দুর্নীতির তালিকায় এবার বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ। গতবার ছিল ত্রয়োদশ। দুর্নীতি একটুও কমেনি

দুর্নীতি একটুও কমেনি

সমকাল প্রতিবেদক
দুর্নীতি একটুও কমেনি বাংলাদেশে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশ এবার এক ধাপ পিছিয়েছে। যদিও পয়েন্ট আগের মতোই। দুর্নীতির তালিকায় এবার বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ। গতবার ছিল ত্রয়োদশ। বাংলাদেশের এবারেরও পয়েন্ট ২ দশমিক ৪। ‘গতবারের সমান পয়েন্ট নিয়ে বাংলাদেশের এ অবস্থান থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বাংলাদেশে দুর্নীতি হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি’_ বলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ২০০৯ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সূচকটি তৈরি।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে একযোগে দুর্নীতির সূচক-২০১০ প্রকাশ করা হয়। প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরার জন্য সূচকটি প্রকাশ করে টিআই। বার্লিনভিত্তিক এ সংস্থাটি বলেছে, এটা প্রামাণ্য বিষয় নয়, তবে এ থেকে দুর্নীতি বিস্তারের একটি ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে টিআইবি। টিআই সূচকে ২০০৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩, ২০০৭ সালে ৭, ২০০৮ সালে ১০ এবং ২০০৯ সালে ছিল ১৩তম। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল শীর্ষে।

টিআইর এবারের সূচকে দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষে রয়েছে আফ্রিকার দেশ সোমালিয়া। তাদের পয়েন্ট ১ দশমিক ১, অর্থাৎ সূচক অনুযায়ী বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় সোমালিয়ায়। শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে আছে যৌথভাবে আফগানিস্তান ও মিয়ানমার। তৃতীয় স্থানে আছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ ইরাক এবং চতুর্থ সুদান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। অন্যদিকে সূচকে ৯ দশমিক ৩ পয়েন্ট নিয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের দিক থেকে আফগানিস্তান ৩, নেপাল ১০, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ ১১, শ্রীলংকা ২০ ও ভারত ২১তম অবস্থানে। তবে ভুটান ৪৪তম স্থান নিয়ে এ অঞ্চলে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
এ বছর ১৭৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৪। গত বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩৯। বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বাদশ অবস্থানে রয়েছে আরও আটটি দেশ। এগুলো হলো_ আজারবাইজান, হন্ডুরাস, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, সিয়েরা লিওন, টোগো, ইউক্রেন ও জিম্বাবুয়ে।

সূচকে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে আরও রয়েছে_ ফিনল্যান্ড, সুইডেন, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, হংকং, ভুটান, ইতালি, থাইল্যান্ড, চীন, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। এ বছর বেশ ক’টি দেশের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এগুলো হলো_ ভুটান, চিলি, ইকুয়েডর, গাম্বিয়া, হাইতি, জ্যামাইকা, কুয়েত ও কাতার।

সংবাদ সম্মেলনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রত্যাশিত ফল আসেনি। অবস্থান ত্রয়োদশ থেকে দ্বাদশ হয়েছে। এটা ক্রমাবনতি। টিআইর সূচকে ১০ পয়েন্ট কেউ করতে পারেনি জানিয়ে তিনি বলেন, তার মানে হলো দুর্নীতি বিশ্বজনীন সমস্যা।

সূচক সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের এবারের পয়েন্ট গতবারের সমপর্যায়ে থাকাটা নিরাশাব্যঞ্জক, কারণ ২০০৮-এর তুলনায় ২০০৯-এ আমরা ০.৩ পয়েন্ট বেশি পেয়েছিলাম। এক বছরের ব্যবধানে ০.৩ পয়েন্ট বেশি পাওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই প্রত্যাশা ছিল যে, গতবারের অর্জিত ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ হয়তো গতবারের চেয়ে কিছুটা হলেও বেশি পয়েন্ট পাবে, বিশেষ করে এমন পরিপ্রেক্ষিতে যখন দেশে এমন এক সরকার ক্ষমতাসীন রয়েছে যাদের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিবিরোধী দৃঢ় অবস্থান অন্যতম প্রাধান্য পেয়েছিল। তিনি আরও বলেন, সূচকে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অগ্রগতি হবে কি-না তা নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ, দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, তথ্য কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, সরকারি প্রশাসন এবং মানবাধিকার কমিশনের মতো গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সততা, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং কার্যকারিতা বর্তমান সরকার কতটা নিশ্চিত করতে পারবে তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশের অগ্রগতির সম্ভাবনা। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করাও দুর্নীতি প্রতিরোধে অপরিহার্য।

এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, পরিসংখ্যানের দিক থেকে বাংলাদেশে দুর্নীতি হ্রাসে অগ্রগতি দেখছি না। তবে মানবাধিকার কমিশন গঠন, সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন কার্যকর করা, সংসদীয় কমিটিগুলো সক্রিয় থাকা ও সিটিজেন্স চার্টার তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।

টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ বলেন, সংসদ অকার্যকর হয়ে আছে। দুর্নীতি দমন কমিশন সম্পূর্ণ কার্যকর নয়। অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে দুদক। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা সোনার নৌকা নিচ্ছেন, সার্ভিস চার্জের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইন পাস করা হয়েছে, সংসদীয় কমিটিগুলো স্বার্থে জড়িয়ে পড়ছে ইত্যাদি একটি দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধে নেতিবাচক। তিনি বলেন, কেবল বক্তব্য দিলেই দুর্নীতি রোধ হবে না। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থাকতে হবে।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসার পর সংসদে যেভাবে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি প্রতিরোধে বক্তব্য দিয়েছেন বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখি না। অর্থমন্ত্রীর বারবার আহ্বানের পরও মন্ত্রিসভার সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়কর রিটার্ন প্রকাশ করা হচ্ছে না। তবে অর্থমন্ত্রীর সম্পদের হিসেব দেওয়াকে স্বাগত জানান তিনি।

দুর্নীতির ধারণা সূচক-২০১০ অনুযায়ী ৯.৩ পয়েন্ট পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত তালিকার শীর্ষে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ একত্রে অবস্থান করে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর। এশিয়ার সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে বিবেচিত সিঙ্গাপুর গত বছরের তুলনায় দশমিক ১ পয়েন্ট বেশি অর্জন করে এ বছর নিউজিল্যান্ড এবং ডেনমার্কের সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বের কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে প্রথমবারের মতো জায়গা করে নিয়েছে। গত বছর ১৮০টি দেশের মধ্যে সিঙ্গাপুরের অবস্থান ছিল তৃতীয়।

২০০৯ সালের মতো এ বছরও তালিকায় সর্বনিম্ন পয়েন্ট (১.১) পেয়েছে সোমালিয়া। দ্বিতীয় স্থানে আফগানিস্তান ও মিয়ানমার, তৃতীয় ইরাক এবং চতুর্থ সুদান, তুর্কমেনিস্তান ও উজবেকিস্তান। সিপিআই-২০১০-এ ১৭৮টি দেশের মধ্যে পরিচালিত জরিপের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশের পয়েন্ট ৫-এর নিচে যা বিশ্বে দুর্নীতির প্রবল মাত্রাকেই ইঙ্গিত করে। টিআইর চেয়ার হিউগেট লেবেল তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ২০১০ সালের ফল থেকে এটা স্পষ্ট, বিশ্বজুড়ে সুশাসনকে সুদৃঢ় করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যেহেতু দুর্নীতির কারণে বহু মানুষের জীবনযাত্রা হুমকির মুখে তাই সব সরকারকেই সুনির্দিষ্ট কাজের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার প্রমাণ করে দেখাতে হবে। বস্তুত সব বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সুশাসন অপরিহার্য সমাধান।

দুর্নীতির ধারণা সূচক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রণীত ও প্রকাশিত একটি সূচক। এ সূচকটি নির্ণয়ে টিআইবি কোনো ভূমিকা পালন করে না। এমনকি টিআইবির গবেষণা থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ সিপিআইয়ে পাঠানো বা বিবেচনা করা হয় না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের টিআই চ্যাপ্টারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাজনীতি ও প্রশাসনে বিরাজমান দুর্নীতির ব্যাপকতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণার ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির তুলনামূলক অবস্থান নির্ণয়ের জন্য এ সূচক ব্যবহার করা হয়। যে দেশগুলো ০ থেকে ১০-এর স্কেলে ৩ বা তার কম পয়েন্ট পেয়ে তালিকার নিচে অবস্থান করে সিপিআই অনুযায়ী সে দেশগুলোতে দুর্নীতির ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে যে দেশের পয়েন্ট যত বেশি অর্থাৎ ১০-এর কাছাকাছি, সে দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা তত কম বলে সূচকে ধারণা করা হয়।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s