জনসাধারণের প্রতি খুবই সংবেদনশীল ও যত্নবান থাকা উচিত সংশ্লিষ্ট সবার। সমাজের বিত্তবানদের জন্য সরকার যেভাবে ঘটা করে জমি বরাদ্দ দেয়, বিত্তহীনদের জন্য খাস জমি বরাদ্দের বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায় বলে মনে হয় না। অথচ ভূমি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসকরা দেশের ভূমিহীনদের জন্য খাস জমি বরাদ্দ দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত। ভূমি মন্ত্রণালয়- পূর্ত মন্ত্রণালয়ের মতোই ঢাকঢোল পিটিয়ে খাস ও পরিত্যক্ত ভূমিগুলো বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে পারেন। মাঝেমধ্যে ‘জাল যার জলা তার’, গুচ্ছগ্রাম জাতীয় স্লোগান শোনা গেলেও কয়েকদিন পরেই ওইসব উদ্যোগ স্তিমিত হয়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, যিনি রক্ষক তিনিই ভক্ষক সেজে যান। জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকদের (রাজস্ব) কাজ হচ্ছে, খাস/সরকারি জমি পুনরুদ্ধার করে ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা। অনেক সময় সে জমি তাদেরই কেউ কেউ অফিসারদের সমিতির নামে নিজেরাই বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা চালান। পূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক, রেলওয়ে, পুলিশ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইত্যাদি প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা সংস্থা যারা সরকারি জমি দেখাশোনা করেন, তাদেরই কেউ কেউ বিভিন্ন নামে এসব জমিজমা কুক্ষিগত করতে চান। ১৬ কোটি মানুষের ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের এ দেশে শুধু বিত্তবানদের জন্যই সবকিছু বরাদ্দ হবে, তেলে মাথায় আরও তেল ঢালা হবে, এমন তো হতে পারে না। সরকারের ভূমি ব্যবহার নীতি এ ব্যাপারে আরও গরিববান্ধব হওয়া উচিত।

আমাদের দেশের জনগণ ও সরকার খুবই উদার ও সদাশয়। যেকোনো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আমরা অনেক কিছু দিতে রাজি। এ দেওয়াটাও অনেক সময় বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যায়। প্রায় এক যুগেরও আগে আমরা আইসিসি ট্রফি জেতার পর সরকারসহ দেশের অনেকে বিভিন্ন পুরস্কার ঘোষণা করে। জনগণের তরফ থেকে কেউ ঘোষণা করে সারা জীবন তাদের ফ্রি চুল কাটার সুযোগ দেবে, এক রেস্টুরেন্ট সারা জীবন ফ্রি খাওয়ানোর ঘোষণা করে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন পুরস্কারের ঘোষণা আসতে থাকে, কিন্তু তার ফল খুব প্রীতিকর হয়নি। এরপর ধারাবাহিক পরাজয়ের গ্লানি সইতে হয়েছে, টেস্ট স্ট্যাটাস প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সম্প্রতি পূর্ণ শক্তির একটি ক্রিকেট দলের সঙ্গে আমরা সিরিজ জয় করেছি। যথার্থভাবে দেশে খুশির বন্যা বইছে। তবে এই খুশি যেন পুরস্কারের আতিশয্যে ভেসে না যায়। বিশ্বকাপ মিশন থেকে আমাদের বিচ্যুত হলে চলবে না। একইভাবে অর্থনীতিতে যাদের বিশেষ অবদানকে পুরস্কৃত করা হলো, তারাও যেন থেমে না যান। পুরস্কারের আধিক্যে যেন আমাদের মাথা গুলিয়ে না যায় অথবা আরও অর্থের পিছনে ধাবিত না করে। কারণ দেশ এখনও এমন কোনো শক্ত অর্থনৈতিক ভিতের ওপর দাঁড়ায়নি, যাতে দেশ শুধু তাদের দিয়েই যাবে। আমাদের দাবি-দাওয়ার ক্ষেত্রে আরও সংযত হওয়া উচিত। দেশের চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক মধ্যবিত্ত শ্রেণী-পেশার সবাই সরকার নির্ধারিত শুল্ক দিয়েই গাড়ি কিনছে। সেখানে শুল্কমুক্ত অথবা কম শুল্কে সুবিধাভোগী উচ্চবিত্তশালীরা গাড়ি কিনবে, এটা সুস্থ সমাজ গঠনে সহায়ক হতে পারে না। নিম্ন আয়ের মানুষের এ দেশে উচ্চবিত্তশালী ব্যবসায়ীদের কম মূল্যে গাড়ি কেনার সুযোগ দাবি করাটা সেক্ষেত্রে কতটা যৌক্তিক ভেবে দেখতে হবে। দেশ আমাকে কি দিল এ নিয়ে আমাদের হিসাব-নিকাশের সীমা নেই। অথচ এক্ষণে ভাবা উচিত_ জনবহুল, সমস্যাবহুল এ দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা দেশকে কি দিলাম বা দিচ্ছি। প্রয়োজন আত্ম বিশ্লেষণ। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের ঊধর্ে্ব উঠে, দেশের জন্য কর্তব্য পালনের আদর্শিক এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে এখনও এ বাক্যটি উচ্চারিত হয় দেশে দেশে।

লেখক : সাবেক সচিব
জাহান হাসান একুশ অর্থ বাণিজ্য bangla desh Share Market

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s