“May is Mental Health Month” আপনার জয় এবং পরাজয় পরিমাপক আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্যতা রাখুন


ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ২২টি টিপস

দক্ষতা বাড়ানো এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য নিচে উল্লেখিত উপসর্গগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমি এটা একজন জ্ঞানী লোকের নিকট থেকে জেনেছি কিন্তু তার নাম আমি এ মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। এ উপায়গুলো আপনার ওপর কতটুকু প্রভাব ফেলছে তা বোঝার জন্য কিছু সময় ব্যয় করুন।

১.    কে দায়ী এবং কিসের জন্য দায়ী। আমার সীমানা অতিক্রমযোগ্য কিন্তু দৃঢ়। বেশিরভাগ সময় আমরা নিজেদের দোষারোপ করি, দায়ী না হয়েও কিন্তু অনেক সময় কোনো কাজের জন্য দায়ী হতে হয় আবার দায়ী হওয়া হওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় তা স্বীকার করি না। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন ‘আসলে কে দায়ী?’ দেখুন আপনার মনোবল এবং শক্তি আপনাকে কী কাজ দিচ্ছে এবং এটি সঠিক কিনা?

২.    সতর্কতামূলক দুশ্চিন্তা পরিহার করুন এবং এটি ক্ষতিকারক হলে ত্যাগ করুন। আমরা দুশ্চিন্তা করে অনেক সময় নষ্ট করি যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। আপনি যদি আপনার দুশ্চিন্তাকে সতর্কতামূলক কাজে পরিণত করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেন তাহলে আপনি ভালো থাকবেন। আপনি যদি তা না পারেন তবে দুশ্চিন্তা ত্যাগ করুন এবং আপনার শক্তিকে কাজে পরিণত করুন। আপনি যদি সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা করেন তবে তা আপনাকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করবে। তাই আপনার কর্মক্ষমতাকে অন্য কাজে ব্যয় করুন।

৩.    আমাদের সবার জানা উচিত সূর্য যেমন পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিমে অস্ত যায় ঠিক সেই নিয়মে আমাদের জীবনে মৃত্যুও অবধারিত। তাই আমাদের কাজের জন্য দ্রুত হাঁটা উচিত। আমরা যন্ত্রমানব নই, আমরা মানুষ। তাই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে আমাদের লক্ষ স্থির রাখতে হবে এবং সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে, কর্মশক্তিকে যোগ্য কাজে লাগাতে হবে। কিন্তু আমরা অনেকেই তা না করে উদ্দেশ্যহীনভাবে এগিয়ে যাই এবং চিন্তা করি অগোছালোভাবে। আমরা এখানে সেখানে দৌড়িয়ে অনেক সময় নষ্ট করি যা ফলপ্রসূ হয় না। একটু বেশি সময় নিন এবং ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়ে দেখুন আমাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে কি না।

৪.    হগ প্রেথার বলেছেন ‘একটি পুরানো প্রবাদ আছে কোনো কিছু যদি আপনাকে নিঃশেষ করে তবে তা থেকে বেরিয়ে আসুন।’ মানসিক যন্ত্রণাশক্তিকে কাজে পরিণত করার পথে একটি বাণিস্বরূপ। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক। সমস্যাকে জীবন পরিবর্তনের চাবিকাঠি হিসেবে নিন। কষ্টের মুখোমুখি হোন। যদি আপনার জীবনে উন্নতি না হয় তবে ব্যবহার অথবা পরিস্থিতির পরিবর্তন করুন।

৫.    বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় এক সপ্তাহে ১৬৮ ঘণ্টা থাকে। আমাদের কাছে এর বেশি বা কম সময় নেই। এটা আমাদের কাজের উৎস। যদি আপনি সময়মতো চলতে পারেন আপনার জীবনও সময়মতো চলবে। কিন্তু আপনি যদি সময় অপচয় করেন আপনার জীবনেরও অপচয় ঘটবে। তাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।

৬.    পছন্দের বা শখের কথা ভাবুন। এটি আপনাকে মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। আমাদের প্রত্যেকের শখের বিষয় রয়েছে। আমাদের সাথে যা ঘটে তার ওপর বেশিরভাগ সময় আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিন্তু আমরা সেই সময়ে সেই কাজের প্রতি যত্নশীল থাকি এবং এটা আমরা স্বেচ্ছায় করতে পারি। শখ এবং অনুভবের মধ্যে একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের নিজেদের প্রতি নিয়ন্ত্রণের একটা নির্দিষ্ট ও আশানুরূপ মাত্রা রয়েছে। তাই শখের প্রতি বা পছন্দের কাজের প্রতি গুরুত্ব দিন।

৭.    মানসিক যুক্তিগুলো অভ্যাস করুন। সত্য এবং অবিঘ্নিত কাজের মধ্যে খুব অল্পই দূরত্ব রয়েছে। অধিকাংশ সময় আমরা অঙ্কের জ্যামিতির মতোই সরাসরি না বলে কিছু কথা ঘুরিয়ে বলে থাকি। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য এটি অভ্যাস করা প্রয়োজন। আমরা অধিকাংশ সময়ই এটি করে থাকি এবং এটি আমাদের মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন।

৮.    সহজ উপায়ে কাজ করুন। এই ছোট বাক্যটি এ কথাই মনে করে দেয় যে, অনেক সময় আমরা কাজ কঠিনভাবে করি যা আমরা সহজভাবেও করতে পারতাম। তাই পরবর্তী সময়ে আমাদের জীবনে চলার পথে মনে রাখব কঠিনভাবে কাজ সম্পন্ন করার পরিবর্তে সহজভাবে করব।

৯.    শুধু কাজ করার চেয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করা ভালো। কোনো ব্যক্তির সাথে কাজের ব্যাপারে দ্বন্দ্ব থাকলে আন্তরিকভাবে কাজ করুন, শুধুমাত্র দায়িত্ব পালনের কথা না ভেবে। আন্তরিক মুখোমুখি বা সম্ভাষণ আপনার সমস্যাকে মিটিয়ে দেবে এবং দুইপক্ষই ভালো অনুভব করবেন। প্রায় সব সময়ই শুধু কাজ করার ক্ষেত্রে দেখা যায় একজন লাভ করে এবং অন্যজন লোকসান করে। তাই এক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে তৈরি হয় লোকসানের ভয়, লাভের তীব্রতা এবং রাগ ও হতাশার ক্ষেত্র। এই অনুভূতিগুলো ক্ষতিকর। তাই ভাবুন কীভাবে আপনি শুধু জেতার কথা না ভেবে দুপক্ষের কথা আন্তরিকভাবে চিন্তা করে কাজটি সমাধা করতে পারেন।

১০.    নিজেদের প্রতি সতর্ক থাকুন কিন্তু সচেতন নয়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি চেষ্টাই হলো নিজেকে সতর্ক রাখা। এটা সিদ্ধান্ত নিতে এবং নিজের অনুভূতিকে বিশ্বাস করার জন্য সহায়ক। আত্মসচেতনতা অনেক সময় অন্যরা কী ভাবল তার প্রতি গুরুত্ব দিতে শেখায়। যারা আত্মসচেতন তারা সিদ্ধান্ত নিতে এবং কাজে পদক্ষেপ নিতে দুশ্চিন্তায় ভোগে। তারা অপরাধবোধ ও লজ্জাবোধে বেশি ভোগে। অন্যদিকে আত্মসতর্কতা কাজ করার ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ও দুশ্চিন্তাহীন মানসিকতার পরিচয় দেয়।

১১.    ভুল হলে খারাপবোধ করুন কিন্তু অপরাধবোধ ও লজ্জাবোধে ভুগবেন না। এটা পূর্বের সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন আপনি খারাপবোধ করবেন তখন ভালো থাকার চেষ্টা করুন। এটা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের একটা ভালো পদ্ধতি। অপরাধবোধ ও লজ্জাবোধের জন্য বাহ্যিক কারণ থাকে। যখন আপনি অপরাধবোধ করবেন তখন আপনি চিরকালের জন্য অপরাধী হয়ে যাবেন। লজ্জা আপনার আত্মোপলব্ধিকে নষ্ট করবে। আপনি খারাপবোধ করতে পারেন এবং গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। যথাযথ ব্যবহার করুন এবং দেখুন এটা আপনাকে ভালো রাখতে সাহায্য করছে কি না।

১২.    অন্যের মন-মানসিকতার কথা চিন্তা করুন। পরার্থবাদিতা এমনই ব্যবহার যা আপনি অন্যের জন্য যেমন করবেন তা নিজের জন্যও সেই মানসিকতা নিয়েই করবেন। আত্মসতর্কতা, আত্মসম্মানবোধ, আত্মদায়িত্ববোধ এবং আত্মজ্ঞান পরার্থবাদিতার ভিত্তি যেমন টেবিলের পায়ার বা ভালোবাসার মতো। যখন আপনি নিজের জন্য কাজ করবেন তখন আপনি অন্যের জন্য, পৃথিবীর জন্য অবদান রাখতে পারবেন। আমরা তখনই অন্যের জন্য কাজ করতে পারি যখন আমরা নিজে ভালো থাকি এবং নিজের যত্ন নিতে শিখি। আপনার কাছে কিছু না থাকলে আপনি অন্যকে কিছুই দিতে পারবেন না।

১৩.    সাময়িকভাবে নিজেকে থামান। এইচ (H) হচ্ছে ক্ষুধার প্রতিচ্ছবি। আপনি আপনার জীবনে কোন বিষয়টির জন্য ক্ষুধার্ত। এ (A)বসবে রাগের জন্য। এটা আমাদের অনেক সময় এবং শক্তি নষ্ট করে। তাই এটি নিয়ন্ত্রণ করার উপায় বের করুন। এল (L) বসবে একাকীত্বের জন্য। অন্য মানুষের সাথে আপনি কী রকম সম্পর্কযুক্ত, আমরা জানি মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য নির্ভর করার মতো বন্ধুর প্রয়োজন। আপনি কি আপনার অনুভূতি ভাগ করার মতো লোক বা বন্ধুর জন্য সময় ব্যয় করছেন? টি (T) বসবে ক্লান্তির জন্য। কী এবং কে আপনাকে ক্লান্ত করছে? আপনার ক্লান্তি দূর করার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত ওই সময়ে? যখন আপনি এই (HALT) পদ্ধতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবেন, আপনি আপনার সামর্থ্যের সর্বাধিক কাজ করতে পারবেন।

১৪.    সত্যিকার দৃঢ় সম্পর্ক আপনার নিজের সাথে গড়ে তুলুন। অন্তত একজন ব্যক্তির সাথে হলেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলুন। ঘনিষ্ঠতা মানুষের অভিজ্ঞতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময় নিয়ে ভাবুন আপনার নিজের প্রতি আপনি কতটা দায়িত্বশীল। অস্বীকার করা বা নিজেকে বঞ্চিত করা ইজিপ্টের নদীর মতো কোনো নদী নয়। প্রত্যেকটা জিনিসকে পরিষ্কার করে দেখা এবং গ্রহণ করার মতো মানসিক প্রস্তুতি থাকা এবং শেখা উচিত, তবেই আমরা পৃথিবীতে শান্তিতে বসবাস করতে পারব। আমরা নিজেরা নিজেদের দেখি কখনো সাধারণ আবার কখনো অসাধারণভাবে। আমাদের মধ্যে অন্তত একজন মানুষ থাকা উচিত, যে আপনাকে পরিপূর্ণভাবে চিনবে। সেই রকম বিষয় এবং মানুষ চেনার জন্য এবং নিজেকে সেরকম তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় এবং ব্যবস্থা নিন।

১৫.    সবচেয়ে ভালো কাজ করার চেয়ে যতটুকু পারেন ততটুকু করার চেষ্টা করুন। যখন আপনি আপনার সাধ্যমতো চেষ্টা করবেন তখন আপনার দুটো চোখই থাকবে কাজের প্রতি অর্থাৎ সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকবে কাজের প্রতি। কিন্তু আপনি যখন সবচেয়ে ভালো করার চেষ্টা করেন তখন আপনার একটি চোখ থাকবে মানের দিকে অন্যটি থাকবে কাজের প্রতি। যখন আমাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ থাকে কাজের প্রতি তখন কে কী ভাবল তা যদি না ভেবে থাকেন তবে কাজ ভালো হবে। আসলে আমরা প্রতি মুহূর্তে নিজের সাধ্যকে অতিক্রম করি। বাস্তবে আমরা যখন নিজের সাধ্যমতো কাজ করার চিন্তা করি, তখন দিনদিন কাজ সন্তোষজনক হতে থাকবে। এভাবে আমাদের কাজ প্রতিদিন এক ধাপ করে উন্নত হতে থাকবে। তাই চেষ্টা করুন নিজের সাধ্যমতো কাজ করতে। সব সময় মনে রাখবেন আপনি আপনার চারপাশের অবস্থাকে কখনই অতিক্রম করতে পারবেন না।

১৬.    রেলস্টেশন অতিক্রম করার নিয়ম যেমন সে অনুযায়ী জীবনে চলার চেষ্টা করুন। মনে করুন এবং স্মরণ করুন আমরা রেলস্টেশন অতিক্রম করার সময় কী করি-থামুন, দেখুন, শুনুন এবং সতর্কতার সাথে সামনে অগ্রসর হোন। যখন আমরা কারো সাথে সম্পর্ক গড়তে যাই চিন্তা করুন যা আমরা করছি তা যদি বন্ধ করে দিই তাহলে কী হবে, অন্যজনের প্রতি মনোযোগ দিলে কী হবে, তারা কী বলতে চায় তা শোনা বা বোঝার চেষ্টা করুন এবং যখন আপনার কথা বলার সুযোগ আসবে আপনি বলুন কী বলতে চান এবং সতর্কতার সাথে এগিয়ে যান। সম্পর্ক গড়া তখন অনেক নিরাপদ এবং উষ্ণ হবে।

১৭.    ভুল স্বীকার করার মতো সাহসী হোন। আমাদের সবারই অনেকের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। আমরা সবাই কমবেশি ভুল করে থাকি এবং সমালোচনার ভয়ে তা অস্বীকার করি। প্রখ্যাত গ্রিক দার্শনিক বলেছিলেন আমরা দোষ বা ভুলকে গোপন করার জন্য যে সময় ব্যয় করি তা না করে যদি ভুলকে স্বীকার করে তা সংশোধন করার জন্য সময় ব্যয় করি তবে আমরা সফল হবো এবং আমাদের মধ্যে মানবিকতা গড়ে উঠবে।

১৮.    আপনার জয় এবং পরাজয় পরিমাপক আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্যতা রাখুন। আমাদের মন সব সময়ই আশপাশের পরিবেশকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে এবং ভালো ও খারাপ অভিজ্ঞতা চিন্তা করে আমরা বেশিরভাগ সময় নেতিবাচক দিক নিয়ে বেশি ভাবি। প্রত্যেকদিন কিছু ভালো সংবাদ থেকে আনন্দ পেতে শিখুন। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় থেকে আনন্দ পেতে শিখুন। এক সমীক্ষণে দেখা যায় যারা এ অভ্যাসটি রপ্ত করতে পারেন তারা ভালো থাকেন এবং অধিক মনোবল পান।

১৯.    দুটি অভ্যাস গড়ে তুলুন। এক. তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ভাববেন না। দুই. সব কিছুই তুচ্ছ বিষয়। আমরা আমাদের জীবনে এক বিরাট অংশ ব্যয় করি ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে যা আমরা এক সময় ভুলে যাই। তাই কিছুক্ষণ বসুন এবং চিন্তা করুন কোনটি আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং কোনটি নয়।

২০.    আমরা প্রায় কোনো কিছু সম্পন্ন করার জন্য বা কোনো কাজকে সফল করার জন্য কাজ করি। মানুষের জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে খেলার জন্য সময় ব্যয় করার প্রয়োজন হয়। যখন আমরা খেলা করি আমাদের মস্তিষ্ক সকল প্রকার চিন্তামুক্ত থাকে। এটা নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ভালো উপায়। সপ্তাহের যে কোনো দিন এমন কাজে ব্যস্ত থাকা ভালো যা আপনাকে আনন্দ দেবে। এটা একা হতে পারে কিংবা অন্য কারো সাথে, ঘরে বা বাইরের কারো সাথে। এটা শারীরিক খেলা বা শখ হতে পারে। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্বাস্থ্যসম্মত এই বিষয়ে কিছু সময় ব্যয় করার জন্য।

২১.    অন্য মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা মানুষের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন মানুষের সংস্পর্শে থাকার অভিজ্ঞতা। উষ্ণ অভ্যর্থনা মানুষের সাথে মানুষের মিলনকে সুন্দর করে তোলে। তাই মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ককে প্রাণবন্ত করে তুলুন।

২২.    আপনার চোখে অধিক ক্ষমতাবানের প্রতি বিশ্বাস রাখুন। সমীক্ষণে দেখা গেছে যারা ঈশ্বর বা আল্লাহ বা ধর্মের প্রতি অনুগত তারা বিপদের সময় তা কাটিয়ে উঠতে দৃঢ় মনোবল পান। তাই শত কাজের ভিড়েও সকল ক্ষমতার যিনি উৎস তাঁর প্রতি কিছু সময় ব্যয় করুন।

অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ
বাংলাদেশের বিশিষ্ট মনোশিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক
অধ্যাপক সাইকিয়াট্রিঃ দি রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স এন্ড
 
সার্জনস অব দি ইউএসএ

Mental Health America is proud to continue its tradition of celebrating “May is Mental Health Month,” which began in 1949 to raise awareness of mental health conditions and mental wellness for all.

This year, we are addressing these important issues through two themes:

Do More for 1 in 4 is a call to action to help the 1 in 4 American adults who live with a diagnosable, treatable mental health condition and the fact that they can go on to live full and productive lives. Download the Do More For 1in4 Toolkit.

The second theme, Healing Trauma’s Invisible Wounds, focuses on the impact of traumatic events on individuals and communities.  It centers around asking the person-based question: “What happened to you?” Download the Healing Trauma’s Invisible Wounds Toolkit.

 
 

জীবন আর সুখ দুটি শব্দই তো গভীর সমুদ্রের মতো বিশাল একটা কিছু


সুখ ভাবনা

সাগর চৌধুরী

‘আমি কি সুখী’?-প্রশ্নটি জীবনচলার পথে প্রায়ই আমাদের মনে উঁকি দেয়। ব্যস্ত জীবনে ব্যস্ত মনে এর উত্তর কি কখনো কেউ খুঁজে পেয়েছে? পাবেই বা কী করে? প্রশ্নটি সহজ মনে হলেও এর উত্তর তো সরল অঙ্কের মতো এক এবং অভিন্ন নয়। আর উত্তর খুঁজে পাওয়ার মতো আমাদের অবসরটাই বা কোথায়? সবাই তো জীবনযুদ্ধের সম্মুখ সেনা। এতটুকু বিশ্রাম নেয়ার সময় কারো নেই। আর এ যুদ্ধ তো আমরণ। মানুষ জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যেন এক যুদ্ধে অবতীর্ণ। মায়ের পেটের অভ্যন্তরেই তো ছিল সুখ, ছিল শান্তি আর ছিল নিরাপত্তা। জন্মলাভের শুরুতেই কান্নার শিঙা বাজিয়ে আমরা যুদ্ধ শুরু করি। প্রথমে যুদ্ধ হয় নতুন এক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার, তারপর বেড়ে ওঠার। যুদ্ধের প্রতিটি ধাপ কতই না কঠিন! তবু পেরিয়ে যেতে হয় একের পর এক সব বাধা, সব বিপত্তি।
সেদিনের শিশু যখন তার শিশুত্ব শেষ করে তাকায় কৈশোরের দিকে, তখন সে ভাবে কৈশোরেই বুঝি তার সব সুখ। এরপর সময় পেরিয়ে সে যখন কৈশোরে পা রাখে, তখনো যুদ্ধ শেষ হয় না। তাকে আরো জানতে হবে, শিখতে হবে, বেড়ে উঠতে হবে। যৌবনকে কাছে পেতে তার কতই না চেষ্টা, কতই না যুদ্ধ। সময় যেন যেতেই চায় না। একদিন সে হাজির হয় যৌবনের দোরগোড়ায়। সাহসী সৈনিকের মতো খড়গ উঁচিয়ে এগিয়ে চলে নতুন উদ্যমে। জয় করতে চায় সব বাধা, বিপত্তি ও চ্যালেঞ্জকে। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যুদ্ধ। নিজ পায়ে দাঁড়ানোর যুদ্ধ।
 
সময়ে সময়ে ক্লান্ত মনে তাকিয়ে থাকে সে সামনের পানে। ওই তো সীমান্ত, যেখানে তার দৌড় শেষ হবে। কিন্তু জীবন দৌড় তো আর ম্যারাথন দৌড় নয় যে, ২৭ মাইল পরেই লাল ফিতা ছুঁয়ে সমাপ্ত হবে সব। এ যে অনন্তকালের দৌড়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় সে নিজেকে আবিষ্কার করে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে। চারদিকে তাকিয়ে বীরের মতো হুংকার করে ওঠে সে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে মনে করে সে। কিন্তু সামনে তাকিয়ে কিছুটা হতাশ হয়, তাকে তো আরো এগোতে হবে, অনেকটাই। আবারো শুরু হয় জীবন-দৌড়। এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজের অজান্তেই এক সময় সে হাজির হয় লাল ফিতার অনেকটা কাছাকাছি। পেছন ফিরে তাকিয়ে সে দেখে ফেলে আসা পথটিকে, স্মৃতির পাতায়। সত্যিই কি সে প্রৌঢ়ত্বে এসে গেছে! এবার সে আবারো হতাশ হয়। মন মানতে চায় না। ফিরে যেতে ইচ্ছা করে যৌবনে, কৈশোরে এবং শৈশবে। কিন্তু তা কী করে হয়! লাল ফিতা তো এখনো ছোঁয়া হয়নি। তাই অনেক কষ্টে এগোতে হয় তাকে জীবনটাকে সঙ্গে নিয়ে। এবার সে বড়ই ক্লান্ত। দীর্ঘ দৌড়ের পর তার নানা অসুবিধা। ভাঙা গাড়ির মতো এগিয়ে চলা। তবু চলছে এটাই সান্ত্বনা। একেবারে থেমে যেতেও কেন জানি ভয় হয়। তাই দৌড়ের কোনো বিকল্প খুঁজে পায় না সে। এ দৌড় যেন থামছে না। মাঝে মাঝে আবারো সেই প্রশ্ন- আমি কি সুখী? বাকি সব সাথীর অনেক সুখী মনে হয়। মনে হয় কত সুখেই, কত স্বাচ্ছন্দ্যেই ওরা দৌড়ে চলেছে। তবে আমি এত ক্লান্ত কেন? আমি কি তবে অসুখী? এবারে অঙ্কের মতো কোনো উত্তর খোঁজা যাবে না।

তবু উত্তরটা কেন যেন স্বচ্ছ মনে হচ্ছে না। স্বচ্ছ মনে হবেই বা কেন? জীবন আর সুখ দুটি শব্দই তো গভীর সমুদ্রের মতো বিশাল একটা কিছু। আর সুখ জিনিসটা মাপার কোনো যন্ত্র তো আজও আবিষ্কার হয়নি, হয়তো হবেও না কোনো দিন। পুরো জিনিসটাই তো মনের ব্যাপার। আর মানুষের মন তো অদ্ভুত একটা জিনিস। পারিপার্শ্বিকতা, পরিস্থিতি আর সময়ের সঙ্গে তার নানারূপ। তাই চিরন্তন সুখ আর চিরন্তন সুখী বলে কোনো জিনিসকে খোঁজা ঠিক হবে না। কখনো তাই নিজেকে খুব সুখী মনে হলেই দেখা যায় এমন এক ঘটনা বা এমন এক পরিস্থিতির উদ্ভব হলো যে, সেই একই মানুষ আবার নিজেকে সুখের বাইরে আবিষ্কার করল। সুখ আর দুঃখ তাই যেন একই পথের দুটি পাশ। সমান্তরালেই তাদের এগিয়ে চলা। পৃথিবীতে দুঃখ না থাকলে হয়তো সুখের তৃপ্তিটা আমরা কেউ উপলব্ধি করতে পারতাম না। সেই হিসেবে দুঃখের গুরুত্বও কম নয়। এ যেন আলো আর অন্ধকারের খেলা। আলোর গুরুত্ব অন্ধকারেই আর অন্ধকারের গুরুত্বও আলোতেই।

সুখ আর দুঃখের গুরুত্ব যা-ই হোক না কেন, মানুষ মাত্রেই সুখের অন্বেষণে ব্যস্ত। আর এই ব্যস্ততার মধ্যে সুখ সম্পর্কে নিজের ধারণা স্বচ্ছ না হলে সুখের কাছে যাওয়া কি সম্ভব? ব্যক্তিজীবনে আমরা সবাই হন্যে হয়ে সুখকে কাছে পেতে চাই। তবে অস্বচ্ছ ও আপেক্ষিক এবং মনসম্পর্কিত এই সুখ সম্পর্কে আপাত স্বচ্ছ একটা ধারণা বোধহয় আমাদের থাকা দরকার। তা না হলে সুখের পেছনে দৌড়ানোটা বোধহয় অরণ্যে রোদনের মতোই ব্যাপার হবে। অনেক দিন হলো আমি নিজের মধ্যে সুখের এক সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছি। যা দিয়ে আমার কিছুটা কাজ হয়েছে। নিজেকে এখন আর তেমন দুঃখী মনে হয় না। তিনটি প্রশ্নের উত্তরে আমি সুখী কি না তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

এক. আমি যা খাচ্ছি তার সঠিক স্বাদ কি আমি পাচ্ছি? উত্তর যদি হয় হ্যাঁ, তবে নিজেকে সুখী ভাবতে হবে। ভেবে দেখুন তো সেই সব মানুষের কথা, যাদের মুখের স্বাদ সৃষ্টিকর্তা তুলে নিয়েছেন। তাদের থেকে আপনি কি অনেক বেশি সুখী নন?

দুই. আপনি যখন ঘুমাতে চান, তখন কি ঘুমাতে পারেন? হ্যাঁ হলে অবশ্যই আপনি সুখী। ক্লান্ত শরীর ও মন নিয়ে বিছানায় শুয়ে প্রহর গুনছেন। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। শুধু ছটফট করছেন। আর বিনিদ্র রজনী পার করছেন। তখনই বুঝবেন ঘুমের গুরুত্ব। ঘুম যেন পৃথিবীতে স্বর্গসুখেরই এক স্বাদ। তাই ঠিকমতো ঘুমাতে পারলে পরের দিনটি হয় নির্মল, কর্মক্ষমতা থাকে প্রখর এবং মন ও মেজাজ থাকে ভালো। তাই তো সঠিকভাবে ঘুমাতে পারাটা সুখেরই বিষয়।

তিন. পৃথিবীতে সত্যিকার বন্ধু হিসেবে আপনার কি একজন কেউ আছে? হতে পারে সে আপনার বাবা, মা, ভাই, বোন বা স্বামী-স্ত্রী বা অন্য কেউ। যার কাছে আপনি আপনার দুঃখ অকপটে আর নিঃসংকোচে প্রকাশ করতে পারেন। যদি সংখ্যায় একজনও কেউ থাকে এমন বন্ধু, তাহলে আপনি সুখী ভাবতে পারেন নিজেকে। আর এই তিন প্রশ্নের প্রতিটিই যদি আপনার উত্তর হয় হ্যাঁ, হ্যাঁ এবং হ্যাঁ, তাহলে সত্যিই আপনি সুখী। তবে তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে কেউ কেউ সন্দিহান হতে পারেন। আর হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বন্ধু অনেকেরই একের অধিক হতে পারে। কিন্তু দেখা যাবে কারোর সঙ্গেই মনের দুঃখ সবটুকু শেয়ার করা যাচ্ছে না। আবার মানুষের কিছু কথা থাকে যা সে কারোর সঙ্গেই ঠিকমতো শেয়ার করতে পারে না বা করতে চায় না।

নিতান্তই গোপনীয় কিছু ব্যাপার। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু বা বন্ধুত্বের পরিবর্তনও ঘটতে পারে। আজ যাকে সবচেয়ে প্রিয় বা বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবা হচ্ছে, সে-ই হয়তো কিছুদিন পর প্রিয় বন্ধু নাও থাকতে পারে। মনের মিল বা বন্ধুত্ব ঘটতে সময় বেশি লাগলেও বন্ধুত্বে বা মনের  অমিল ঘটতে কিন্তু দেখা যায় বেশি সময় লাগে না। সে যা-ই হোক, বন্ধু বিনে মানুষ বাঁচতে পারে না। মানুষ সুখী হতে পারে না। শুধু মানুষ কেন, একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে পৃথিবীর সব প্রাণীই বন্ধুবৎসল। একই খাঁচায় বন্দি দুই হিংস্র প্রাণীর মধ্যেও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। হয়তো বা বেঁচে থাকার তাগিদেই। আর মানুষ তো সামাজিক জীব। মানুষ বন্ধু ছাড়া বাঁচবে কী করে! সুখ তো আরো পরের কথা। লক্ষ করলে দেখা যায়, উপরের তিনটি প্রশ্নের সঙ্গেই মানসিক ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

মনই যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। গাড়ির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে যেমন স্টিয়ারিং হুইলের গুরুত্ব, মনও তেমনি মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই আমরা যদি আমাদের নিজ নিজ মনকে সঠিক পথে চালনা করতে পারি, তাহলে হয়তো বা দুঃখের বোঝাভার কমিয়ে আমরা সুখের কাছাকাছি থাকতে পারব। না পাওয়ার দুঃখ ভুলে আমরা যা পেয়েছি, যদি সেই সুখে মত্ত থাকি তাহলে সবাই আমরা বেশি বেশি সুখী হতে পারতাম।

আমাদের একটা বড় দোষ অন্যের সুখকে বড় করে দেখা। অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করতে যাওয়ায় আমাদের গলতি রয়েছে। তুলনা করা ভালো তবে তার দিক সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। একটা কথা আছে, ‘তুমি তোমার নিচের দিকে তাকাও।’ নিচে তাকাতে শিখলে আমরা বুঝব কত উপরে আমরা দাঁড়িয়ে আছি অথচ এই দৃষ্টিই যদি একবার ঊর্ধ্বমুখী করে ফেলি, তাহলে না পাওয়ার দুঃখ আমাদের ধীরে ধীরে ছেয়ে ফেলবে। তাই আমাদের সব অর্জনকেই বড় করে দেখতে হবে। সব ব্যর্থতা আর না পাওয়াকে গৌণ ভেবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। সুখ, দুঃখ, পাওয়া আর না-পাওয়ার কোনো বিষয় নয়-এটা ধনী-গরিবেরও কোনো বিষয় নয়। প্রকৃত বিষয়টিই হচ্ছে মানসিক। পাওয়ার আনন্দকে বড় করে দেখা, আর না-পাওয়ার বেদনাকে উপশম, মন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাই মনই সুখের কেন্দ্রস্থল বা রুট।

সেই রুটের সঠিক পরিচর্যায় আমাদের যত্নশীল হতে হবে। এই পরিচর্যার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক শিক্ষার। শিক্ষা বলতে এখানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষার কথা বলছি না। শিখতে হবে আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা থেকে। মনে রাখতে হবে, আমরা সবাই একটাই জীবন পেয়েছি। আর যে সময় আমরা প্রতিটি মুহূর্তে পার করছি তা আমাদের জীবনে আর কখনো ফিরে আসবে না। তাই নিজেকে সুখী করার, সুখী ভাবার জন্য এখনই কাজ করতে হবে। বেশি কিছু পাওয়ার আশায় বর্তমানকে আমরা যেন অবহেলা করে কাটিয়ে না দিই। অতীত তো গেছেই। তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার মধ্যে বর্তমানই যেন একমাত্র সম্বল। তাই উচিত হবে অতীতের দুঃখকে বড় করে না দেখা, আর ভবিষ্যতের সুখের জন্য সুন্দর বর্তমানকে পুরোপুরি জলাঞ্জলি না দেয়া। সময়কে সঙ্গে নিয়ে চলুন, মনকে সঠিক নিয়ন্ত্রণ করুন, দেখবেন জীবনটা অর্থবহ মনে হবে। নিজেকে অনেক সুখী মনে হবে।

রোমান্সে ভেসে যাওয়ার একগাদা টিপস্‌


রোমান্সে ভেসে যাওয়ার একগাদা টিপস্‌

তামিম আবদুল্লাহ

আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদ দিনে…
ড্রয়িং রুম, বুক সেলফ, ওয়ারড্রব কিংবা গ্যারেজ সাফসুতরো করতে পারেন। এসব কাজ করা কোনো ব্যাপার নয় যদি দুজন একসঙ্গে করা যায়। এক্সারসাইজ করতে পারেন। চলে যান কোনো সুইমিং ক্লাবে সাঁতার কাটতে কিংবা স্রেফ বৃষ্টিতে হাঁটাহাঁটি করেও উপভোগ করতে পারেন সময়। ম্যারাথন মুভি দেখতে বসে যান। আশপাশের ভিডিও শপ থেকে একগাদা মুভি আনুন, সেই সঙ্গে খাবার-দাবার। সারাটা দিন মুভি ক্রিটিক হিসেবেই কাটিয়ে দিন।

কোনো একটা আর্ট গ্যালারি ঘুরে আসুন। আপনার এলাকায় বা এর আশপাশে হচ্ছে এমন কোনো একজিবিশন ঘুরে দেখুন দুজন।

সময়কে পিছিয়ে নিন, ঘুরে আসুন মিউজিয়ামে। অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক জায়গা আছে যেগুলো কেবল দর্শনীয় হিসেবেই খ্যাত নয় বরং সেখানে ঘুরে কিছু শেখাও সম্ভব।

দুজনের স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটাতে পারেন। অনলাইনে মেমোরি টেস্টের বিভিন্ন প্রোগ্রাম থেকে। দিনজুড়ে দুজন দুজনার মনে রাখার ক্ষমতা যাচাই করতে পারেন।

নিজেদের আবিষ্কার করুন। বইয়ের দোকান কিংবা ইন্টারনেটে আজকাল অনেক ধরনের পারসোনাল প্রোফাইল টুলস পাওয়া যায় যেগুলো আপনাদের ব্যক্তিত্বের ধরন, আপনাদের আইকিউ অথবা আপনাদের রিলেশনশিপ স্টাইল খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

কিছু তৈরি করতে পারেন। হতে পারে একটা টি-টেবিল, কোনো সেলফ, পটারি ডিশ, ফ্লাওয়ার ভাস, চেহারার ভাস্কর্য, ক্যান্ডল ইত্যাদি। ক্রাফট শপে গেলে এ ধরনের শত শত আইডিয়া পাবেন।

ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা দেখে আসতে পারেন, যদিও খেলাধুলা খুব একটা ধাতে সয় না আপনার তবু পরিবেশের একটা প্রভাব তো আছেই। যাওয়ার আগে পত্রিকার পাতায় ফিকশ্চার লিস্ট দেখে নিন।

সন্ধ্যাটা নিজেদের ব্যাপক পছন্দের আইটেম দিয়ে সাজান। টিভি প্রোগ্রামের তালিকায় চোখ বুলিয়ে নিন আর বিনোদনে ভরপুর একটা রাত তৈরি করুন।
মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুঁটি…
দুজন মিলে হাঁটতে বেরুতে পারেন যে কোনো জায়গায়। হাইকিংয়ে বের হতে পারেন। হাইকিং হলো পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ। আশপাশে কোনো পাহাড়ি পথ থাকলে দুজনে হাঁটা ধরুন, দেখুন ক্লান্ত হয়ে কে আগে বসে পড়ে।

অভ্যাস থাকলে সাইকেল রাইডিংয়েও বেরিয়ে পড়তে পারেন দুজনে। হাঁটার মতো সাইকেলও এনার্জেটিক ও চমৎকার। হাঁটা বা সাইকেল দুই ক্ষেত্রেই মানসিক চাঙ্গা ভাবের সঙ্গে সঙ্গে আপনার স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে।

বোট ভাড়া করতে পারেন। নৌকা বাইতে বাইতে নদী বা লেকের এলোমেলো হাওয়ায় চুল উড়িয়ে একটা রোমান্টিক নৌকা ভ্রমণ সেরে ফেলতে পারেন। পার্কে ঘুরে আসুন। দোলনায় দোল খেয়ে সময় কাটাতে পারেন বা খেলতে পারেন টেনিস।

রিকশা করে ঘুরতে অনেকেরই পছন্দ। লম্বা খোলা রাস্তায় ঘণ্টা চুক্তিতে রিকশা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়ুন অজানার উদ্দেশে।
গ্রামের বাড়িতে বেড়িয়ে আসুন। আপনার নিজের মায়ার বাঁধনে বাঁধা নিড়ে ফিরে কিছুটা প্রেরণা নিয়ে আসুন নিজের মধ্যে।

নিজেদের পশুসুলভ প্রবৃত্তিকে মেনে নিয়েই ঘুরে আসুন চিড়িয়াখানা বা কোনো বড় ফার্ম হাউসে। পার্কের এদিক-ওদিক ঘোরার সময় রিলাক্স থাকুন। আর মাকড়সা কিংবা সাপকে যদি আপনি অপছন্দ করেন তবে বানরের খাঁচার কাছে গিয়েও কাটাতে পারেন সময়।

পিকনিকের কথা ভুলবেন না। ওপরের আইডিয়াগুলোকে আরো আনন্দদায়ক করে তুলতে সঙ্গে মজার মজার খাবার নিতে ভুলবেন না কিন্তু।
সপ্তাহ শেষ, কী করা যায়

নিজের শহর থেকে বের হয়ে ঘুরে আসতে পারেন আশপাশের কোনো শহর বা গ্রামাঞ্চলে।

বেড়িয়ে আসতে পারেন আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবের বাসায়। ভিন্ন অঞ্চলের মানুষজনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। তারা যদি রাতে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা না করতে পারে সে ক্ষেত্রে নিজেদের থাকা আর সকালের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা নিজেরাই করুন।

কোনো হেলথ ক্লাবে নিজেদের পুরো সময়টা ব্যয় করতে পারেন।
আপনাদের বাসার যে কোনো একটি রুম বেছে নিয়ে সেটিকে ঢেলে সাজাতে পারেন।
পুরো বাসাটাকে একেবারে ঝেড়েমুছে ফেলুন কিংবা বাগানটিকে নতুন কোনো শেপ দিতে পারেন।

বাচ্চারা এখন বিছানায়…
খেলাধুলা করতে পারেন, হতে পারে সেটা ক্যারম, কম্পিউটার গেমস, কার্ডের গেমস বা কোনো দুষ্টুমি খেলা…
মাথা খাটানোর কাজে সময় কাটাতে পারেন, জিগস পাজল, ক্রস ওয়ার্ড বা কুইজ বুক। আপনাদের আইকিউর ধারটা কার কেমন সেটা পরখ করে দেখুন। নিজেদের মধ্যে কিছুটা বাড়তি প্রশ্রয় দিতে পারেন, আপনার পার্টনারকে হালকা ম্যাসাজ, ম্যানিকিউর বা প্যাডিকিউর দিন। আমাদের সবারই কিছু সময় বাড়তি প্রশ্রয়ের দরকার হয়।

আপনাদের রুচির সঙ্গে ম্যাচ করে কোনো ফিল্ম ভাড়া করে আনতে পারেন, হতে পারে সেটা কমেডি, কান্নাকাটি, রোমান্টিক বা হরর মুভি।
ইচ্ছামতো খাবারের স্বাদ নিতে পারেন।

দুজনে মিলে রোমান্টিক একটা ডিনার উপভোগ করতে পারেন, মোমবাতিগুলো জ্বালান, হালকা মিউজিক ছেড়ে দিন, দামি ক্রোকারিজ বের করে ফেলুন। হাজার হোক সময়টাকে ভোগ করার একটা অজুহাত চাচ্ছেন আপনারা। বাগানে বা ছাদে বসেই পিকনিক সারতে পারেন।

সোফা বা ইজি চেয়ারগুলোকে টেনে বাইরে আনুন। দুই কাপ হট চকোলেট নিয়ে আরাম করে সময় কাটান দুজনে।
দুজনে মিলে একই বই বা গল্প পড়ুন, এরপর বইটি সম্পর্কে দুজনের নোট তুলনা করতে পারেন।

পুরনো ফটো অ্যালবামগুলো নিয়ে বসুন। রাতটা উপভোগ করতে পারেন নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। বা এর সঙ্গে নিজেদের আরো সম্পৃক্ত হতে চাইলে আপনাদের পোরট্রেইটগুলোকেই বেছে নিন না কেন?

দুজন মিলে নতুন কোনো রেসিপি তৈরির চেষ্টা করতে পারেন। জিভের গোড়ায় থাই, ইন্ডিয়ান, চায়নিজ যেটাই চান তার একটা স্বাদ দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
দুজনে মিলে ল্যাঙ্গুয়েজ প্র্যাকটিস করতে পারেন। বাংলা, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ যে কোনো ভাষাই হতে পারে সেটা।

ইন্টারনেট শপিং করতে পারেন। আর এটা দিয়ে দুজনেই কিন্তু পারেন দুজনকে সারপ্রাইজ দিতে। অনলাইনে জিনিসটা কিনুন তারপর অপেক্ষা করুন সেটা পৌঁছানোর জন্য।
দুজন মিলে একটা কবিতা বা গল্প লিখতে পারেন, নিজেদের মধ্যে সুরের মূর্ছনা অনুভব করলে লিখে ফেলতে পারেন একটা গানও।

বিকেলটা বাইরে কাটাতে চাইলে

থিয়েটারে চলে যান।

কিছুক্ষণ এক্সারসাইজ করুন। যেতে পারেন জিমে কিংবা সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে অথবা ব্যাডমিন্টন বা স্কোয়াশ খেলতে পারেন।

আজকাল আশপাশে অনেক বোলিং ক্লাব হয়েছে। যোগ দিতে পারেন আপনার কাছাকাছি কোনো বোলিং ক্লাবে।

শহরের কোথাও কনসার্ট হচ্ছে কি? কিংবা গজলের আসর? ভিন্নধারা কিছু উপভোগ করতে বেরিয়ে পড়ুন দুজনে।

আলসেমিতে ভরা একটা ডিনার সারতে পারেন। এটা হতে পারে কম দামি ও আনন্দদায়ক কিংবা গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে। বাধাহীন কথোপকথনের এ সুযোগ উপভোগ করুন।

চলে যান সিনেমা হলে। পেছনের সারির সিট দখল করে সামপ্রতিক কোনো ব্লক বাস্টার মুভি উপভোগ করুন। দেখুন আপনার এলাকায় কী মুভি চলছে।

হাতে সময় মাত্র এক ঘণ্টা
কথার বদলে বালিশ দিয়েই একটা ফাইট হয়ে যাক। আরো ভালোবাসার জন্য কাতর হয়ে পড়েছে মন? নিজেদের মধ্যে খানিকটা ভালোবাসার স্পর্শ হলে মন্দ কি?
সাবানের ফেনায় ভরপুর একটা গোসল সেরে ফেলুন।

সকালের নাশতা হোক আর যাই হোক, বিছানাতেই সেটা সেরে ফেলুন। হাতে যখন সময় কম, তাহলে প্ল্যান করে ফেলুন, পুরো বিকেলটা যখন পাবেন নিজেদের হাতের মুঠোয় কী করবেন।
আপনাদের পারিবারিক বংশধারা নিয়ে গবেষণা শুরু করতে পারেন, এরপর ঘণ্টাখানেক সময় হাতে পেলেই তাতে নতুন করে কিছু আইটেম যোগ করুন। একটা কেক বা এমন কিছু তৈরি করুন যা দুজন মিলে একসঙ্গে খেতে ভালো লাগবে।

কোনো ফিটনেস ভিডিও চালিয়ে দিয়ে দুজনে অ্যারোবিকস, পাইলেটস বা যোগব্যায়াম প্র্যাকটিস করতে পারেন। 
অনলাইন কুইজ সেরে ফেলতে পারেন এক ঘণ্টায়।

রোমান্টিক ভঙ্গি
বলুন, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আই লাভ ইউ। একবার আলিঙ্গনে বাঁধুন নিজেদের। ভালোবাসার একটা নোট ছেড়ে যেতে পারেন ব্রিফকেসের ওপর বা টিভি স্ক্রিনে। কিংবা রেডিওতে লাভসং রিকোয়েস্ট করতে পারেন। একটি চুমো দিতে পারেন বা ভয়ংকর রকমের প্রণয়-চাপল্যও প্রকাশ করতে পারেন। ফুল দিন। যোগাযোগ রাখুন। যখন দুজনে আলাদা আছেন মেসেজ, ই-মেইল কিংবা ফোনে তার খবর নিন। লিপস্টিক দিয়ে আয়না বা অন্ধকারে ভেসে থাকে এমন চক দিয়ে দেয়ালে লিখতে পারেন- আই লাভ ইউ।

 

মাইকেল গুরিয়ান দু-দশক ধরে সম্পর্কিত নারী-পুরুষের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ কিভাবে তাদের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলে তা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেছেন। তিনি রোমান্সের অনুভূতিগুলোকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। রোমান্সের প্রথম পর্যায়টি শুরু হয়, যখন দু-জন নারী-পুরুষ পরস্পরের কাছাকাছি আসে। তখন তাদের মস্তিষ্কের ভেতর এক ধরনের সংকেত অনুভূত হয়, যা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা যখন পরস্পরের সান্নিধ্যে আসে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত আলোড়নের সৃষ্টি হয়। এই আলোড়নের ফলে তারা ভাবতে থাকে যে, তাদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ এক হয়ে গেছে; কোনো প্রলয়কারী ভূমিকম্পও এই অস্তিত্বকে ছিন্ন করতে পারবে না।

অক্সিটোসিন নামের একটি হরমোন, যেটিকে বলা হয় সম্পর্কের হরমোন (বন্ডিং হরমোন), সেটির উপস্থিতি তখন প্রিয়জনের মধ্যে যে বিরক্তিকর বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলোকে তাদের দৃষ্টির ও অনুভূতির বাইরে সরিয়ে রাখে। আর সে জন্যই, দু-জনকে দুজনের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় মনে হয়। তখন তারা পরস্পরের সামান্য ছোঁয়াকেও স্বর্গীয় সুখ মনে করে। তবে এই স্বর্গীয় সুখ বেশিদিন চিরস্থায়ী হয় না। সর্বোচ্চ বছর খানেক পর মস্তিষ্কের ক্রিয়া বা সংকেত পরিবর্তিত হতে থাকে, এবং মস্তিষ্কের বিষেশ একটি অংশ থেকে এমন একটি বার্তা আসে, তা হচ্ছে “আমার প্রিয়ার মধ্যে অনেক অসামজ্ঞস্য রয়েছে”।

এর ফলে তারা রোমান্সের প্রথম স্তর থেকে দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে। ফলে তাদের পরস্পরের প্রতি ক্ষোভের সৃষ্টি হতে থাকে। এই ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে; ফলে একজনের আচরণ অপরজনের কাছে ক্রমশ বিরক্তিকর ও সন্দেহজনক মনে হতে থাকে। বিরক্তি ও সন্দেহ ক্রমশ বাড়তে বাড়তে এমন এক অস্বস্তিকর অবস্থায় পৌছায় তখন একজন আরেকজনের ওপর মানসিক অথবা শারীরিক অথবা মানসিক-শারীরিক জোর খাটাতে থাকে। আর তখনই তারা রোমান্সের দ্বিতীয় স্তর থেকে তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করে। তার তখনই শুরু হয় সহ্যহীন ও বিরামহীন ভুমিকম্প।

সূত্র : মন ও মানসিকতা — মেহতাব খানম


 

ধরে রাখুন আপনার ‘তারুণ্য’


ধরে রাখুন আপনার ‘তারুণ্য’

তারুণ্য ধরে রাখতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের জুড়ি মেলা ভার। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার থাকতে হবে। এর ফলে অকাল বার্ধক্য এবং নানা ধরনের রোগ আমাদের কাছ থেকে শত হাত দূরে থাকবে।

প্রাচীনকাল থেকে সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ চেয়েছে তার রূপ-লাবণ্য বাড়ানোর পাশাপাশি তারুণ্য ধরে রাখতে। বিজ্ঞানের এই অত্যাধুনিক যুগে এসেও এর বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। বরং রুপালি পর্দার তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই চায় বয়স যতই বাড়ুক না কেন তারুণ্যের ছোঁয়া থাকুক সব সময়।

জাদু আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে
তারুণ্য ধরে রাখতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের জুড়ি মেলা ভার। আমাদের শরীরে অনেক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্ষিত থাকে। কিন্তু বর্তমান লাইফস্টাইল, যেমন-ফাস্ট ফুড খাওয়া, স্ট্রেস, মাত্রাতিরিক্ত টেনশন, ধূমপান, কায়িক পরিশ্রমে অনীহা ইত্যাদি আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক অক্সিডেন্টকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার থাকতে হবে। এর ফলে অকাল বার্ধক্য এবং নানা ধরনের রোগ আমাদের কাছ থেকে শত হাত দূরে থাকবে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহণে করণীয়
ফলমূল, শাকসবজি ইচ্ছামতো গ্রহণে কোনো বিধিনিষেধ নেই। যতটা ইচ্ছে খেতে পারেন। তবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ট্যাবলেট খেতে গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, ফলমূল, শাকসবজি গ্রহণে যেখানে ১০০ শতাংশ সুফল পাওয়া যায়, সেখানে মাত্র ২৫ শতাংশ কাজ হয় ট্যাবেলেট বা ক্যাপসুলে।

পোড়া তেল নিষিদ্ধ
কোনো কিছু ভাজার পর পোড়া তেল অনেকে তুলে রেখে দেন পরদিন রান্না করার জন্য। এটা করা উচিত নয়। কারণ পোড়া তেল শরীরের জন্য মারাত্মক কুফল বয়ে আনে। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তৈরির সহায়ক এনজাইমগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রান্না যতখানি সম্ভব সিদ্ধ করে খাওয়া উচিত। এভাবে খাদ্যগুণ বজায় থাকে এবং হজমে সহায়তা হয়।

মাছ-মাংস কম খাওয়া ভালো
এটা শুধু বড়দের বেলায় প্রযোজ্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ-মাংস কম খাওয়া উচিত। রেডমিট যেমন গরু, খাসির মাংস বেশি খেলে রক্তে আয়রনের মাত্রা বেড়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের প্রক্রিয়া বিনষ্ট করে।

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট 
শরীর ও মনের ক্ষতি করতে স্ট্রেসের জুড়ি নেই। কিন্তু এটা থেকে দূরে থাকতে হবে। বলা যত সহজ, দূরে থাকাটা ততই কঠিন। তাই কীভাবে একে ম্যানেজ করা যায়, সেটা ভাবাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে স্ট্রেস সৃষ্টি হলে শরীরে অ্যাড্রিনালিন গ্ল্যান্ড থেকে এক ধরনের হরমোন বের হয়, যা শরীরে টক্সিন ছড়ায়। এটা রক্তনালিকে সরু করে দেয়, যার ফলে রক্তচাপ বাড়ে, মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডে তার সুদূর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ত্বক খসখসে হওয়া, চুল উঠে যাওয়া, বুড়োটে ভাব ইত্যাদি শারীরিক সমস্যাগুলোও এর ফলে উদ্ভব হয়। স্ট্রেস কমানোর প্রয়োজন তাই সবাই অনুভব করে। নিজের পছন্দমতো কোনো কাজ করা বা ছবি থাকলে, যেমন-জীবজন্তু পোষা, বই পড়া, গান শোনা, নিয়মিত খোলা জায়গায় বেড়ানো ইত্যাদিতে মনের ভার অনেকখানি লাঘব হয়।

পজিটিভ থিংকিং
রূপের দুনিয়ায় বর্তমানে নতুন একটা মতবাদ প্রায়ই শোনা যায়। আর তা হচ্ছে পজিটিভ থিংকিং। সহজ কথায় ইতিবাচক চিন্তা। দুশ্চিন্তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব প্রায় পারমাণবিক বোমার মতোই। এর প্রভাবে ত্বক, চুল বিনষ্ট হয়ে যায়, এমনকি শরীরের প্রধান প্রধান অঙ্গ, যেমন-হৃৎপিণ্ড, কিডনি, লিভার ইত্যাদির ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। জীবনে সুখ-দুঃখ তো থাকবেই। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মাঝে যে ব্যক্তি সাহসে বুক বেঁধে মাথা উঁচু করে চলতে পারে, যৌবনের আশীর্বাদ আর বরমালা দুই-ই তার ভাগ্যে জোটে। সব সময় হাসিখুশি থাকলে নিজের জীবনটা যেমন স্বস্তিদায়ক হয়, তেমনি চারপাশের পরিবেশও আনন্দপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানেই যৌবনের সার্থকতা।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার তালিকা
ফল
ক্যারোটিনসমৃদ্ধ ফলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। যেমন-পাকা কলা, পাকা পেঁপে, পাকা আম, পাকা পেয়ারা ইত্যাদি।
দুগ্ধজাত খাবার
দই, ছানা, দুধ, ডিম ইত্যাদি।
টাটকা শাকসবজি
আমাদের পরিচিত শাকসবজি অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের এক অপূর্ব ভাণ্ডার। যেমন-পালংশাক, লাউশাক, ঢেঁড়স, গাজর, বাঁধাকপি, পাকা কুমড়া, টমেটো, তরমুজ ইত্যাদি। ক্যান্সার প্রতিরোধকারী লাইকোপিন নামে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায় টমেটো এবং তরমুজে। ত্বকের সুস্থতা এবং সজীবতা ধরে রাখতে টাটকা শাকসবজি এক অব্যর্থ ওষুধ।

বাংলাদেশের যাবতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে


আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের পণ্য

ড. আবু এন. এম. ওয়াহিদ :: স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৪১ পেরিয়ে মাত্র ৪২এ পড়ল। এ সময় স্বাধীনতার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে যে কেউ হিসেব নিকাশ করতেই পারেন। এই বিচার-বিবেচনায় ইতিবাচক

এবং নেতিবাচক অনেক কিছুই অলোচনায় উঠে আসতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক। দেশে বিরাজিত রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হতাশায় অন্যদের মত আমিও অনেক সময় দেশ ও দেশের ভবিষ্যত সম্মন্ধে শঙ্কিত হই, নেতিবাচক অনেক কিছুই বলে ফেলি, এবং মাঝেমধ্যে এসব বিষয় নিয়ে লেখালেখিও করি, কাগজে ছাপাই, লোকজন পড়ে, প্রতিক্রিয়া জানায়, কোনো কোনো সময় বাহ্বাও কুড়াই।

তবে আজ বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক দিকে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। স্বাধীনতার ফসল স্বরূপ আর কিছু না হলেও বাংলাদেশ দুটো লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে। প্রথমত, প্রায় ১ কোটি পরিশ্রমি জনশক্তি আজ বিদেশের মাটিতে কর্মরত। প্রতি বছর তাঁরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মূদ্রা আয় করে দেশে পাঠাচ্ছেন।

এছাড়া বিরাট আকারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক আজকাল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। তৈরি পোশাক ছাড়াও আরো অনেক নন-ট্র্যাডিশনাল আইটেম দেশের বাইরে যাচ্ছে। রপ্তানি দ্রব্যের তালিকায় আছে বিভিন্ন ধরণের হিমায়িত মাছ, সামুদ্রিক শেল ফিশ, টিনজাত ফল, ফলের রস, তরি তরকারি, গুঁড়ো মসলা, কালিজিরা চাল, চিঁড়া-মুড়ি জাতীয় শুকনো খাবার, চা, চামড়া, চামড়াজাত দ্রব্য, পাট, পাটজাত দ্রব্য, কুটির ও হস্ত শিল্প জাত দ্রব্য সামগ্রী, সিরামিক টেবিল ওয়েয়ার ও সিরামিক প্রডাক্টস, সাবান, ব্যাটারি, বড়লেখার সুজানগরের আগর-আতর ও সুগন্ধী দ্রব্য, খেলনা, ঔষধ, কীটনাশক রাসায়নিক দ্রব্য, জুয়েলরি, ঘড়ি, নির্মাণ সামগ্রীর মধ্যে সিমেন্ট, পাথর, বালু, এমন কী ইটও ভারতের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে রপ্তানি হয় বলে শুনেছি। ইদানীং স্ক্র্যাপ মেটাল ও তা থেকে তৈরি সমূদ্রগামী জাহাজও বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যাচ্ছে। আমেরিকার বাজারে যেসব বাংলাদেশি পণ্য নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি বা পাই তার বয়ানও আমার আজকের আলোচনায় উঠে আসবে।

প্রথমে বলছি বাংলাদেশীয় তৈরি পোশাক শিল্পের বিবর্তন ও তার সাফল্যের সংক্ষিপ্ত পটভূমি। ঊনিশ শ’ আশি সালের গোড়ার দিকে আমি কানাডার ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র এমএ পাশ করে পিএইচডি শুরু করেছি। এমন সময় আমার বড় ভাইএর সুবাদে আমেরিকায় ইমিগ্র্যান্ট ভিসা পেয়ে যাই। তার কিছুদিন পরই বস্টনের নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিতে অ্যাডমিশন সহ একটি টিচিং অ্যাসিস্টেন্টশিপের অফার আসে।

অফারটি পেয়ে আগপাছ না ভেবেই ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে সিদ্ধান্ত নিলাম ম্যানিটোবার পিএইচডি প্রোগ্রাম থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে প্রত্যাহার করে নর্থ ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে যোগ দেব পরবর্তী জানুয়ারিতে। উইনিপ্যাগ থেকে বস্টন যাওয়ার পথে নিউ ইয়র্কে বড়ভাইএর বাসায় ছিলাম দু-তিন সপ্তাহ। ওই সময় সেখানে দেখা হয়েছিল এক তরুণ বাংলাদেশি গারমেন্ট উদ্যোক্তার সঙ্গে। কথা প্রসঙ্গে তিনি সাহসের সাথে বেশ জোর দিয়ে একটি কথা বলেছিলেন যা আজও আমার মনে আছে। তাঁরই ভাষায়, ‘এবার ব্যবসা লাইনআপ করে গেলাম, ইনশাল্লাহ আগামী বছর এসে মাল্টিমিলিয়ন ডলারের কনট্র্যাক্ট সাইন করে যাব’। তখন ওই গারমেন্ট ব্যবসায়ীর চোখে-মুখে যে আত্মপ্রত্যয় এবং দৃঢ়তার ছাপ দেখেছিলাম তাতে তাঁর কথার বিশ্বাসযোগ্যতায় আমার মনে একটুও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দানা বাঁধতে পারেনি।

এরপর প্রায় দশ বছর কেটে যায়। ইতিমধ্যে জীবনের অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে আমি ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের চার্লস্টন শহরে ইস্টার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছি। এমনি এক সময় ১৯৯০ সালের শেষ দিকে চার্লস্টনে প্রয়াত ড. মুশফেকুর রহমানের বাড়িতে দেখা হয় বাংলাদেশের একজন প্রতিষ্টিত এবং সফল পোশাক শিল্পের উদ্যেক্তার সঙ্গে। তাঁর পুরো নাম কী তা জানা হয়নি, তবে সবাই তাঁকে জাকারিয়া স’ব বলে ডাকছিলেন।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠিত একটি বড় এবং সফল গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির মালিক। তাঁর কোম্পানির নাম ছিল ‘জুয়েল গার্মেন্টস’। ওই দিন সবার মুখেই শুনছিলাম পোশাক শিল্পে জাকারিয়া সা’বের সফলতা ও তাঁর ধন দৌলতের কথা। ছেলেমেয়েদের আমেরিকায় পড়াবার জন্য তিনি ওহাইওর ডেইটনে রীতিমত আরেকটি সংসার পেতেছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে কিছুদিন পর ডেইটনে জাকারিয়া সা’বের বাসায়ও আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যতদূর মনে পড়ে তাঁর ছেলের নাম ছিল জুয়েল এবং মেয়ে দু’টির নাম ছিল নয়ন এবং নূপুর।

অন্য অনেক ব্যবসার সাথে আমার এক মামারও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে। তিনি ব্যবসা সংক্রান্ত কাজে ঘন ঘন আমেরিকা আসেন। আসলেই দেখেন কোন কোন স্টোরসে তাঁর কোম্পানির তৈরি পোশাক রাখে এবং বিক্রি করে। এতে তিনি স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ রকমের আত্মতৃপ্তি উপভোগ করেন। আমি এবং আমার স্ত্রী এখানকার ডিসকাউন্ট এবং স্পেশাল্টি স্টোরস সব জায়গাতেই যাই। কোনো সময় কেনা কাটা করতে, কোনো সময় উইন্ডো শপিংএ বা নিছক ঘোরাঘুরি করতে। কম বেশি প্রায় সব দোকানেই আমি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখতে দেখেছি। কোনো কোনো দোকান থেকে মাঝে মধ্যে কিনেছিও। ওয়াল মার্ট, কে-মার্ট, গ্যাপ, ওল্ড নেভী, মেসিজ, গুডিজ, টিজে ম্যাক্স, টার্গেট, সিয়ার্স, ডিলার্ডস, জেসি পেনি, বেল্ক, ডিজনি স্টোরসের র‌্যাকে বাংলাদেশের তৈরি বিভিন্ন জাতের পোশাক হরমামেশাই দেখা যায়।

 

swadesh Ekush News Media Jahan Hassan

Swadesh Restaurant, Los Angeles

বাংলাদেশের রপ্তানিজাত ননট্র্যাডিশনাল আইটেম রাখে আমেরিকার কার্লাইল অ্যান্ড কোম্পানি, বাথ অ্যান্ড বডি ওয়ার্কস, ওল্ড মিল পটারিজ, পটারি বার্ন, বেড বাথ অ্যান্ড বিওন্ড, ডলার ট্রি, ডলার জেনারেল স্টোরস, ইত্যাদি। বাংলাদেশের যাবতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এবার দিচ্ছি আমার দেখা আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশি দ্রব্যের একটি খতিয়ান। কয়েক মাস আগে আমি এবং আমার স্ত্রী একদিন কাপড় কিনতে গিয়েছিলাম মোটামুটি নামি দামি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরস – মেসিজে। আমার স্ত্রী মেয়েদের কাপড় দেখছিলেন। আমি উপর তালায় ঘোরাঘুরি করছিলাম ডমেস্টিক্স সেকশনে। হঠাত্ চোখে পড়ল বাংলাদেশের সিরামিক প্রডাক্টস।

ডিনার প্লেট, কারি বোল, ফুলদানি, পানির জার বা পিচার, সল্ট অ্যান্ড পেপার শেকার ইত্যাদি, ইত্যাদি। কেনার ইচ্ছে ছিল কিন্তু দাম দেখেই আমার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। একেকটি ডিনার প্লেটের দাম ৭০ ডলার, একেকটি মাঝারি আকারের কারি বোলের দাম ধরা হয়েছে ৪৫ ডলার করে। এক জোড়া সল্ট অ্যান্ড পেপার শেকারের দাম ৫০ ডলার। ফুলদানি ও পিচারের দামটা সঠিক মনে করতে পারছি না। প্রতিটি প্রডাক্টের কোয়ালিটি এবং ফিনিশিং দেখলাম খুবই উন্নত মানের। আইটেমগুলোর গায়ে ছাপায় লেখা, ‘প্রডাক্ট অফ বাংলাদেশ’ কিন্তু কোন কোম্পানির তৈরি অনেক চেষ্টা করেও তার হদিস বের করতে পারলাম না।

আরো দেখলাম আমেরিকান কাস্টমাররা উত্সাহভরে শেলফে রাখা বাংলাদেশি জিনিসগুলো নাড়াচাড়া করছে, উল্টে পাল্টে দেখছে, প্রাইস স্টিকারের দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে। হয়ত কিনবে, হয়তবা কিনবে না, তবে কেউ না কেউ তো অবশ্যই কিনবে, নতুবা মেসিজের মত দোকানের ফ্লোরে এগুলো স্থান করে নিতে পারত না। মেসিজের দুতালায় বাংলাদেশের সিরামিক টেবিল ওয়েয়ার দেখে আমার ও আমার স্ত্রীর কাছে সেদিন খুবই ভাল লেগেছিল।

তার কয়েক মাস পর মাত্র সেদিন আমি এবং আমার স্ত্রী গিয়েছিলাম অরগ্যানিক চেইন ফুড স্টোরস – ‘হোল ফুডসের’ দোকানে। হোল ফুডসে গ্রসারি সেরে রাস্তার ওপারে গেলাম তাদেরই সাবসিডিয়ারি বডি কেয়ারের দোকান ‘হোল বডি’ শপে। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম তাতে অভিভূত না হয়ে পারলাম না। অ্যান্ট্রেন্স দরজার সামনে একটি আয়লের মাথায় সেল্ফের নিচে মেঝেতে রাখা তাল পাতার তৈরি কিছু ফ্রুট বাস্কেট এবং লম্বা হাতলওয়ালা মেয়েদের হ্যান্ড ব্যাগ। দোকানে ঢোকার সময় আমার চোখে পড়েনি। বেরিয়ে আসার সময় আমার স্ত্রী আমাকে বললেন, ‘দেখ বাংলাদেশি প্রডাক্টস’।

আমি হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগলাম। পড়ে দেখলাম ‘ব্লেসিং বাস্কেট’ নামে একটি এনজিও জিনিসগুলো তৈরি করেছে বাংলাদেশের কোনো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া একটি কাগজে ‘ব্লেসিং বাস্কেট’ প্রজেক্টের ম্যানেজার মিসেস তেরেসা উইলসনের একটি মূল্যবান কোটেশন শোভা পাচ্ছে প্রতিটি দ্রব্যের গায়ে, পড়ে দেখলাম কাগজের লেভেলে লেখা আছে, ‘দেয়ার ইজ নো হিডেন অ্যাজেন্ডা। উই সিম্পলি ওয়ান্ট টু এন্ড পোভার্টি ফ্রম দি লাইভস অফ দৌজ হু উই সার্ভ’। অর্থাত, ‘আমাদের কোনো গোপন অভিসন্ধি নেই। আমরা যাদের সেবা দিচ্ছি, শুধু তাদের জীবন থেকে দারিদ্র দূর করতে চাই’।

যে সব হস্ত ও কুঠির শিল্পীরা বাস্কেট এবং ব্যাগগুলো তৈরি করেছেন তাঁদের নামও সেঁটে দেওয়া হয়েছে প্রডাক্টের গায়ে কাপড়ের লেভেলে। যাঁদের নাম আমি আজ এখানে লিখব তাঁরা যদি আমার এ লেখাটি পড়েন বা যে পড়েছে তার কাছে শোনতে পান তবে জানি না তাঁদের মনের অনুভূতি কেমন হবে, তবে তাঁদের নাম আজ গর্বভরে লিখতে পেরে আমি নিজেকে খ্বুই ভাগ্যবান মনে করছি।

 

বাংলাদেশের জনগণের কাছে হয়তবা তাঁরা দেশের লক্ষকোটি মা-বোনের মতই একেকজন গ্রাম্য বধু কিংবা বালিকা, কিন্তু আমার কাছে তাঁরা প্রত্যেকেই সুদূর আমেরিকায় একেক জন বাংলাদেশি অ্যাম্বেসেডার। নিজেদের সৃষ্টিশীল কাজের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে তাঁরা সগৌরবে দেশ মাতৃকা ও তার সুনামকে তুলে ধরেছেন। আমার এই কলামের মাধ্যমে আজ আমি বাংলাদেশের নাম না জানা অখ্যাত অজপাড়াগাঁয়ের এই শিল্পীদের জানাই আমার আন্তরিক অভিনন্দন।

গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব শিল্পীর মন ও হাতের ছোঁয়া নিয়ে কয়েকটি ফ্রুট বাস্কেট এবং হ্যান্ড ব্যাগ আমেরিকার বাজারে সগর্বে বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করছে তারা হলেন, স্বর্ণ, পপি, সুচিত্রা, সুষমা, রীতা, ববিতা, এবং মেরি। তাঁদের হাতের তৈরি জিনিসগুলো আমি সেদিন দেখেছি হোল বডি শপের ফ্লোরে আজ হয়তবা সেগুলো শোভা পাচ্ছে কোনো মার্কিন পরিবারের বেডরুমে অথবা বসার ঘরে। বাংলাদেশের এই পরিশ্রমি মানুষগুলোর প্রতি আমেরিকা প্রবাসী প্রতিটি বাংলাদেশি অভিবাসীর পক্ষ থেকে আবারো জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ।

লেখক: ড. আবু এন. এম. ওয়াহিদ; অধ্যাপক

সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহময়তা


স্নেহময় অভিভাবকত্ব যৌন-রসাত্মক টাইম
তরুণীর বুকের দুধ শিশুকে খাওয়ানো নিয়ে তোলপাড় চলছে। ঘটনাটি ঘটেছে বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান পাওয়া ওই ছবিটি নিয়ে। বিষয়টি স্নেহময় অভিভাবকত্ব হিসেবে ধরে নিলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যত দোষ নন্দ ঘোষ হলে সমস্যা। আর সমস্যাটা হয়েছে প্রকাশ্যে পত্রিকার পাতায় দুধ খাওয়ানের দৃশ্য নিয়ে। টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে সাহসী স্নেহময় অভিভাবকত্বধারী সেই নারীর নাম লিন গ্রুমেট। বিতর্ক উঠেছে এটা যৌন-রসাত্মক কৌতুকের বলে। কথা উঠেছে বাল্যকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও বুকের দুধ খাওয়াটা ঠিক কি না।

তিন বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এক তরুণী। এটাই ছিল এ সপ্তাহের টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ। ‘স্নেহময় অভিভাবকত্ব’ শিরোনামের প্রতিবেদনটির জন্য তোলা হয়েছিল ছবিটি। আর এটা প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই বিতর্কে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা এ ম্যাগাজিনটি। অনেকেই উৎসাহিত করেছেন সন্তানের প্রতি মায়ের স্নেহময়তাকে। আবার অনেকেই প্রকাশ করেছেন ভীত ও সন্দেহমূলক অভিব্যক্তি।

তবে লস অ্যাঞ্জেলেস নিবাসী গ্রুমেট তার তিন বছর বয়সী সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়টিকে খুবই স্বাভাবিক ও জৈবিক ব্যাপার বলে অভিহিত করেছেন। এমনকি তার মা তাকে ছয় বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাইয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষকে বুঝতে হবে যে এটা জৈবিকভাবে খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। মানুষ এটা যত বেশি দেখবে, ততই আমাদের সংস্কৃতিতে এটা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হবে। আমি এখন তেমনটাই আশা করছি। আমি চাই মানুষ এটা দেখুক।

তবে টাইম ম্যাগাজিনের এ প্রচ্ছদ নিয়ে জোর সমালোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে। এটা যৌন-রসাত্মক কৌতুকের উদ্রেক করবে বলে মত দিয়েছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শিশুটি যখন বড় হবে, তখন তাকে অনেক বিদ্রƒপের মুখে পড়তে হবে। বাল্যকাল পেরিয়ে যাওয়ার পরও বুকের দুধ খাওয়াটা ঠিক কি না, এসব বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেকে। আরকানসাস নিবাসী ছয় সন্তানের জননী ববি মিলার বলেছেন, এমনকি একটা গরুও জানে কখন তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর অভ্যাস ত্যাগ করা দরকার। আর প্রচ্ছদটি সম্পর্কে তার অভিমত, ‘এটাকে কেন এখানে আনতে হবে? এটা হাস্যকর।বিপরীতে টাইম ম্যাগাজিনের পক্ষেও দাঁড়িয়েছেন শিশুযতœবিষয়ক কিছু সংগঠন। বেস্ট ফর বেবিস নামের একটি সংগঠনের সহপ্রতিষ্ঠাতা বেটিনা ফোর্বস বলেছেন, এ প্রচ্ছদটা মূলধারার আমেরিকানদের কিছুটা কম রোগে ভুগতে সাহায্য করবে। নারীরা তাদের যে কোনো বয়সী সন্তানকেই বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। আর এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় এটাই।

চুড়ির রিনিক ঝিনিক ও ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’


চুড়িবন্দনা

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘অরক্ষণীয়া’ উপন্যাসে নারীর চুড়িপ্রেম ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যে। বুড়ো মেসতুতো ভাই জ্ঞানদার হবু বউয়ের জন্য মাসিমা দুর্গামণির হাতে অতুল যেই আকর্ষণীয় চুড়ি তুলে দিয়ে ছিলেন, তার বর্ণনা এসেছে এভাবে :

‘তাহার রং এবং কারুকার্য দেখিয়া দুর্গামণি অত্যন্ত পুলকিতচিত্তে দাতার ভূয়োঃ ভূয়োঃ যশোগান করিতে লাগিলেন। চুড়ি দুগাছি কাচের বটে, কিন্তু সেরূপ মূল্যবান বাহারে চুড়ি পাড়াগাঁয়ে কেন, কলিকাতাতেও তখনো আমদানি হয় নাই। বস্তুত তাহার গঠন, চাকচিক্য এবং সৌন্দর্য দেখিয়া মায়ের নাম করিয়া অতুল নিজের টাকাতেই বোম্বাই হইতে ক্রয় করিয়া আনিয়াছিল।’

আর বাংলা গানে এসেছে :

‘আমার চুড়ির রিনিক ঝিনিক রে

তার কাছে লাগত বড় বেশ।’

হ্যাঁ, চুড়ির আবেদন সব সময়ই ছিল। হয়তো থাকবে নানা আঙ্গিকে। তবে এক সময় শুধু শাড়ির সঙ্গেই পরত ললনারা। তারা সোনা আর কাচের চুড়ি পছন্দ করতেন। এখন সময়ের নিয়মে ‘সময়’ বদলে গেছে। তারপরও চুড়ির আবেদন কমেনি। বরং হাল ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠছে চুড়ি নানান ফরমেটে-ডিজাইনে। যে কোনো পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করে পরা যায়Ñ এমন চুড়ি উদ্ভাবন হচ্ছে দিনকে দিন। বয়স দিয়েও এখন চুড়িকে বাঁধার সুযোগ নেই। বিশ্বায়ন সব বয়সী নারীর জন্য চুড়ির দরজা খুলে দিয়েছে। তাই কাচের চুড়ির পাশাপাশি ফ্যাশন শোকেসে জায়গা করে নিচ্ছে নানা উপাদানের চুড়ি।

তবে কাচের চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ আর বাহারি রঙের মিশেলে জড়িয়ে আছে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য। শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ, পোশাক যাই হোক না কেন এখনো অনেক আধুনিক তর”ণীর পছন্দের এক বিশেষ অনুষঙ্গ হচ্ছে কাচের চুড়ি।

অবশ্য আজকাল সব কিছুতেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। প্রচলিত ধারার বাইরে আধুনিক মানুষের আগ্রহ বেড়েছে নান্দনিকতার দিকে। তাই অতীতের সাদামাটা এক রঙের কাচের চুড়িতে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে শিল্পের বাহারি ডিজাইনের ছোঁয়া। কাচের চুড়ির পাশাপাশি এখন কাচের চুড়ির ওপর নানা রঙের পাথর, চুমকি, জরিসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে আনা হচ্ছে নতুনত্ব।

আবার কাচের চুড়ির আধিপত্যে ধীরে ধীরে ভাগ বসাচ্ছে চৌকো, ত্রিকোণ, ডিম্বাকৃতির প্লাস্টিক ও মেটাল চুড়ি। বস্তুত বাঙালি নারীদের এক অনন্য অলঙ্কার হচ্ছে চুড়ি। এমন অনেক নারীই আছে যারা যে কোনো পোশাকেই চুড়ি পরেন। চুড়ি ছাড়া তাদের দিনই কাটে না।

তবে আধুনিকতার কল্যাণে মেটাল, সুতা, চামড়া, ব্যাকেলাইট, রবার, কাঠ, মাটি, বিডস, পুঁতি, সিটি গোল্ডসহ নানা ধরনের চুড়ির ব্যবহার বাড়ছে।

এক সময় চুড়ি প্রধানত কাচ থেকে তৈরি হতো। তবে শামুকের খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও হাতির দাঁতের চুরিও তখন ছিল।

অন্যসব উপাদান দিয়ে চুড়ি তৈরির কারণ এবং হাল ফ্যাশনের চুড়ির উপযোগিতার কথা ফ্যাশনবিদদের ঠোঁটের ডগায় লাফায়, ‘আসলে কাচের চুড়ি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অন্যান্য টেকসই উপাদানে তৈরি চুড়ির চিš—া আসছে। পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে রুচিবোধেও। কারণ পার্বতীর মতো হাত ভর্তি চুড়ি এখন সবাই পরতে চান না। আবার হাতে মাত্র বালা ধারণ করে অনেকে এখন তৃপ্তি পাচ্ছেন। আসলে কসমোপলিটন পণ্য হয়ে যাওয়ার কারণে সব বয়সের নারীই চুড়ি পরছেন।’

বাঙালি নারীর সঙ্গে চুড়ির গভীর সখ্য ঠিক কবে সৃষ্টি হয়েছে, তার কোনো প্রামাণ্য রেকর্ড আমাদের হাতে নেই। তবে চুড়ি পরতে ভালবাসেন সব বয়সী নারী। উৎসবের দিন জমকালো সাজের সঙ্গে চুড়ি এখন অপরিহার্য হয়ে গেছে। বলা হচ্ছে, হাতে চুড়ি না থাকলে সাজ ঠিক পরিপূর্ণতা পায় না। পত্রিকার বিশেষ পাতায় বিভিন্ন উৎসবের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে পছন্দসই চুড়ি পরার প্রেসক্রিপশন হামেশাই চোখে পড়ে।

চুড়ির রিনিঝিনি ছন্দ মনেও দোলা দেয়। হালে ফ্যাশনের নতুন প্রবণতা হচ্ছে সুতোর চুড়ি। প্লাস্টিকের বালার ওপর নানা রঙের সুতো পেঁচিয়ে তৈরি হচ্ছে চমৎকার সব সুতো-চুড়ি। সুতো ছাড়াও কাতান কাপড়ের লেস পেঁচিয়ে বানানো হচ্ছে রং-বেরঙের চুড়ি। শাড়ি, কামিজ, ফতুয়া সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে এ ধরনের চুড়ি মানানসই বলে দাবি করা হয়।

আবার কপার, তামা, দস্তাসহ বিভিন্ন ধাতু দিয়ে তৈরি হচ্ছে বৈচিত্র্যময় ডিজাইনের চুড়ি আর বালা। মাটি বা সিরামিকের নানা রং ও নকশা করা চুড়িও পাওয়া যাচ্ছে। এসব চুড়ি নাকি দেশি সুতি বা ঁতাঁত কাপড়ের সঙ্গে বেশ মানায়।

কাঠ ও প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ডিজাইনের চুড়ি ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। মোটা, চিকন, বাঁকা অবয়বে বিভিন্ন কাঠের চুড়ি চোখে পড়ে। কাঠ দিয়ে আবার ব্রেসলেটও তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে গোলাকার ছাড়াও ঢেউ খেলানো, বাঁকা, ত্রিভুজ, ষড়ভুজসহ নানা আকৃতির প্লাস্টিকের চুড়ি পাওয়া যাচ্ছে মোটা আর চিকন ডিজাইনে। স্কার্ট, টপস, ফতুয়া-জিনসের সঙ্গে ম্যাচিং করে কাঠ ও প্লাস্টিকের তৈরি এসব চুড়ি তৈরি হচ্ছে। জয়পুরি, মাল্টি, কাসুটিসহ নানা ধরনের চুড়ির কথাও শোনা যায়। মুক্তার চুড়ির চাহিদাও বাড়ছে। বিভিন্ন ফ্যাশন হাউসও তৈরি করছে নানা ডিজাইনের ফ্যাশনেবল চুড়ি।

বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে চুড়ির প্রচলন রয়েছে। এটা চেকে naramek, ডাচে enkelring, ফিনিশে rannerengas, জার্মানে armreif, হাঙ্গেরিয়ানে karperec, ইন্দোনেশিয়ায় gelang, ইতালিয়ানে braccialette, মালয়ে gelang, স্পেনিশে brazlete ও তুর্কিতে halhal, তামিলে ভালায়ন, মালয়ালমে ভালা আর নেপালিতে চুরা নামে পরিচিত।

ভারতীয় উপমহাদেশে চুড়ি ঠিক কবে চালু হয়েছে, তার সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। তবে বিভিন্ন প্রত্নতাত্তিক খননকালে খোল, তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা ও আকিক পাথরের চুড়ি পাওয়া গেছে।

পাকিস্তানের মহেঞ্জোদারোতে (যিশুখ্রিস্টের জন্মেরও ২৬শ বছর আগে) পাওয়া এক মূর্তিতে দেখা যায়, নৃত্যরত এক বালিকার বাম হাতে চুরি রয়েছে। সম্ভবত তখন দুহাতে চুড়ি পরার সংস্কৃতি ছিল না। অন্যদিকে মৌর্য সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ডিজাইনের চুড়ি পাওয়া গেছে ভারতের তক্ষশীলায়।

হীরা, মূল্যবান পাথর আর মুক্তো বসানো চুড়ির প্রচলন এখনো ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে। এক সময় লাক্ষার তৈরি চুড়িরও বেশ প্রচলন ছিল এখানে। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন অংশেও চুড়ির প্রচলন রয়েছে।

বিয়ের চুড়ি সাধারণত রঙিন হয়ে থাকে। লাল রঙের চুড়ি হচ্ছে ‘জীবন ও আনন্দের প্রতীক’ আর সবুজ রঙের চুড়ি হচ্ছে ‘উর্বরতার প্রতীক’। চুড়ি দুই হাতে পরা যায়। এক হাতে পরতেও বাধা নেই।

আধুনিক প্রজন্মের তরুণ সমাজের একটি অংশ এখন বেশ আগ্রহ নিয়েই চুড়ি পরছে। তবে তাদের এই চুড়ি ‘খাড়–’ নামে পরিচিত। এটা রবার অথবা ধাতুর তৈরি হতে পারে। পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের উঠতি তরুণরা এটা পরছে।

গিফট আইটেম হিসাবেও চুড়ি বেশ আদরণীয়। কারণ নারীরা শাড়ি বা জামার সঙ্গে ম্যাচিং করে চুড়ি পরতে এখন বেশ সচেতন।

চুড়ি নিয়ে কুসংস্কারও আছে। বলা হয়, চুড়ির কারণে স্বামীর নিরাপত্তা যেমন বাড়ে, তেমনি ভাগ্যও ফেরে। আবার চুড়ি অকারণে ভেঙে গেলে স্বামীর বিপদ ঘটে।

আমাদের দেশে বৈশাখে লাল-সাদা বিভিন্ন বর্ণের রেশমি চুড়ি পরে নিজেকে নানাভাবে সাজানোর প্রবণতা নারীদের মাঝে এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার তারাই ভিন্ন উৎসবের দৈনন্দিন পথচলায় দেশপ্রেমের বহির্প্রকাশ ঘটাচ্ছেন পতাকার রং মিলিয়ে লাল-সবুজ রঙের হাত ভরা চুড়ি পরে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমানে প্রতিটি উৎসবেই বাঙালি নারী চুড়ি সাজের জন্য বেছে নিচ্ছে বিশেষ বিশেষ রংকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি চুড়ি।

হাতভরা চুড়ি পরা বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ। ফ্যাশনবিদরা বলেন, হাতের গড়নের সঙ্গে মিলিয়ে দুহাত ভরা চুড়ি হাতের সৌন্দর্য যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনি সাজকেও করে পরিপূর্ণ।

একবার এক মহিলা তার স্বামীর সঙ্গে শপিং করতে গেছে। এক পর্যায়ে ওই উন্নাসিক মহিলা এক সেট চুড়ি পছন্দ করল।

‘তুমি এত চুড়ি কেনো। অথচ কোনদিন পরতে দেখি না’ স্বামী অনুযোগের সুরে বলল।

‘চুড়ি পরলে ভেঙে যাবে। তাই চুড়ি পরি না, শুধু কিনি’ মহিলার চটপট জবাব।

হাতপাখাবন্দনা

হাজার হাজার বছর ধরে গ্রামবাংলার সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে হাতপাখা। কবি-সাহিত্যিক, বাউল শিল্পীরা হাতপাখা নিয়ে বিভিন্ন গান, কবিতা ও গীত রচনা করেছেন এবং তুলে ধরেছেন এটার সৌন্দর্যমণ্ডিত ঐতিহ্য। হাতপাখা নিয়ে মজার মজার রূপকথা, গল্প-কাহিনীও আমাদের সমাজে প্রচলিত।

আমাদের সমাজে এক সময় হাতপাখা বলতে তালপাখাই বোঝাত। আর সংস্কৃতে তালপাখা ‘তালবৃন্তক’ নামে পরিচিত। পরে কাপড়, বাঁশ ও সুতো দিয়ে হাতপাখা বানানো শুরু হয়। হাতপাখায় নকশা আর ডিজাইনের নতুন মাত্রা এসেছে। পদ¥, শতফুল, উনিশকাঁটা, সঙ্কলন, বরফি, শিঙ্গারা, শক্সখ, আয়নাকোটা, শক্সখপদ¥, ঝুরিফুল, চালতা ফুল, পানপাতা, তারাফুল, চারমাছ, হাতিবান্ধা, মোরগ, চৌখুপি, চক্র নামে হাতপাখার নকশার কথা শোনা যায়। কোনো কোনো নকশার মধ্যে আয়নার টুকরোও বসানো হয়। হাতলে লাগানো হয় বাঁশের একটি নল, যাতে হাতপাখা ঘোরাতে কম বেগ পেতে হয়।

অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর ‘লোকশিল্প’ গ্রন্থে হাতপাখা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে ‘উষ্ণমণ্ডলে অবস্থিত এদেশে খর বৈশাখের দাবদাহ এবং ভাদ্রের আর্দ্রতা মিশ্রিত গরমে হাতপাখা মানুষের নিত্যসঙ্গী। সুতা, বাঁশ, চুলের ফিতা, বেত, খেজুরপাতা, নারকেলপাতা, তালপাতা, কলার শুকনো খোল, পাখির পালক, সুপারির খোল, শোলা, গমের ডাঁটা, মোটা কাগজ প্রভৃতি পাখার উপাদান। এ নিত্যব্যবহার্য বস্তুটি বিশেষ করে মেয়েদের হাত পড়ে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। সুতা, বাঁশ, সরতা বেত ও কলার খোলের শুকনা বেতি দিয়ে পাখা বোনা হয় পাটি বা ম্যাট বোনার কায়দায়। বিভিন্ন মটিফ বা ডিজাইনে এ পাখা তৈরি হয় এবং এগুলোর বিভিন্ন নামও রয়েছে। এর মধ্যে পানগুছি, কেচিকাটা, তারাজো, পুকুই রাজো, ধানছড়ি, ফলং ঠেইঙ্গা, ফড়িংয়ের ঠ্যাং, রাবণকোডা, নবকোডা, কবুতর খোপ, মাকড়ের জাল, পদ¥জো, কামরাঙ্গা জো, ধাইড়া জো, সুজনি জো, চালতা ফুল, কাগজ কাটা, হাতি, মরিচ ফুল, আটাসান, শক্সখলতা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য’।

কাপড় ও সুতো দিয়ে হাতপাখা বানাতে গেলে প্রথমে বাঁশের কাঠি দিয়ে বৃত্ত তৈরি করে নিতে হয়। এর ওপরেই সুতো অথবা কাপড়ের নানা বুনন। বৃত্তের পরিধিতে জুড়ে দেওয়া হয় রঙিন কাপড়ের ঝালর।

গরমে অতিষ্ঠ ইংলিশ বেনিয়ারা এ দেশে ল¤¦া কাঠের সঙ্গে লাল শালুতে কিনার মোড়ানো পাটি জুড়ে দিয়ে আংটা লাগানো আর ছাদে ঝোলানো বিশেষ পাখা উদ্ভাবন করেছিলেন। দূরে বসে দড়ি বাঁধা এই পাখা যারা মৃদুলয়ে টা

জাহান হাসান একুশ নিউজ মিডিয়া

হাতপাখা

নতেন তাদের বলা হতো ‘পাক্সখাবরদার’। এক সময় আদালতের এজলাসেও এসব পাখা দেখা যেত।

তবে বর্তমানে লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণার কারণে হালে হাতপাখা পল্লীজীবন ছাপিয়ে নগরজীবনেও বেশ পোক্ত স্থান করে নিচ্ছে।

নিত্যদিনের ব্যবহারের জন্য এক সময় বাঁশ অথবা তালপাতার ডাঁটিতে বোনা তালপাখাই ছিল গরমে স্ব¯ি— পাওয়ার সম্বল। তবে বহনে অসুবিধা থাকায় নগরজীবনে ফোল্ডিং হাতপাখার প্রচলন বাড়ে। কথাটাকে আরো সহজভাবে বললে এভাবে বলা হয়, দৃষ্টিনন্দন চীনা হাতপাখার কাছে দেশি হাতপাখা টিকে উঠতে পারছে না। শিক্ষার্থীরাও এখন বইয়ের ঝোলায় ফোল্ডিং হাতপাখা বহন করছে। বিশেষত অসহ্য রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ব্যাগে এই জাতীয় পাখা রাখার ফায়দা অনেক। পাবলিক বাসেও এখন অনেককে হাতপাখা বুলোতে দেখা যায়।

হাতপাখায় জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যও। বৈশাখী মেলা থেকে শুরু করে যে কোনো বাঙালি উৎসবেই হাতপাখার থাকে আলাদা কদর। গরমে আরাম পাওয়াই হাতপাখার মৌল উদ্দেশ্য হলেও প্রযুক্তি ও ফ্যাশনের উৎকর্ষে এটি ধারণ করছে শৈল্পিক রূপ।

এক সময় জমিদার বাড়ির হাতপাখাগুলো হতো ঝালর লাগানো এবং বিশাল আকৃতির। সেসব পাখা রেশম বা সাটিনের কাপড়ের ওপর সুতা, জরি এমনকি সোনা-রুপা দিয়েও কাজ করা থাকত। এখন অনেকের ড্রয়িংরুমে নানা ডিজাইনের হাতপাখা শোপিস হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

প্রাচীন কারুশিল্প হাতপাখার যাত্রা কোথায় এবং কাদের মাধ্যমে ঠিক কবে শুরু হয়েছিল সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। তবে ভ্যাপসা গরমে হাতপাখা নাড়িয়ে বাতাসে দোলাচল সৃষ্টি গরম হাওয়া সরিয়ে অপেক্ষাকৃত শীতল হাওয়া প্রবাহের উদ্দেশ্যেই হাতপাখার ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে মনে করা হয়। আর গরমে এটার উপযোগিতা প্রমাণিত হওয়ার পর সময়ের ব্যবধানে এটা রূপান্তরের পথ বেয়ে একটি অলঙ্করণময় শিল্পে পরিণত হয়। এখনো ধর্মীয় ও রাজকীয় অনুষ্ঠানে কারুকাজমণ্ডিত হাতপাখার প্রচলন রয়েছে।

প্রত্নতাত্তিক সাক্ষ্য থেকে ধারণা করা হয় ভারতবর্ষ, চীন, জাপানসহ প্রাচ্যের কয়েকটি দেশে হাতপাখার ব্যবহার ছিল। আবার প্রাচীনকালে মধ্যপ্রাচ্যে পশুর চামড়ার তৈরি অলঙ্কৃত হাতপাখার সন্ধান পাওয়া গেছে। এটার হাতলে গাছের ডালের অংশ অথবা পশুর হাড় লাগানো থাকত।

এক সময় গ্রামের ললনারা হাতপাখা তৈরি করে রঙিন সুতা দিয়ে ‘ভুলো না আমায়’ বা ‘যাও পাখি বলো তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’- টাইপের ছন্দ লিখত। আবার রোদেলা দুপুরে দুরন্ত কিশোর দলের হাতে শোভা পেত কারুকাজের তালপাখা। আর মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধরা গাছের ছায়ায় বসে তালপাখা হাতে বাতাস করতে করতে দূরের রাখাল ছেলেটির বাঁশির সুর শুনত।

অন্যদিকে ক্লান্তপরিশ্রান্ত কৃষক মাঠ থেকে ফেরার পর কিষাণী ব্যস্ত হয়ে পড়ত হাতপাখার শীতল পরশে তাকে জুড়িয়ে দিত।

আসলে হাতপাখার প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে থাকতে পারে গ্রামীণ নারীর আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ নাম না জানা কত্ত কাহিনী। হাতপাখা বুনন ছিল আবহমান গ্রামবাংলার চিরাচরিত অতি পরিচিত দৃশ্য। প্রযুক্তি আর যান্ত্রিকতার দাপটে নাগরিক জীবনে হাতপাখার প্রচলন এখন কমে গেছে। তারপরও ভয়াবহ লোডশেডিংকালে বিপর্যস্ত নগরবাসী ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে করেন হাতপাখার শীতল পরশ বা বাতাসের কথা। কেউ কেউ অসহ্য গরমে স্বস্তি পেতে এখনো হাতপাখার দ্বারস্থ হন।

আজকাল হাতপাখা ফ্যাশনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। তালপাখার পাশাপাশি বাহারি রং ও ডিজাইনে প্লাস্টিক, বেত, ব্যাকেলাইট, কাগজ দিয়ে হাতপাখা তৈরি করা হয়। এছাড়া অধিকাংশ হাতপাখার হাতল হিসাবে জুড়ে দেওয়া হয় বাঁশের চিকন কাঠি, বেত অথবা লাঠি। তবে আজকাল কাপড় ও সুতার কারুকার্যমণ্ডিত বাহারি ধরনের হাতপাখা পাওয়া যাচ্ছে। এতে যুক্ত হচ্ছে হরেক রকমের রং ও সুতা, ফলস, শাড়ির পাড় ও লেস।

‘আমার নাম তালের পাখা শীতকালে দেই না দেখা, গ্রীষ্মকালে প্রাণের সখা’- এটি আমাদের দেশের গ্রামবাংলার একটি পুরনো প্রবচন। এখনো গরমে আমরা হাতপাখার ওপর নির্ভরশীল। চাহিদা থাকায় অভিজাত বুটিক বাড়ি কিংবা ফ্যাশন হাউসগুলোও নজর দিচ্ছে বাহারি হাতপাখার ওপর। এসব হাতের পাখা নানা ঢং আর রঙে চলে আসছে অভিজাত ড্রইংরুমের সৌন্দর্য বাড়ানোর উপকরণ হয়ে।

একাধিক দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ জোয়ারা গ্রামের হাতপাখা এখন বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। মান ভালো হওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও সৌদি আরব, জার্মানি, দুবাই, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে এখানকার পাখার চাহিদা বাড়ছে।

বোশেখের কাঠফাটা রোদে লোডশেডিং নগর জীবনে উত্তাপ বাড়ায়- দিনে রাতে সমানে। মাথার ওপর তিন পাখাওয়ালা যন্ত্রটা নিশ্চল ঝুলে থাকে। ঘামভেজা দেহটাকে এক বিন্দু স্বস্তি দিতে সবার চোখ যায় হাতপাখাটার দিকেÑহোক না তা তালপাতা, কাপড়, প্লাস্টিক, প্রক্রিয়াজাত কাঠ অথবা কাগজের। অসহ্য গরমে হাতপাখাই হয়ে গেছে দিনে-রাতের সঙ্গী। হাতপাখা ছাড়া নগরজীবন চলে কী করে? ২০১১ সালের নববর্ষের একটি বাড়তি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিনে পয়সায় কাগজের হাতপাখা বিতরণ। এটার মানবিক দিক থাকলেও পণ্যের বিজ্ঞাপনই ছিল মুখ্য। রমনা, চারুকলা, টিএসসি, শিল্পকলা প্রান্তর ঘুরে দেখা গেছে, সিঙ্গার, ইমাম টেলিকমসহ কমপক্ষে ১৫টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বিনে পয়সায় কাগজের হাতপাখা বিলিয়েছে। এক সময় এ দেশে তালপাখার ব্যাপক প্রচলন ছিল। বাঁশ, বেত ও কাপড় দিয়েও তা তৈরি হতো। কিন্তু ঠিক কবে এ দেশে হাতপাখার প্রচলন হয়েছিল, তার কোনো লিপিবদ্ধ বা প্রত্নতাত্তিক প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। মুঘল আমলে হাত-টানা পাখার প্রচলন দেখে এটা অনুমান করা যেতে পারে, পরবর্তীকালে জমিদার ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে হাতটানা পাখার প্রচলন ঘটে।

পশ্চিমা বিশ্বসহ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে হাতপাখা ফ্যাশন সামগ্রী হলেও আমাদের দেশে তা নয়। বিদ্যুতের কল্যাণে নগরজীবন থেকে হাতপাখা বিদায় নিয়েছে। কিন্তু লোডশেডিংই হাতপাখাকে নগরজীবনে ফিরিয়ে আনছে। হাতপাখা মূলত কুটির শিল্প হলেও হালে প্লাস্টিকের হাতপাখা চোখে পড়ে। তারপরও এটা সুসংঘবদ্ধ শিল্পে পরিণত হতে পারেনি। তাই দেশে এ পণ্যটির চাহিদার প্রকৃত পরিসংখ্যান জানার উপায় নেই। তবে লোডশেডিং এ শিল্পের পুনরুজ্জীবনে ভমিকা রাখছেÑ এমন দাবি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। লোডশেডিং অভিশাপ কাটানো গেলে হাতপাখা আমাদের ফ্যাশন পণ্য হয়ে যেতে পারে।

বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে বাংলাদেশিদের জীবনে হাতপাখার প্রচলন বাড়ছে। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা আর কাঁহাতক সহ্য করা যায়? তপ্তদেহে এক চিলতে শাšি—র পরশ বুলাতে হাতপাখার বিকল্প নেই।

বিশ্বে শিল্প, হাতির দাঁত, পশুর হাড়, মাইক, চন্দনকাঠ, মুক্তো এমনকি কচ্ছপের খোল দিয়েও হাতপাখা তৈরির প্রমাণ রয়েছে।

জাপানে হাতপাখার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য অনেক। ওখানে এটা বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা ও শুভ কামনার প্রতীক। জাপানি নাচেও হাতপাখার উপস্থিতি চোখে পড়ে।

ইতিহাসে রয়েছে, ১৫শ শতকে পর্তুগিজ বণিকরা চীন ও জাপান থেকে হাতপাখা আমদানি করে পশ্চিমা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। ১৬শ শতকে চীনা ভাঁজ করা হাতপাখা ইউরোপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফোল্ডিং ফ্যান হাতে ব্রিটেনের রানী প্রথম এলিজাবেথের একটি প্রোর্ট্রেট এখনো রাজপরিবারে সংরক্ষিত রয়েছে। এ কারণে বলা হয়, হাতের মুঠোয় ঠাঁই পাওয়া হাতপাখাই একটি জাতির ইতিহাস, ভূগোল ইতিহাসের গল্প বলে। মিসর, ব্যবলিন, আজটেক, ইনকা, পারস্য, গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় হাতপাখার প্রচলন ছিল। তবে এটার আবিষ্কারক কারা, তা জানা যায়নি।

রেশম, পাখির পালক, হালকা ধাতু পাত দিয়েও হাতপাখা তৈরি হয়। এটাতে হ্যাড পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি পুতি, ক্রিস্টাল ও ফিতা লাগানো হয়।

হাতপাখা নিয়ে প্রচলিত কৌতুক এ রকম :

একদিন এক সর্দারজি ট্রেনে চেপে কোথাও যাচ্ছিলেন। সেদিন ছিল প্রচণ্ড গরম। তাই সর্দারজিসহ অনেকেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে হাতপাখা কিনে বাতাস করতে লাগলেন। অথচ এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে যেতে না যেতেই সবার হাতপাখা খুলে নষ্ট হয়ে গেল।

কিন্তু সর্দারজির হাতপাখাটা একদম নতুনের মতোই আছে। এটা দেখে অবাক হয়ে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘সর্দারজি, আপনার হাতপাখাটি এখনো নতুনের মতো আছে কী করে?’ সর্দারজি বললেন, ‘আরে মশাই, আমি আপনাদের মতো বোকা নাকি? টাকা দিয়ে হাতপাখা কিনেছি কি নষ্ট করার জন্য? আমি তো হাতপাখা মুখের কাছে ধরে শুধু মাথাটা নড়াচড়া করেছি।’

সূত্রঃ সাপ্তাহিক ২০০০

সারাদেশে যৌন চিকিৎসার ফাঁদ পাতা হাজার হাজার হারবাল ও হোমিও প্রতিষ্ঠান


হারবাল প্রতারণা

খোন্দকার তাজউদ্দিন

মানুষ সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে গল্প বলতে এবং শুনতে। আর সেটা যদি কিংবদন্তি হয় তাহলে তো কথাই নেই। এ রকমই একটি গল্প শোনাই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত জাদুকর হাওয়ার্ড থর্সটনকে নিয়ে এই গল্পটি প্রথম চালু হয়। থর্সটনের জাদুর অনুষ্ঠান। দর্শকভর্তি হলরুম। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও জাদুকরের দেখা নেই। ক্রমেই অধৈর্য হয়ে উঠছেন দর্শক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা। এমন সময় মঞ্চে হাজির হলেন জাদুকর। উত্তেজিত দর্শক দেরি হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতেই জাদুকর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন ‘কই’ আমি তো এক মিনিটও দেরি করিনি’। দর্শকরাও নিজেদের হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন, একটু আগে দেখা সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা পিছিয়ে গেছে! বিস্ময়কর এই ম্যাজিকে হলভর্তি দর্শক তুমুল হাততালি দিয়ে স্বাগত জানালেন জাদুকরকে। পরবর্তী সময়ে এই গল্পটি অনেক খ্যাত-অখ্যাত জাদুকরকে নিয়েও শোনা যায়। জুয়েল আইচ বা ডেভিড কপারফিল্ডের জাদু আমাদের বিস্ময়কর জগতে নিয়ে যায়। তাদের জাদু দেখে আমরা মুগ্ধ হই, হই শিহরিত। ধরে নিই এবং বিশ্বাস করি জাদু দিয়ে যে কোনো কিছুই করা সম্ভব।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, উপরে যে জাদুটির কথা বলা হলো, তার বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কোনো দিনই ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দেওয়ার এই জাদু দেখানো হয়নি। তারপরও পিসি সরকারের এমন জাদু নিজে দেখেছেন এমন প্রত্যক্ষদর্শীও এ দেশে আছেন। এটা কী করে সম্ভব? যে জাদু কখনো দেখানো হয়নি সে জাদু দেখেছেন কীভাবে? ওই যে বললাম গল্প বলা এবং শোনা মানুষের সবচেয়ে প্রিয় অভ্যেসÑ তা সে সত্যি-মিথ্যা যা-ই হোক। আসলে আমরা একটি গল্প শোনা বা বলার আগে যুক্তি দিয়ে ভাবি না। একটু শুনে তার সঙ্গে আর একটু যোগ করে গল্পটিকে আকর্ষণীয় করতে ভালবাসি। গল্প বলে সবাইকে চমকে দিয়ে আড্ডার মধ্যমণি হতে চাই। মধ্যমণি হতে গিয়ে কিছু মিথ্যা কুসংস্কারকে সত্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি। অন্যের মুখের শোনা ঘটনাকে নিজের দেখা বলে গর্বের সঙ্গে গল্প করি। এভাবেই তৈরি হয় অতিরঞ্জিত কাহিনী, যা এক পর্যায়ে রূপ নেয় কিংবদন্তির। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশান্তরে। এক পর্যায়ে অনেক মানুষের মনে করে নেয় বিশ্বাসের আসন।

এক সময় পাহাড়, সমুদ্র, আগুন, নদী, ঝড় সব কিছুকেই মানুষ বসিয়েছিল দেবতার আসনে। চন্দ্র, সূর্য, পৃথিবী, বৃহস্পতি, শনি প্রভৃতি নক্ষত্র এবং গ্রহগুলোকে মানুষ পূজা করত দেবতা হিসাবে। মানুষের জানা ছিল না জীবাণুর অস্তিত্ব সম্পর্কে। অসুখকে মানুষ মেনে নিয়েছে নিয়তি হিসেবে। ভেবে নিয়েছে পাপের ফলই অসুখ। তন্ত্র-মন্ত্র, তেলপড়া, পানিপড়া ঝাড়ফুঁক ¯^প্নে পাওয়া ওষুধের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু এ তো অনেক অনেক যুগ আগের কথা। এখন তো অলৌকিক অনেক কিছুই মানুষের নাগালের মধ্যে। পৃথিবী জয় করে মানুষ এখন বসতি স্থাপনের চেষ্টা করছে মঙ্গল গ্রহে। এত কিছুর পরও কিছু মানুষ এখনো রয়ে গেছে সেই তন্ত্র-মন্ত্রের যুগে। সে মানুষগুলো যুক্তি নয়, সব কিছু বিচার করে কুসংস্কার আর প্রচলিত ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে। সেই মানুষগুলো আমরা। বিনোদনের জন্য জাদুকর জাদুর খেলা দেখায়। এটা তার পেশা। সেই খেলা দেখে আমরা বিস্মিত হই। আনন্দ পাই। আধুনিক জাদুকরাও বলেন, এগুলো বিশেষ ধরনের কৌশল। চেষ্টা করলে অনেকের পক্ষেই অনেক কিছু আয়ত্ত করা সম্ভব। এর মধ্যে অলৌকিক শক্তির কোনো বিষয় নেই। কিন্তু আমাদের সমাজে একশ্রেণীর মানুষ আছেন, যারা এই স্বাভাবিক লৌকিক ঘটনাগুলোকে অলৌকিক কর্মকাণ্ড হিসাবে আখ্যা দেয়। অল্প শিক্ষিত, শিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষকে বিভ্রান্ত করে। মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য ব্যবহার করে ধর্মকে। লৌকিক ঘটনাকে বানিয়ে ফেলে পারলৌকিক। নিম্নশ্রেণীর কিছু জাদু দেখিয়ে নিজেরা আয় করে লাখ লাখ টাকা। অসহায় মানুষ তাদের এই অলৌকিক প্রচারণায় মুগ্ধ হয়ে তুলে দেয় তার শেষ সম্বল। হয়ে যায় নিঃস্ব।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য রাজধানী শহর ঢাকায় চলছে লৌকিক-পারলৌকিক এমন অনেক বাণিজ্য। গোপনে নয়, প্রকাশ্যে। এক থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে সাপের মণি। অথচ ‘সাপের মণি’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্বই নেই পৃথিবীতে! আপনার কী বিশ্বাস হয় মানুষ জারজ সন্তানের হাড়ের তাবিজ কেনে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে?!! ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি হয় কালো কুত্তার দাঁতের তাবিজ?!

ঘটনার ভেতরে প্রবেশ করা যাক। যার কথা বলছি তার আসল নাম বলছি না। বলছি না এই কারণে যে, তিনি নাম প্রকাশ করতে চান না। ধরে নিই তার নাম আবদুস সালাম। তিনি একটি স্টেশনারি দোকানের মালিক। শ্বশুরবাড়ির টাকায় এই ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এক বছরের মধ্যে লোকসান হয়েছে ২ লাখ টাকা। একজনের মাধ্যমে শুনেছেন সাপের মণির আংটি ব্যবহার করলে মাত্র ১৪ দিনের মধ্যে তার সব ক্ষতি পুষিয়ে যাবে। কেটে যাবে আর্থিক অনটন। ব্যবসায় শুধু থাকবে লাভ আর লাভ। সালাম সাহেবের অবস্থা তখন খুবই খারাপ। শ্বশুরবাড়িতে মুখ দেখাতে পারছেন না। এ অবস্থায় তিনি গেলেন ‘খানকায়ে শেফায়’। ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে কিনে আনলেন সাপের মণি। এই সাপের মণি কিনে আনার কাহিনী তার কাছ থেকে শুনলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, বিষয়টি নিজেরই জানতে হবে। পত্রিকায় দেওয়া খানকায়ে শেফার বিজ্ঞাপনটি ভালো করে পড়লাম। এই খানকায়ে শেফার সাধক সুফিয়া বেগম। তিনি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করেছেন এশিয়া মহাদেশের ভেতরে একমাত্র আধ্যাত্মিক তান্ত্রিক মহিলা। যে কোনো সমস্যা সে যত কঠিনই হোক না কেন তিনি আধ্যাত্মিক ঘটনা ও ক্ষমতার বলে সমাধান দিয়ে থাকেন। বিজ্ঞাপনে যে সমস্যাগুলোর কথা লিখেছেন সেগুলোর কয়েকটি এমন স্বামী স্ত্রীর অমিল, প্রেম-ভালোবাসায় ব্যর্থতা, যে কোনো লোককে বশ করা, শত্রুকে পরাস্ত করা, মনের মানুষকে কাছে পাওয়া, বিয়ে হয় না, বিয়েতে বাধা, ব্যবসায়ে লোকসান, বানমারা, বান ফেরানো ইত্যাদি। পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই যে তিনি সমাধান করতে পারেন না। সালাম সাহেবের কল্যাণে বিজ্ঞাপনটি পড়লাম এবং যারপরনাই চমকিত হলাম।

খানকায়ে শেফার অবস্থান মগবাজার রেল ক্রসিংয়ের পাশে। গত ১৬ ফেব্রæয়ারি সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে হাজির হলাম সুফিয়া বেগমের দরবারে। গ্লাসের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, সোফায় সাদা পাঞ্জাবি লুঙ্গি পরিহিত একটি লোক বসা। বললেন, মা’র সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। সিরিয়ালে নাম লেখালাম। সিরিয়াল নম্বর ৯। অর্থাৎ আমার আগে আজকে আরো ৮ জন এসেছে। পাশ থেকে এক যুবক ধমকের সুরে বললেন ২৫ টাকা দেন। কিসের টাকা? যার সঙ্গে দেখা করার ফি বাবদ ২০০ টাকা। এটা নাম লেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই দেওয়ার নিয়ম। না দিলে মা কষ্ট পাবে। এতে ক্ষতি হবে। একসময় ডাক এলো। বসলাম সুফিয়া বেগমের সামনে। গদিওয়ালা চেয়ারে বসে আছেন মাথায় ঘোমটা। চোখ বন্ধ, মাথা নিচু করে আছেন। প্রায় এক মিনিট পরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন আপনার সমস্যা কী বলেন বাবা?

তেমন কোনো সমস্যা নয়। ব্যবসায় লাভ হচ্ছে না।

‘কিসের ব্যবসা’?

বিজ্ঞাপনী সংস্থার।

কী ব্যবসা করেন?

বোঝা গেল তিনি বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। বুঝিয়ে বলার পর বললেন, ঠিক আছে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কোনো চিন্তা নেই।

চোখ বন্ধ করে একনাগাড়ে বলে গেলেন আমি আপনার ইমান দেখেছি। আপনি সত্যবাদী ও ইমানদার মানুষ। ইমান শক্তিশালী করার জন্য আমার কাছে এসেছেন। যান এক বোতল পানি নিয়ে আসেন।

বললাম, আমার নিজের যেতে হবে না টাকা দিলে অন্য কেউ কিনে আনতে পারবে?

‘না আপনার নিজেরই যেতে হবে, যান।’ বললেন ধমকের সুরে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ১০ টাকা দিয়ে এক বোতল পানি কিনে আনলাম।

বোতল খুলে ডান হাতের তালুতে একটু পানি নেন।

ডান হাতের তালুতে পানি নিলাম। পানিতে তিনি দুই আঙুল ডুবিয়ে কিছু একটা ঘষতে থাকলেন। মুখে বিড়বিড় করে কিছু একটা পড়ে যাচ্ছেন। বিসমিল্লাহ আল্লাহ, আবদুল কাদের জিলানী খাজাবাবা, মা কালী ইত্যাদি শব্দ বোঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম মিলিয়ে দোয়া পড়ছেন।

আপনার এই পানি যদি তিতা বা টক হয়, তাহলে আপনার মুশকিল আসান আমি করব না। আর যদি আপনার পানিতে কোনো আল্লাহ হুজুরপাক মা কালীর আশীর্বাদে কোনো কুদরত এসে থাকে তাহলে আপনার মুশকিল আসান আমার মাধ্যমে হবেই হবে। পানিটা এক চুমুকে খেয়ে ফেলুন।’

সুফিয়া বেগম তার ময়লা দুটি আঙুল পানিতে ডুবিয়েছেন। আঙুলে কিছু একটা নিয়ে অনেকক্ষণ ঘষেছেন। ফলে পানিটা ঘোলা হয়ে গেছে। না খেয়ে ইতস্তত করছি। তিনি বলে উঠলেন, তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলেন। না খেলে আপনার অমঙ্গল হবে।

আরো অনেক কিছু জানতে হবে, এ কারণে তীব্র অরুচি এবং অনিচ্ছা সত্তে¡ও পানিটা খেলাম। খেতে গিয়ে অবশ্য ইচ্ছে করে বেশি অংশ ফেলে দিলাম। এতে তিনি কিছুটা বিরক্ত হলেন। ‘পানির স্বাদ কেমন বাবা?’ প্রশ্ন করলেন সুফিয়া বেগম।

মিষ্টি স্যাকারিন দিলে যেমন হয় তেমন মনে হলো।

তওবা আস্তাক ফেরউল্লাহ। এ কথা বলবেন না। আপনার ওপর আল্লাহর রহমত নেমে এসেছে। তাই পানির স্বাদে পরিবর্তন এসেছে। সুস্বাদু হয়েছে।

এরপর প্রায় এক মিনিট বিরতি। কাগজে কিছু একটা আঁকাআঁকি করছেন। কথা বলতে নিলে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন, আপনার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আপনি এখন কী ভাবছেন সেটাও দেখতে পাচ্ছি। আপনার ব্যবসার শুরুটা তো খুবই ভালো হয়েছিল। খুবই ভালো। আপনার কাজের শুরুটা ভালো, শেষটা ভালো না, আপনি খুব বড় মনের মানুষ। আপনি সবাইকে দিয়ে খুশি হতে চান। কিন্তু আপনাকে কেউ বুঝতে পারে না। সামনে যে আপনার বন্ধু, পেছনে সেই আপনার পিঠে ছুরি মারতে চায়। কিন্তু আপনি সেটা বুঝতে পারেন না। আপনার ওপর রাহু এবং শনির প্রভাব আছে। এ কারণে বৃহস্পতি দূরে সরে যাচ্ছে। এখনই বৃহস্পতিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাড়াতে হবে রাহু আর শনিকে।

রুমে ঢুকলেন সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা লোকটি। বসলেন আমার পাশের চেয়ারে। রাহু ও শনি তাড়ানো বিষয়ে আরো অনেক কথা বললেন। আমার সম্পর্কে বললেন আরো অনেক ভালো ভালো কথা। যা শুনতে বেশ ভালোই লাগে। এত ভালো কথা নিজের সম্পর্কে জীবনে শুনিনি। আমাকে প্রায় ফেরেশতার পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। আবার কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে গম্ভীরভাবে বলে উঠলেন, ‘দুই হাত মাথার ওপরে উঁচু করে ধরুন। এক হাতে সুখ আর এক হাতে দুঃখ নিয়ে মুঠ করে ধরুন।’

হাত মুঠ করে বসে আছি। সুফিয়া বেগম কাগজে দাগ কাটছেন। স্বাভাবিকভাবে যেটা করার কথা সেটা না করে সুখ-দুঃখ ধরার ক্ষেত্রে আমি উল্টোটা করেছি। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলছেন, বুঝতে পারছি না। জোরে বলে উঠলেন, ‘আপনি ডান হাতে সুখ আর বাম হাতে দুঃখ ধরেছেন। ঠিক বলেছি? বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।’

মানুষের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার রহস্যটা বুঝতে পারছি। স্বাভাবিক বিশ্বাসে যারা সুফিয়া বেগমের কাছে যাবেন তাদের প্রায় সবাই ‘সুখ’ ডান হাতেই ধরবেন, বাম হাতে নয়। সুফিয়া বেগমের কথার সঙ্গে মিলে যাবে। ফলে তার প্রতি বিশ্বাস আরো দৃঢ় হবে।

আপনি কী সাপের মণি নিতে পারবেন?

সাপের মণি কোথায় পাব কীভাবে নেব? বললাম আমি।

এবার তিনি গর্জন করে উঠলেন, এত কথা বলবেন না। আর বেশিক্ষণ সময় নেই। সাপের মণির ব্যবস্থা আমি করব। আপনার সাহস হবে ব্যবসায় উন্নতি হবে। শত্রু আপনার সামনে এসে পা জড়িয়ে ধরে মাফ চাইবে। বড় সাপের মণি নিতে চাইলে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাগবে।

সাপের মণি কি এখন দেখা যাবে?

না না না। এই জিনিস বাইরে রাখা যায় না। এটা আছে সাপের মাথার ভেতরে। আপনি এখন কিছু টাকা অ্যাডভান্স করে যাবেন। যাদের কাছে মণিওয়ালা সাপ আছে তাদের খবর দিলে সাপ নিয়ে আসবে। আপনি ব্লেড দিয়ে কেটে সাপের মণি বের করে নেবেন। একজন বিভিন্ন সাইজের আংটি নিয়ে এসে আমার হাতের মাপ নিলেন।

‘তা এখন কত টাকা অ্যাডভান্স করবেন বাবা?’

‘এখন আমার কাছে টাকা নেই। কালকে এসে নিয়ে যাব।’

‘আমার কাছে মিথ্যা বলবেন না বাবা। আপনার মানিব্যাগে ৫শ টাকার নোট দেখতে পাচ্ছি।’

ম্যানিব্যাগ আমার আর উনি ৫শ টাকার নোট দেখতে পাচ্ছেন। আসলে আমি যখন ২শ টাকা ফি দিচ্ছিলাম তখন একজন আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার মাধ্যমে খবরটা চলে গেছে সুফিয়া বেগমের কাছে। বললাম, ‘এটা আমার টাকা নয়, অন্যজনের। টাকাটা আজই দিতে হবে। আমি কালকে টাকা নিয়ে আসব।’

‘আজকে কিছু অ্যাডভান্স করে গেলে আপনার মঙ্গল হতো। আচ্ছা ঠিক আছে কালকে আসেন। আপনার মোবাইল নম্বরটা লিখে দিয়ে যান।

বললাম, সাপের মণি নিলে আমার বিদেশ যাওয়া হবে কি না? তিনি বললেন আপনি অনেকবার বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতি আপনার সঙ্গে ছিল না। আপনি সাপের মণি ব্যবহার করলে একুশ দিনের মধ্যে বিদেশ যেতে পারবেন।

প্রায় ৩০ মিনিট পরে বেরিয়ে এলাম খানকায়ে শেফা থেকে। আমার ক্ষেত্রে যে ঘটনাগুলো ঘটল প্রায় হুবহু গল্প শুনেছিলাম সালাম সাহেবের কাছ থেকে।

সুফিয়া বেগম কতটা আধ্যাত্মিক, কতটা ক্ষমতাবান তা তার কথার মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে গেছে।

মানুষের নানা কিসিমের গোপন রোগের বিদ্যুৎগতিতে সমাধান দেয়া ও ভাগ্য ফিরিয়ে দেয়ার নামে গড়ে উঠেছে দাওয়াখানা, হারবাল চিকিৎসা ও হোমিও চিকিৎসালয়। এ চিকিৎসায় বিতরণ করা হয় লিফলেট, যা অশ্লীল ও অশ্রাব্য। এসব লিফলেটের নিচে লেখা থাকে বিভিন্ন দাওয়াখানা হারবাল ও হোমিও চিকিৎসালয়ের ঠিকানা। ভাগ্য ফেরানোর কারিগরদের নামের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে অদ্ভুত ধরনের ডিগ্রি ও মেডেল প্রাপ্তির ইতিহাস, যৌন রোগ ও ভাগ্যবদল করার ব্যানারেই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো। প্রশাসনের সামনেই এসব ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও তারা নির্বিকার। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এরা ব্যবসা করে যাচ্ছে দেদার।

ওষুধ প্রশাসনের হেঁয়ালি ও আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে এবং মানুষের গোপনীয় ও ব্যক্তিগত দুর্বলতা পুঁজি করে সারাদেশে ভেজাল, অকার্যকর ও মানহীন ওষুধের রমরমা বাণিজ্য হচ্ছে।

জানা গেছে, ভাগ্য ফেরানোর নামে গড়ে ওঠা দাওয়াখানা, হারবাল ও হোমিও চিকিৎসালয়ের অধিকাংশের ট্রেড লাইসেন্স নেই। তারপরও ওষুধ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

ধর্মকে ব্যবহার করে বাণিজ্য করার প্রবণতা প্রাচীনকাল থেকে। এক দল ধর্মব্যবসায়ী ধর্মের ব্যানারে মানুষের অসহায়ত্ব ও দুর্বলতা পুঁজি করে ধান্ধাবাজি করে। ভণ্ড পীর-ফকিরের ব্যানারে তারা নিয়মিত প্রতারণা করছে। গ্রামগঞ্জেও এই টাউট-বাটপারদের অবাধ বাণিজ্য। এই টাউট-বাটপাররা ক্রমেই গ্রাম ছেড়ে শহরে আস্তানা গড়ে তুলেছে। জন্ম দিচ্ছে হুজুর সাইদাবাদী, সুফিয়া বেগম, জীবন চৌধুরীদের। এদের অবশ্য এই ব্যবসা করতে সরকারের অনুমতি নিতে হয় না। সরকারকে তারা ট্যাক্সও দেয় না। তারা ট্যাক্স দেয় এলাকার মস্তানদের। নিয়মিত মাসোয়ারা দেয় সংশ্লিষ্ট থানাকেও। যে কারণে সগৌরবে চলছে এই প্রতারণার ব্যবসা।

‘মনের কষ্ট আর নয় বনে বনে’ অথবা হতাশ জীবনে অমাবস্যা আঁধারের মাঝে স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নাময় পূর্ণিমায় যেন হয় আপনার দর্শন কিংবা ‘জীবনের শেষ দর্শন’ এ রকম বিচিত্র স্লোগান দিয়েই ফাঁদ পাতা হচ্ছে প্রতারণার।

ধর্মীয় অনুভতি কাজে লাগিয়ে লৌকিক-পারলৌকিক ব্যবসা যেসব স্থান থেকে হচ্ছে সেগুলো হলোÑ আল্লাহর দান, বাস্তব কাহিনী, দরবারে পীরানী, দরবারে আশেক, কামরূপ কামাক্ষা, যজ্ঞমন্দির, আলি কাদিরী দরবার শরীফ, দস্তগীর পীরের দরবার, শেষ ভাগ্য নিবাস, আশেকানে সমাধান, দরবারে মুক্তি, দরবারে শান্তি, চন্দ্রমণি, কোরাইশী দরবার শরীফ, দরবারে সুলতান শরীফ, রহমানিয়া দরবার শরীফ, দারুল উলুস মাদ্রাসা ও দরবার শরীফ, জান্নাতি দরবার শরীফ, আল্লার দান দরবার শরীফ, হাজী বিল্লাল মিসরী দরবার শরীফ, পায়রা পাথর ঘর, শারা হারবাল কেয়ার, আল নূর, শেরে আলী দরবার শরীফ, ফুরফুরা খানকা শরীফ, স্বপ্ননিবাস দরবার শরীফ, তদবিরে শেফা, বিস্ময় বালক, কালীমন্দির, দরবারের আল তকদীর, গাউছে পাক দরবার শরীফ, মোহাম্মদীয় পাক দরবার শরীফ, আল আহসানিয়া খানকা শরীফ, মুসলিম পাক দরবার শরীফ, স্বপ্নের দরবার, দিকদর্শন, শেষ দিকদর্শন, শেষ দর্শন, আজমেরী জেমস হাউস, আল ফরিয়াদ, স্বপ্ন বাস্তবায়ন দরবার, বৌদ্ধ বাবুর আশ্রম, ক্ষ্যাপা সাধুর আশ্রম, মণিঠাকুরের আস্তানা, শেষ ভরসা কেন্দ্র, জান্নাতি দরবার, মা কালীমন্দির, সর্পরাজের দরবার, সর্প-সম্রাটের শেষ দর্শন, রুহানী দরবার শরীফ প্রভৃতি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে খোঁজ নিয়ে নিয়ে জানা যায়, লৌকিক পারলৌকিক এ ব্যবসার মূল লক্ষ্য পাথর বিক্রয়। ক্ষেত্র বিশেষে এ পাথর কয়েক লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। এর বাইরে সাপের মণির নামে নেয়া হয় ১ লাখ টাকা। জারজ সন্তানের হাড় ৫০ হাজার টাকা, কালো কুত্তার দাঁত ৬০ হাজার টাকা। তাবিজ ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। মূলত এগুলো বিক্রি করার জন্যই লোক সংগ্রহ করা হয়। তাদের কাছে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন অন্যতম লক্ষ্য।

হারবালের নামে প্রতারণা

রাজধানীতে হারবাল চিকিৎসার নামে চলছে প্রতারণা। নামে-বেনামে বিভিন্ন স্পটে গড়ে উঠেছে  অর্ধশতাধিক চিকিৎসা কেন্দ্র। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা হারবাল ওষুধের ইউনানি দাওয়াখানার নেই কোনো ট্রেড লাইসেন্স। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে  যৌনরোগ, পাইলস, অ্যাজমা, গ্যাস্ট্রিক ও ক্যান্সারসহ অনেক রোগের চিকিৎসার কথা বলে প্রতারিত করা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যারা এই চিকিৎসাসেবার সঙ্গে জড়িত তাদের অনেকেরই হারবাল বা গাছগাছড়া সংক্রান্ত তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। হারবাল চিকিৎসার দাওয়াখানা দিয়ে কবিরাজ কিংবা হেকিম বনে গেছেন। এসব চিকিৎসক নিজের নামের আগে ও পরে যুৎসই বড় বড় ডিগ্রি, বিশেষজ্ঞ ও বিশেষণ বসিয়ে রোগীদের ফাঁদে ফেলছেন।

বর্তমানে রাজধানীতে একশ্রেণীর মহিলা দ্বারা কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে বাসের যাত্রীদের কাছে যৌন চিকিৎসার বিজ্ঞাপন তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। এসবের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টার পাশাপাশি পত্রিকায় চটকদার বিজ্ঞাপন দেখে রোগীরা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বা কবিরাজের শরণাপন্ন হলেও রোগ থেকে পরিত্রাণ মিলছে না । বরং আরোগ্য না হয়ে আক্রান্ত হচ্ছে নতুন নতুন জটিল  রোগে।

ফর্সা হওয়ার নিশ্চয়তা দিচ্ছে কারওয়ান বাজারের হাফিজিয়া ম্যানশনের জেনুইন হারবাল। মাত্র ১শ টাকায় রোগীর ত্বক পরীক্ষা করে ফর্সা হওয়ার ওষুধ দিচ্ছে। প্রথম ফাইল ১২শ’ টাকা। প্রয়োজনে সঙ্গে দেন বিশেষ ক্রিম। চিটাগাংয়ের দেওয়ানহাট মোড়ের অ্যাজমা কমপ্লেক্সের ইবনে সিনা হারবাল সেন্টার লিমিটেড লম্বা, মোটা, ফর্সা যা-ই হতে চান তার ওষুধ আছে। বাংলাদেশের যে কোনো প্রাš— থেকে তাদের ওষুধ পৌঁছে দিচ্ছে। তবে এজন্য প্রথমে বিজ্ঞাপনে দেওয়া ৩২০৮০৩২৫ নম্বরে ডাক্তারের নির্দেশ অনুসারে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ফ্লেক্সিলোড করতে হয়। পরে ফোন করে ঠিকানা জানালে সে অনুযায়ী এসএ পরিবহনের মাধ্যমে ওষুধ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সার্ভিস চার্জসহ প্রতি কোর্সের দাম পড়ে মাত্র ১ হাজার টাকা। চিকিৎসালয়ের পরিচালক জানান, ‘কোনো অভিযোগ থাকলে বা ভুয়া হলে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আমরা ব্যবসা করতে পারতাম না।’ ফ্লেক্সিলোড কেন করতে হয়, এর উত্তরে তিনি জানান, এসএ পরিবহনে পার্সেল করার খরচ নেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

লম্বা হতে চাইলে মালিবাগ রেলগেটের পাশেই হারবাল সেবা কেন্দ্রে পাওয়া যাচ্ছে অভিনব দুই ধরনের ওষুধ। এর মধ্যে রয়েছে একটি লোশন যা  প্রতিদিন পায়ের পাতায় দিতে হবে। এছাড়া রয়েছে ট্যাবলেটের ব্যবস্থা, যার জন্য খরচ  হবে ২ হাজার টাকা। নিয়মিত এ চিকিৎসা চালিয়ে গেলে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি লম্বা হওয়ার নিশ্চয়তা দিলেও উপস্থিত আগন্তুকদের চিকিৎসার উপকারিতা সম্পর্কে কোনো তথ্য কেউই দিতে পারেনি। উপকারিতা সম্পর্কে জানতে চাইলে চিকিৎসা নিতে আসা আসলাম জানান, চিকিৎসকের কথামতো ২ হাজার টাকা খরচ করেও তিনি কোনো উপকার পাননি।

তাঁতীবাজার মোড়ের মাদ্রাজ হারবালে যৌন সমস্যার সমাধানে এক রোগীকে ১৫ দিনের ওষুধের জন্য ৫ হাজার টাকার মৌখিক চুক্তি করা হয়। এ ব্যাপারে রফিকুল ইসলাম নামে এক রোগী অভিযোগ করে  বলেন, যৌন সমস্যার জন্য গত ১৫ দিনে ওষুধ খেয়েও তার কোনো লাভ হয়নি।

নগরীর ফার্মগেট মোড়ে হারবাল চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, চেম্বার খুলে এক রুমে বসে আছেন ‘ডাক্তার’। পাশের রুমে যৌনরোগ এবং স্তনের চিকিৎসা হয়। এই রুমে রোগী আর ডাক্তার ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না। রোগীদের সঙ্গে রোগীর নিজস্ব কোনো লোককেও প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে রিসেপশনিস্ট জানান, ডাক্তার কথা বলতে রাজি নন।

এছাড়াও উত্তর জুরাইন পাইপ রাস্তার বিজয় ইউনানি দাওয়াখানা মেদভুঁড়ি কমানোর জন্য বিশেষ ওষুধ দিয়ে থাকে। দরদাম প্রতিফাইল হাজার-১২শ থেকে শুরু।

গুলিস্তান এলাকায় যৌন শক্তিবর্ধক ও বিভিন্ন জটিল রোগের মহৌষধ নামে কথিত বনাজী হালুয়া, তেল ও বটিকা বিক্রি করেন ‘কবিরাজ’ মোঃ মহসিন। জানা যায়, তার  মানিকনগর এলাকায় হালুয়া তৈরির কারখানা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সহজ-সরল মানুষের কাছে বিভিন্ন চটকদার কথাবার্তা বলে এবং নারী-পুরুষের অশালীন ছবি দেখিয়ে এসব হালুয়া ও বটিকা বিক্রি করে আসছেন। এই হালুয়া ও বটিকা বিষাক্ত কেমিক্যাল সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়। এ ধরনের হালুয়া ও বটিকা খেয়ে মানুষের কিডনি এবং লিভার নষ্টসহ জটিল রোগব্যাধি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞ কয়েকজন চিকিৎসক জানান।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মালিবাগ, মৌচাক, মগবাজার, গুলিস্তান, সদরঘাট, মহাখালী, কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন স্পটে গড়ে উঠেছে নানা নামে হারবাল চিকিৎসা কেন্দ্র। এসব চিকিৎসা কেন্দ্রের রোগীদের মধ্যে নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের সংখ্যাই বেশি। আবার যৌন চিকিৎসার জন্য মধ্যবয়সীর চেয়ে তরুণ-তরুণীর সংখ্যাটা বেশি বলে জানালেন যাত্রাবাড়ী হারবাল চিকিৎসা কেন্দ্রের এক ডাক্তার। জানা গেছে, অবৈধ মেলামেশা করে চুলকানি, ক্ষত এবং যৌন কাজে অক্ষমতাসহ বিভিন্ন রোগের সমাধানের জন্য অনেকেই গোপন চিকিৎসা নিতে আসেন এসব নামসর্বস্ব চিকিৎসা কেন্দ্রে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জানায়, যৌন সমস্যার জন্য যাত্রাবাড়ী শাখা থেকে ওষুধ খেয়ে সে কোনো রকমের উপকার পায়নি। প্রথমে মাত্র সাত দিনে সমস্যা উপশমের কথা বলা হয়। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে রোগ উপশম না হওয়ায় তাকে ৬ মাসের কোর্স কমপ্লিট করতে বলা হয়। আর এক সপ্তাহে ওষুধ বাবদ রাখা হয় ২ থেকে ৪ হাজার টাকা। ডাক্তারের ভিজিট বাবদ কোনো টাকা নেয়া হয় না। তবে ওষুধের মাধ্যমে সেই টাকা নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করে অনেক রোগী।

গত কয়েক বছরে সারাদেশে যৌন চিকিৎসার ফাঁদ পাতা হাজার হাজার হারবাল ও হোমিও প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠলেও ২০০৩ সালের পর এসবের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। ওষুধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ২০০৩-এর পরে ঢাকার বাইরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ড্রাগ কোর্টের তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ সালে ১টি ও ২০১০-এ ৩টি মামলা হয়েছে। নিয়মানুযায়ী ওষুধ বিক্রেতা বা উৎপাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানকে ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদন নিতে হয়। উৎপাদনকারী প্রতিটি ওষুধ প্রচারের জন্য নিতে হয় সংশ্লিষ্ট বিভাগের অনুমোদন। কিন্তু এসবের কোনো তোয়াক্কা না করে যৌন চিকিৎসার ফাঁদ পেতেছে কথিত হোমিও এবং হারবাল প্রতিষ্ঠানগুলো। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এখন পর্যন্ত মাত্র ১৬ থেকে ১৭টি হারবাল প্রতিষ্ঠান এবং ৬০টির মতো হোমিও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন নিয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোঃ রুহুল আমিন জানান, ভেজাল ওষুধ প্রমাণের জন্য ড্রাগ প্রশাসন প্রথমে অভিযুক্ত ওষুধটি সংগ্রহ করে থাকে। তারপর ল্যাবে পাঠায়। এরপর রিপোর্ট যাওয়ার পর নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়ে জবাব মনঃপূত না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ ব্যবস্থায় আবার ৩টি ধাপ রয়েছে। প্রথমত অভিযুক্ত ওষুধটির উৎপাদন স্থগিত, দ্বিতীয়ত রেজিস্ট্রেশন স্থগিত, তৃতীয়ত অভিযুক্ত ওষুধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের। এরপর মামলার দীর্ঘসূত্রতা। অতঃপর অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া।

এদিকে ওষুধ বিষয়ক অপরাধের জন্য ১৯৮২ সালে ড্রাগ কোর্ট প্রতিষ্ঠা করা হলেও ভেজাল বা অনুমোদনহীন কোনো ওষুধ অথবা বিজ্ঞাপনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কারো মামলা আমলে নিতে পারবে না সংশ্লিষ্ট আদালত। আইন অনুযায়ী মামলা দায়ের করার অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ হলো ড্রাগ প্রশাসন। এ ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মামলা দায়ের করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। এসব জটিল প্রক্রিয়া ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা সংক্ষুব্ধ কেউ মামলা করতে যান না। ড্রাগ কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এ কোর্টে ৩০টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে মাত্র ৬-৭টি মামলা মানহীন ও ভেজাল ওষুধের জন্য। বাকিগুলো অননুমোদিত বিজ্ঞাপনের জন্য। তবে ২০১০ সালের পর আর কোনো মামলা এ আদালতে দায়ের করা হয়নি।

২০০৩ সাল পর্যন্ত ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ঢাকা ও অন্যান্য স্থানের যে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করেছে সেগুলো হলো চট্টগ্রামের হাকিম শাহ আলম চৌধুরীর মেসার্স জীবনের শেষ চিকিৎসা, হাকিম খায়রুল বশর চৌধুরীর জীবনের শেষ চিকিৎসা, কবিরাজ এয়াকুব আলী চৌধুরীর জীবনের শেষ চিকিৎসা, হাকিম হাজী নূর আহমদ চৌধুরীর জীবনের শেষ চিকিৎসা, ঢাকার মেসার্স মগবাজার চিকিৎসালয়, স্বাস্থ্যই সম্পদ, মেসার্স ঢাকা ইউনানি সেন্টার, মেসার্স দি ইউনানি রিসার্চ সেন্টার, মেসার্স হোমিও হেলথ সেন্টার, নাটোরের মেসার্স জীবন শক্তি হাকিমী ঔষধালয়, মেসার্স সাধক জ্যোতিষী, মেসার্স এফ এ চিকিৎসালয়, মহাখালীর মেসার্স হেলথ অ্যান্ড সেক্স ডেভেলপমেন্ট পয়েন্ট, আর কে মিশন রোডের মেসার্স লাইফ কেয়ার ইন্টারন্যাশনাল, বেইলি রোডের এইচ এম ক্লিনিক পয়েন্ট, মেসার্স হেয়ার লাইফ, মেসার্স চায়না হারবাল হোম, মেসার্স বিডি ল্যাবরেটরিজ, মেসার্স ইবনে সিনা হারবাল সেন্টার, মেসার্স নেচার হিলিং, মেসার্স মঘা ঔষধালয়, মঘা শাস্ত্রীয় দাওয়াখানা, মেসার্স মডার্ন হারবাল রিসার্চ গার্ডেন, মেসার্স তুষিন ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল, মেসার্স আলম ম্যানুফ্যাকচারিং। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৪ ধারা লক্সঘন ও ১৯৯৭ সালের সংশোধিত একই আইনের ২১ ধারা মোতাবেক অননুমোদিত বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য মামলা করা হয়েছে। তাদের প্রস্তুতকৃত কোনো ওষুধের জন্য মামলা হয়নি। এসব মামলার মধ্যে মেসার্স হেয়ার লাইফ ও মেসার্স সাধক জ্যোতিষীর নামে অননুমোদিত বিজ্ঞাপনের জন্য, মেসার্স মডার্ন হারবাল রিসার্চ গার্ডেনের বিরুদ্ধে কস্তুরীর জন্য মামলা করা হলেও সেগুলো উচ্চ আদালত স্থগিত করে দেন। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র মোঃ রুহুল আমিন বলেন, স্বল্প সংখ্যক জনবল নিয়েও তারা কাজ করার চেষ্টা করছেন। জনবল বাড়ানো গেলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতো। চিকিৎসার নামে প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জনবল সঙ্কটের জন্য তারা তা করতে পারছেন না।

ড্রাগ কোর্টের স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট মাহমুদ হোসেন জাহাঙ্গীর বলেন, রাস্তায় চলার পথে বিভিন্ন হারবাল ও হোমিও প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হয়, পুরো দেশ বুঝি যৌন রোগে আক্রান্ত। এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠোর আইনি ব্যবস্থার মধ্যে আনা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। তিনি বলেন, হারবাল ও হোমিও চিকিৎসার আড়ালে যেসব প্রতিষ্ঠান যৌন চিকিৎসার ফাঁদ পেতে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে, তাদের ওপর কড়া নজরদারি বা মনিটরিং থাকা দরকার।

মাথায় চুল গজাতে গিয়ে বা ফর্সা হতে গিয়ে অনেকেই ত্বক ক্যান্সারের মুখোমুখিও হতে পারেন আশঙ্কা করে বাংলাদেশ মেডিক্যালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সিরাজুল হক বলেন, ‘চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন কোনো মেডিসিন নেই। এসবই প্রতারণার জন্য প্রচারণা।’ জাতীয় হƒদরোগ  ইনস্টিটিউটের মেডিসিন ও হƒদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রহমাতুল বারী জানান, ‘এসব চিকিৎসা আদৌ কতটুকু চিকিৎসার পর্যায়ে পড়ে তা বিবেচ্য সবার আগে। কেননা কাউকে ডায়াগনসিস না করে মুখে শুনে চিকিৎসা করা চিকিৎসা বিজ্ঞানবহিভর্ত আচরণ। তাছাড়া যে কোনো ওষুধেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকবে। হারবাল বলছে কীভাবে নিশ্চিত হবে রোগী এটা হারবাল উপাদানে তৈরি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় রোগী যে কোনো সমস্যা থেকে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. গোলাম কিবরিয়া  জানান, চিকন বা মোটা হওয়ার সব রকমের চিকিৎসাও মেলে এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে। তবে তাৎক্ষণিক এসব চিকিৎসার ওষুধ সেবনে ফল পেলেও পরবর্তী সময়ে কিডনির ক্ষতি করে বলে মনে করেন তিনি। এসব চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ক্যান্সার রোগের চিকিৎসা যদি হারবাল ওষুধ দিয়ে সমাধান হতো, তাহলে মানুষ বিদেশে চিকিৎসাসেবা নিত না।

হোমিও চিকিৎসা, ইউনানি ও আয়ুর্বেদির নামে প্রতারণা

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে কালো তালিকাভুক্ত অর্ধশত ইউনানি ও আয়ুর্বেদি প্রতিষ্ঠান জনসাধারণের সঙ্গে একের পর এক প্রতারণা করে যাচ্ছে। সব জটিল রোগের ওষুধ উৎপাদনকারী এসব প্রতিষ্ঠান রাজধানীসহ সারাদেশে ইউনানি ও আয়ুর্বেদি ওষুধের নামে বছরের পর বছর রমরমা বাণিজ্য করছে। ১৯৮২ সালের ওষুধ অধ্যাদেশের ১৪ ধারা অনুসারে যে কোনো ধরনের ওষুধ বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন প্রচার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও ওষুধ প্রশাসনকে কোনো তোয়াক্কা না করে কালো তালিকাভুক্ত এসব প্রতিষ্ঠান অনেক আগ থেকে প্রতারণা ও জালিয়াতি করে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন প্রচার করে আসছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, দেশে ২৬১টি ইউনানি ও ১৬১টি আয়ুর্বেদি কোম্পানি রয়েছে। এগুলোর রেজিস্ট্রেশন থাকলেও এর বাইরে আরো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

রেজিস্টার্ড কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০টির ওষুধ গুণগত মানের। বাকিগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিম্নমানের প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থের বিনিময়ে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন দিয়ে মানুষের মন আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। আকর্ষণীয় এসব বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে ¯^ল্প শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মানুষ প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে।

ইউনানি ও আয়ুর্বেদির পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসার নামেও চলছে জমজমাট প্রতারণা। রাজধানীজুড়ে গড়ে উঠেছে এই প্রতারকদের নেটওয়ার্ক। এর সদস্যরা ছোট ছোট কার্ড, লিফলেট বিতরণ করে মানুষ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান অবাধে গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের লিফলেট, পোস্টার ও বিজ্ঞাপনের ভাষা অভিন্ন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লিফলেটে ‘কম্পিউটারাইজড হোমিও সেন্টার’ নামে চিকিৎসা করে থাকে বলে উল্লেখ করে। এছাড়া প্রয়োজনে মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয় বলেও বিভ্রান্তিকর প্রচার চালায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতারিত লোকদের রোষানলে পড়ার আগেই রাতারাতি নাম-ঠিকানা পাল্টে ভিন্ন নামে ব্যবসা শুরু করে। মডার্ন ভেষজ কমপ্লেক্স, প্যারিস হারবাল গার্ডেন, জনতা দাওয়াখানা, পপুলার হারবাল মেডিক্যাল হোম, এশিয়া হারবাল মেডিক্যাল, বাংলাদেশ হারবাল মেডিক্যাল, আধুনিক হারবাল, দি হারবাল মেডিসিন সেন্টার, আমেরিকান হারবাল কমপ্লেক্স, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা সেবা, এবি কোং, আল রাজী ভেষজ লাইফ, ডক্টরস ভেষজ চেম্বার, হারবাল পয়েন্ট, ইউএ হারবাল সেন্টার, আয়ুর্বেদ ভবন-ঢাকা, গ্রামীণ হারবাল মেডিক্যাল, ইন্ডিয়ান হারবাল মেডিক্যাল, হোমিও থেরাপি অ্যান্ড হেলথ কেয়ার, মডার্ন হোমিও রিসার্চ কমপ্লেক্স, ইন্টারন্যাশনাল হোমিও রিসার্চ, জার্মান হোমিও হেলথ, আমেরিকান হোমিও ক্লিনিক, মাদ্রাজ হারবাল মেডিক্যাল, ন্যাশনাল হারবাল, কলিকাতা হারবাল কেয়ার, আমেরিকা হারবাল মেডিক্যাল, ভিআইপি হারবাল মেডিক্যাল, হেকিমী দাওয়াখানা, ভেষজ হেলথ কমপ্লেক্স, ঢাকা হোমিও ক্লিনিক, দিল্লি হারবাল সেন্টার, ইউনানি হেলথ সেন্টার, পিওর হারবাল সেন্টারসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাধে প্রতারণামূলক এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পুরুষত্ব ও নারীর দেহসৌষ্ঠবের আকর্ষণ বৃদ্ধির নামে এরা বিক্রি করে নানা মানহীন, ভেজাল, অকার্যকর ওষুধ।

হারবাল ও হোমিওপ্যাথের লেবেল এঁটে বেশ চাকচিক্যময় মোড়কে তারা এসব পণ্য বিক্রি করছে নির্বিঘেœ। এসব পণ্যের মূল্য ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। রাতের শক্তি চায়না সেক্স মদক, সেক্স কিং জিনসেং মালিশ, স্পেশাল পিএইচ পাওয়ার অয়েল, এইচএম ৬০ এনার্জি ক্যাপসুল, এইচএম এইচ পাওয়ার অয়েল, নিশি মালতি জেনিট, স্পেশাল এএইচ পাওয়ার অয়েল, বিএইচ পাওয়ার অয়েল, স্পেশাল এইচএম পাওয়ার মালিশ, মদক, সেক্স পাওয়ার মদক, ব্রেস্টআপ লোশন, হর্স পাওয়ার লোশন, টাইগার ক্যাপসুল, সেক্স আম্বর ক্যাপসুল, সেক্স পাওয়ার জেলি, পাওয়ার গোপন লোশন, এইচপি কাপ, এইচপি মদক, খারাতিম লোশন, সেক্স পাওয়ার মালিশ, সেক্স পাওয়ার ক্যাপসুল, সেক্স পাওয়ার মদক, পুরুষত্বের প্রতীক মণিরাজ তেল, নারীর সৌন্দর্যের প্রতীক ডিএইচ ক্রিম, ইউএ মালিশ, ইউএ হারবাল ডাস্ট, ইউএ কুস্তায়ে হালুয়া, ইউএ কাপ, সেক্স পাওয়ার মদক, হর্স পাওয়ার লোশন, টাইগার ক্যাপসুল, নাইট কিং অয়েল, হারবাল জেনিটাল ডিউরেক্স স্পেশাল অয়েলসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রচারের মাধ্যমে পুরুষ-নারীকে আকৃষ্ট করতে চায় প্রতিষ্ঠানগুলো। ঢাকার ৯৩ নিউ সার্কুলার রোডের লিলি প্লাজায় অবস্থিত হোমিও থেরাপি অ্যান্ড হেলথ কেয়ারের ডা. ওয়াজেদ আলীকে তার লিফলেটে উল্লিখিত পুরুষের বিশেষ অঙ্গ স্ফীত করার বিশেষ পণ্যের ব্যাপারে জানতে চেয়ে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের ওষুধ কতটা স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত জানতে চাইলে তাও জানাতে পারেননি তিনি। এ বিষয়ে সন্দেহের কথা তুললে তিনি ‘সন্দেহ থাকলে সন্দেহ নিয়ে বসে থাকেন’ বলে ফোন রেখে দেন। পরে তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। এর আগে তার প্রতিষ্ঠানের টিঅ্যান্ডটি ফোনে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে অপরপ্রান্ত থেকে ‘তিনি (ডাক্তার) দেশে নেই’ বলে জানানো হয়। মহাখালী আমতলী মোড়ের এইচ-২৩ এয়ারপোর্ট রোড তৃতীয়তলায় অবস্থিত জার্মান হোমিও হেলথের চিকিৎসক ডা. এম এন ইসলামের মোবাইলে ফোন দেয়া হলে কথা বলেন ডা. বীরেন্দ্রনাথ সিকদার নামে এক ব্যক্তি।

তার কাছে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত পুরুষের বিশেষ অঙ্গের দুর্বলতা দূর করার স্পেশাল জেনিটাল ও মহিলাদের বিশেষ অঙ্গ বড় করার ক্রিম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের কাছে এ ধরনের কোনো পণ্য নেই। যৌন চিকিৎসার জন্য প্রস্তুতকৃত তাদের ওষুধ কতটা মানসম্পন্ন এবং এ ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন কি না জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কথিত ডা. বীরেন্দ্রনাথ সিকদার।

এসব ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনীর উদ্দীন আহমদ জানান, এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধে সরকারের কঠোর হওয়া জরুরি। এসব অপকর্ম রোধে ড্রাগ প্রশাসন, পুলিশ ও র‌্যাবকে অগ্রণী ভমিকা নেয়ার আহŸান জানান তিনি। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের ওষুধ নামধারী পণ্যগুলো খেয়ে বা ব্যবহার করে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেউ কেউ মারাও যাচ্ছে। বাসে, ট্রেনে বা জনসমাগমে যারা এ ধরনের ওষুধ বিক্রি বা লিফলেট বিতরণ করে তাদের ধরে শাস্তি দেয়া উচিত। এ ধরনের প্রতারণা থেকে জনগণকে রক্ষায় সরকারের উচিত ধারাবাহিকভাবে মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করা।

রূপচর্চায় হারবাল প্রতারণা

ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েরা রূপচর্চায় খুব বেশি মনোযোগী। সেই সুবাধে রূপচর্চার ক্ষেত্রে   ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্যের প্রতি একটু দুর্বলতাও বেশি। তাই বাহারি বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে মান যাচাই না করে যুবক-যুবতীরা ব্যবহার করছে এ ধরনের পণ্য। বর্তমানে আমাদের দেশে রূপচর্চার পণ্য উৎপাদনে বেশ কিছু ভালো কোম্পানি এগিয়ে এসেছে। পাশাপাশি নামসর্বস্ব কিছু কোম্পানিও এ পণ্য উৎপাদন করছে। রূপচর্চায় হারবাল পণ্যের প্রতি সাধারণ মানুষের কদর থাকায় অনেকে তাদের কোম্পানির নামের শেষে হারবালজুড়ে দেয়। আবার এদের অনেকেই বিদেশি লেভেন নকল করছে।
জানা যায়, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগেও বেশ কিছু রূপচর্চার হারবাল পণ্য তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানা যায়, বেশ নিম্নমানের হারবাল কোম্পানিগুলোর একটি পণ্য তৈরিতে সর্বোচ্চ ১৮-২০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এর গায়ে বিক্রয় মূল্য থাকে সর্বনিম্ন ৮০ থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা। এ কোম্পানিগুলো চকবাজারের কিছু পাইকারি দোকানকে ম্যানেজ করে ঢাকার কিছু এলাকা এবং গ্রামগঞ্জের দোকানগুলোতে ওইসব নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়ে থাকে। দাম কম হওয়ায় পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের এসব পণ্যের প্রতি চাহিদাও একটু বেশি। অন্যদিকে মানহীন এসব পণ্য ক্রয় করে ত্বকের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যেই থাকছেন সাধারণ মানুষ। এসব রূপচর্চার বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত হয় স্টিয়ারিক, প্যারাবেন, মিথাইল, জিঙ্ক, চর্বি ও সাইট্রিক এসিড।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেলের চর্ম বিভাগের ডা. মো. শাহজাহান জানান, সাইট্রিক এসিড, চর্বি ও জিংক থাকার ফলে ত্বক খুব অল্পদিনে সুন্দর হয়। কিন্তু হঠাৎ করে এ পণ্য ব্যবহার বন্ধ করে দিলে ব্যবহারকারীকে অধিক বয়স্ক দেখা যায় এবং ত্বকে স্থায়ী কালো দাগসহ অন্যান্য চর্ম রোগ জন্ম নেয়।

সূত্রঃ সাপ্তাহিক ২০০০

দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অর্গানিক কৃষিপণ্য


অর্গানিক কৃষিপণ্য : ছয় হাজার কোটি ডলারের বাজারে নেই বাংলাদেশ
মীর মনিরুজ্জামান

দুনিয়াজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অর্গানিক কৃষিপণ্য। বাড়ছে এ পদ্ধতির চাষাবাদও। সত্তরের দশকের আগ পর্যন্ত অর্গানিক চাষেই নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে এ চাষাবাদ। এ দেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু অর্গানিক কৃষির জন্য উপযোগী হলেও অধিকাংশ কৃষক এখন মনে করেন, অর্গানিক চাষ আর লাভজনক নয়। এ পদ্ধতির চাষ বিলীন বলেই ৬ হাজার কোটি ডলারের অর্গানিক পণ্যের বাজারে নেই বাংলাদেশ।
ইউরোপীয় রিসার্চ প্রতিষ্ঠান এফআইবিএলের এক গবেষণায় দেখা যায়, গত এক দশকে অর্গানিক কৃষিপণ্যের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০০ শতাংশ। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাপী এ খাতের বাজার ছিল ১৮ বিলিয়ন ডলার, ২০০৯ সালে যা উন্নীত হয় ৫৪ বিলিয়ন ডলারে। ধারণা করা হচ্ছে বর্তমানে তা ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্গানিক পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ফ্রান্স। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এ বাজার ছিল ২৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ইউরোপে ২৫ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জার্মানিতে ৮ বিলিয়ন ও ফ্রান্সে ছিল ৪ বিলিয়ন ডলার।
কৃষিবিদদের মতে, সত্তরের দশকের আগে অর্গানিক পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশের কৃষি। মূলত সত্তরের দশক থেকে জনসংখ্যা বাড়ার চাপে এ দেশে রাসায়নিক সারের মাধ্যমে উচ্চফলনশীল শস্যের চাষাবাদ শুরু হয়। এরপর খুব দ্রুতই হারিয়ে যায় অর্গানিক পদ্ধতির আবাদ। সীমিত কৃষিজমি, অবকাঠামো সমস্যা, নীতিমালা ও তদারকির অভাবে এ পদ্ধতি এখন আর লাভজনক নয় বলে মনে করেন অধিকাংশ কৃষক।
জানা গেছে, ধান উত্পাদনে পৃথিবীর শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ থাকলেও অর্গানিক ধান উত্পাদনে কোনো অবস্থান নেই দেশটির। ধানের পাশাপাশি পাট ও তুলার ক্ষেত্রেও একই অবস্থান। কেবল অর্গানিক চা উত্পাদনে কিছুটা এগিয়ে বাংলাদেশ।
২০০০ সালে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় জেমকন গ্রুপ শুরু করে দেশের প্রথম অর্গানিক চা বাগান। প্রতিষ্ঠানটির তেঁতুলিয়া ব্র্যান্ডের চা এখন লন্ডনের দামি সুপার শপ হ্যারডসে প্রিমিয়াম প্রাইসে বিক্রি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্গানিক সুপার শপ হোল ফুডের ১০০টি আউটলেটসহ নিউজিল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও কুয়েতের বাজারেও বিক্রি হচ্ছে তেঁতুলিয়া চা। হোয়াইট, লেমন গ্রাস, মিন্ট, বেঙ্গল ব্রেকফাস্টসহ ৯টি ফ্লেভারে তেঁতুলিয়া চা দেশের পাশাপাশি বিদেশেও বাজারজাত করছে জেমকন গ্রুপ। চা নিলামের বাজারে গত ৫ বছর সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে এ অর্গানিক চা।
 
জেমকন গ্রুপের সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার আসমা-উল রুকসানা এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে ও বিদেশে অর্গানিক পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে অর্গানিক কৃষির সম্ভাবনাও অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাধা নেই। গুণগতমান বজায় রেখে পণ্য উত্পাদন করলেও এটি একটি লাভজনক পদ্ধতি।
জেমকন গ্রুপের পাশাপাশি প্রশিকা, প্রবর্তণাসহ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অর্গানিক পদ্ধতিতে অল্প কিছু সবজিজাতীয় পণ্য উত্পাদন করে। তবে বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা, পাট, তুলা, ধানসহ সবজি চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলার পতিত জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বিশ্ববাজারে অবস্থান সৃষ্টি করতে পারে বাংলাদেশ।
 
বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবদুল লতিফ এ ব্যাপারে বলেন, পাহাড়ি এলাকার পতিত জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করার জন্য এলাকার জনগণকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ি এলাকার মানুষ জৈব সার ব্যবহারে অভ্যস্ত নয়। তারা জুম চাষেই অভ্যস্ত।
তিনি আরও বলেন, দেশে জমি কম কিন্তু মানুষ বেশি। এ কারণে অর্গানিক চাষাবাদেও নীতিমালা হচ্ছে না। তবে জৈব সার উত্পাদনের জন্য প্রকল্প রয়েছে। মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। প্রতিটি বাড়িতে যদি সব ধরনের আবর্জনা দিয়ে জৈব সার তৈরি করা হয়, তাহলে এ চাষাবাদ বৃদ্ধি পাবে।
জানা গেছে, এশিয়ার ৩৬ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। প্রায় সাড়ে ৭ লাখ উত্পাদননকারী এর সঙ্গে জড়িত। এর বেশির ভাগই চীন ও ভারতে। চীনে প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর ও ভারতে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। ২০১১ সালে ইউরোপীয় জার্নাল অব সোস্যাল সাইন্সের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মাত্র ১ হাজার ১৬২ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়।
এ ব্যাপারে ফ্রেন্ডস ইন ভিলেজ ডেভেলপমেন্ট বাংলাদেশের (এফআইভিডিবি) কনসালটেন্ট ও জৈব কৃষি পরামর্শক ড. শেখ তানভীর হোসেন বলেন, নীতিগত সমস্যার কারণে বাংলাদেশে অর্গানিক কৃষির বিকাশ হচ্ছে না। কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব, অর্গানিক সনদ প্রদানকারী কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকা ও বাজারজাতকরণে সমস্যাসহ কৃষি জমির অভাবে এর বিস্তার নেই। তবে অর্গানিক কৃষি প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। জৈব সার উত্পাদন ও ধানক্ষেতে হাঁস পরিপালন এর একটি বড় দৃষ্টান্ত। কেঁচো কম্পোস্ট সারের সুনাম দেশের বাইরেও রয়েছে। সঠিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে ইউরোপে মতো অর্গানিক পদ্ধতিতেও বাংলাদেশে অধিক ফলন সম্ভব।
 
অর্গানিক চাষাবাদে বিশ্বের শীর্ষে ইউরোপ। মোট অর্গানিক চাষের ২৫ শতাংশ হয় এ মহাদেশে। ৯৩ লাখ হেক্টর জমির এ চাষাবাদে আড়াই লাখেরও বেশি ফার্ম জড়িত। স্পেনে ১৩ লাখ, ইতালিতে ১১ লাখ ও জার্মানিতে সাড়ে ৯ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক চাষ হয়। ইউরোপের পাশাপাশি এ পদ্ধতির চাষাবাদে এগিয়ে যাচ্ছে ল্যাটিন আমেরিকাও। এ অঞ্চলে প্রায় ৮৬ লাখ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতিতে চাষ হয়। পৃথিবীর মোট অর্গানিক কৃষি জমির ২৩ শতাংশই রয়েছে ল্যাটিন আমেরিকায়। আর্জেন্টিনায় ৪৪ লাখ ও ব্রাজিলের ১৮ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ হয়। আফ্রিকায় ১০ লাখ হেক্টর জমিতে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ হয়। প্রায় ৫ লাখ কৃষক এর সঙ্গে জড়িত। উগান্ডা বছরে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ডলারের অর্গানিক পণ্য রফতানি করে।

সূত্রঃ বণিক বার্তা রিপোর্ট

যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের হার এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে


যুক্তরাষ্ট্রে কম মজুরিতে দক্ষ কর্মী পাচ্ছে বিএমডব্লিউ

যুক্তরাষ্ট্রে কম বেতনে দক্ষ কর্মী পাচ্ছে জার্মান গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিএমডব্লিউ। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসাটা সুবিধা হিসেবে দেখা দিয়েছে বিদেশী এ কোম্পানিটির কাছে। জার্মানির একটি কারখানায় কর্মীদের যেখানে ঘণ্টায় ৩৩ ডলার পারিশ্রমিক দিতে হয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫ ডলারে একই মানের কর্মী পাচ্ছে তারা। তা সত্ত্বেও এটিকে ‘উইন-উইন’ সম্পর্ক হিসেবে দেখছে বিএমডব্লিউ ও তাদের যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা। খবর ওয়াশিংটন পোস্টের। 
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কারখানায় ১ হাজারেরও বেশি কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দেয় জার্মান এ প্রতিষ্ঠানটি। তবে এ নিয়োগ সরাসরি নিজেরা না দিয়ে ঠিকাদারের মাধ্যমে দেয়ার কথা জানিয়েছে।
 
চলমান মন্দায় যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নয়নশীল বিশ্বের কারখানাগুলোয় ছাঁটাইয়ের কারণে হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারায়। এর কবল থেকে বাদ পড়েনি দক্ষ কর্মীরাও। তারা এখন বিদেশী কোম্পানির কারখানায় চাকরির জন্য ধরনা দিচ্ছেন। এমনকি আগের চেয়ে অনেক কম মূল্যে শ্রম বেচতেও প্রস্তুত তারা, যা যুক্তরাষ্ট্রে আগে কখনো দেখা যায়নি।
 
সেন্ট্রার ফর অটোমোটিভ রিচার্সের শ্রম ও শিল্প গ্রুপের পরিচালক ক্রিশ্চিন ডিচেক বলেন, ‘আমরা জার্মানির তুলনায় কম মজুরির দেশে বাস করি এবং এটিই তাদের এখানে কর্মসংস্থান তৈরিতে উত্সাহ জোগাচ্ছে।’
 
শুধু বিএমডব্লিউ নয়, জেনারেল মোটরস ও ক্রাইসলারের মতো কোম্পানিগুলোও এখানে ঘণ্টায় ১৪ ডলার মজুরিতে নতুন কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। এ মজুরি জার্মানির যেকোনো কারখানায় দেয়া মজুরির তুলনায় প্রায় অর্ধেক। তবে নিম্ন মজুরিতে হলেও কর্মসংস্থানের এ সুযোগে খুশি যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা।
 
আড়াই বছর আগে ইলেকট্রোলাক্সের একটি কারখানা থেকে চাকরিচ্যুত ডেবরা হ্যারিসন বিএমডব্লিউ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি সততার সঙ্গে বলছি, জীবনে যত জায়গায় চাকরি করেছি তার মধ্যে এটিই সেরা কর্মস্থল।’ চলতি বছরের জুলাইয়ে তিনি বিএমডব্লিউতে যোগ দেন।
 
উইন-উইন সম্পর্ক: যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের হার এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে পৌঁছলেও বিএমডব্লিউ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এখানে কারখানা স্থাপনের ১৬ বছর ধরেই নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে আসছে জার্মান এ প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে তাদের ৭ হাজার কর্মী নিয়োজিত। এ ছাড়া গাড়ির যন্ত্রাংশ বিপণন ও সরবরাহ খাতে আরও অনেক অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে তারা।
বিএমডব্লিউ জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের উত্পাদিত গাড়ির ৭০ ভাগই রফতানি করা হয়। তাদের এ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি ওবামা প্রশাসনের বাণিজ্য বিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রিক সি ওয়াডে প্রতিষ্ঠানটিকে অন্যদের জন্য ‘উদাহরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সম্প্রতি তিনি বিএমডব্লিউর কারখানা পরিদর্শন করেন।
 
তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের জার্মানির কারখানার শ্রমিকদের দেয়া সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জার্মান অ্যাসোসিয়েশন অব অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে অন্যান্য সুবিধাসহ প্রতি ঘণ্টার মজুরি হচ্ছে ৪৬ ইউরো, যা যুক্তরাষ্ট্রে ২৬ ইউরো।

সূত্রঃ
বনিকবার্তা

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.

Join 65 other followers