আট মাস ধরে স্পট মার্কেটে গ্রামীণফোন ও ম্যারিকো : পাবলিক মার্কেটের শেয়ার বিক্রি করে স্পট মার্কেটের শেয়ার কিনতে চাইলে বিনিয়োগকারীকে অপেক্ষা করতে হয় ৪ থেকে ১০ দিন

আট মাস ধরে স্পট মার্কেটে গ্রামীণফোন ও ম্যারিকো
সমকাল প্রতিবেদক
শেয়ারবাজারের এক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী চট্টগ্রামের সুবিনয় সাহা। নিজের সব পুঁজি আর সমপরিমাণ ঋণ নিয়ে চলতি বছরের গোড়ার দিকে গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগ করেছিলেন। এর কয়েকদিন পরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নির্দেশে কোম্পানিটিকে পাবলিক মার্কেট নামের সাধারণ বাজার থেকে স্পট মার্কেট নামের নগদ বাজারে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনাচক্রে তারপর থেকেই বাজারে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ক্রমাগত কমছে। শেয়ারের টানা দাম বাড়ার কারণে কোম্পানিটিকে স্পট মার্কেটে সরিয়ে নেওয়া হলেও এসইসির নির্দেশনার পর এর শেয়ারের ৪০ শতাংশ দর হারানো সত্ত্বেও একে আর মূল বাজারে ফিরিয়ে আনা হয়নি। বাজারে শেয়ারের দাম যতই কমেছে ততই কমেছে ঋণের বিপরীতে সুবিনয়ের নিজস্ব মূলধন। বাধ্যতামূলক বিক্রি (ফোর্সড সেল) এড়াতে তিনি সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংকে একাধিক দফায় বাড়তি অর্থ জমা দিয়েছেন। শেয়ারের দাম আরেকটু কমলে নতুন করে বাড়তি টাকা জমা দেওয়ার মতো আর কোনো অবস্থা নেই তার। কখন মার্চেন্ট ব্যাংক সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে ঋণ সমন্বয় করে নেয় এমন ভয়ে দিন কাটছে।

সুবিনয় সাহার মতোই এমন উদ্বেগ-আতঙ্কে দিন কাটছে হাজারো বিনিয়োগকারীর। তাদের অনেকেই প্রায় সর্বস্বান্তের পথে। শেয়ারের দরপতনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাড়তি অর্থ জমা না দিতে পারায় ইতিমধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী বাধ্যতামূলক বিক্রির কবলে পড়েছেন। হারিয়েছেন নিজস্ব মূলধনের পুরোটা। গ্রামীণফোনের শেয়ারে বিনিয়োগ করে দুর্দশাগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, গ্রামীণফোনের প্রতি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিমাতাসুলভ আচরণের কারণেই তারা এভাবে সর্বস্বান্ত হতে চলেছেন। এর আগে বিভিন্ন সময়ে একাধিক কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে নিয়ে আসা হলেও এত দীর্ঘ সময় কোনো কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে থাকতে হয়নি। তারা বলেন, শেয়ারের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণে স্পট মার্কেটে নিয়ে যাবার কথা বলেছিল এসইসি। কিন্তু স্পটে আসার পর শেয়ারের দাম ৩৭ শতাংশের বেশি কমলেও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেনি এসইসি। অন্যদিকে এ সময়ের মধ্যে বাজার মূলধন প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, ৩০/৩৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধির কারণে গ্রামীণফোনকে স্পট মার্কেটে নিয়ে যাওয়া হলেও ১০০ শতাংশের বেশি মূল্য বৃদ্ধির পরও আর কোনো কোম্পানিকে গ্রামীণের পরিণতি বরণ করতে হয়নি।

পাবলিক মার্কেটে এ বি ও এন ক্যাটাগরির শেয়ারের লেনদেন নিষ্পত্তি হয় শেয়ার কেনা-বেচার চতুর্থ দিনে। ওই দিন ক্রেতার বিও বিনিয়োগ হিসাবে শেয়ার চলে আসে, ক্রেতা চাইলে ওইদিনই তা বিক্রি করতে পারেন। অন্যদিকে শেয়ার বিক্রির চতুর্থ দিনে বিক্রেতা তার দাম পেয়ে যান। জেড ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে এ সময় লাগে ১০ দিন। পাবলিক মার্কেটে লেনদেন নিস্পত্তিতে ৪ দিন সময় লাগে বলে একজন বিনিয়োগকারী চেকের মাধ্যমে টাকা পরিশোধের সুযোগ নিয়েও এসব কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারেন। কিন্তু স্পট মার্কেটে নগদ টাকায় শেয়ার কিনতে হয়। অন্যদিকে ঋণ পাওয়ার যোগ্য শেয়ারের ক্ষেত্রে পাবলিক মার্কেটে একটি কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে সমপরিমাণ অর্থে অপর যে কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনা যায়। কিন্তু স্পট মার্কেটে থাকা কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে ওই অর্থ দিয়ে একই দিনে অন্য কোনো শেয়ার কেনা যায় না। অন্যদিকে পাবলিক মার্কেটের শেয়ার বিক্রি করে স্পট মার্কেটের শেয়ার কিনতে চাইলে বিনিয়োগকারীকে অপেক্ষা করতে হয় ৪ থেকে ১০ দিন। এসব সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণত স্পট মার্কেটে শেয়ারের দাম কমে যায়, লেনদেনও হয় কম।
চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি এসইসি গ্রামীণফোন এবং ম্যারিকো বাংলাদেশ নামের অপর একটি কোম্পানিকে স্পট মার্কেটে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় যা পরদিন থেকে কার্যকর হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ছিল ৩৮০ টাকা। গতকাল সোমবার তা ২৪২ টাকায় নেমে এসেছে। দর কমেছে প্রায় ১৪০ টাকা বা ৩৭ শতাংশ। অন্যদিকে ১৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা, গতকাল যা বেড়ে হয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার কোটি। একই সময়ে ডিএসই সাধারণ সূচক ৫ হাজার ৭৬০ পয়েন্ট থেকে ৭ হাজার ৭৪০ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। আট মাসের ব্যবধানে গ্রামীণফোনের শেয়ারের ৩৭ শতাংশ দরপতনের বিপরীতে বাজার মূলধন ও সূচক বেড়েছে যথাক্রমে ৪২ ও ৩৪ শতাংশ।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, গ্রামীণফোন একটি বড় মূলধনসম্পন্ন কোম্পানি হওয়ায় এর শেয়ারের অল্প দাম বৃদ্ধি সূচকের ওপর অপেক্ষাকৃত বেশি প্রভাব ফেলে। সূচকের মাধ্যমে যাতে বাজারের প্রবল ঊর্ধ্বমুখী ধারার প্রকৃত প্রতিফলন না ঘটে সে লক্ষ্যেই গ্রামীণফোনকে স্পট মার্কেটে সরিয়ে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন তারা। তবে তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। এতে করে বড় মূলধনসম্পন্ন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। তাছাড়া শুধু ‘সূচক ম্যানেজমেন্টের’ উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে এভাবে মূল বাজারের বাইরে রাখা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

স্পট মার্কেটে থাকা অপর বহুজাতিক কোম্পানি ম্যারিকো বাংলাদেশের শেয়ারের দাম গ্রামীনফোণের মতো না কমলেও স্পটে আসার পর তেমন বাড়েওনি। সর্বশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুসারে কোম্পানিটির ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে শেয়ার প্রতি আয় ছিল ২১ টাকা ৬৪ পয়সা। বাজারে এর শেয়ারের দাম ৬৩০ থেকে ৬৪০ টাকা। এ হিসাবে এর মূল্য-আয় অনুপাত দাঁড়ায় ৩১। তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অর্ধেকেরও বেশি কোম্পানির মূল্য-আয় অনুপাত এর চেয়ে বেশি। অথচ এদের কাউকেই স্পট মার্কেটে আসতে হয়নি।
কোম্পানি দুটিকে এভাবে পাবলিক মার্কেটের বাইরে রাখায় শুধু বিনিয়োগকারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত নন; দেশের শেয়ারবাজারের ভাবমূর্তিও কিছুটা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দুটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রতি এমন অযৌক্তিক বিমাতাসুলভ আচরণ অন্যান্য বহুজাতিক কোম্পানির প্রতি ভুল সংকেত পাঠাবে।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: