ভারতের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্কট

ভারতের উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্কট

আদিব ফয়সাল
এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারত। ৮ দশমিক ৫শতাংশের প্রবৃদ্ধির উধর্্বমুখী ধারা বহাল রেখে ২০১৩ সাল নাগাদ ভারত অর্থনৈতিক ভাবে চীনের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দাড়াবে এমন কথা বলছেন পশ্চিমা বিশেস্নষকরা। ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে আত্নপ্রকাশের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভ্থমিকা রাখছে দেশটির গনতন্ত্র আর বেসরকারি খাতের উন্নয়ন। উত্তর আমেরিকা থেকে শুরু করে পশ্চিম আফ্রিকা। কোথায় নেই ভারতের সরব উপস্থিতি। আফ্রিকার তেল সম্পদ কিংবা ভ্থমি লিজ নিয়ে কৃষি খামার গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় সব খানে চীনের সাথে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভারতকে তার অবস্থান ধরে রাখতে হচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তির সাথে ভারতের প্রতিযোগিতা চলছে। এ ক্ষেত্রে ভারতের বেসরকারি খাতের দক্ষতায় এ সাফল্য এসেছে। আজকে বিশ্বের ধনীদের তালিকায় ভারতের যে নাম চলে আসছে তাও বেসরকারি খাতের সাফল্য। টাটা বিড়ালার মতো আরে অনেক করপোরেট ব্যবসায় ভারতীয় প্রতিষ্টানের নাম চলে আসছে। আর তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতের সাফল্য তো ঈর্ষণীয়।

শাইনিং ইন্ডিয়ার এই চিত্রের একটি বিপরীত চিত্র আছে। যাকে বলা হচ্ছে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভেতরের দুর্বলতা। শুধু গণতন্ত্র কিংবা বেসরকারি খাতের সাফল্য দিয়ে তা ঢেকে দেয়া কঠিন। গত মাসে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের অন্তনির্হিত এই দুর্বলতা যেনো প্রকাশ পেয়েছে। খেলোয়াড়দের আবাসন সমস্যা, বাজে টয়লেট, ডেঙ্গুর প্রকোপ, নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ একটি আন্তজার্তিক মানের খেলা আয়োজনে ভারতের অসামর্থ্য যেনো ফুটে উঠেছে।

ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে সামাজিক উন্নয়নের সূচকে যে ব্যবধান চিত্র তা দেশটির অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে উত্থানের বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের উন্নয়নের এই শত্রুদের চিত্রটা দেখা যাক।

ইউএনডিপি কতর্ৃক প্রকাশিত দারিদ্র্য সূচকে ভারতের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৩৪তম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ভারতের ৪৫ কোটি মানুষ দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলারের কম আয়ে জীবনযাপন করে। কর্মক্ষম জনগণের মধ্যে ১০ শতাংশ বেকার। এখনো খাদ্যের জন্য মানুষকে লাইনে দাঁড়াতে হয়। ভারত সরকার এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা। বর্তমান বাজেটে সরকার স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় নির্ধারণ করেছে ২২ হাজার ৬৪১ কোটি রুপি, যা মোট জিডিপি’র মাত্র দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ সামরিক খাতে ব্যয় করা হবে মোট জিডিপি’র আড়াই শতাংশ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে প্রতি বছর দূষিত পানি এবং বাতাসের কারণে মারা যায় প্রায় ৯ লাখ মানুষ। ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ঋণের টাকা শোধসহ এ জাতীয় কারণে ভারতে দুই লাখের বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছে। ২৪ লাখ মানুষ এইডসে আক্রান্ত। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তিন বছরের কম বয়সী ৪৬ শতাংশ শিশু পুষ্টিহীনতায় ভোগে। ভারতের প্রায় ৩৪ শতাংশ মানুষ নিরক্ষর।

বিশাল ভূভারতে নিয়মিত নির্বাচন আর কেন্দ্রের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ নি:সন্দেহে ভারতের বড় সাফল্য। এই সাফল্যর ওপর নির্ভর করে ভারতের জনগণ নিজেদের কর্মপ্রেরণা, মেধা ও মননে তাদের সাফল্য ধরে রেখেছে। বিশাল ভারত শুধু আবহাওয়ার বৈচিত্র্য নয় সম্পদের দিক দিয়েও বৈচিত্র্যময়। লৌহআকরিক, খনিজ বক্সাইট, তামা, সিলিকা, ইউরেনিয়াম, লাইমস্টোন কী নেই ভারতে। এই সম্পদ উত্তোলন আর শিল্পখাতে ব্যবহারকে কেন্দ্র করে ভারতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ প্রতিবছর বিলিয়ন ডলার বাড়ছে। কিন্তু হাল আমলে এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সম্পদে সমৃদ্ধ মধ্যাঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে মাওবাদীদের হাত। ভারতের ২০টি প্রদেশের ২২৩ টি জেলায় কমবেশি মাওবাদীদের প্রভাব রয়েছে। এরা শুধু ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে না, খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী কোম্পানীগুলোকেও স্থানীয় ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। মাওবাদীদের বড় অংকের চাঁদা না দিয়ে ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, বিহারে খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ অঞ্চলে সরকারের ভেতরে এক ধরনের সরকার ব্যবস্থা কায়েম করেছে মাওবাদীরা। ভারতের প্রাজ্ঞ প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এ কারনে মাওবাদীদের ভারতের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। দেখা যাচ্ছে মাওবাদীরা ভারতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। ভারতের সমাজ বিশেস্নষকরা বলছেন, মাওবাদীরা মূলত ভারতের পিছিয়ে পড়া জনগাষ্ঠী। যারা করপোরেট অর্থনীতির সুবিধা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।

ভারত অর্থনৈতিক ভাবে যত শক্তিশালী হচ্ছে ধনী _ গরিবের ব্যবধানও ততটা বাড়ছে। বাড়ছে হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা। মুম্বাইয়ের বস্তির চিত্র যেনো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে ভারতের ইমেজের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। একই কারনে দেখা যাচ্ছে ভারতের অঞ্চল ভিত্তিক বৈষম্য বাড়ছে। দক্ষিণ ভারত শিল্প আর কৃষিতে যেভাবে এগিয়েছে, বিহার, উড়িষ্যা কিংবা উত্তর পূর্ব ভারত সমানতালে যেনো পিছিয়ে পড়ছে। গুজরাটে কৃষি প্রযুক্তি কিংবা শিল্পখাতে উন্নয়ন ভূবেনশ্বরের মানুষের কাছে কল্পনারও অগম্য।

ভারতের অর্থনৈতিক বিশেস্নষকরাও চিন্তিত এই ব্যবধান নিয়ে। অঞ্চল ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবধান দূর করা হবে আগামী দিনে ভারতের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ। ভারতের প্রধান অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে কিন্তু এ ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে না। ভারতের ধনী গরিব আর আঞ্চলিক ব্যবধান দেশটির নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। সেটি মনে হয় ভারতের বর্তমান নেতৃত্ব বুঝতে পারেন। কিন্তু এ এমন এক সঙ্কট যার গোলক ধাঁধা থেকে বের হয়ে আসা কঠিন। কারণ যেখানে উন্নয়ন হচ্ছে সেখানে আরো উন্নতি হবে। অবকাঠামো সুবিধা বাড়বে। পুঁজির স্ফিতি ঘটবে। সেখানকার সাধারণ মানুষের জীবন মান বাড়বে। কিন্তু যেখানে পুঁজি আসবে না সেখানে উন্নয়নও থমকে দাঁড়াবে। যে কারণে ছত্তিশগড় আর গুজরাটের মধ্যে ব্যবধান থেকেই যাবে।

Advertisements

তথ্য কণিকা Jahan Hassan জাহান হাসান
Ekush, Publisher/Editor/ Hollywood media hyphenate/ একুশ নিউজ মিডিয়া, লিটল বাংলাদেশ, লস এঞ্জেলেস / 1 818 266 7539 / FB: JahanHassan

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: