বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকছে মানুষ স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকছে মানুষ
স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

রাজু আহমেদ ॥ গত অর্থবছরে কালো টাকার শর্তহীন বিনিয়োগের সুযোগ, গ্যাস-বিদ্যুত সঙ্কটের কারণে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়া এবং ব্যাংক আমানত ও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমে যাওয়ায় গত বিনিয়োগের বিকল্প ক্ষেত্রে হিসেবে পুঁজিবাজারকে বেছে নিচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষ। প্রতিদিনই নতুন নতুন বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে আসছেন। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তারল্য। এ কারণেই মার্জিন ঋণ এবং সমন্বয় (নেটিং) সুবিধা প্রদানে কড়াকড়ি আরোপ করার পরও পুঁজিবাজারের শেয়ারের অতি মূল্যায়ন রোধ করা হচ্ছে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিশ্লেষকদের উদ্বেগ সত্ত্বেও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে অধিকাংশ শেয়ারের দর। আগের সপ্তাহে মাত্র একদিন সামান্য কমার পর আবারও ছুটে চলেছে শেয়ারবাজারের পাগলা ঘোড়া।

দুই কার্যদিবসেই ১২৫ পয়েন্টের বেশি বেড়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাধারণ সূচক। এর আগের সপ্তাহে সূচক বেড়েছে ১২২ পয়েন্ট। স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই শেয়ারবাজারের এই উর্ধমুখী প্রবণতাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, বিভিন্ন মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সেই তুলনায় শেয়ারের সরবরাহ বাড়ায় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দর। এ অবস্থায় শেয়ারের যোগান বাড়ানোকেই বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে বড় উপায় বলে মনে করছেন তাঁরা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সালাহ উদ্দিন আহমেদ খান বলেন, দেশের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ পরিস্থিতি প্রায় স্থবির হয়ে থাকায় শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে শেয়ারের চাহিদা বেড়েই চলেছে। কিন্তু এর বিপরীতে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ছে না। এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে ঋণ সঙ্কোচন করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গত দু’বছরে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের পরিমাণ ব্যাপকহারে বেড়েছে। বিশেষ করে কালো টাকার সাদা করার শর্তহীন সুযোগ গ্রহণ করে গত অর্থবছরে অনেকেই বিপুল পরিমাণ টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছেন। কারণ অন্যান্য খাতের চেয়ে শেয়ারবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগে ঝামেলা কম, মুনাফার সুযোগ বেশি। পাশাপাশি বিদু্যত ও জ্বালানি সঙ্কটের কারণে শিল্প খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় শিল্প উদ্যোক্তাদের অনেকেই শেয়ারবাজারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন। একই কারণে ব্যাংকিং খাতের উদ্বৃত্ত তারল্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে। এসব কারণেই ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে শেয়ারবাজারের লেনদেন।

সব দিক থেকেই দেশের পুঁজিবাজার এখন যে কোন সময়ের তুলনায় শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ১৯৯৬ সালে যখন শেয়ারবাজার নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়েছে, তখন ডিএসই বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বাজার মূলধনের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে_ যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪৬ শতাংশ। মোট বাজার মূলধনের এক-তৃতীয়াংশ ধরা হলেও সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এদিকে যৌক্তিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরাও বাজারের অস্বাভাবিক উর্ধগতি থামাতে কার্যকর পদৰেপ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এ কারণেই তারল্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে স্বাভাবিক সংশোধনের চেষ্টা করছে এসইসি। এর অংশ হিসেবেই মার্জিন ঋণ প্রদানের ৰেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এর আগে মার্জিন ঋণের হার কমানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বেঁধে দেয়া হয়েছে একক গ্রাহকের জন্য ঋণ প্রদানের সর্বোচ্চ সীমা। কারণ বড় বিনিয়োগকারীদের নেয়া বিপুল পরিমাণ মার্জিন ঋণ বাজারে তারল্য বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছে এসইসি। তবে বাজার বিশেস্নষকরা মনে করেন, গত দেড় বছরে নানা উৎস থেকে স্রোতের মতো টাকা ঢুকলেও এর সঙ্গে পালস্না দিয়ে নতুন শেয়ারের যোগান বাড়াতে না পারার কারণেই পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক উর্ধমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দর কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পেঁৗছেছে। এরপরও নানা ধরনের গুজব ও প্রলোভনের কারণে শেয়ার ধরে রাখছেন অধিকাংশ বিনিয়োগকারী। একের পর এক পদৰেপ নিয়েও বাজারের রাশ টানতে ব্যর্থ হচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি। এ অবস্থায় শেয়ারবাজারে জমে ওঠা পুঁজি উৎপাদনমুখী খাতে স্থানানত্মর করে শেয়ারের যোগান বাড়ানো সবচেয়ে জরম্নরী হয়ে পড়েছে। চাহিদা ও যোগানের এই অসামঞ্জস্যতা কমাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে তালিকাভুক্ত কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে না পারলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে বলে বিশেস্নষকরা মনে করেন। তাঁদের মতে, শক্তিশালী পুঁজিবাজারকে দেশের উৎপাদনমুখী খাতসহ সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশে কীভাবে কাজে লাগানো যায়_ সরকারের দিক থেকে সে ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। এজন্য বিদু্যত, গ্যাসসহ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্প খাতকে শক্তিশালী করতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সরবরাহের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে_ তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়বে। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারে যে হারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়ছে সেই তুলনায় নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। এর ফলে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

অনাকাঙ্ৰিত পরিস্থিতি এড়াতে এখনই উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে নতুন নতুন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে হবে। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২৬টি সরকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ করা হলে শেয়ারবাজারে বিপুলসংখ্যক শেয়ার যুক্ত হবে_ যা বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যনত্ম গুরম্নত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নতুন বিদু্যত কেন্দ্রসহ অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হলে একদিকে ভাল শেয়ারের যোগান বাড়বে, অন্যদিকে উন্নয়নে পরনির্ভরশীলতা কমবে।

ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জের (ডিএসই) সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান বলেন, শেয়ারবাজারে চাহিদা অনুযায়ী ভাল শেয়ারের সরবরাহ নেই। ফলে অনেক শেয়ারই অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। বিদু্যত, গ্যাসসহ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং শিল্পখাতকে শক্তিশালী করতে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সরবরাহের প্রক্রিয়া গতিশীল করতে হবে। এৰেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারলে একদিকে যেমন জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে_ তেমনি পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়বে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফ খানের মতে, চাহিদা অনুযায়ী শেয়ারের সরবরাহ না থাকার কারণে দেশের শেয়ারবাজারে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারের দর বাড়ছে। এই অবস্থায় শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে হলে শেয়ারের যোগান বাড়াতে হবে। সেৰেত্রে সরকার পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করলে একদিকে উন্নয়ন কাজে অর্থায়ন সহজ হবে, অন্যদিকে ভাল শেয়ারের সরবরাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে। এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক আনোয়ারুল কবীর ভুঁইয়া বলেন, বাজারে শেয়ার সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি কমিশনের পক্ষ থেকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। কমিশনের কাছে কোন আইপিও আবেদন এলে তা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তবে এসব অনুমোদন দেয়ার ৰেত্রে আইন ও বিধি-বিধান মেনে কাজ করতে হয়। শেয়ারবাজার থেকে কোন কোম্পানি অর্থ সংগ্রহ করতে চাইলে অবশ্যই তাকে এগুলো মানতে হবে।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

One Response to বিনিয়োগের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়ায় শেয়ারবাজারে ঝুঁকছে মানুষ স্বাভাবিক সংশোধন ছাড়াই ধারাবাহিক উর্ধগতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

  1. Is it true that because of less employment more people are getting involve in share market.
    http://xplore4life.com/category/bangladesh/

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: